দেশে হাতি হত্যার ঘটনা বেড়েছে আশঙ্কাজনক মাত্রায়। একের পর এক হত্যার শিকার হচ্ছে পরিবেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এ প্রাণী। গত ১৭ বছরে মানুষের হাতে ৯০টি হাতির মৃত্যু হয়েছে। বন বিভাগের তথ্যানুযায়ী, এর মধ্যে ১১টি হাতিকে হত্যা করা হয়েছে কেবল ২০২০ সালেই। দেশে লভ্য এশীয় প্রজাতির এ হাতিকে ‘মহাবিপন্নের’ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে প্রকৃতি সংরক্ষণবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা আইইউসিএন। এক হিসাব বলছে, ২০১৬ সালে দেশে এশিয়ান বন্য হাতি ছিল ২৬৮টি। কিন্তু নিয়মিত বিরতিতে হত্যার শিকার হয়ে যেভাবে হাতির সংখ্যা কমছে তা উদ্বেগজনক। এমনটা চলতে থাকলে দেশে হাতির এ প্রজাতিকে টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। কাজেই হাতি হত্যা বন্ধে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা ও বন বিভাগের নজরদারি বাড়ানো জরুরি।
দেশে হাতির আবাসস্থল মূলত পার্বত্য জেলা বান্দরবান, রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি, চট্টগ্রাম জেলার লোহাগাড়া, সাতকানিয়া, চন্দনাইশ, বাঁশখালী, বোয়ালখালী, রাঙ্গুনিয়া, কক্সবাজার জেলার ফাঁসিয়াখালী, রামু, উখিয়া ও টেকনাফ বন এবং গারো পাহাড়। কিন্তু বর্তমানে উল্লিখিত এলাকাগুলোয় হাতির বিচরণক্ষেত্র অনেকটাই সংকুচিত। অনেক জায়গায় রাস্তাঘাট, সরকারি স্থাপনা গড়ে তোলা হয়েছে। কোথাও কোথাও বনভূমি ইজারা দেয়া হয়েছে। আবার কোথাও কোথাও হাতির বিচরণক্ষেত্র দখল করে স্থানীয়রা নিজেরাই সবজি ও ধান চাষ করছে। সেই ফসল যেন হাতি নষ্ট করতে না পারে সেজন্য ক্ষেতের চারপাশে জিআই তারের বেড়া দিয়ে জেনারেটরের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে। এতে জিআই তারে বিদ্যুত্স্পৃষ্ট হয়ে মারা যাচ্ছে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক হাতি। এছাড়া নির্বিচারে বন উজাড় করায় খাদ্য সংকটে পড়ে লোকালয়ে বা ফসলের ক্ষেতে ঢুকে যাচ্ছে হাতিগুলো। এরই প্রতিক্রিয়ায় কখনো কখনো গুলি করে কিংবা ধারালো অস্ত্র দিয়ে সদলবলে হামলা চালানো হচ্ছে হাতির ওপর। ফলে এতেও খুন হচ্ছে বিপন্ন প্রাণীটি। সর্বোপরি আছে চোরাশিকারিদের অপতত্পরতা। হাতির বিভিন্ন অঙ্গ চিকিৎসা বা শোভাবর্ধনে খুব গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে হাড় ও হাতির দাঁত কিনে নেয় এমন এক এক শক্তিশালী চক্র আন্তর্জাতিকভাবে সক্রিয়। হাতির দাঁতের লোভে দেশীয় একটি চোরাকারবারি গোষ্ঠীও প্রাণীটিকে হত্যা করছে। সব মিলিয়ে আশঙ্কাজনক হারে কমছে হাতির সংখ্যা।
আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে এশিয়ান হাতিকে সর্বপ্রথম কনভেনশন অন ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড অব ইনডেনজার্ড স্পেসিস ইন ওয়াইল্ড ফনা অ্যান্ড ফ্লোরার (সিআইটিইএস) পরিশিষ্টে লিপিবদ্ধ করা হয়। পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে আইন করে নিষিদ্ধ করা হয় এ প্রজাতির হাতির অংশবিশেষ ও পণ্যের বাণিজ্যিক ব্যবসা। বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয় বিপদাপন্ন হাতির নিরাপত্তা, আবাস সংরক্ষণ ও সুরক্ষায় গবেষণা বাড়ানোর ওপর। আমরা দেখছি আন্তর্জাতিক রীতিনীতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে এশিয়ার বিভিন্ন দেশ এ প্রজাতির হাতি সুরক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ নিয়েছে। থাইল্যান্ড নতুন আইন জারি করে হাতির ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ এবং তাদের জিনগত তথ্যসংবলিত একটি বিস্তৃত ডাটাবেজ গড়ে তুলেছে। হাতির জন্য অতিরিক্ত খাদ্য উৎস সরবরাহ করা, কৃষকদের ক্ষতিপূরণ দেয়া এবং হাতি ও সম্প্রদায়ের মধ্যে বাফার অঞ্চল তৈরি করাসহ দ্বন্দ্ব নিরসনে বাড়তি পদক্ষেপ নিয়েছে। সমাজের কাছে পশুর গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে ১৩ মার্চ থাই এলিফ্যান্ট দিবস পালন করে আসছে। শ্রীলংকায়ও একই অবস্থা। দেশটির স্থানীয় সংস্কৃতিতে হাতি একটা গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। আইন করে সেখানে হাতি হত্যা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বন বিভাগের সক্রিয়তায় দেশটিতে হাতির উপযোগী পরিবেশ গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। প্রতিবেশী ভারতেও হাতিকে জাতীয় ঐতিহ্যবাহী প্রাণী বিবেচনা করা হয়। দেশটির সংশোধিত বন্যজীবন সংরক্ষণ আইনে বন্য হাতির অবৈধ বাণিজ্য নিষিদ্ধ করা হয়। ধরা, হত্যা করা বা ফাঁদে ফেলার জন্য জেল বা অর্থদণ্ড সংযোজন করা হয়। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি দেশটিতে সচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজ করছেন পরিবেশকর্মীরা। আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শুধু হাতির জন্য দেশটিতে ‘হাতি স্পেশালিটি হাসপাতাল’ করা হয়েছে। দেশগুলোর অভিজ্ঞতা ও কর্মপ্রক্রিয়া আমাদের জন্য অনুসরণীয়।
বন বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, দেশে হাতির বিচরণের পথ দ্রুত কমে আসছে। বাধ্য হয়ে বিশালাকার প্রাণীটি মানুষের বসতি এলাকা দিয়েই চলাচলের চেষ্টা করছে। আর মানুষ আতঙ্কিত হয়ে হামলা চালিয়ে কিংবা ফাঁদ পেতে তাদের হত্যা করছে। এরই মধ্যে হাতি হত্যা করার ঘটনায় ১০টির বেশি মামলা হয়েছে। তবে একটি মামলারও নিষ্পত্তি হয়নি, কেউ সাজা পেয়েছে, এমন নজিরও নেই। বিলুপ্তির ঝুঁকিতে থাকা হাতি রক্ষায় আছে কঠোর আইন, হাইকোর্টে করা হয়েছে রিট মামলাও। অথচ কিছুতেই বন্ধ করা যাচ্ছে না হাতি হত্যা। দেশে প্রচলিত বন্যপ্রাণী আইন অনুযায়ী কোনো ব্যক্তি হাতি হত্যা করেছে বলে প্রমাণিত হলে জেল-জরিমানার বিধান আছে। তবে কেউ যদি হাতির হামলার শিকার হয় এবং তার প্রাণ যাওয়ার শঙ্কা থাকে তাহলে জীবন রক্ষার্থে হাতি হত্যায় এ বিধান প্রযোজ্য হবে না। কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বিনা কারণে হত্যা করা হচ্ছে হাতি। কাজেই অপরাধীদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে, যাতে কেউ হাতি হত্যায় প্রবৃত্ত না হয়।
বন অধিদপ্তর জরিপ করে বন্য হাতি চলাচলের জন্য ১২টি করিডোর নির্ধারণ করেছিল। কিন্তু ওইসব করিডোর এখনো সংরক্ষিত এলাকা ঘোষণা করা হয়নি। যে কারণে বন্য হাতির চলাচলের জায়গায় মানুষজন বাড়িঘর বানাচ্ছে। এটা বন্ধ করতে প্রজ্ঞাপন জারি করে উল্লিখিত করিডোরগুলোকে সংরক্ষিত এলাকা ঘোষণা করতে হবে। একই সঙ্গে বনভূমির জায়গা মানুষের কাজের জন্য, সড়ক বা রেলপথ এমনকি চাষাবাদের জন্য ইজারা দেয়া বন্ধ করতে হবে। যেগুলো দখল হয়ে গেছে সেগুলো পুনরুদ্ধার করতে হবে। গড়ে তুলতে হবে এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিম। বন বিভাগের উদ্যোগে হাতির খাদ্য উপযোগী বনায়ন কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে, যাতে খাদ্যের অভাবে লোকালয়ে ঢুকে পড়া বন্ধ হয়। স্থানীয়দের সচেতনতা বাড়াতেও নিতে হবে কার্যকর পদক্ষেপ।
পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের জন্য হাতিকে বলা হয় ফরেস্ট ইঞ্জিনিয়ার। সুতরাং যেকোনো মূল্যে হাতি রক্ষা করতে হবে। দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষকে যেমন সক্রিয় হতে হবে, তেমনি সোচ্চার হতে হবে নাগরিক ও পরিবেশকর্মীদেরও। আইনের প্রয়োগ, বন বিভাগের নজরদারি ও জনসাধারণের সচেতন প্রয়াসে হাতি হত্যা বন্ধ হবে, এমনটাই প্রত্যাশা।










