নদীর পানিতে গ্রহণযোগ্য মাত্রার চেয়ে বেশি পরিমাণে জিংক, কপার, আয়রন, লেড, ক্যাডমিয়াম, নিকেল, ক্রোমিয়াম, মার্কারির মতো ক্ষতিকর উপাদানের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। নদীর মাছের মাধ্যমে তা মানবদেহে প্রবেশ করছে। সংশ্লিষ্ট নদীর তীরবর্তী এলাকায় উৎপাদিত ফসলও বিষাক্ত হয়ে উঠছে। দীর্ঘদিন এসব দূষিত খাবার গ্রহণের কারণে মানুষের শরীরে ক্যান্সারের মতো রোগের প্রাদুর্ভাব বাড়ছে, যা সবাইকে শঙ্কিত করে তুলছে। নদীদূষণ বন্ধ ও তদারকির জন্য একাধিক প্রতিষ্ঠান ও আইন থাকার পরও সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অবনতি দুঃখজনক। এমন প্রবণতা বন্ধে কর্তৃপক্ষকে আরো কঠোর হতে হবে।
দেশের নদীগুলোর ভয়াবহ দূষণের বিষয়টি বহুল আলোচিত। দেশে বিভিন্ন নদীর পানি কতটা দূষণের শিকার, রাজধানীর চারপাশের নদীগুলোর দিকে তাকালেই তা স্পষ্ট হয়। শিল্প-কারখানার বর্জ্য যাতে চারপাশে ছড়িয়ে পড়তে না পারে, তার জন্য যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া জরুরি হলেও এসব ক্ষেত্রে নানা রকম অনিয়মের খবর পাওয়া যায়। অভিযোগ রয়েছে, পরিশোধন যন্ত্র থাকলেও কোনো কোনো কারখানায় বর্জ্য পরিশোধন না করে সরাসরি তা ফেলে দেয়া হয়। কৃষিকাজে ব্যবহূত হওয়া মাত্রাতিরিক্ত সার ও কীটনাশকও সেচের পানির সঙ্গে ধুয়ে নদীতে পড়ছে। হাটবাজার, শহর ও বস্তি এলাকার গৃহস্থ বর্জ্য ফেলার সবচেয়ে বড় ভাগাড়ও এ নদী। এতে বিভিন্ন ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ আমাদের খাদ্যচক্রে প্রবেশ করার সুযোগ তৈরি হয়। কোনো কোনো রাসায়নিক পদার্থ মানবস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। দূষণের কারণে বিশ্বের অনেক নদীর পানি ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে গেছে। যেসব অঞ্চলের পরিবেশ আজ মারাত্মক হুমকির সম্মুখীন। অস্ট্রেলিয়া, ভেনিজুয়েলা, চীন ও ভারতের কয়েকটি নদী এরই মধ্যে নানা মাত্রায় দূষণের কারণে বিশ্বে আলোচিত। বাংলাদেশের বুড়িগঙ্গার পানিও জীববৈচিত্র্য বেঁচে থাকার উপযুক্ত নয় বলে গবেষণায় দেখা গেছে। এ দূষণ দেশের সব নদীতে ছড়িয়ে পড়া রোধ করতে হবে। নইলে বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা দেয়ার শঙ্কা উড়িয়ে দেয়া যায় না।
নদী রক্ষায় বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের সমন্বয়ের ঘাটতি প্রকট। বলা বাহুল্য, নদী দখল ও দূষণ রোধে সরাসরি দায়িত্ব প্রায় ১৫টি মন্ত্রণালয়ের। পরিবেশ অধিদপ্তরের কাজের আওতায় রয়েছে নদীর পানিদূষণ রোধ করা। বিআইডব্লিউটিএর দায়িত্ব তীরের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা। নদীর পানির কর্তৃপক্ষ পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়, তলদেশের কর্তৃপক্ষ ভূমি মন্ত্রণালয় এবং পাড়ের মালিক নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়। সেখানে যেকোনো উন্নয়নকাজ করতে গেলেই দ্বারস্থ হতে হয় পরিকল্পনা ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের। আর দখলমুক্ত রাখতে প্রয়োজন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সক্রিয় ভূমিকা। কিন্তু মন্ত্রণালয়গুলোর সমন্বয়ের অভাবে নদী দখল ও দূষণ কোনোটাই রোধ করা যাচ্ছে না। নদীদূষণের পরিণতিতে জনস্বাস্থ্যের বিষয়টিও জরুরিভাবে আমলে নেয়ার দাবি রাখে। আশার কথা, আমাদের দেশে দূষণ রোধে এরই মধ্যে বেশকিছু পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সংরক্ষণ ও পরিবেশবিষয়ক আইন আধুনিক করা, দূষণকারীদের জরিমানা করা এবং পানির গুণগত মান পর্যবেক্ষণ করা। এছাড়া কেন্দ্রীয় ট্রিটমেন্ট প্লান্ট স্থাপন এবং বর্জ্য শোধন প্রক্রিয়া উন্নত করতে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করছে সরকার। দখল-দূষণমুক্ত নদ-নদীর ক্ষেত্রে একটি বড় সমস্যা হচ্ছে পুনঃদখল ও দূষণ। এটি রোধে আইনি ব্যবস্থাও গ্রহণ করা উচিত।
নদীগুলোকে দূষণকারীর হাত থেকে রক্ষায় ১৯৯৫ সালে একটি আইন প্রণয়ন করা হয়, যেখানে সব শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে নদীর পানি দূষণ থেকে বাঁচাতে ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্লান্ট (ইটিপি) ব্যবহার বাধ্যতামূলক করে। বাংলাদেশের হাইকোর্ট নদীগুলোকে আইনি সত্তা হিসেবে ঘোষণা করেন। জলাশয়, খাল-বিল, উপকূল, পাহাড় ও বনের অধিকার রক্ষায় তাদের অভিভাবক হিসেবে কাজ করার জন্য জাতীয় নদী সংরক্ষণ কমিশনকে (এনআরপিসি) আইনি অভিভাবক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। প্রকৃতপক্ষে বিশ্বের যেকোনো আদালত কর্তৃক নদী বা অন্য কোনো প্রাকৃতিক সত্তার অধিকার রক্ষার জন্য সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনাসহ এটিই সবচেয়ে বিস্তৃত রায়। প্রধানমন্ত্রীও নদীদূষণকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেয়ার কথা বলেছেন। কিন্তু কর্তৃপক্ষের কার্যক্রম এক্ষেত্রে দৃশ্যমান হয়ে উঠছে না। অনেক শিল্প-কারখানায় ইটিপি থাকলেও জনবলস্বল্পতার কারণে ইটিপিগুলো সার্বক্ষণিক চালু রাখা নিশ্চিতে পরিবেশ অধিদপ্তর কর্তৃক তদারক করা এবং দায়ী শিল্প-কারখানার বিরুদ্ধে নিয়মিত এনফোর্সমেন্ট অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে না। এক্ষেত্রে নদীদূষণ রোধে উন্নত বিশ্বের মতো উচ্চহারে দূষণ করারোপ সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে। বিশ্বের অনেক দেশ যেমন— যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য দূষণ করারোপের মাধ্যমে শিল্প-কারখানার দূষণ কমিয়ে এনেছে। তবে বিধানটি কাগজে-কলমে থাকলেই হবে না, তার বাস্তবায়নও নিশ্চিত করতে হবে। আপেক্ষিক ব্যয়ের তত্ত্ব অনুযায়ী শিল্প উৎপাদন ব্যয় কমিয়ে রাখতে কারখানাগুলো ইটিপি স্থাপন করবে। নদী ও সমুদ্রের পাড়ে জাহাজ ভাঙা শিল্প, লঞ্চ, স্টিমার নির্মাণ ও মেরামতকালে নদী ও সমুদ্রের পানিতে কারখানার তৈলাক্ত বর্জ্যের মিশ্রণ প্রতিহত করতে পারলে নদীদূষণ অনেকাংশে হ্রাস পাবে। কৃষিক্ষেতে ব্যবহূত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক মিশ্রিত পানি যাতে খাল-বিল-নদীতে এসে মিশতে না পারে, তার ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। এছাড়া নতুন বাড়ি নির্মাণে বর্জ্য পরিশোধনাগার বা ইটিপি নির্মাণ করতে হবে। যাদের বাড়িতে সোক পিট (পয়ো এবং পানি আলাদা করার ব্যবস্থা) নেই, তাদের সোক পিট তৈরি করতে হবে অথবা ইটিপি বসাতে হবে। সব পানি একটি পয়েন্ট দিয়ে নদীতে যাওয়া উচিত। আর সেখানে একটি ইটিপি থাকা দরকার।
নদ-নদীগুলো আমাদের দেশের প্রাণ। নদীকে ঘিরে শিল্পায়ন, কৃষির উৎপাদন ও বাণিজ্য এখনো আবির্ভূত হয়। দূষণ ও দখলের কারণে এগুলো না বাঁচলে এর খেসারত আমাদেরই দিতে হবে। এসব নদ-নদী বাঁচাতে অবিলম্বে সরকারকে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। পানি উন্নয়ন বোর্ড, স্থানীয় প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তরকে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। যেসব কল-কারখানা নদ-নদী দূষণের জন্য দায়ী, সেগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। মানুষের জীবন, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় নদ-নদী দূষণমুক্ত রাখার বিকল্প নেই।










