গতকাল দেশব্যাপী পালিত হলো বিশ্ব শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস। প্রতি বছর বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশে দিবসটি পালিত হলেও শিশুশ্রমের ব্যাপ্তি এখনো ব্যাপক। ২০১৩ সালের শিশুশ্রম জরিপের প্রতিবেদন অনুসারে, বাংলাদেশে এখন প্রায় ১৭ লাখ শিশু শ্রমিক রয়েছে। এরা সপ্তাহে গড়ে প্রায় ৩৯ ঘণ্টা কাজ করে এবং সাপ্তাহিক গড় মজুরি ১ হাজার ৪৮৭ টাকা। এসব শিশু শিক্ষা, বিশ্রাম ও খেলাধুলার অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে শৈশবেই জীবিকার জন্য কাজ করতে বাধ্য হয়। অনেক সময় তারা পাচার, নির্যাতন এবং সহিংসতারও সম্মুখীন হয়। স্বাধীনতা অর্জনের পর থেকেই জাতীয় বিভিন্ন নীতি ও উদ্যোগে শিশু অধিকারের বিষয়টি প্রতিফলিত হয়েছে, যেখানে শিশুশ্রম বন্ধের অঙ্গীকার আছে। এ সত্ত্বেও বাংলাদেশে বিপুলসংখ্যক শিশুশ্রমিক বিদ্যমান, যা প্রকারান্তরে শিশু অধিকার লঙ্ঘনের প্রতিচ্ছবি। অনেক দরিদ্র পরিবার তাদের মৌলিক চাহিদা মেটানোর জন্য সন্তানদের আয়ের ওপর নির্ভর করে। বাংলাদেশ জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে বদ্ধপরিকর। এসডিজি অর্জনের অন্যতম শর্তই হলো শিশুশ্রমের অবসান। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান খুব একটা সুখকর নয়। লক্ষ্য অর্জনে তাই অবশিষ্ট সময়ে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে। আর কাজটি সরকারকেই করতে হবে, বেসরকারি খাত তাতে সহায়তা জোগাবে বলে প্রত্যাশা।
তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনায় দেখা যায়, বাংলাদেশের যেসব বিভাগে দারিদ্র্যের হার তুলনামূলক কম, সেখানে শিশুশ্রমিকের সংখ্যা বেশি। ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগে শিশুশ্রমের হার সর্বোচ্চ। অথচ দারিদ্র্যের হার বেশি যথাক্রমে রংপুর, বরিশাল ও রাজশাহী বিভাগে। দারিদ্র্যপীড়িত উপজেলা থেকে ঢাকা ও চট্টগ্রামের নগরাঞ্চলের দিকে অভ্যন্তরীণ অভিবাসনই এর সম্ভাব্য কারণ হতে পারে। এছাড়া প্রতি বছর বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার হয়ে, জমি এবং কর্মসংস্থান হারিয়ে মানুষ গ্রামীণ এলাকা থেকে শহর এলাকায় অভিবাসী হয়ে আসছে। এভাবেই শহর দরিদ্রের সংখ্যা বাড়ছে। এসব দরিদ্র গ্রামীণ জনগোষ্ঠী শহরের পরিত্যক্ত বা খাসজমিতে অবৈধ বসতি স্থাপন করে দুর্দশাগ্রস্ত জীবনযাপন করে। বস্তিতে জন্মনিবন্ধন হার জাতীয় গড়ের চেয়ে প্রায় অর্ধেক, বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া এবং পুনরায় ভর্তি হওয়া শিশুর সংখ্যাও প্রচুর। এ কারণেই বস্তিগুলোয় শিশুশ্রমিকের সংখ্যা জাতীয় গড়ের তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেশি। শহরের দারিদ্র্যপ্রবণতা গ্রামীণ এলাকার সমস্যা থেকে বেশ আলাদা। শহরের দরিদ্র বস্তিবাসীরা পানি, পয়োনিষ্কাশন ও বিদ্যুতের স্থিতিশীল সরবরাহবিহীন, নাগরিক সুবিধাবঞ্চিত নোংরা ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে বসবাস করে বিধায় এখানে শিশুশ্রমিকের চাহিদা অনেক বেশি।
সরকার নয়টি খাত চিহ্নিত করে শিশুশ্রম রোধে পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। পরিকল্পনাটি হচ্ছে, ২০১০ সালের জাতীয় শিশুশ্রম নিরসন নীতির আলোকে জাতীয় কর্মপরিকল্পনার আওতায় নয়টি কৌশলগত ক্ষেত্র চিহ্নিত করে দায়িত্ব বণ্টন করা। এর মধ্যে শিশুশ্রম নিরসনের লক্ষ্যে নীতি বাস্তবায়ন এবং প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়নের বিষয়টি দেখবে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং ন্যাশনাল কমিশন টু রিভিউ দ্য ওয়ার্কিং অব দ্য কনস্টিটিউশন। শ্রমে নিয়োজিত শিশুদের শিক্ষা নিশ্চিতের বিষয়টি দেখবে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় শ্রমে নিয়োজিত শিশুদের স্বাস্থ্য ও পুষ্টির উন্নয়নে কাজ করবে। শিশুশ্রম রোধে সামাজিক সচেতনতা তৈরিতে কাজ করবে তথ্য ও ধর্ম মন্ত্রণালয় এবং সিটি করপোরেশন। কর্মসংস্থান ও শ্রমবাজারে শিশুশ্রম বন্ধের বিষয়টি দেখবে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। আইন প্রয়োগ ও বাস্তবায়ন করবে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়। শিশুশ্রম প্রতিরোধে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও স্থানীয় সরকার বিভাগ কাজ করছে। বাংলাদেশ সরকার শিশু আইন ১৯৭৪, জাতীয় শিশুনীতি ১৯৯৪, শিশুদের জন্য জাতীয় কর্মপরিকল্পনা ২০০৫-১০, শিশুশ্রম জরিপ ২০০২-০৩ ও ২০১৩-এর পাশাপাশি জাতিসংঘের শিশু অধিকার সম্পর্কিত কনভেনশন এবং আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার বিভিন্ন কনভেনশনে শিশু অধিকার সম্পর্কিত নীতিমালাগুলো বাস্তবায়নে অঙ্গীকারবদ্ধ। কিন্তু বাস্তবায়নে শিথিলতা লক্ষণীয়।
বাংলাদেশে শিশুশ্রমের অবস্থার উন্নতির জন্য কয়েকটি কৌশল নেয়া প্রয়োজন। বিষয়গুলো হলো শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, প্রচারণা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, প্রতিরোধ, পুনর্বাসন এবং শিশু আইনের প্রচার ও স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা। মূল কৌশল হতে হবে কর্মজীবী শিশুদের জন্য দ্রুত শিক্ষা কর্মসূচি চালু করা, যোগাযোগের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য কর্মসূচি উদ্ভাবন করা, বিশ্লেষণাত্মক ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির জন্য বিভিন্ন আর্থিক সংস্থার সঙ্গে কর্মজীবী শিশুদের সংযোগ স্থাপন করা। শিশুদের জন্য উপযুক্ত করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতার নীতিগুলোর বিকাশ এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, ট্রেড ইউনিয়ন ও বিভিন্ন নিয়োগকারী সংস্থার মধ্যে সমন্বয় সাধন করে শিশুশ্রম কমাতে সচেতনতা সৃষ্টি করা প্রয়োজন। দারিদ্র্য নিরসন এবং শিশু আইনের প্রচার ও স্থায়িত্ব নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। শ্রম আইন বাস্তবায়নের পাশাপাশি স্কুল বৃত্তি এবং স্কুলে খাদ্য বিতরণ কর্মসূচিতে শিশুদের তালিকাভুক্ত করে শিশুশ্রম থেকে সুরক্ষা বাড়ানো যেতে পারে।
বাংলাদেশে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলোর সংখ্যা ও প্রসার ভালো হলেও সরাসরি শিশুশ্রম সমস্যা মোকাবেলার জন্য গৃহীত কর্মসূচি এখনো খুবই কম। প্রধানত স্কুল বৃত্তি এবং স্কুলে খাওয়ানোর কর্মসূচি, পুনর্বাসন ও নগদ অর্থ প্রদানের মধ্যেই এ কর্মসূচিগুলোর কার্যক্রম পরিচালিত হয়। তবে স্কুলভিত্তিক কর্মসূচি ছাড়া অন্য কর্মসূচিগুলোর জন্য বরাদ্দ ও ব্যাপ্তি খুবই কম। শিশুশ্রমের সমস্যা বিবেচনায় রেখে যদি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুবিধাভোগীদের চিহ্নিত করা হয়, তবে তা শিশুদের জন্য আরো কল্যাণকর হবে। জাতিসংঘ ২০২৫ সালের মধ্যে শিশুশ্রম নির্মূলের জন্য কিছু নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। এছাড়া এসডিজির লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী জোরপূর্বক শ্রম নির্মূল, আধুনিক দাসপ্রথা ও মানব পাচারের অবসান এবং নিকৃষ্টতম শিশুশ্রমের নিষেধাজ্ঞা ও নির্মূল করার জন্য অবিলম্বে এবং কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলা হয়েছে। এসডিজির আরেকটি লক্ষ্যমাত্রা শিশু শ্রমিকদের নিয়োগ ও ব্যবহার, শোষণ, পাচার এবং সব ধরনের সহিংসতা ও নির্যাতনের অবসান ঘটানো এবং সব ধরনের শিশুশ্রমের অবসান ঘটানোর কথা উল্লেখ করেছে। বাংলাদেশ সরকার জাতিসংঘ কর্তৃক নির্ধারিত এসডিজি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তাই শিশুশ্রম নিরসনে সরকার বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের অধীনে বেশকিছু উদ্যোগ, প্রকল্প ও কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। এছাড়া জাতীয় ও আন্তর্জাতিক এনজিওগুলোও শিশুশ্রম নিরসনে বিভিন্ন প্রকল্প ও কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা কঠিন হবে। কারণ শিশুশ্রমের মাত্রা কমছে না, বরং কভিড-১৯ ও চলমান যুদ্ধের কারণে তা আবার বৃদ্ধির সূত্রপাত করেছে। সুতরাং এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে মহামারী চলাকালীন ক্রমবর্ধমান শিশুশ্রমের জন্য আরো উদ্যোগের প্রয়োজন।
বাংলাদেশ একটি ঘনবসতিপূর্ণ দেশ, যেখানে জনসংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি শিশুদের সংখ্যাও বাড়ছে। তাই শিশুশ্রম নির্মূলে গৃহীত কর্মসূচি এবং পরিকল্পনাগুলোয় ভবিষ্যৎ শিশুশ্রমের মাত্রা ও অন্যান্য বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে পূর্বপরিকল্পনা রাখা উচিত। শুধু বিদ্যমান শিশুশ্রমের ওপর মনোযোগ নিবদ্ধ রাখলে শিশুশ্রম নির্মূলের স্থায়ী সমাধান আসবে না। বর্তমান ও ভবিষ্যৎ শিশুদের শ্রম থেকে রক্ষা করার কৌশল প্রণয়ন এ সমস্যা নিরসনের সর্বোত্তম পন্থা। এক্ষেত্রে নারী ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক কার্যক্রমের তালিকা এবং বাস্তবায়নের মাত্রা আরো জোরদার করতে হবে। সেই সঙ্গে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মাঝেও শিশুশ্রম সম্পর্কিত বিষয়গুলো মোকাবেলায় অনীহা দেখা গেছে। তাই মন্ত্রণালয়গুলোয় শিশুশ্রম প্রতিরোধের নীতিগুলো জোরদার করা এবং জবাবদিহি জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করতে হবে। প্রতিটি মন্ত্রণালয়কে শিশুশ্রম নিরসনে তাদের কর্তব্য সম্পর্কে অবহিত করতে হবে।
বাংলাদেশের অর্থনীতি ক্রমেই নানা প্রতিকূলতা মোকাবেলায় সুদক্ষ হয়ে উঠেছে, আয় বাড়ার সঙ্গে দেশের অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতার শঙ্কাও দূরীভূত হয়েছে অনেকখানি। বিগত কয়েক বছরের উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং তা বজায় রাখার ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ এরই মধ্যে স্বল্প আয়ের দেশের তালিকা থেকে নিম্নমধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে নবজাতক ও শিশুমৃত্যু হার হ্রাস, টিকাদান কর্মসূচি, দারিদ্র্য বিমোচন, প্রাথমিক শিক্ষায় জোর, সমতা অর্জনের মাধ্যমে সহস্রাব্দ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনসহ বিভিন্ন সামাজিক খাতেও অভাবনীয় সাফল্য অর্জিত হয়েছে। টেকসই উন্নয়নের যাত্রাপথে ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্য মানব উন্নয়নে বিনিয়োগ হলো সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ, আর মানব উন্নয়নে বিনিয়োগের সর্বোত্তম ক্ষেত্র হচ্ছে শিশুদের ওপর বিনিয়োগ। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়, দেশের ভবিষ্যৎ উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির উত্তম পন্থা হলো শিশুদের ওপর কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় সরকারি বিনিয়োগ নিশ্চিত করা।










