করোনা মোকাবেলায় দেশে চলছে গণটিকাদান কার্যক্রম। বর্তমানে চল্লিশোর্ধ্ব ও ২০ শ্রেণী-পেশার জনগোষ্ঠীকে টিকা দেয়া হচ্ছে। উল্লিখিত ক্যাটাগরির মধ্যে অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা প্রবাসী শ্রমিকরাও রয়েছেন। বিদেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে হয়রানি এড়াতে তাদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে টিকার আওতায় আনা হয়েছে। বেশি মানুষকে টিকাকরণের উদ্দেশ্যে বর্তমানে বয়সসীমা ৩৫ বছর করারও চিন্তা করা হচ্ছে। শিগগিরই এ ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। অথচ এখন পর্যন্ত পোশাক কর্মীদের টিকার আওতায় আনা হয়নি। তারা মহামারীতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছেন। সম্প্রতি সম্মুখসারির এসব অর্থনৈতিক যোদ্ধার জন্য টিকা বরাদ্দের প্রস্তাব করেছে পোশাক মালিক সংগঠন বিজিএমইএ। ভালো প্রস্তাব। এটি আমলে নিয়ে পোশাক কর্মীদের জন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে টিকার ব্যবস্থা করাই এখন জরুরি।
দেশের অর্থনীতির অন্যতম বড় চালিকাশক্তি পোশাক শিল্প। আমাদের রফতানি আয়ের সিংহভাগই আসে এ খাত থেকে। মহামারীর প্রাদুর্ভাবের পর থেকে খাতটি চ্যালেঞ্জিং সময় পার করছে। মাঝে বড় গন্তব্যগুলোয় পোশাকের চাহিদা কমায় রফতানি আয়ে ঋণাত্মক প্রবণতা দেখা দিয়েছিল। সংক্রমণজনিত স্থিতাবস্থায় বিশ্ববাজারে পোশাকের চাহিদা ফের ঊর্ধ্বমুখী। এখন পোশাক রফতানিতে ইতিবাচক ধারা বিরাজমান। ক্রমেই বাড়ছে এ খাতের আয়। এটা সম্ভব হয়েছে পোশাক কর্মীদের পরিশ্রম ও একাগ্রতার কারণে। গত বছরের লকডাউনেও পোশাক কারখানা খোলা রাখা হয়েছিল। এবারের লকডাউনেও কারখানা সচল। সংক্রমণের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছেন পোশাক শ্রমিকরা। এ পর্যন্ত অনেকে করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন, পরে তাদের অনেকে সুস্থ হয়েছেন। কেউ কেউ মারাও গেছেন। বলা চলে, অর্থনীতি সচল রাখার ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রাখছেন তারা। সংক্রমণের অবনতিশীল পরিস্থিতিতেও তাদের অফিসে যেতে হচ্ছে। দ্রুত টিকার আওতায় আনা গেলে এ শিল্পের কর্মীদের সংক্রমণের ঝুঁকি অনেকটাই কমে আসত। কাজেই বিষয়টি গভীরভাবে বিবেচনার দাবি রাখে।
সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে স্বাভাবিকতা ফেরাতে দেশে দেশে চলছে গণটিকাকরণ। সবাই চেষ্টা করছে দ্রুততম সময়ে বেশি মানুষকে টিকার আওতায় আনতে। প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে। এক্ষেত্রে তারা বেশি অগ্রাধিকার দিচ্ছে বয়স্ক জনগোষ্ঠী, সম্মুখসারির স্বাস্থ্যযোদ্ধা এবং নিজস্ব অর্থনীতিতে বেশি অবদান রাখা কর্মীদের। উদ্দেশ্য, অর্থনীতি যেন দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে পারে। সর্বোচ্চ পোশাক রফতানিকারক দেশগুলোর নীতি পর্যালোচনায় বিষয়টি আরো বেশি পরিষ্কার হবে। পোশাক রফতানিতে বর্তমানে প্রথম ও দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে যথাক্রমে চীন ও জার্মানি। দেশ দুটির পোশাক শিল্প বেশির ভাগ ক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয় হয়েছে। প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে তারা উচ্চ মূল্যসংযোজিত পণ্য তৈরি করছে। সে হিসেবে সেখানে কর্মী নিয়োজন তুলনামূলক কম। তবু তারা পোশাক শিল্পে নিয়োজিত কর্মীদের টিকার আওতায় এনেছে। শুধু পোশাক নয়, ক্রমানুক্রমিকভাবে অবদান রাখা অন্য শিল্পের কর্মীদেরও টিকা প্রদান করা হচ্ছে। এর লক্ষ্য হলো মহামারীর অভিঘাত যেন অর্থনীতিগুলো দ্রুত কাটিয়ে ওঠে, আর যেন অনিশ্চয়তায় না পড়ে। ভিয়েতনামও পোশাক কর্মীদের টিকা দিচ্ছে। ভারতও পোশাক কর্মীদের টিকার অগ্রাধিকার তালিকায় রেখেছে। হংকং, স্পেনও তা-ই করছে। পোশাক রফতানিতে বর্তমানে বিশ্বে আমাদের অবস্থান তৃতীয়। রফতানি বৈচিত্র্যের অভাবে পোশাক এখনো আমাদের দেশের প্রধান পণ্য। অথচ এখন পর্যন্ত এ খাতের কর্মীদের টিকার আওতায় আনা হয়নি। এটি হতাশাজনক। প্রতিযোগী দেশগুলোর নীতি ও অভিজ্ঞতা পুনর্বীক্ষণ করে এক্ষেত্রে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া দরকার।
রফতানি ঝুড়ি বৈচিত্র্যময় না হওয়ায় পোশাক খাতের অভিঘাত খুব প্রত্যক্ষভাবে অর্থনীতিতে পড়ে। চলমান মহামারীতে এটি এরই মধ্যে স্পষ্ট। দেশ যেহেতু টিকা যুগে প্রবেশ করেছে, সেহেতু কর্মীদের টিকা প্রদান ক্রেতাদের কমপ্লায়েন্স শর্ত হিসেবেও হাজির হতে পারে। এমনও হতে পারে, শ্রমিকদের টিকা না দিলে বড় ক্রেতারা বাংলাদেশে ক্রয়াদেশ দেবে না কিংবা বিদ্যমান ক্রয়াদেশ প্রত্যাহার করবে। এখন পর্যন্ত অবশ্য এটা হয়নি। ফলে এ ধরনের একটা বহিঃস্থ অভিঘাতের শঙ্কা থেকেই যায় বৈকি। কাজেই এ ধরনের শঙ্কা এড়াতে জরুরি ভিত্তিতে পোশাক কর্মীদের টিকার আওতায় আনতে হবে। এরই মধ্যে অনেক দেরি হয়েছে। আর বিলম্ব কাম্য নয়। বলা হচ্ছে, দেশীয় শ্রমিকের পাশাপাশি সাড়ে ৮০০ খাতে বিদেশী কর্মী কাজ করে। সে হিসেবে বিজিএমইএর পক্ষ থেকে সরকারের কাছে ৪২ লাখ টিকা বরাদ্দ চেয়েছে। বর্তমানে বিভিন্ন উৎস থেকে টিকা আনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এরই মধ্যে কিছু টিকা দেশে এসেছে। আরো আসবে। ফলে টিকার মজুদ বাড়ছে। এ প্রেক্ষাপটে বিজিএমইএর চাওয়া টিকার সংস্থান করা কঠিন হবে না। অর্থনীতির স্বার্থেই তাদের জন্য টিকা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
আমাদের পোশাক খাত ব্যাপক শ্রমঘন। স্বল্প পরিসরে বিপুলসংখ্যক কর্মী একসঙ্গে কাজ করে। লকডাউনে অর্ধেক কর্মী দিয়ে পরিচালিত হলেও স্বাভাবিক অবস্থায় পূর্ণ সক্ষমতায় কারখানাগুলো সচল থাকে। এক্ষেত্রে শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা কঠিন, বিশেষ করে কমন স্পেসগুলো ব্যবহারের সময়ে। ফলে সংক্রমণের আশঙ্কাও বেশি। এ বাস্তবতায় যেহেতু কারখানা বন্ধ রাখা যাচ্ছে না, সেহেতু পোশাক কর্মীদের টিকা প্রদানই আপাতত সংক্রমণ প্রতিরোধের অন্যতম জুতসই সমাধান বৈকি।
এত বিপুলসংখ্যক মানুষের টিকা প্রদানের বিষয়টি নিঃসন্দেহে বেশ চ্যালেঞ্জিং। এখন সারা দেশে গণটিকাদান চলছে। এজন্য বিপুল কর্মিবাহিনী নিয়োজিত। এর মধ্যে পোশাক খাতের কর্মীদের টিকা দেয়া হলে আরো অনেক জনবল লাগবে। বর্তমান অবস্থায় সরকারের পক্ষ থেকে জনবলের জোগান দেয়া কঠিন। সেক্ষেত্রে দায়িত্বটি বিজিএমইএর ওপর ন্যস্ত করা যেতে হবে। সংগঠনটির ব্যবস্থাপনা ভালো। কোন কারখানায় কতজন কর্মী রয়েছেন, পুঙ্খানুপুঙ্খ তথ্য তাদের আছে। তালিকা ধরে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় টিকা প্রদান করা হলে কাজটি খুব একটা কঠিন হবে না। সরকার ও পোশাক সংগঠনের সক্রিয়তায় পোশাক কর্মীদের দ্রুত টিকার আওতায় আনা হবে, এটিই প্রত্যাশা।










