পুরান ঢাকায় রাসায়নিক কারখানা-গুদাম থেকে সৃষ্ট অগ্নিদুর্ঘটনা অনেকটা নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। কয়েক বছর পর পরই ঘটছে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি। আবারো সেখানে অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ ঝরল। শুক্রবার আরমানিটোলার যে ছয়তলা ভবনটিতে আগুন লেগেছিল, তার নিচতলায় ছিল দোকান ও রাসায়নিকের গুদাম। বাকি পাঁচতলা ছিল আবাসিক। মূলত রাসায়নিকের গুদাম থেকেই আগুনের সূত্রপাত। এ অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারিয়েছেন চারজন এবং হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ২০ জন।

আরমানিটোলা ট্র্যাজেডির পর আবারো নতুন করে সামনে এসেছে আবাসিক এলাকায় দাহ্য রাসায়নিক মজুদের ভয়াবহতার বিষয়টি। প্রতিটি দুর্ঘটনার পর কর্তৃপক্ষের কিছুটা টনক নড়লেও কিছুদিনের মধ্যেই তা থেমে যায়। বলা চলে, অবহেলাজনিত কারণে পুরান ঢাকা থেকে অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি আর গেল না। ২০১০ সালে নিমতলীতে ভয়াবহ আগুনে মারা যায় ১২৫ জন। ২০১৯ সালে চুড়িহাট্টার ওয়াহিদ ম্যানশনে রাসায়নিকের গুদামে বিস্ফোরণে আগুনে পুড়ে মারা যায় ৭১ জন। ওই বিস্ফোরণের কারণ ছিল রাসায়নিক দ্রব্য। একইভাবে নিমতলীর আগুনের কারণও ছিল রাসায়নিক দ্রব্য, যা জুতার আঠা তৈরির জন্য ব্যবহার করা হয়। নিমতলীর মর্মান্তিক ঘটনার পর রাসায়নিকের গুদাম ও দাহ্য পদার্থ ব্যবহার করে তৈরি পণ্যের কারখানা পুরান ঢাকা থেকে মুন্সীগঞ্জে সরিয়ে নেয়ার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনামতে রাসায়নিক পল্লী করার কাজও শুরু হয়। কিন্তু এখনো সেই কাজ শেয় হয়নি। নয় বছর পর চুড়িহাট্টার ঘটনার পরে গাজীপুরের টঙ্গী ও রাজধানীর শ্যামপুরে অস্থায়ীভাবে রাসায়নিকের ব্যবসা সরিয়ে নেয়ার উদ্যোগও মাঝপথে থমকে যায়। সরেনি রাসায়নিকের গুদাম ও কারখানা। এক্ষেত্রে কেন অগ্রগতি ঘটেনি বা কারা দায়ী, তা খতিয়ে দেখা জরুরি। 

এক হিসাব বলছে, পুরান ঢাকায় রয়েছে ২৫ হাজার রাসায়নিক দাহ্য বস্তুর গুদাম। এসবের মধ্যে ১৫ হাজার আছে বাসাবাড়িতেই। মাত্র আড়াই হাজার গুদামকে ট্রেড লাইসেন্স দিয়েছে সিটি করপোরেশন। বাকি ২২ হাজারের বেশি গুদামই অবৈধ। আড়াই শতাধিক ক্ষতিকর ও ঝুঁকিপূর্ণ রাসায়নিকের ব্যবসা রয়েছে এলাকায়। অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় অবৈধ কেমিক্যাল ব্যবসায়ীরা তাদের ব্যবসা বাড়িয়েই চলেছেন সেখানে। রাসায়নিকের গুদাম সরানো বাধাগ্রস্ত হওয়ার পেছনেও এই রাজনৈতিক প্রভাব কাজ করছে বলে স্থানীয়দের ভাষ্য। সুতরাং বিষয়টি আমলে নিয়ে সরকারের বলিষ্ঠ উদ্যোগ নিতে হবে বৈকি।

নিমতলী ট্র্যাজেডির পর দুর্ঘটনা রোধে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে গঠিত কমিটি রাসায়নিক কারখানা অপসারণসহ ১৭ দফা নির্দেশনা দেয়। উচ্চপর্যায়ের সেই কমিটির দেয়া সুপারিশমালা বাস্তবায়ন না করায় পরে রুল জারি করেন হাইকোর্ট। চুড়িহাট্টার ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার তদন্ত শেষে অগ্নিদুর্ঘটনার ঝুঁকিতে থাকা পুরান ঢাকায় অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধে আবার ২৫টি সুপারিশ করে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের গঠিত কমিটি। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটিও পাঁচটি স্বল্পমেয়াদি ও ২৬টি দীর্ঘমেয়াদি সুপারিশ করে। তদন্ত কমিটিগুলোর সুপারিশ বাস্তবায়ন করা গেলে হয়তো অনেক সমস্যার সমাধান হতো। পুরান ঢাকার ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থার পরিবর্তন ঘটত। কিন্তু সব সুপারিশ শুধু কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ। সরানো হয়নি রাসায়নিকের গুদাম। অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি নিয়েই বসবাস করতে হচ্ছে পুরান ঢাকার বাসিন্দাদের। এ অবস্থায় পুরান ঢাকা থেকে অবিলম্বে সব রাসায়নিকের কারখানা ও গুদাম সরাতে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়ার বিকল্প নেই।

কথা ছিল মুন্সীগঞ্জে বিসিক কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক নির্মাণ প্রকল্প ২০২২ সালের জুনের মধ্যে বাস্তবায়ন করা হবে। তবে বণিক বার্তায় প্রকাশিত সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত প্রকল্পের অগ্রগতি কেবল মাটি ভরাটের কাজ শুরু হওয়ার মধ্যেই সীমিত। এটা হতাশাজনক। মুন্সীগঞ্জের প্রকল্প এলাকা তৈরি হওয়ার আগে সাময়িকভাবে রাসায়নিক কারখানাগুলো ঢাকার শ্যামপুরে উজালা ম্যাচ ফ্যাক্টরিতে সরিয়ে নেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয় ২০১৯ সালে। চুড়িহাট্টার দুর্ঘটনার পর ছয় মাসের মধ্যে এসব রাসায়নিকের গুদাম ও কারখানা সরানোর জন্য সময়সীমা বেঁধে দেয়া হয়। কিন্তু দুই বছরেও তা সরেনি। এক্ষেত্রে বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতাগুলো চিহ্নিত করে রাসায়নিক কারখানা স্থানান্তরের কাজটি বেগবান করতে হবে।

একটি প্রবণতা লক্ষণীয় যে, প্রতিটি আগুনের ঘটনার পর পুরান ঢাকার আবাসিক এলাকা থেকে রাসায়নিকের গুদাম সরানোর তোড়জোড় শুরু হয়। গঠন করা হয় নানা কমিটি ও কমিশন। একের পর এক সুপারিশ ও নির্দেশনা দেয়া হয়। কিন্তু পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেই থেমে যায় সবকিছু। এ যেন একটি স্থায়ী সংস্কৃতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এবার এর ব্যত্যয় আশা করব। সম্প্রতি অগ্নিকাণ্ডে ঘটা প্রাণহানি নিছকই দুর্ঘটনা নয়, এটিকে অবহেলাজনিত হত্যা বলা যায়। কেননা গৃহীত উদ্যোগগুলো বছরের পর বছর ঝুলে থাকার ফলেই এ দুর্ঘটনা ঘটেছে। এর দায় ভবন মালিক, ব্যবসায়ীর যেমন, তেমনি এর দায় সিটি করপোরেশনসহ সরকারি কর্তৃপক্ষগুলোর। এ দায় তারা এড়াতে পারে না। সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে আলোচ্য দুর্ঘটনার জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা এবং পুরান ঢাকা থেকে দ্রুত রাসায়নিক মজুদ অপসারণ করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হবে, এটিই প্রত্যাশা।