অস্বীকার করার উপায় নেই যে এক বিস্ময়কর বহুমাত্রিক প্রতিভার নাম আকবর আলি খান। প্রাবন্ধিক, প্রশাসক, সুবক্তা, শিক্ষক, সমাজসচেতক এবং নিপাট ভালো মানুষ—এমন বহুবিধ বিশেষণে তাকে বিশেষায়িত করা যেতে পারে। তবে আমার দৃষ্টিতে তিনি যে গভীর গবেষণাসমৃদ্ধ একজন উঁচু মাপের লেখক সে পরিচয়টিই তার টেকসই হবে। নামে জানতাম। কিন্তু সামনাসামনি দেখা হয়নি। প্রথম দেখা হলো ১৯৮০ সালে লন্ডনে, সোয়াসে। তখন আমি পিএইচডি করছিলাম। তিনি তার পিএইচডি শেষ করে কানাডা থেকে দেশে ফিরছিলেন। সামান্য সময়ের দেখা। কিন্তু বুদ্ধিদীপ্ত মৃদুভাষী ড. আকবর আলি খানের সঙ্গে আজীবনের সম্পর্কের সূত্রপাত হলো সেদিনই। এরপর গবেষণা শেষ করে দেশে ফিরে তার সঙ্গে সম্পর্ক আরো গভীরতর হয়েছে। সে সম্পর্কের গভীরতা আজও একই পর্যায়ে আছে। কত কথা! কত স্মৃতি তাকে ঘিরে! তখন তিনি অর্থ সচিব। মন্ত্রী প্রয়াত জনাব কিবরিয়া। আমি তখন সোনালী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে বসি। ব্যাংক খাতের সুশাসনের জন্য তাদের উভয়ের কাছ থেকে পর্যাপ্ত সহায়তা পেয়েছি। একদিন সচিবালয়ে ড. খানের অফিসে গিয়েছি। হঠাৎ একটি টেলিফোন এল। মনে হলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীর টেলিফোন। তিনি বারবার ‘স্যার’ বলছিলেন টেলিফোনে। কোনো একটি প্রকল্পের জন্য হয়তো অর্থছাড় নিয়ে কথা বলছিলেন। খুবই সৌজন্যের সঙ্গে তিনি তাকে বুঝিয়ে দিলেন, ওই প্রকল্পে অর্থছাড়ের কোনো সুযোগ নেই। কেননা এটি এখনো পাস হয়নি। ওপার থেকে মনে হলো অর্থ সচিবের যুক্তি মেনেই নিলেন। যখন মন্ত্রী জোর করছিলেন তখন ড. খান হেসে বলছিলেন, প্রকল্প পাস করা হলে তিনি কেন অর্থ ছাড় করবেন না? তিনি তো চেকবই পকেটে নিয়েই বসে আছেন। রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও সরকারি কর্মকর্তার এমন কথোপকথনে আমি খুবই স্বস্তিবোধ করছিলাম এজন্য যে উভয়ই তাদের দায়িত্বের সীমানার মধ্যে থেকেই কাজ করছিলেন। কেউ সীমা লঙ্ঘনের চেষ্টা করেননি।

আরেকবার জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির একটি পরিবেশ সংরক্ষণ কর্মসূচি এক অবিবেচক সচিবের জন্য বাতিল হতে বসেছিল। সরকারি ও বেসরকারি অনেক অংশীজন এ কর্মসূচির বাস্তবায়নে নিয়োজিত ছিলেন। জাতিসংঘের আবাসিক প্রতিনিধি ওই সচিবের খামখেয়ালিতে কর্মসূচিটি বন্ধ করার উদ্যোগ নিচ্ছিলেন। বাস্তবায়নকারীদের পক্ষ থেকে আমি ড. খানের কাছে যাই। তিনি পুরো ব্যাপারটি শুনে বললেন, ‘খুবই বিপদে ফেললে তুমি। ওই সচিব আমারও ঘনিষ্ঠ। কিন্তু ও যা করছে তাতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেশের বদনাম হচ্ছে। দেখি।’ তিনি কয়েকদিন সময় চাইলেন। খোঁজ-খবর নিয়ে দেখলেন আমাদের অভিযোগ ঠিক। তাই তিনি সরকারের ঊর্ধ্বতন মহলের সঙ্গে কথা বলে ওই সচিবকে সরিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করলেন। নতুন সচিব আসায় কর্মসূচিটি বেঁচে গেল। বাংলাদেশের সঙ্গে জাতিসংঘের সম্পর্কের কোনো ক্ষতিও হলো না। এভাবেই তিনি ‘দুষ্টের দমন ও শিষ্টের লালন’ করতেন।

প্রশাসক হিসেবে কতটা সফল ও সুবিবেচক সে আলাপে না-ই বা গেলাম। তিনি বেঁচে থাকবেন তার অসাধারণ লেখালেখির জন্য। বহুমাত্রিক জীবনঘেঁষা এ লেখক এরই মধ্যে নিজস্ব এক স্টাইল তৈরি করে ফেলেছেন। প্রতিটি বই লেখার আগে তিনি বিস্তর গবেষণা করেছেন। কোনো কোনো বই ২০-২৫ বছর ধরে তথ্য সংগ্রহের পরে লিখেছেন। এমন নিষ্ঠাবান কজন লেখকই বা আছেন আমাদের সমাজে? অর্থনীতির জটিল বিষয়গুলোও তিনি তার স্বভাবসুলভ বৈঠকি ঢঙে হাস্যরসের আবরণে এমনভাবে তুলে এনেছেন যে পাঠকের মন আঠার মতো লেগে থাকে তার বইয়ের পাতায়। সুযোগ পেলেই মোল্লা নাসিরুদ্দীনের গল্প টেনে এনে অর্থনীতির মতো কঠিন বিষয়কে দারুণ উপভোগ্য করে তোলেন।

আর তার লেখার বিষয় নির্বাচনের বৈচিত্র্য দেখে অবাক হতেই হয়। জনগণের বাজেট, দারিদ্র্য নিরসন, অপচয়ের অর্থনীতি থেকে শুরু করে জীবনানন্দের ‘বনলতা সেন’ পর্যন্ত লেখক আকবর আলি খানের স্বচ্ছন্দ বিচরণ। রবীন্দ্র্রনাথও বাদ যাননি। তার রচনাসম্ভার এতই বিচিত্র ও গভীর, এসব পর্যালোচনা করার মতো জায়গা এটি নয়। তবু তার লেখা কয়েকটি বইয়ের আংশিক পর্যালোচনার চেষ্টা করেছি এ লেখায়।

‘বাংলাদেশের বাজেট প্রক্রিয়ায় গণমানুষের অংশীদারত্ব: কতিপয় নীতিমালা সংস্কার’ (২০০৮)।

‘Friendly Fires, Humpty Dumpty Disorder, and Other Essays’ (২০১০).

‘আজব ও জবর আজব অর্থনীতি’ (২০১৩) নামের বইতে অর্থনৈতিক সুশাসনের নানা দিক নিয়ে লিখেছেন ড. আকবর আলি খান। প্রথম বইটি তিনি লিখেছেন সমুন্নয়নের গবেষণার অংশ হিসেবে। আমি জানতাম তিনি ছাড়া বাজেটের এ গভীর দিকগুলো এমন করে আর কেউ তুলে আনতে পারবেন না। শরীর তার ভালো ছিল না, তবু তিনি আমার অনুরোধ ফেলে দেননি। ওই বইয়ের ভূমিকায় তিনি লিখেছেন, ‘বাজেট সম্পর্কে সাধারণ মানুষের জন্য লেখা অত্যন্ত শক্ত কাজ। বিশেষ করে সংবিধান, হিসাববিজ্ঞান, অথনৈতিক ও রাজনৈতিক তত্ত্ব নিয়ে অনেকের ধারণা স্পষ্ট নয়। আমি এ ধারণাগুলোকে সহজ করে লেখার চেষ্টা করেছি।’ তাছাড়া এ বইতেই তিনি লিখেছেন, ‘সমাজের সংঘাতের মিল করতে হলে সে মিলে সাধারণ মানুষের সমাধান থাকতে হবে’। আরো লিখেছেন, ‘ক্ষুধা ও ক্ষুধার পরিমাণ দর করার সংগতি থাকতে হবে। জীবনের মধ্যে স্বপ্নের বিদ্রোহ মেলাতে হবে। এ ধরনের মিল অত্যন্ত কঠিন। ...মানুষের চাহিদা অনেক কিন্তু সব চাহিদা পূরণ করার মতো যথেষ্ট সম্পদ নেই। তাই চটজলদি গোঁজামিল দিয়ে চালানো হয়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে সমস্যার সমাধান হয় না। তিনি যথার্থই বলেছেন, বাজেটে শুধু জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা মেটানোর ব্যবস্থা থাকলেই চলবে না, বাজেট গোপনীয়তার সঙ্গে তৈরি করতে হবে।

‘পৃথিবীর অনেক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রেই মধ্যযুগের রূপকথার ঘুমন্ত রাজপুরীর মতো বিরাট প্রাসাদ রয়েছে। প্রাসাদে রয়েছে রাজা-রানী, রাজপুত্র, রাজকন্যা, রয়েছে উজির-নাজির-কোতোয়ালসহ সব ধরনের আমলা; রয়েছে সাধারণ মানুষ। কিন্তু সব মিলিয়ে কাজ করে না। আধুনিক যুগেও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রয়েছে উচ্চাকাঙ্ক্ষী বিরাট কাঠামো। এখানে জনগণের স্বার্থরক্ষার জন্য অনেক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। ...আপাতদৃষ্টে সবাই কাজ করছে, কিন্তু যে পরিমাণ কাজ করছে, তাতে জনগণের চাহিদা মিটছে না। ...এ অবস্থার পরিবর্তন করতে হলে গণজাগরণের প্রয়োজন। যতক্ষণ পর্যন্ত জনগণ তাদের নিজেদের অধিকার আদায়ের জন্য সক্রিয় হবে না, ততক্ষণ পর্যন্ত কিছু অর্জন করা যাবে না। বিশেষ করে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মাধ্যমে।’

তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বইয়ের নাম ‘দারিদ্র্যের অর্থনীতি—অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ’। এ বইতে তিনি লিখেছেন, ‘দারিদ্র্যের অর্থনীতি নিয়ে আলোচনা করার জন্য তাই বিস্তৃত প্রেক্ষাপট দরকার। এ প্রেক্ষাপটে দারিদ্র্যের ঐতিহাসিক বিবর্তন উপলব্ধি করতে হবে, আবার বিশ্বের বিভিন্ন দেশে একই সঙ্গে কী ধরনের পরিবর্তন হচ্ছে, সেটাও বুঝতে হবে। ...দারিদ্র্যের অর্থনীতি বুঝতে হলে আমাদের জানতে হবে দারিদ্র্য কী, কেন মানুষ দরিদ্র হয়, কোত্থেকে দারিদ্র্য এল, কীভাবে দারিদ্র্য দূর করতে হবে, কোথায় দারিদ্র্য নিরসন কর্মসূচি সফল হয়েছে এবং কারা দারিদ্র্য নিরসনে সাফল্য অর্জন করেছে।’

একই সঙ্গে তিনি জানিয়েছেন, ‘অর্থনীতির তত্ত্ব দিয়ে দারিদ্র্যের সব সমাধান খুঁজে পাওয়া যাবে না। এক্ষেত্রে অর্থনীতিবিদদের জ্ঞানের সঙ্গে নৃতত্ত্ববিদদের জ্ঞান যুক্ত করলে দারিদ্র্য নিরসনে অধিকতর সাফল্য অর্জনের সম্ভাবনা রয়েছে। ...বহুমাত্রিক দারিদ্র্য সমাধানের জন্য আমাদের শুধু বিশেষ একটি শাস্ত্রের ওপর নির্ভর না করে সব ধরনের জ্ঞান ব্যবহার করার উদ্যোগ নিতে হবে।’

দুর্ভিক্ষ দারিদ্র্যের এক চরম রূপ। এর ব্যাপ্তি রাষ্ট্রের চরিত্রেও প্রতিফলিত হয়। তার মতে, ‘দুর্ভিক্ষের মূল কারণ খাদ্যোৎপাদনে ব্যর্থতা নয়, এর কারণ হলো অনেক রাষ্ট্রই খাদ্যের সুষ্ঠু বণ্টন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারেনি।’

সবশেষে তিনি এ বইতে দারিদ্র্যকে নানা দিক থেকে দেখার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, ‘এ কথা স্বীকার করতেই হবে, দারিদ্র্যের হার ও সংখ্যা সম্পর্কে যেসব তথ্য সংগৃহীত হয়েছে, তাতে বাংলাদেশে দারিদ্র্য কমেছে, এ ধারণা সমর্থন করে। কিন্তু সব সংখ্যা সম্পর্কেই সতর্কতার প্রয়োজন রয়েছে। ...এখনো দরিদ্রদের সম্বন্ধে আমরা অনেক কিছুই জানি না। তাই দারিদ্র্য সম্পর্কে আরো গবেষণার প্রয়োজন। এছাড়া সংখ্যাতত্ত্ব ও অর্থনীতির বাইরে যেসব শাস্ত্রে দরিদ্রদের নিয়ে গবেষণা করা হচ্ছে (যেমন নৃতত্ত্ব, চিকিৎসাশাস্ত্র, মনোবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান ইত্যাদি) সেসব গবেষণার ফলাফলও দারিদ্র্য নিরসনের কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।’

টেকসই ভিত্তিতে দারিদ্র্য নিরসনের জন্য আর্থিক অসাম্য কমানো এবং কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার কথা বলতে গিয়ে তিনি সমাজ সংস্কারের ওপর আলো ফেলেছেন। তার কথায়, ‘সত্যিকার অর্থে দারিদ্র্য দূর করতে হলে সমাজের ব্যাপক সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে। শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর প্রয়োজন রয়েছে। ...দারিদ্র্য দূরীকরণ একটি দীর্ঘস্থায়ী প্রক্রিয়া এবং দীর্ঘদিনের সংগ্রাম ছাড়া এ সমস্যা কমানো যাবে বলে মনে হয় না।

দারিদ্র্য নিরসনে অবকাঠামোর ভূমিকা যে ব্যাপক সে বিয়ষটিও তার নজর এড়ায়নি। তাই তো তিনি বলতে পেরেছেন, ‘অবকাঠামো দেশের উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারে, কিন্তু সব ধরনের অবকাঠামো প্রকল্পে গরিবেরা উপকৃত হয় না। গরিবদের উপকার করতে হলে এমন প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে, যার সুফল গরিবদের কাছে পৌঁছানো নিশ্চিত করা যাবে।’

সমকালীন খ্যাতিমান অর্থনৈতিক ইতিহাসবিদ পিকেটির গবেষণা সমর্থন করে তিনি লিখেছেন, বৈষম্য বজায় রেখে দারিদ্র্য নিরসন করা সত্যি দুরূহ। তিনি বলেছেন, ‘ধনীরা আরো ধনী হবে এবং গরিবেরা নিঃস্ব থেকে নিঃস্বতর হবে। এ অবস্থায় দেশে ধনবৈষম্য কমানোর জন্য বৈপ্লবিক অর্থনৈতিক সংস্কার করতে হবে।’

আজীবন আশাবাদী লেখক আকবর আলি খান লিখেছেন, ‘সমস্যা অনেক রয়েছে। সব সমস্যা হয়তো সমাধান করা যাবে না। অনেক সমস্যার আগামী এক-দুই দশকে সমাধান হবে না। তবু দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে মানুষের সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে। সব মানুষকে বিশেষ করে দরিদ্র্যদের এ সমস্যা সমাধানে অগ্রণী হতে হবে। এ সংগ্রামে যারা অংশ নেবে, তাদের গৌতম বুদ্ধের বাণী সবসময় মনে রাখতে হবে: ‘No one save us but ourselves. No one can and no one may. We ourselves must walk the path’

‘পরার্থপরতার অর্থনীতি’ তার আরেকটি অমর সৃষ্টি। তিনি মনে করেন, অর্থনীতিবিদরা ধীরে ধীরে বিষয়টির প্রতি ঝুঁকে পড়েছেন। অবশ্য অর্থনীতিবিদরা দান-খয়রাতের অর্থনীতির নাম দিয়েছেন ‘পরার্থপরতার অর্থনীতি’ (economics of altruism)। স্বেচ্ছাসেবামূলক প্রতিষ্ঠানকে এরা বলেন লাভের সঙ্গে সম্পর্কহীন (non-profits) প্রতিষ্ঠান।

তার ধারণা (যা যথার্থ), সামাজিকভাবে যে যত কাছে থাকে মানুষ তাকে তত ভালোবাসে। সামাজিক দূরত্ব যত বাড়ে ভালোবাসার নিবিড়তা তত কমে। আর তাই তিনি সিদ্ধান্ত টেনেছেন, ‘অর্থনীতির মৌলিক বাস্তবতাকে অস্বীকার করে টেকসই পরার্থপরতা সম্ভব নয়।’

সরকারের আয়তন কমিয়ে দুর্নীতি কমানোর কথা বলেছেন তিনি এ বইতে, বেশ স্পষ্ট করেই লিখেছেন।

সংস্কার খুবই অপ্রিয় বিষয়। আর সংস্কার করতে না পারার কারণেই রাষ্ট্র সংকটে পড়ে। তার মতে, ‘আধুনিক রাষ্ট্রসমূহে আর্থিক সংকটের একটি বড় কারণ হলো, সবাই কর হ্রাস করতে চায় কিন্তু কেউই খরচ কমাতে চায় না।’

n বাজেট ঘাটতি

n অস্থিতিশীলতা

সেজন্যই বাজেট ঘাটতি বাড়তে থাকে। তা মেটাতে বাড়তি কর অথবা ঋণ নিতে হয় সরকারকে। এ কারণেই সমাজে অস্থিতিশীলতা তৈরি হয়। সেজন্য তার উপদেশ, ‘সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করাই যথেষ্ট নয়। সংস্কারের জন্য প্রয়োজন সুদৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকার।’

তিনি ঠিকভাবেই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে ‘সংস্কার করতে গেলে বাঘের পিঠে চড়তেই হবে। তবে সব বাঘের বিরুদ্ধে একসঙ্গে লড়াইয়ের প্রয়োজন নেই। তার পক্ষে বাঘ নির্বাচন সম্ভব।’

গল্পচ্ছলে বলতে গিয়ে তিনি অর্থনীতির ভাবনার গোড়ায় হাত দিয়েছেন। মোল্লা নাসিরুদ্দীনের সহায়তা নিয়ে অর্থনীতির শেকড় সন্ধানে ব্রতী হয়েছেন। তার ভাষায়, ‘অর্থনীতির সমস্যা এত গুরুত্বপূর্ণ যে তা শুধু পেশাদার অর্থনীতিবিদদের কাছে ছেড়ে রাখা সম্ভব নয়। মোল্লা নাসিরুদ্দীনের মতো চিন্তাবিদদের আজকের দিনেও তাই আমাদের প্রয়োজন রয়েছে। মোল্লার মতো প্রশ্ন করা দরকার, ‘এটাই যদি সেই বিড়াল হয় তাহলে মাংস কোথায়? আর এটাই যদি সেই মাংস হয়, তাহলে বিড়াল কোথায়?’

আকবর আলি খানের অর্থনীতি সাহিত্যের জারক রসে সিক্ত। তাই তো তিনি জীবনানন্দের বনলতা সেনকে সামনে রেখে বলতে পারেন, ‘লিঙ্গভিত্তিক না হলে মানব উন্নয়ন বিপন্ন হবে।’

চাবিকাঠির খোঁজে—নতুন আলোকে জীবনানন্দের ‘বনলতা সেন’ বইটিতে এ কথা বলেছেন। তার মতে, ‘জীবনানন্দের সৃষ্টি এখনো অনাবিষ্কৃত মহাদেশের মতো। নতুন করে তাকে আবিষ্কারের প্রয়োজন রয়েছে।’

‘জীবনানন্দের অধিকাংশ পাঠকই তার কবিতার চাবিকাঠি খুঁজে পাননি’ বলে তিনি লিখেছেন। তার মতে, ‘...জীবনানন্দের কবিতা নিছক উপমার সংকলন নয়, এসব কবিতায় দর্শন সম্পর্কে তার অভিমত ব্যক্ত হয়েছে। জীবনানন্দচর্চার ক্ষেত্রে এ বই একটি ব্যতিক্রমধর্মী রচনা। এ গ্রন্থ প্রমাণ করেছে, জীবনানন্দের কবিতা এখনো অনাবিষ্কৃত মহাদেশ, নতুন করে তাকে আবিষ্কারের প্রয়োজন রয়েছে।’

‘জীবনযাপন করাই যথেষ্ট নয়, জীবন থেকে শেখার প্রয়োজন রয়েছে। জীবন নিয়ে বীক্ষণ করতে হবে। প্রত্যেকের মধ্যেই কমবেশি মুনাফেকি রয়েছে।’

এ পর্যায়ে তিনি দার্শনিকের মতো বলে ওঠেন,  ‘...পৃথিবীতে শতভাগ লোক মুনাফেক নয়, আবার শতভাগ লোক সৎও নয়। সততা ও মুনাফেকির আল্পনায় চলছে মানুষের জীবন।’

‘দুর্ভাবনা ও ভাবনা রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে’—প্রথম প্রকাশ, জানুয়ারি, (২০১৯) বইটি তার আরেক অনবদ্য সৃষ্টি। তিনি মনে করেন, রবীন্দ্রনাথকে যেসব প্রশ্নে হেয় করার চেষ্টা করা হয়েছে, সেসব প্রশ্নের বেশির ভাগই অসার। অন্যদিকে যেসব প্রশ্নে রবীন্দ্রনাথকে অতি উচ্চমর্যাদা দেয়া হয়েছে, সেসব প্রশ্ন বা প্রশ্নে রবীন্দ্রনাথের যেসব দুর্বলতা ছিল, সেগুলো চাপা দেয়া হয়েছে। দোষে-গুণে মানুষ। রবীন্দ্রনাথ এর বাইরে নন। রবীন্দ্রনাথ সম্বন্ধে তার শেষ কথা, ‘রবীন্দ্রনাথ সমাজ পরিবর্তন চান—আদর্শ বাস্তবায়নের জন্য নয়, মানুষের জন্য। এজন্য প্রয়োজন দুর্বল জনগোষ্ঠীর ক্ষমতায়ন। তাদের চেতনাকে জাগিয়ে তুলতে হবে শিক্ষার মাধ্যমে। তিনি চান পরিবর্তনের অভিঘাতগুলোর সমন্বয়। তার অভীষ্ট পাশ্চাত্য ও প্রাচ্যের সভ্যতার মহামিল। তিনি অস্পৃশ্যতার মতো বৈষম্য তুলে দিয়ে মানুষের অধিকার নিশ্চিত করতে চান। তবে তিনি বৈপ্লবিক পরিবর্তন চান না। ...তিনি জানতেন, ‘যেকোনো টেকসই সংস্কার বাইরে থেকে চাপিয়ে দেয়া যায় না। সব সংস্কার কর্মকাণ্ডে জনগণের ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে হবে, যাতে সংস্কার রক্ষা করার শক্তি তারা নিজেদের ভেতর থেকেই সংগ্রহ করতে পারে। ...তার মানবতাবাদী আদর্শের মধ্যে কোনো খাদ নেই।’

তার আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থের নাম ‘পুরোনো সেই দিনের কথা’ (২০২২)। এ বইতেই তিনি লিখেছেন, ‘বই থেকে যেমন শিখেছি, আমার নিজের জীবন থেকেও আমি শেখার চেষ্টা করেছি।’

এ বইতেই তিনি স্বীকার করেছেন, বামপন্থী ও বিলাসী জীবনের দ্বন্দ্ব তাকে সারা জীবন ভুগিয়েছে। তিনি হতে চেয়েছিলেন শিক্ষক। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এ প্রতিভাবান শিক্ষককে নিয়োগ দিতে পারেনি ক্ষুদ্রমনা বিভাগীয় রাজনীতির কারণে। তাই বেছে নেন পাকিস্তানের এলিট প্রশাসক গোষ্ঠী সিএসপির জীবন। এর সুবাদেই একাত্তরে তিনি হবিগঞ্জে, মহাকুমা অফিসার হিসেবে। সেখান থেকেই যোগ দেন মুক্তিযুদ্ধে। কেন তিনি মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিলেন? এ প্রশ্নের উত্তর তিনি দিয়েছেন এভাবে, ‘বাইরের দেশের লোকেরা যদি স্পেনকে মুক্ত করার জন্য লড়াই করতে পারে, তাহলে নিজের দেশের স্বাধীনতা রক্ষার জন্য যদি আমি আমার দায়িত্ব পালন না করি, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে মুখ দেখাব কীভাবে? ১৯৭১-এর ১৬ ডিসেম্বরের পর প্রতিদিনই আমার মনে হয় মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ আমার জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন।’

এভাবেই মুক্তির দিশারি আকবর আলি খান একাত্তরের এক মুক্তিযোদ্ধা হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। মুক্তির আহ্বানে তিনি যে সাড়া দিতে পেরেছেন তার পেছনে জীবনকে অর্থবহ করার আকাঙ্ক্ষাই মূলত কাজ করেছে। আর সে কারণেই তিনি লিখতে পেরেছেন ‘...জীবনযাপন করাই যথেষ্ট নয়, জীবন থেকে শেখার প্রয়োজন রয়েছে। জীবন নিয়ে বীক্ষণ করতে হবে।’ যাপিত জীবন নিয়ে বিস্তর লিখেছেন। জীবনকে বীক্ষণ করে আমাদের আগামী দিনের সমুন্নত জীবনের পথের দিশা দেয়ার চেষ্টা করেছেন তার অসংখ্য বইয়ের মাধ্যমে। মাত্র কয়েকটি বইয়ের অংশবিশেষ নিয়ে আলাপ করলাম এ নিবন্ধে। আমার বিশ্বাস, ভাবীকাল একজন প্রশাসকের চেয়ে লেখক আকবর আলি খানকেই বেশি করে মনে রাখবে অতীব যতনে।

 

ড. আতিউর রহমান: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু চেয়ার অধ্যাপক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর