জীবন ও জীবিকাকে গুরুত্ব দিয়ে অর্থমন্ত্রী ৬ লাখ কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব পেশ করলেও তাতে জীবন ও জীবিকা রক্ষায় বলিষ্ঠ পদক্ষেপের দেখা মেলেনি। সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূচক হচ্ছে দারিদ্র্য, কর্মসংস্থান ও আয়। বাজেটে এ তিন ক্ষেত্রেই যা বলা হয়েছে, তার মধ্যে বিস্তর ব্যবধান রয়েছে। আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান হারানোর সংখ্যাও নেহাত কম নয়। দারিদ্র্যের পাশাপাশি সমাজে বৈষম্যও বেড়েছে। অন্যদিকে কর্মসংস্থানের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়েছে। অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, ২০২১ সালে দারিদ্র্যের হার দাঁড়াবে ২৩ শতাংশে। ২০২৪ সালে তা দাঁড়াবে ১৭ শতাংশে। কিন্তু বাজেট বক্তৃতায় বলা হলো, ওই সময় দারিদ্র্য ১২ দশমিক ৩ শতাংশে নামিয়ে আনা যাবে। অথচ সব গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, ২০২১ সালে দারিদ্র্যের হার ন্যূনতম ৩০ থেকে সর্বোচ্চ ৪০ শতাংশ পর্যন্ত উঠতে পারে। প্রস্তাবিত বাজেটে বলা হয়েছে, তিন বছরে বিদেশে সাত লাখ করে মোট ২১ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হবে। কিন্তু অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, ছয় লাখ করে কর্মসংস্থান হবে। যুব প্রশিক্ষণের কথা আছে কিন্তু কর্মসংস্থানের কথা নেই। সামাজিক নিরাপত্তার আওতা বাড়ছে কিন্তু এ অর্থের পরিমাণ জিডিপির মাত্র শূন্য দশমিক ২ শতাংশ। ৫০০ টাকা করে দেয়া হচ্ছে। অথচ ন্যূনতম জীবনধারণের জন্য প্রয়োজন ১ হাজার ৮৬২ টাকা। আবার ভারতে এ ভাতার পরিমাণ বাংলাদেশী টাকায় ১ হাজার ২০০ টাকা। প্রশ্ন হলো, এমন বৈপরীত্য নিয়ে নতুন দারিদ্র্য ও বেকারত্বের দৈত্য থেকে বাজেট

কি সাধারণ মানুষকে সুরক্ষা দিতে পারবে? জীবন ও জীবিকা রক্ষায় সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার ঘাটতি লক্ষণীয়।

করোনাকালে নতুন করে দরিদ্র হয়ে পড়া জনগোষ্ঠী করোনা-উত্তরকালে আপনাআপনি দারিদ্র্য বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসবে, এমনটি ধরে নেয়া ঠিক হবে না। করোনাকালে সৃষ্ট নতুন দরিদ্রশ্রেণীকে দারিদ্র্য থেকে বের করে আনতে প্রয়োজন যথাযথ ও কার্যকর পদক্ষেপ। মনে রাখতে হবে, তাদের দরিদ্র হয়ে ওঠার ঘটনাটি ঘটেছে ভিন্ন একটি প্রেক্ষাপটে। এ দারিদ্র্য বিমোচন প্রক্রিয়ায় তাই প্রচলিত কৌশল কাজে লাগানোর পরিবর্তে বিশেষ কৌশল নিয়ে মাঠে নামতে হবে। দারিদ্র্যসীমার ওপরে ওঠা ও দারিদ্র্য ফাঁদ থামানো বা দারিদ্র্যকে টেকসইভাবে কমিয়ে আনার জন্য জরুরি বিষয় হলো তাদের অনুকূলে সম্পদ হস্তান্তর, ক্ষুদ্র ও মাঝারি কর্মমুখী উদ্যোগে বিনিয়োগ বা ঋণ, উৎপাদনমুখী ভাতা, ব্যবসায় সহায়তা, কর্মসংস্থানের ফয়সালা কিংবা কর্মমুখী শিক্ষার নিশ্চয়তা তৈরি। প্রস্তাবিত বাজেটে এর কোনো কিছুই নেই। বড় ব্যবসায়ী ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানকে বিপুল কর ছাড় দিয়ে অর্থনীতির গতি হয়তো কিছুটা বাড়ানো যাবে, কিন্তু তাতে নতুন দারিদ্র্য ও বেকারদের অবস্থার দ্রুত পরিবর্তন ঘটবে না। এতদিন বাংলাদেশ যে প্রবৃদ্ধির পথে এগোচ্ছিল, তা ছিল কর্মসংস্থানবিহীন। কভিডের প্রভাবে এতে আরো নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। যে কর্মসংস্থান হারিয়েছি, তা পুনরুদ্ধারে এবং নতুন করে আরো কর্মসংস্থান তৈরিতে এখন বিশেষ কর্মযজ্ঞের প্রয়োজন। এ মুহূর্তে সরকারি বিনিয়োগকেই হতে হবে মুখ্য বিনিয়োগ। একই সঙ্গে বেসরকারি বিনিয়োগও দারিদ্র্য কমাতে সহায়কের ভূমিকা পালন করতে পারে।

দারিদ্র্য বিমোচনে বাংলাদেশে ধারাবাহিক সাফল্য বিশ্বে প্রশংসিত হয়েছে। এর পেছনে রাষ্ট্রীয় সমর্থন ও বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার যুগপৎ অবদান রয়েছে। বাংলাদেশের দারিদ্র্য বিমোচন কৌশল উন্নয়নশীল অনেক দেশেই অনুসরিত হচ্ছে। নিশ্চয়ই করোনাসৃষ্ট দারিদ্র্যও সফলতার সঙ্গে আমরা মোকাবেলা করতে পারব। তবে তার জন্য সামাজিক সুরক্ষায় বিরাজমান দুর্বলতাগুলো দূর করা প্রয়োজন। নতুন মাত্রাগুলো চিহ্নিত করে সময়োপযোগী, সুচিন্তিত পদক্ষেপ নিতে হবে। বাড়াতে হবে নগদ সহায়তা। এক্ষেত্রে সুফলভোগীর তালিকা তৈরি থেকে বিতরণ—সব পর্যায়ে আগের ত্রুটির পুনরাবৃত্তি দূরীকরণ এবং কার্যক্রমে স্বচ্ছতা আনতে হবে। করোনাকালীন সহায়তার ক্ষেত্রে শ্রীলংকা, ইন্দোনেশিয়া, অস্ট্রেলিয়ার উদ্যোগ প্রশংসার দাবি রাখে। এক্ষেত্রে সিঙ্গাপুরের অভিজ্ঞতা বিশেষভাবে দৃষ্টান্তমূলক। দেশটি কর্মহীন ও নতুন করে দারিদ্র্যের রেজিস্ট্রেশনের জন্য হট লাইন নম্বর চালু করেছে। সেখানে সহায়তা প্রয়োজন হওয়া যে কেউ ফোন করতে পারে। ফোন করলে টেলিফোন কর্মীরা তাদের প্রয়োজনীয় তথ্য সংরক্ষণ করেন এবং অনলাইনে নিবন্ধন করে নেন। এতে তালিকা তৈরি ও বিতরণ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে। আমাদের দেশেও এটা অনুসরণ করা যেতে পারে। যদিও এরই মধ্যে মোবাইল ব্যবহারকারীদের তথ্য নিয়ে দারিদ্র্য চিহ্নিত এবং তাদের সহায়তা প্রদানের একটি প্রকল্প সরকার গ্রহণ করেছে। এর যথাযথ বাস্তবায়নেও ইতিবাচক ফল মিলতে পারে।

বিশ্ব অর্থনীতি নিয়ে নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ দম্পতি অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় ও এস্থার দুফলো বলেছেন, এখন সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো মানুষের জীবন বাঁচানো ও অদূর ভবিষ্যতে তাদের কাজে ফেরানো। তার পরবর্তী সময়ের সমস্যা, স্বাভাবিক অর্থনীতিতে ফিরে যাওয়া। আজ আমরা প্রাণ বাঁচাতে যা করছি, তার পরিণাম বড় হতে হতে যেন ভবিষ্যতে জীবিকা হারানোর কারণ হয়ে না দাঁড়ায়, তা দেখতে হবে। এক্ষেত্রে বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়ার কথা; কিন্তু সেটি দেয়া হয়নি। জিডিপি অনুপাতে বরাদ্দ আরো কমেছে। চিকিৎসক ও নার্সদের বেতন-ভাতা, সহায়ক হাসপাতাল ও জরুরি কক্ষ তৈরি, টিকা কেনা, ক্লিনিক প্রতিষ্ঠা, সব ধরনের নিরাপত্তাসহ প্রয়োজনীয় উপকরণের ব্যবস্থা, নিয়মিত হাত ধোয়া ও মাস্ক ব্যবহার করতে হবে— এমন অতিসাধারণ সচেতনতামূলক প্রচার চালিয়ে যাওয়া, এসবই হচ্ছে এ মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি বিনিয়োগ। আর জীবিকা বাঁচাতে প্রয়োজন লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা প্রদান। এর মধ্যে থাকবে নগদ সহায়তা, বেতনে ভর্তুকি, স্বল্পমেয়াদি কাজের ব্যবস্থা করা, বেকারদের জন্য কর্মসূচি তৈরি এবং ঋণ করার ব্যয় কমানো। আবার যেসব দেশে অনানুষ্ঠানিক খাত বড়, যাদের জীবিকা প্রতিদিনকার মজুরির ওপর নির্ভরশীল, সেসব দেশে বিশেষ ব্যবস্থা নেয়া জরুরি। কেননা, সেখানে সামাজিক দূরত্ব পালন করে যাওয়া কঠিন একটি কাজ। বাংলাদেশে মোট শ্রমশক্তির বড় অংশই কাজ করে অনানুষ্ঠানিক খাতে। জনস্বাস্থ্য রক্ষা এবং মানুষকে কর্মে ফিরিয়ে আনার কাজটি একই সঙ্গে করতে হবে। বিপর্যয় ও মন্দার এ সময়ে কাদের বিশেষ সহায়তা লাগবে এবং কী ধরনের, সে পরিকল্পনা তৈরি করা হবে প্রথম কাজ। প্রস্তাবিত বাজেটে এ সম্পর্কিত বলিষ্ঠ পদক্ষেপ ও পরিকল্পনার ঘাটতি দৃশ্যমান। ফলে ঘোষিত বাজেট জীবন ও জীবিকা রক্ষায় কতটা সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।

সরকার টানা তিন মেয়াদে যেভাবে দেশের অতিদরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীমূলক কর্মসূচির আওতা বাড়িয়েছে, যেভাবে অবকাঠামোগত উন্নয়নে সর্বাত্মক মনোযোগী হয়েছে, তাতে দারিদ্র্য বিমোচনে সাফল্য অস্বাভাবিক ছিল না। কিন্তু করোনা এসে নতুন পরিস্থিতির মুখোমুখি করেছে সবাইকে। এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকারের দ্বিগুণ উদ্যোগ প্রয়োজন। সেক্ষেত্রে একদিকে যেমন সরকারি প্রণোদনা, সহায়তা, সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীমূলক কর্মসূচিগুলোর সুচারু বাস্তবায়নে জোর দিতে হবে, তেমনি নিতে হবে কর্মসংস্থানমূলক নতুন নতুন কর্মসূচি। বর্তমানে প্রচলিত সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলো সর্বজনীন নয়। কিছু নির্দিষ্ট শ্রেণীর মানুষকে লক্ষ্য করে কর্মসূচিগুলো গৃহীত। ফলে সুবিধাভোগী বাছাই করা হয় রাজনৈতিক বিবেচনায়। জনসংখ্যার তথ্যভিত্তিক ডাটাবেজ নেই। ফলে প্রকৃত সুবিধাভোগী বাছাই করা যাচ্ছে না এবং সবার কাছে সহায়তা পৌঁছাতে পারছে না। করোনার অভিঘাতে খানাগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। যেকোনো অভিঘাতে খানাগুলোর ঝুঁকি হ্রাসের সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে সর্বজনীন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি প্রয়োজন। সর্বজনীন পেনশন ভাতা, বেকার ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা, শিশু প্রতিপালন ভাতা, আবাসন সুবিধা, আয় সহায়ক ভাতা ও স্বাস্থ্য ভাতা প্রদানের মতো কর্মসূচি গ্রহণ করা প্রয়োজন।