করোনাকালে বিভিন্ন শিল্প ও ব্যবসা খাতের ঝুঁকি মোকাবেলায় সরকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে, যার বেশির ভাগই স্বল্প সুদে ও সহজ শর্তের ঋণ। এতে তৈরি পোশাক খাতসহ বড় শিল্প-ব্যবসা ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প উদ্যোক্তাদের জন্যও সরকার প্রণোদনা দিয়েছে। কিন্তু অধিকাংশ নারী উদ্যোক্তা এ সুবিধা পাচ্ছেন না। সম্প্রতি গবেষণা সংস্থা সিপিডি আয়োজিত এক সেমিনারে অংশগ্রহণকারী আলোচকরা বলেছেন, অতিমারীর সময়কালে সরকার ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজগুলো নারীদের জন্য তেমনভাবে কার্যকর হয়নি। বেশির ভাগ নারী এসব প্যাকেজ সম্পর্কে অবগতও নন। কাগজপত্রসহ নানা জটিলতার কারণে অনেকের মধ্যে ঋণের আবেদনে অনিচ্ছা লক্ষ করা গেছে। এ কারণে নারী উদ্যোক্তাদের বিশেষ ও নগদ সহায়তা প্রদানের সুপারিশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের নারী উদ্যোক্তারা কভিড মহামারীর কারণে পুঁজি হারিয়েছেন, ফলে তারা তাদের প্রতিষ্ঠান চালাতে পারছেন না এবং কর্মী ছাঁটাই করতে হয়েছে। এসব সমস্যা নিরসনে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশেষ উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন।

অধিকাংশ নারী উদ্যোক্তার প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নেই। আবার যে আয় বা ব্যয় দেখিয়ে তারা ব্যাংকঋণের জন্য আবেদন করবেন, যেমন মেশিনারিজ, কাঁচামাল, সেগুলোও ব্যাংকের কাছে খুব একটা গ্রহণযোগ্যতা পায় না। সরকার ঘোষিত প্রণোদনা এ খাতের উদ্যোক্তাদের জন্য খুব একটা সহায়কও হচ্ছে না। কেননা প্রণোদনার ঋণ পাওয়া যাবে স্বল্প সময়ের জন্য। এ সময়ে ব্যবসা করে সেই টাকা ফেরত দেয়া কঠিন বৈকি। এ খাতের নারী উদ্যোক্তাদের ঘুরে দাঁড়াতে দরকার সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা এবং সর্বোপরি ব্যাংকগুলোর উদ্যোক্তাবান্ধব মানসিকতা। মানে সহজ শর্তে ঋণ দেয়া এবং গ্রেস পিরিয়ড বাড়ানো। একথা সত্য, যেকোনো ব্যবসা শুরু করার জন্য ট্রেড লাইসেন্স বা নিবন্ধন জরুরি। এক্ষেত্রে নারী উদ্যোক্তাদের যেমন এগিয়ে আসতে হবে, তেমনি নিবন্ধনের শর্তও শিথিল করতে হবে সরকারকে। এ উদ্যোক্তাদের বেশির ভাগই বাসাবাড়িতে বসে অনলাইন, ফেসবুক, অ্যাপ প্রভৃতি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগপূর্বক ব্যবসা করেন। অন্য ব্যবসায়ীদের মতো তাদের অবকাঠামো সুবিধা নেই। তারা যাতে নিবন্ধন ও ঋণসহায়তা পেতে পারেন, সেজন্য আইন শিথিল করা যেতে পারে। বর্তমান পরিস্থিতিতে করোনার কারণে এরই মধ্যে যেসব নারী উদ্যোক্তার ব্যবসা বন্ধ হয়ে গেছে, তালিকা করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তাদের সহজ শর্তে ও স্বল্প সুদে ঋণ দেয়া হোক। যেসব উদ্যোক্তা ধারকর্জ করে ব্যবসা টিকিয়ে রেখেছেন, তাদেরও ঋণ পাওয়া নিশ্চিত করতে হবে।

সিএমএসএমই ব্যবসার একটি বড় অংশই অনানুষ্ঠানিক খাতের, যাদের ব্যাংক থেকে ঋণ পাওয়ার সুযোগ সীমিত। এ খাতকে টেকসই ও বিকশিত করতে বর্তমান প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় ঋণ দেয়ার সময়সীমা বাড়ানো এবং শর্ত সহজ করতে হবে। নথিগত সমস্যা, জামানত ও সুসম্পর্কের অভাবে ঝুঁকি বিবেচনায় ব্যাংকগুলো সিএমএসএমই খাতে ঋণ দিতে অনাগ্রহ দেখাচ্ছে। এ খাতে ঋণ দেয়ার ব্যয় অনেক বেশি বলেও দাবি করছে তারা। এছাড়া সিএমএসএমইর সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্যভাণ্ডার না থাকায় এ প্রণোদনা প্যাকেজের সুবিধা অনেকেই নিতে পারছেন না। শহরের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো প্রণোদনা প্যাকেজের ঋণ কিছুটা পেলেও জেলা শহরের ব্যবসায়ীরা বঞ্চিত হচ্ছেন। গ্রামাঞ্চলের উদ্যোক্তাদের অনেকেই এ ঋণ কার্যক্রম সম্পর্কে জানেন না। তথ্য ঘাটতির অভাবও বড় সমস্যা। এসব সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশ ব্যাংককেই এগিয়ে আসতে হবে। নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ ডেস্ক চালু করতে নির্দেশনা প্রদান করতে পারে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। একই সঙ্গে ঋণ গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করতে প্রচারণা, ব্যাংকগুলোতে নারী উদ্যোক্তাদেরে জন্য ওয়ানস্টপ সার্ভিস চালু করা প্রয়োজন। ব্যাংকগুলো ক্ষুদ্র ও মাঝারি নারী উদ্যোক্তাদের ঠিকমতো সহায়তা ও ঋণ প্রদান করছে কিনা, তা-ও তদারক করা উচিত।

সরকার বা দাতা সংস্থার উদ্যোগে নারী উদ্যোক্তাদের পুনরায় ব্যবসা শুরুর জন্য কার্যকরী মূলধনের ব্যবস্থা করা এক্ষেত্রে বড় সমাধান হতে পারে। তৃণমূল পর্যায়ে নারী উদ্যোক্তাদের প্রণোদনা প্যাকেজের ঋণ নিশ্চিত করতে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা থাকা জরুরি। প্রণোদনা প্যাকেজটি দ্রুত বিতরণ নিশ্চিত করার পাশাপাশি ঋণের কিস্তির সময়সীমা বাড়ানো দরকার। অনলাইন ব্যবসা পরিচালনার জন্য সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে নারী উদ্যোক্তাদের আইসিটি, ই-কমার্স, ডিজিটাল ব্যাংকিং, ডিজিটাল পেমেন্ট পদ্ধতি ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা বিষয়ে সচেতনতা ও দক্ষতা বাড়ানোর ব্যবস্থা করা যেতে পারে। কভিড-১৯ মহামারীকালীন সরকারের পক্ষ থেকে যেসব আর্থিক প্যাকেজ বা বিশেষ সুবিধা প্রণয়ন করা হয়েছে, তার কতটুকু জেন্ডার সংবেদনশীল ছিল এবং নারীদের এ মহামারীর প্রভাব কাটিয়ে উঠতে তা কীভাবে সহায়তা করেছে, তা-ও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। ব্যাংকের মাধ্যমে নারী উদ্যোক্তারা কীভাবে সহজে অর্থ পেতে পারেন, তার নীতি-বিধান প্রণয়নে বাংলাদেশ ব্যাংককে আরো সক্রিয় হতে হবে। 

ভারত সরকারও গ্রামীণ কর্মসংস্থান নিশ্চয়তা স্কিম ও পিএম কিষাণের মতো কর্মসূচির আওতায় নগদ সহায়তা প্রদান করছে নারীদের। করোনায় অধিক ক্ষতিগ্রস্তদের কাছে পৌঁছতে কেন্দ্রীয়ভাবে উন্নয়ন করা হয়েছে ন্যাশনাল আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেম ও সামাজিক সুরক্ষা সরবরাহ কার্যক্রমের। শ্রীলংকার সরকার ন্যাশনাল সোসিও-ইকোনমিক রেজিস্ট্রি ব্যবহারের মাধ্যমে সুবিধাবঞ্চিতদের চিহ্নিত করছে। প্রণোদনা প্যাকেজের সুবিধাগুলো যাতে সঠিক ভুক্তভোগীর কাছে পৌঁছানো যায়, তার জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে বায়োমেট্রিক পেমেন্ট সিস্টেম; যা জাতীয় পরিচয়পত্র নিবন্ধনের সঙ্গে সংযুক্ত। ‘সমৃদ্ধি’ কর্মসূচির আওতায় নগদ টাকা সরবরাহের মাধ্যমে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে শ্রীলংকার সরকারের সহযোগিতা পৌঁছে দেয়া হচ্ছে। বাংলাদেশেও সরাসরি করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত নারী উদ্যোক্তাদের চিহ্নিতপূর্বক তাদের কাছে যাতে সহায়তা পৌঁছে দেয়া যায়, তার জন্য দ্রুত কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে।