বর্তমানের ভূরাজনৈতিক পরিবেশে বিশ্ব নেতারা খুব কম বিষয়ে একমত। কিন্তু তার মধ্যে বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকে নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি একটি, যা সবাইকে এক কাতারে নিয়ে আসতে পারে। চীন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি কর্তৃপক্ষ বাজারের ক্ষমতা কমাতে, ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা করতে,  অধিক প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরিতে অ্যান্ট্রি ট্রাস্ট আইনের দিকে ঝুঁকছে। সামনের বছরগুলোতে আমরা সম্ভবত বাজার এবং রাষ্ট্রের মধ্যে একটি ফয়সালার বিষয়ে আরো বেশি তাগিদ দেখতে পাব। যেখানে এ প্রচেষ্টার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে অ্যান্টি ট্রাস্ট ল এবং বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো হবে এর প্রাথমিক লক্ষ্য।

ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়া একটা উদ্বেগের বিষয় হলো বিগ টেক কোম্পানিগুলো অনেক বড় হয়ে গেছে, যা এ বিষয়ে নেতিবাচক মনোভাব তৈরিতে ইন্ধন জুগিয়েছে। বছরের পর বছর ধরে টেক জায়ান্টগুলো যে অভিযোগে বিদ্ধ হচ্ছে, তাহলো তারা অনলাইন মার্কেটপ্লেসগুলোতে তাদের নিজস্ব পণ্যের পক্ষে সুবিধা দেয়, প্রতিযোগিতামূলক লাভের জন্য বিশেষ সুবিধায় প্রাপ্ত ভোক্তার তথ্যগুলোর অপব্যবহার করে এবং তাদের বাজারের অবস্থানের জন্য হুমকিস্বরূপ এমন প্রতিটি কোম্পানিকে অধিগ্রহণ করে প্রতিযোগিতার সুযোগ নষ্ট করে। এ চর্চার কারণে ভোক্তাদের জন্য খুব অল্প বিকল্প থাকে। ফলে তারা মুষ্টিমেয় কিছু কোম্পানির পণ্য এবং পরিষেবার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।

ইইউ দীর্ঘদিন ধরে বাজারের শক্তি পুনর্বণ্টন ও ভোক্তা কল্যাণ বাড়াতে অ্যান্টি ট্রাস্ট আইনকে কাজে লাগিয়ে এ সমস্যাগুলো মোকাবেলায় নেতৃত্ব দিচ্ছে। গত এক দশকে এটি শুধু গুগলের বিরুদ্ধেই তিনটি প্রতিযোগিতা খর্বের অভিযোগের তদন্ত সম্পন্ন করেছে, যার ফলে প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার জরিমানা করা হয়েছে। ইউরোপিয়ান কমিশন এখন গুগলের বিজ্ঞাপন প্রযুক্তি, ডাটা সংগ্রহের পদ্ধতি, অ্যাপলের অ্যাপ স্টোর, মোবাইল পেমেন্ট সিস্টেম, ফেসবুকের ডেটা সংগ্রহ ও ডিজিটাল বিজ্ঞাপন মডেল এবং অ্যামাজনের মার্কেটপ্লেসের কার্যক্রমের ওপর তদন্ত করছে এবং ইইউ নিয়ন্ত্রকরা আরো বেশি কিছু করতে চায়।

২০২০ সালে ইউরোপিয়ান কমিশন ডিজিটাল মার্কেট অ্যাক্টের প্রস্তাব (ডিএমএ) করেছিল, যাতে প্রযুক্তি জায়ান্ট এবং অন্য রাঘব বোয়াল কোম্পানিগুলোকে নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা তাদের ওপর ন্যস্ত করা হয়।  ডিজিটাল মার্কেট অ্যাক্ট এ স্বীকৃতি থেকে উদ্ভূত হয়েছে যে বিদ্যমান অ্যান্ট্রি ট্রাস্ট আইনের প্রয়োগ ডিজিটাল মার্কেটকে অধিক প্রতিযোগিতামূলক করতে পারেনি। ডিএমএ হলে এটি ইইউকে সম্পূর্ণরূপে একচেটিয়া ব্যবসা নিষিদ্ধ করার অনুমতি দেবে। আইনটি সম্ভবত ২০২২ সালে গৃহীত হবে, যার ফলে এটি বিশ্বব্যাপী প্রভাব ফেলবে। ‘ব্রাসেলস ইফেক্ট’ নামে পরিচিত একটি ঘটনার মাধ্যমে বড় বহুজাতিক কোম্পানিগুলো প্রায়ই বিশ্বব্যাপী তাদের ক্রিয়াকলাপে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিয়ম প্রসারিত করে। ঠিকইভাবে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোও এরই মধ্যে এ ধরনের প্রভাবের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে।

ইইউর আমেরিকান বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে অ্যান্টি ট্রাস্ট আইনের প্রয়োগ এতদিন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চুপচাপ দেখছিল। প্রযুক্তির স্বাধীনতাবাদীরা এ আইনকে ইউরোপের ঈর্ষাকাতরতা হিসেবে দেখলেও মার্কিন আইন প্রণেতারা এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো এখন এ শিল্পটির বাড়াবাড়ির বিষয়ে সজাগ হয়ে উঠছে। তারা ক্রমবর্ধমানভাবে প্রশ্ন করছে যে উন্মুক্ত বাজার ব্যবস্থা আসলেই কাঙ্ক্ষিত ফলাফল দিচ্ছে কিনা।

যুক্তরাষ্ট্রের হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভ বারবার বিগ টেক নেতাদের তাদের প্রতিযোগিতা খর্ব করার চর্চা বিষয়ে শুনানির আগে সাক্ষ্য দেয়ার জন্য ডেকেছিল। ২০২০ সালে অ্যান্টিট্রাস্ট, কমার্শিয়াল এবং অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ল সংক্রান্ত হাউজ সাবকমিটি ডিজিটাল মার্কেটে প্রতিযোগিতার ওপর একটি বড় রিপোর্ট প্রকাশ করে, যাতে মার্কিন অ্যান্টিট্রাস্ট আইনকে পুনরুজ্জীবিত করার আবেদন জানানো হয়েছে। বিচার বিভাগ ও ফেডারেল ট্রেড কমিশনও এর বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগ করছে, যেখানে বিচার বিভাগ গুগলের একচেটিয়া ব্যবসার চর্চাকে চ্যালেঞ্জ করেছে এবং ফেডারেল ট্রেড কমিশন অবৈধভাবে একচেটিয়া ব্যবসা করার জন্য ফেসবুকের বিরুদ্ধে মামলা করেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন এ নীতি পরিবর্তনের পেছনের পুরোভাগে রয়েছেন। তিনি শীর্ষ সরকারি পদে অ্যান্টিট্রাস্ট আইনের পক্ষের লোক হিসেবে পরিচিত শিল্প সমালোচকদের নিয়োগ করেছেন। ২০২১ সালের জুলাই মাসে বাইডেন প্রশাসন ‘আমেরিকান অর্থনীতিতে প্রতিযোগিতার উন্নয়ন’ বিষয়ে একটি উচ্চাভিলাষী নির্বাহী আদেশ জারি করেছিল, যা ইন্টারনেট প্লাটফর্ম শিল্পে একচেটিয়া ব্যবসার বিরুদ্ধে লড়াই করার প্রতিশ্রুতি দেয়।

চীনও প্রযুক্তি শিল্পে তার দৃষ্টিভঙ্গিতে একটি বিশাল পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘকাল ধরে চীনের কমিউনিস্ট পার্টি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা এবং চীনের প্রযুক্তিগত আধিপত্যকে এগিয়ে নেয়ার প্রয়াসে দেশীয় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর প্রতি একটি উদার মনোভাব বজায় রেখেছে। শিথিল বিধিবিধানের বিনিময়ে শীর্ষস্থানীয় কোম্পানিগুলো অনলাইন সেন্সরশিপের মাধ্যমে চীনের কমিউনিস্ট পার্টিকে সহায়তা করাসহ সরকারি প্রয়োজনের কাছে নিজেদের সমর্পণ করেছে। কিন্তু এখন সরকার ক্রমবর্ধমান সামাজিক বৈষম্য এবং সম্পদের বৈষম্যের দিকে মনোযোগ দিচ্ছে। চীনের বিগ টেক কোম্পানিগুলো রাষ্ট্রের চেয়ে বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠছে এ ভয়ে কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্ব এ শিল্পের নেতাদের আসল ক্ষমতার মালিক কারা তা মনে করিয়ে দিতে প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে।

একইভাবে ২০২১ সালের এপ্রিলে চীনা কর্তৃপক্ষ প্রতিদ্বন্দ্বী ই-কমার্স প্লাটফর্মগুলোতে ব্যবসায়ীদের পণ্য বিক্রি করতে বাধা দেয়ার জন্য ই-কমার্স জায়ান্ট আলিবাবাকে ২ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার জরিমানা করেছিল। কর্তৃপক্ষ প্রযুক্তি কোম্পানি টেনসেন্টকে জরিমানা করেছে। এটিকে গ্লোবাল রেকর্ড লেবেলের সঙ্গে তার একচেটিয়া সংগীত লাইসেন্সিং চুক্তি শেষ করার আদেশ দিয়েছে এবং চীনের শীর্ষ দুটি ভিডিও গেম স্ট্রিমিং সাইট, হুয়া এবং ডুইউ অধিগ্রহণের প্রচেষ্টাকে প্রতিহত করেছে। এ জরুরি পদক্ষেপগুলো ছাড়াও সরকার ইন্টারনেটভিত্তিক কোম্পানিগুলোকে টার্গেট করে নতুন অ্যান্টিট্রাস্ট আইনের খসড়া তৈরি করেছে।

আসন্ন অগ্নিপরীক্ষা

পরবর্তী সময়ে কী ঘটবে তা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের তুলনায় ইইউতে ভবিষ্যদ্বাণী করা সহজ। সম্ভাব্য ২০২২ সালে ইইউর ডিজিটাল মার্কেট অ্যাক্ট কার্যকর করার পর কমিশন তার অনেকগুলো অ্যান্টিট্রাস্ট আইনের অধীনে তদন্তের ক্ষমতাসহ স্বাধীন হয়ে যাবে (ইউরোপীয় আদালতের একটি বড় ঘটনা ছাড়া, যাতে আগামী বছরের মধ্যে আদালত কমিশনের বিরুদ্ধে গুগলের আপিলের ওপর রায় দেবে বলে আশা করা হচ্ছে)।

বড় একটি অস্পষ্ট বিষয় হলো মার্কিন নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো অ্যান্টিট্রাস্ট আইনের মতো বড় পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত হতে মার্কিন আদালতকে রাজি করাতে কতটা কার্যকর হবে। গত বছর   থেকে দেখা  গেছে,  ফেসবুক এবং অ্যাপল  যে একচেটিয়া ব্যবসা করে না  সেটি যুক্তি দিয়ে আমেরিকার রক্ষণশীল আদালতগুলোকে সহজে  বোঝানো যাবে না। বড় আকারে বিভক্ত ইউএস কংগ্রেস বিগ টেকের বিরুদ্ধে তার অসন্তোষকে কাজে লাগাতে পারে কিনা এবং অর্থবহ আইন পাস করতে পারে কিনা তাও দেখতে হবে।

হাস্যকরভাবে চীনের নিজস্ব কঠোর নীতিমালা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অ্যান্টিট্রাস্ট আইন সংস্কারের পথ প্রশস্ত করতে পারে, কারণ এর ফলে মার্কিন কোম্পানিগুলো এ যুক্তি দিতে পারবে না যে তাদের শক্তি হ্রাস করা হলে তাদের চীনা প্রতিদ্বন্দ্বীদের বিরুদ্ধে তারা দুর্বল হয়ে যাবে। এখানে কমিউনিস্ট পার্টি কী করতে পারে প্রশ্ন তা নয়, বরং এটি কতদূর যেতে প্রস্তুত প্রশ্ন সেটাই। চীন যদি বৈশ্বিক প্রযুক্তিগত পরাশক্তি হয়ে উঠতে চায় তার একটি সমৃদ্ধ প্রযুক্তি শিল্প প্রয়োজন; কিন্তু সরকারের জন্য সামাজিক সম্প্রীতি আরো বেশি প্রয়োজন। বিষয়গুলো দেখে মনে হচ্ছে যে পার্টিটি নিশ্চিত করতে চায় যে চীনা প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর সাফল্যের ফল ‘সম্মিলিত সমৃদ্ধির’ নামে আরো ব্যাপকভাবে বণ্টিত  হোক। এ ভারসাম্য বজায় রাখা চীনের নিয়ন্ত্রকদের জন্য শুধু আগামী বছরেই নয়, পরবর্তী দশকেও মূল চ্যালেঞ্জ হবে।

কিছু অনিশ্চয়তা সত্ত্বেও এটা স্পষ্ট যে নতুন নিয়ন্ত্রণ অভিযান একটি উদীয়মান আন্তর্জাতিক ঐকমত্যকে প্রতিফলিত করে। ইইউ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং চীন ছাড়াও অস্ট্রেলিয়া, ভারত, জাপান, রাশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাজ্যের মতো অন্যান্য বৃহৎ অর্থনীতিগুলোও প্রযুক্তি শিল্পে অভিযান চালাতে যাচ্ছে।

এ পরিবেশে বিগ টেককে তার আসল লড়াই বেছে নিতে হবে এবং সাবধানে পদচারণা করতে হবে। আমরা বাণিজ্য ও সরকারের মধ্যে একটি দীর্ঘস্থায়ী প্রতিযোগিতার দিকে যাচ্ছি, যা সব সমাজের জন্য সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে এবং তাত্ক্ষণিকভাবে এর কোনো শেষ নেই।

 

আনু ব্র্যাডফোর্ড: অধ্যাপক, ল অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন, কলাম্বিয়া ল স্কুল, যুক্তরাষ্ট্র

ভাষান্তর: হাসান তানভীর