বিশ্বব্যাপী রেল সবচেয়ে নিরাপদ যোগাযোগ ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচিত। কিন্তু বাংলাদেশে রেল ব্যবস্থাও ক্রমেই অনিরাপদ হয়ে উঠছে। নিয়মিত বিরতিতে ঘটছে দুর্ঘটনা। বাড়ছে প্রাণহানিও। শুক্রবার এমনই এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটেছে চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে। মারা গিয়েছে ১১ জন। বাকি ছয়জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। রেল দুর্ঘটনার বেশির ভাগই ঘটছে ক্রসিংয়ে। তথ্য বলছে, দেশে বিদ্যমান ক্রসিংয়ের ৮২ শতাংশই অরক্ষিত। অর্থাৎ ট্রেন চলাচলের সময় যানবাহন আটকানোর ব্যবস্থা নেই। এসব অনিরাপদ রেলক্রসিংই দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। লেভেল ক্রসিংগুলো নিরাপদ করা গেলে রেল দুর্ঘটনা অনেকাংশে কমে আসবে বলে বিশেষজ্ঞদের মত। এটা আমলে নিয়ে রেল কর্তৃপক্ষের কার্যকর ব্যবস্থা কাম্য।

রেল ও সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থায় লেভেল ক্রসিং একটা অত্যাবশ্যকীয় অনুষঙ্গ। কিন্তু বাংলাদেশে এটি অনেকটা অবহেলার দৃষ্টিতে দেখা হয়। বণিক বার্তার সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, দেশে বর্তমানে রেলক্রসিং রয়েছে ২ হাজার ৮৫৬টি। এর মধ্যে ১ হাজার ৪৯৫টি রেলক্রসিং বৈধ ও ১ হাজার ৩৬১টি অবৈধ। বৈধ ও অবৈধ এসব লেভেল ক্রসিংয়ের কোথাও নেই গেটম্যান, আবার কোথাও নেই গেটবার। আরো উদ্বেগের হলো, এগুলোর প্রকৌশলগত মান নিয়ে রয়েছে প্রশ্ন। সড়কের উচ্চতার সঙ্গে ক্রসিংয়ের উচ্চতার সামঞ্জস্য নেই। অধিকাংশ লেভেল ক্রসিংয়ে রাস্তা ভাঙা ও খানাখন্দময়। পেভমেন্টজনিত ত্রুটিও বিদ্যমান। ফলে লেভেল ক্রসিংয়ে এসে গাড়িচালকরা গাড়ির গতি কমিয়ে আনতে বাধ্য হন। হঠাৎ করে গতি পরিবর্তন করায় অনেক সময় গাড়ির স্টার্ট বন্ধ হয়ে যায়। আবার বর্ষা ও গরমের সময় লেভেল ক্রসিংগুলো পিচ্ছিল হয়ে থাকে। ফলে এখান দিয়ে গাড়ি চলাচলের সময় ব্রেকিং সিস্টেম ঠিকমতো কাজ করে না। লেভেল ক্রসিং তৈরি নিয়ে সুচিন্তিত কোনো পরিকল্পনা নেই। সিটি করপোরেশন, এলজিইডি, সওজ নিজেদের মতো করে লেভেল ক্রসিং তৈরি করছে। অনেক ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের সহায়তাও নেয়া হয় না। স্বভাবত রয়ে যাচ্ছে নকশা ও নির্মাণগত ত্রুটি। সিগন্যালিং ও ক্রসিং ব্যবস্থাপনায়ও আছে নানা অসংগতি। সব মিলিয়ে দেশে লেভেল ক্রসিংগুলো যেন ক্রমেই মৃত্যুফাঁদ হয়ে উঠছে।

বিশ্বের সবচেয়ে ব্যস্ত রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা ইংল্যান্ডের। দেশটিতে কয়েক হাজার লেভেল ক্রসিং ও অনেক বেশি ফ্রিকোয়েন্সিতে ট্রেন চললেও দুর্ঘটনা খুব কম। এর পেছনে কাজ করেছে দেশটির রেল বিভাগের গাইডলাইন ও আইন। লেভেল ক্রসিং তৈরি, পরিচালনা ও নকশাসম্পর্কিত বিস্তারিত গাইডলাইন রয়েছে। মহাসড়কের লেভেল ক্রসিং কোন নকশা, কোন কাঁচামাল ও কীভাবে নির্মিত হবে, ঢাল কেমন হবে, কোন ধরনের গাড়ি চলবে, রেলের গতি কেমন হবে প্রভৃতির অনুপুঙ্খ নির্দেশনা রয়েছে এতে। ভারতেও রেলের লেভেল ক্রসিং নির্মাণ থেকে শুরু করে ব্যবস্থাপনা সব বিষয়ে একটি কার্যকর গাইডলাইন রয়েছে, যা সড়ক ও রেল বিভাগ মেনে চলে। এমনকি ক্রসিং নির্মাণের আগে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের পরামর্শ ও অনুমতি নিতে হয়। দায়িত্বপ্রাপ্তরা ঠিকমতো দায়িত্ব পালন করছে কিনা, সিগন্যালিং যথাযথ হচ্ছে কিনা, তা নিবিড়ভাবে তদারক করা হয়। আজকাল এক্ষেত্রে তারা প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াচ্ছে। এর সুফলও মিলছে। বড় দেশ হয়েও সেখানে রেল দুর্ঘটনা অনেকটা কমে আসছে।

বলা হচ্ছে, দেশের রেল ব্যবস্থা শক্তিশালী করা হচ্ছে। গত এক যুগে রেলপথে ১ লাখ ৬৩ হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। অথচ লেভেল ক্রসিংয়ের দুর্ঘটনা রোধে তেমন কোনো বড় অংকের অর্থের প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়নি। রেলে চলমান যে বরাদ্দ আছে এর ১ শতাংশের কম বিনিয়োগ করলেও রেলপথ অনেকটা নিরাপদ হবে বলে অনেকের মতামত রয়েছে। কিন্তু রেলের কর্মকর্তাদের এসব দিকে মনোযোগ নেই, এটা দুঃখজনক। 

আমরা দেখছি, রেলপথে একটি দুর্ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই আরেকটির পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। অরক্ষিত রেলক্রসিংয়ে ছোট একটি সতর্কীকরণ নোটিস টানিয়ে কর্তৃপক্ষ দায় সারে। দুর্ঘটনা ঘটলে দায়ী ব্যক্তিকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কিন্তু তদন্ত কমিটির রিপোর্টের সুপারিশ অনুযায়ী কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয় না। এটা যেন রীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ প্রবণতা থেকে রেল কর্তৃপক্ষকে বেরিয়ে আসতে হবে। রেলে নতুন কোচ ও ইঞ্জিন আনা হচ্ছে। সামনে ফ্রিকোয়েন্সি আরো বাড়বে। স্বভাবত দুর্ঘটনাও আরো বাড়বে। তাই লেভেল ক্রসিং নিরাপদ করার ব্যাপারে আরো মনোযোগ দেয়া সময়ের দাবি। সেক্ষেত্রে সর্বাগ্রে লেভেল ক্রসিং নির্মাণ, ব্যবস্থাপনা ও এর নিরাপত্তা নিশ্চিতে একটি কার্যকর গাইডলাইন প্রণয়ন করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সেটি মেনে চলতে অন্যদেরও তাগিদ দিতে হবে। রেলপথ মন্ত্রণালয়ের অনুমতি ব্যতিরেকে বা নির্ধারিত নকশার বাইরে গিয়ে লেভেল ক্রসিং নির্মাণ না করা হয়, তা নিশ্চিত করতে তদারকি জোরদার করতে হবে। অবৈধ রেলক্রসিং বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। সর্বোপরি যানবাহনের চালক, পথচারীসহ সাধারণ মানুষের সচেতনতা বাড়ানোও প্রয়োজন।

মিরসরাইয়ের সাম্প্রতিক দুর্ঘটনা অরক্ষিত রেলক্রসিং এবং সংশ্লিষ্টদের দায়িত্ব পালনে উদাসীনতার বিষয়টি আবারো স্পষ্ট করেছে। এ প্রেক্ষাপটে রেলে দুর্ঘটনা কীভাবে কমানো যায় তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা চলছে। রোড সেফটি ফাউন্ডেশন এরই মধ্যে বেশকিছু সুপারিশ দিয়েছে।  সেগুলো বিবেচনায় নেয়া জরুরি। রেল সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়নে বহু প্রকল্প নেয়া হচ্ছে। কিন্তু রেলের অন্যতম বড় সমস্যা রেলক্রসিং সুরক্ষিত করার ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ দৃশ্যমান হচ্ছে না। ফলে এগুলো অরক্ষিত মৃত্যুফাঁদ হয়ে থাকছে। রেলক্রসিংয়ে দুর্ঘটনার কারণগুলো সঠিকভাবে চিহ্নিত করে প্রতিকারের ব্যবস্থা নেয়া দরকার। বিদ্যমান কাঠামোগত ত্রুটিও দূর করতে হবে। রেলপথ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগী ভূমিকাই প্রত্যাশিত।