উচ্চমূল্যে বিদ্যুৎ কিনে
কম দামে
বিক্রি করে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ
উন্নয়ন বোর্ড
(বিপিডিবি)। এজন্য প্রতি
বছর বড় অংকের লোকসান
গুনছে সংস্থাটি।
এ ঘাটতি
পূরণে ভর্তুকি
চাইলেও তা ঋণ হিসেবে
বিপিডিবিকে দিয়েছে
অর্থ মন্ত্রণালয়। পাহাড়সম এ ঋণ পরিশোধ করতে
পারছে না সংস্থাটি। আবার
এ ঋণের
কারণেই বিদ্যুৎ
খাতের উন্নয়নে
বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হতে পারছে না বিপিডিবি। বিপাকে
পড়ে ঋণ ভর্তুকিতে রূপান্তরের জন্য কয়েক দফায়
অর্থ বিভাগকে
চিঠিও দিয়েছে
সংস্থাটি। কিন্তু
অর্থ মন্ত্রণালয় সাড়া দিচ্ছে না। বিপিডিবির একদিকে
বিদ্যুৎ কেনার
অর্থ নেই, অন্যদিকে নতুন
কোনো বিনিয়োগও
করতে পারছে
না। ফলে বিদ্যুৎ খাত বড় ধরনের
ঝুঁকির মুখোমুখি।
জটিলতা নিরসনে
সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোকেই আলোচনার মাধ্যমে একটি
গ্রহণযোগ্য সমাধানে
দ্রুত উপনীত
হতে হবে।
মহাপরিকল্পনা সংশোধনপূর্বক ভর্তুকি ও ঋণের
চক্র থেকে
বিদ্যুৎ খাতকে
বের করে আনা প্রয়োজন।
ভ্রান্ত নীতির
কারণে বিপিডিবি
আজ রুগ্ণ
প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত হয়েছে।
বিদ্যুৎ
খাতে ক্রমাগত
লোকসানের পেছনে
মূলত দুটি
কারণ দায়ী
বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, একদিকে
বেসরকারি খাতে
বিশেষত রেন্টাল
ও কুইক
রেন্টাল কেন্দ্রগুলো থেকে উচ্চমূল্যে বিদ্যুৎ
কিনতে হচ্ছে,
আবার প্রত্যাশিত হারে চাহিদা না বাড়ায় বসিয়ে
রাখতে হচ্ছে
নতুন-পুরনো
অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র। উৎপাদন সক্ষমতা প্রায়
দ্বিগুণ হলেও
চাহিদা না থাকায় এত বিদ্যুৎ উৎপাদন
করে না বিদ্যুৎ বিভাগ।
বিদ্যুতের চাহিদা
না থাকায়
কিছু বিদ্যুৎকেন্দ্রকে বসিয়ে রাখতে হচ্ছে।
তবে অলস বসে থাকা
বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে ঠিকই কোটি
কোটি টাকা
ভাড়া দিতে
হয়। অলস বসে থাকা
বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্যাপাসিটি চার্জ যুক্ত হয়ে বিদ্যুতের গড় উৎপাদন খরচ বেড়েছে। পিডিবির
হাজার কোটি
টাকা লোকসানের
বোঝা জনগণের
ঘাড়ে এসে পড়েছে। এটিকে
যৌক্তিক পর্যায়ে
নামিয়ে আনলে
বিদ্যুৎ খাতে
লোকসান অনেক
কমে যেত।
এদিকে সঠিক
পরিকল্পনার ঘাটতি
ও চাহিদা
না থাকার
পরও একের
পর এক কয়লা ও তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের ফলে জ্বালানি
খাতে সংকট
আরো প্রকট
হয়েছে। এ খাতের আরেকটি
সমস্যা হচ্ছে,
বিদ্যুৎ উৎপাদনের
দিকে যেভাবে
গুরুত্ব দেয়া
হয়েছে, সরবরাহ
ব্যবস্থার উন্নয়নের
দিকে সেভাবে
গুরুত্ব দেয়া
হয়নি। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন
সক্ষমতা বাড়িয়েও
সুফল মিলছে
না। বিদ্যুৎ
বিভাগের মহাপরিকল্পনায় বাংলাদেশের ভূপ্রকৃতি, জনবসতি,
জাতীয় সক্ষমতা
এবং জনস্বার্থ
উপেক্ষিত হয়েছে;
আমদানি ও ঋণ নির্ভরতাকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে।
পরিকল্পনায় অতিরিক্ত
চাহিদা নিরূপণ
করা হয়েছে।
এসব ভ্রান্ত
নীতির কারণে
বিপিডিবিকে ব্যাপক
লোকসান করতে
হয়েছে। আর ঘাটতি মেটাতে
গিয়ে সরকারের
কাছ থেকে
কখনো ভর্তুকি
আবার কখনো
ঋণ করতে
হয়েছে।
বিদ্যমান
বাস্তবতায় বিপিডিবির
সংকট উত্তরণে
সরকারকে এগিয়ে
আসতে হবে।
এক্ষেত্রে বিপুল
অংকের ঋণ সরকার ভর্তুকি
বা ইকুইটি
হিসেবে দিতে
পারে। কারণ
বিদ্যুৎ খাত পরিচালনা করতে
গিয়ে এ অর্থ ব্যয়
হয়েছে। একই সঙ্গে আগামীতে
যাতে পিডিবি
আর ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেজন্য
সরকারকে বিদ্যুৎ
ক্রয় চুক্তি,
বিদ্যুতের উৎপাদন
সক্ষমতা ও আইপিপি খাতের
বিষয়গুলো গুরুত্ব
দিয়ে দেখতে
হবে। কত বছর ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করা হবে, কী পরিমাণ অর্থ
দেয়া হবে প্রভৃতি বিষয়ে
নীতি সংস্কার
করা প্রয়োজন।
বিদ্যুৎ খাতের
উন্নয়নের সঙ্গে
বিনিয়োগ, উৎপাদন
ব্যবস্থা, জীবনমানের
উন্নয়ন অনেকাংশে
নির্ভরশীল। গত এক দশকে
এ খাতে
সরকারের অর্জন
অবশ্যই প্রশংসনীয়। তবে এক্ষেত্রে অস্বচ্ছতা,
দুর্নীতি ও জবাবদিহিতার বিষয়টি
জনমনে বড় ধরনের সংশয়
সৃষ্টি করেছে।
বিদ্যুৎ খাতের
অ্যাডহকভিত্তিক পদক্ষেপ
ও অপরিণামদর্শী চুক্তিগুলো নিয়ে নতুন
করে ভাবতে
এবং দ্রুত
কার্যকর সিদ্ধান্ত
নিতে হবে।
বিদ্যুতের দাম অনেকটা নির্ভর করে প্রাথমিক জ্বালানি মূল্যের ওপর। সংগত কারণে প্রায় সব দেশই দেশীয় উৎসের জ্বালানি প্রাপ্যতার নিরিখে বিদ্যুৎ খাতের পরিকল্পনা করেছে। কারণ তারা জানে আমদানিনির্ভর জ্বালানি দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে সহনীয় দামে তা সরবরাহ করা সম্ভব নয়। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, দক্ষিণ কোরিয়া, চীন প্রভৃতি দেশ তাই টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তা অর্জন করেছে। দেশীয় জ্বালানি ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে। সেজন্য জার্মানিসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বিদ্যুতের দাম আমাদের চেয়ে কম। এমনকি প্রতিবেশী ভারতও প্রাকৃতিক গ্যাস, কয়লা, পানিসম্পদ, সৌরশক্তিসহ দেশীয় জ্বালানি দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে এবং সুলভে গ্রাহকের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে। বাংলাদেশেও কৌশল একসময় একই রকম ছিল। স্বল্পমূল্যের প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর নির্ভর করে বাংলাদেশ দীর্ঘ সময় অর্থনীতির চাকা স্বচ্ছন্দে চালু রেখেছে। পরবর্তী সময়ে গ্যাস সংকট জ্বালানি খাতে ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। আমদানি করা জ্বালানির ওপর বেড়ে যায় নির্ভরতা। এর ভিত্তিতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা জারি রাখা হয়। এখনো আমদানিনির্ভরতা বিদ্যমান। প্রাকৃতিক গ্যাস কিংবা অন্য জ্বালানি সম্পদ অনুসন্ধানে খুব একটা গতি নেই। ফলে এলএনজি আমদানি করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের দিকেই এগোচ্ছে সরকার, যা আরো একটি ভ্রান্ত নীতির উদাহরণ। আন্তর্জাতিক এলএনজি বাজারের উদ্বায়িতা প্রবল। আকস্মিক দাম ওঠানামা করে। এই বহিস্থ অভিঘাত মোকাবেলায় সমর্থ নয় আমাদের জ্বালানি খাত। উচ্চমূল্যে আমদানীকৃত এলএনজি দিয়ে উৎপাদিত বিদ্যুৎ সহনীয় দামে পৌঁছানো নিয়ে সন্দিহান বিশেষজ্ঞরা। কাজেই আমদানির পরিবর্তে দেশীয় উৎসের জ্বালানির ওপর জোর দিচ্ছেন তারা। অন্য দেশের অভিজ্ঞতা অনুসরণ করে এক্ষেত্রে যথাযথ পদক্ষেপ নেয়া জরুরি।
বিদ্যুৎ খাতের উন্নয়ন নিশ্চিতে বিপিডিবির ঋণের বোঝা লাঘব করা প্রয়োজন। সেক্ষেত্রে নির্ধারণ করা জরুরি লোকসান বা ঋণের কত শতাংশ সরকারের পরিকল্পনা বা নীতির কারণে হয়েছে আর কত শতাংশ বিপিডিবির অদক্ষতার কারণে হয়েছে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন ভূমিকা রাখতে পারে। তারা বিপিডিবির আয়-ব্যয় যাচাই করে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে অর্থ মন্ত্রণালয়কে সহযোগিতা করতে পারে। লোকসানের যে অংশ সিস্টেম লস বা দুর্নীতির কারণে বিপিডিবি করেছে, তা ভর্তুকি হিসেবে দেয়া যৌক্তিক হবে না। নীতি গ্রহণের কারণে বিপিডিবিকে যে অর্থ লোকসান গুনতে হয়েছে, সরকার তা জোগাতে পারে। তবে এক্ষেত্রে বিপিডিবিকে ভ্রান্ত পরিকল্পনা পরিহার করতে হবে। সংস্থাটির ভুলের জন্য বছরের পর বছর সরকারি কোষাগারের অর্থ জোগানো কোনো ভালো দৃষ্টান্ত হতে পারে না।
ঋণ ও ভর্তুকির কারণে অতিরিক্ত আর্থিক বোঝা ও গ্রাহকের ওপর মূল্যবৃদ্ধির চাপ কমাতে বিদ্যুৎ খাতের বিদ্যমান নীতিতে পরিবর্তন আনতে হবে। বিশেষ করে বেসরকারি খাতের বিদ্যুৎ উৎপাদকদের সঙ্গে দরকষাকষির মাধ্যমে বিদ্যুতের দাম যৌক্তিক পর্যায়ে নিয়ে আসতে হবে। প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে চুক্তি করার সময় ক্যাপাসিটি চার্জ বাদ দেয়ার পাশাপাশি পুরনো, অদক্ষ ও ব্যয়বহুল বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে যত দ্রুত সম্ভব বন্ধ করতে হবে। ২০ বছরের কম মেয়াদ রয়েছে এমন রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল কেন্দ্র অনুমোদন থেকে বিরত থাকতে হবে। যেহেতু বেসরকারি কোম্পানিগুলো তাদের বিনিয়োগের বিপরীতে উল্লেখযোগ্য রিটার্ন পাচ্ছে, তাই এ খাতের স্থিতিশীলতার স্বার্থে এটিকে যৌক্তিক পর্যায়ে নিয়ে আসা প্রয়োজন। যদি এ খাতে স্থিতিশীলতা আনতে সরকার ব্যর্থ হয় তাহলে খুচরা গ্রাহক, শিল্প ও গৃহস্থালি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম অনেক বেড়ে যাবে এবং এতে শিল্প খাতে ধীরগতি তৈরি হবে; যা সার্বিকভাবে দেশের অর্থনীতিকেও ধীর করবে।










