অসচ্ছলতা আর কর্মহীনতার যূপকাষ্ঠ থেকে মুক্তির আশায় প্রতি বছর দেশের হাজারো অসহায় মানুষ অবৈধ পথে বিদেশ যাওয়ার উপায় খুঁজে নিচ্ছে। কোনোভাবেই ঝুঁকিপূর্ণ ও অবৈধ অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না। চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহের দিকে লিবিয়া থেকে ইউরোপ যাওয়ার পথে ভূমধ্যসাগর থেকে দেড় শতাধিক বাংলাদেশীকে উদ্ধার করা হয়। মাত্র তিন সপ্তাহের ব্যবধানে আবারো আড়াইশরও বেশি বাংলাদেশীকে উদ্ধার করা হয়েছে। যা উদ্বেগজনক পরিস্থিতির চিত্র তুলে ধরে এবং বৈধ অভিবাসনের বিপরীতে মানব পাচারকারী ও দালাল চক্রের সক্রিয়তার বিষয়গুলো সামনে আনে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি। তাই অবৈধ অভিবাসন ও সক্রিয় দালাল চক্রের তত্পরতা রোধে সরকার ও নীতিনির্ধারকদের সর্বোচ্চ সক্রিয় ও কঠোর হওয়ার বিকল্প নেই।

ভৌগোলিক অবস্থান ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগের কারণে বাংলাদেশ মানব পাচারের অন্যতম কেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে। একই সঙ্গে দেশের অভ্যন্তরে কাজের অনিশ্চয়তা, ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব ইউরোপ অভিমুখে শরণার্থীদের স্রোতে শামিল করেছে বাংলাদেশী জনগোষ্ঠীকে। জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের তথ্যানুসারে, ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টায় বাংলাদেশীদের অবস্থান বর্তমানে বিশ্বে চতুর্থ। ৫ হাজার ৩৬০ জন বাংলাদেশী গত দেড় বছরে ইউরোপে অবৈধভাবে প্রবেশের চেষ্টা করেছেন। এভাবে বিদেশ পাড়ি দিতে গিয়ে তারা প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। ঝুঁকি নিয়ে ট্রলারে করে যেতে গিয়ে দুর্ঘটনায় অনেকে মারা যাচ্ছেন। অনেকে গ্রেফতার হচ্ছেন। অনেকে ইউরোপের জেলে বন্দি জীবন কাটাচ্ছেন। অথচ স্বল্পোন্নত থেকে উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের তালিকায় নাম লেখানোর প্রক্রিয়ায় রয়েছি আমরা। বাংলাদেশ যখন উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার স্বপ্ন দেখছে তখন অবৈধ অভিবাসনের বিষয়টি বড় আকারের সমস্যা হিসেবেই সামনে আসছে।

তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর জন্য অবৈধ ও ঝুঁকিপূর্ণ অভিবাসন বড় ধরনের সমস্যা। যেমন শ্রীলংকা থেকে অবৈধ পথে প্রতি বছর হাজার অভিবাসনপ্রার্থী অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমায়। তবে সে দেশের মানব পাচারকারীদের রুখতে দেশটির পররাষ্ট্রবিষয়ক মন্ত্রণালয় ২০০৬ সালের অভিবাসন আইনে যেমন সংস্কার এনেছে, তেমনি তাদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ শাস্তির ঘোষণা দিয়েছে। দালালদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের পাশাপাশি ২০ বছরের কারাদণ্ডের বিধান করেছে। তাছাড়া কভিড পরিস্থিতিতে নতুন করে সক্রিয় হওয়া মানব পাচারকারীদের কার্যক্রম রুখতে শ্রীলংকার নৌবাহিনীকেও আগের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি তত্পর থাকার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। অবৈধ অভিবাসন রোধে জোরদার কার্যক্রম রয়েছে ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়ারও। রাষ্ট্র দুটি মানব পাচারকারীদের বিরুদ্ধে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেয়ার পাশাপাশি দক্ষ জনশক্তি তৈরি এবং শক্তিশালী অভিবাসন প্রক্রিয়া গড়ে তুলেছে। সেখানে দালাল বা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের অনিয়মের সুযোগ কম। তাছাড়া প্রচারণা কার্যক্রমের মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ অভিবাসনে মানুষকে অনুৎসাহিতও করেছে। এদিকে ভিয়েতনাম উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে এ ধরনের কার্যক্রমগুলো চিহ্নিত করে। আমাদের এখানেও এ ধরনের উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন।

তবে অবৈধ উপায়ে বিদেশ যাওয়ার প্রবণতা বন্ধে সবার আগে জনসচেতনতার ওপর জোর দিয়ে অভিবাসী আইনের যথাযথ বাস্তবায়ন জরুরি। আমাদের একটি শক্তিশালী মানব পাচার প্রতিরোধ আইন বিদ্যমান। কিন্তু সেই আইনের কোনো প্রয়োগ দেখা যায় না; বরং দেখা যাচ্ছে, এসব ঘটনায় মামলা হলেও তদন্ত আর বিচার এগোয় না। ২০১২ সালে মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন হওয়ার পর হাজারো মামলা হয়েছে। বিপরীতে গ্রেফতার হয়েছে হাতেগোনা কয়েকশ অভিযুক্ত। সাজার মুখোমুখি হয়েছে খুব কম অপরাধী। মামলা নিষ্পত্তির হারই খুব কম। আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, মানব পাচার মামলায় মূলত প্রাথমিক পর্যায়ের দালালরা গ্রেফতার হয়। তদন্তে ঘাটতি থাকায় অনেক আসামি খালাস পায়। অথচ ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করেই এসব দালাল ও দুষ্কৃতকারীকে চিহ্নিত করা সম্ভব। অনেক দেশই ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে সহজেই পাচারকারী ও তার অবস্থান শনাক্ত করছে। এখানে সরকারের পাশাপাশি রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সক্রিয়তা প্রয়োজন।

উল্লেখ্য, তৃণমূল পর্যায়ে অভিবাসী সেবাদানকারী নির্ভরযোগ্য কোনো প্রতিষ্ঠান না থাকায় সঠিক তথ্য ও সহযোগিতা পেতে বিদেশগামীদের প্রায়ই মধ্যস্বত্বভোগীর ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। দালালরা ঠিক তাদের অসহায় এ অবস্থার সুযোগ নিচ্ছে। নিরাপদ শ্রম অভিবাসন নিশ্চয়তার লক্ষ্যে সাধারণ মানুষের কাছে সঠিক সেবাদানকারীর উপস্থিতি নিশ্চিত করা জরুরি। কিন্তু সদিচ্ছা থাকলেও সরকারের পর্যাপ্ত সক্ষমতা না থাকায় সেবার মান মাঠ পর্যায়ে বিস্তৃত করাও সহজে সম্ভব হয় না। ফলে দালালরাও মানুষের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে যাচ্ছে। শুধু ইউরোপ নয়, অভিবাসনপ্রত্যাশী মানুষকে প্রলোভন দিয়ে একশ্রেণীর অসাধু মানব পাচারকারী সাগরপথে মালয়েশিয়া বা থাইল্যান্ডসহ অন্যান্য দেশেও নিয়ে যাচ্ছে। এভাবে ঝুঁকিপূর্ণ পথে বিদেশ পাড়ি দিতে গিয়ে অর্থ ও জীবন দুটিই হারাচ্ছে দরিদ্র ও অসহায় মানুষ। দালালদের এ প্রক্রিয়া বন্ধে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সহায়তায় বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠনের মাধ্যমে পরিস্থিতি বিশ্লেষণপূর্বক প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া চাই।

তাছাড়া বৈধ পথে ইউরোপ-আমেরিকায় যেতে হলে দক্ষ ও প্রশিক্ষিত হতে হয়। দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে বাংলাদেশের ঘাটতি দৃশ্যমান। আমরা যদি আমাদের দেশের বেকারদের দক্ষ ও প্রশিক্ষিত করে বিদেশের বাজারের জন্য যোগ্য করে তুলতে সমর্থ হই, তাহলে তারা অনিরাপদ অভিবাসন প্রক্রিয়া বেছে নেবেন না। তরুণ-বেকারদের তাই যথাযথ প্রশিক্ষণ দিতে হবে। কোন দেশে কেমন জনশক্তি প্রয়োজন তা যাচাই এবং সে অনুযায়ী প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নিতে হবে। মানসম্পন্ন অভিবাসনের দিকে নজর দিতে হবে সরকারকেই। আইনের কড়াকড়ি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। কিন্তু কেবল আইন প্রয়োগই যথেষ্ট নয়। যারা অবৈধ অভিবাসনপ্রত্যাশী বা দালাল চক্র যাদের সহজেই এ পথে প্রভাবিত করতে পারে, তারা আর্থিকভাবে দরিদ্র। বিষয়টি বিবেচনায় আনা চাই। সর্বোপরি দালাল চক্রের সক্রিয়তা রোধে আইনের কঠোর প্রয়োগের বিকল্প নেই। পাশাপাশি দেশের বেকার জনগোষ্ঠীকে উপযুক্ত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারের জন্য যোগ্য করে তুলে বৈধ অভিবাসনের পথ উন্মোচন করতে হবে।