দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়ন ও গ্রামীণ দারিদ্র্যপীড়িত জনগণের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা এবং তাদের জীবনধারার মানোন্নয়নে কার্যকর প্রশাসন ব্যবস্থা একান্ত অপরিহার্য। জনগণের ক্ষমতায়ন, আইনের শাসন, জবাবদিহিতা এবং স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করা ছাড়া বিক্ষিপ্ত ও অপরিকল্পিতভাবে টাকা ব্যয় করে দারিদ্র্য বিমোচন সম্ভব নয়। সব পর্যায়ে গণতন্ত্রায়নে প্রয়োজন নির্বাচন ব্যবস্থার সংস্কার। যে ব্যবস্থায় অসহায় দরিদ্র মানুয়েরও রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন ঘটে; উচ্চবিত্তদের প্রভাব-প্রতিপত্তির সুযোগ কমে। বিপুল জনগোষ্ঠীকে দারিদ্র্যসীমার নিচে রেখে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নসহ সামষ্টিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। এজন্য দরিদ্র্য জনগণের দিকে লক্ষ করে হলেও স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে কার্যকর ও শক্তিশালীকরণের পাশাপাশি ক্ষুদ্র ঋণের প্রসার সাধনে সরকার, ব্যাংক ও এনজিওগুলোর সহযোগিতার হাত সম্প্রসারণ অধিক জরুরি।
এমনিতেই এ দেশের জনগণ চলমান রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নানাবিধ বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে কোনো রকম দিন অতিবাহিত করছে। এর মধ্যে আবার দূব্যমূল্যের সীমাহীন ঊর্ধ্বগতি, গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি, বাড়ি ভাড়া ও জ্বালানি তেলের মূল্য বাড়ছে। নানামুখী সংকট তৈরি হচ্ছে। সব মিলিয়ে দেশের নাগরিকদের জীবন দুর্বিষহ।
বাজার অর্থনীতি সুচারুভাবে কাজ করছে। কাঠামোগত দুুর্বলতার সুযোগ নিয়ে একটা গোষ্ঠী আধিপত্য বিস্তার করছে। নানাভাবে পণ্যমূল্যের দাম বাড়িয়ে করছে অতি মুনাফা। এদিকে মূল্যস্ফীতির চাপে বিপুল জনগোষ্ঠীর ক্রয়ক্ষমতা কমছে। স্ফীত হচ্ছে বৈষম্য। এ ধরনের বিশাল বৈষম্য রোধে নতুন অর্থনৈতিক নীতি প্রবর্তন করতে হবে এবং নতুন অর্থনৈতিক দর্শনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। এখানে বাজার নয়, রাষ্ট্রকে মূল প্রহরীর ভূমিকা পালন নিতে হবে। এক্ষেত্রে স্থানীয় সরকারকেন্দ্রিক উন্নয়ন ভাবনা সংবিধান নির্দেশিত পথে যথাযথ পরিচালিত করতে হবে। এ ব্যাপারে নীতিনির্ধারকদের কোনো টালবাহানা চলবে না, এর জন্য স্থানীয় সরকারের অনুকূলে প্রয়োজনীয় অর্থায়ন ও ক্ষমতায়ন যথাযথ প্রদানের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। সম্ভব হলে শতকরা ৪০ শতাংশ রাজস্ব বাজেট সরাসরি স্থানীয় সরকারকে দিতে হবে। সব বাণিজ্যিক ব্যাংকের কমপক্ষে শতকরা ৫-৬ ভাগ দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য দিতে হবে। স্থানীয় সরকারকে গ্রামীণ জনগণের উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে তৈরি করতে হবে। স্থানীয় সরকারের সঙ্গে গ্রামীণ অর্থনীতি এবং গ্রামীণ অর্থনীতির সঙ্গে জাতীয় অর্থনীতির সংযোগ স্থাপন করতে হবে। এগুলো করতে পারলে দারিদ্র্য বিমোচনের পথ সুগম হবে এবং উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধিত হবে বলে আমরা আশা রাখি।
দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পকে শক্তিশালী করতে হবে। তাদের জন্য অধিক বরাদ্দ ও অর্থায়নের ব্যবস্থা করতে হবে। বিনিয়োগ বোর্ডকে কার্যকর করতে হবে। কৃষিপণ্য উৎপাদন ও রফতানির জন্য সরকারকে বিশেষ সহযোগিতাদানের ব্যবস্থা করতে হবে। গ্রামীণ অবহেলিত জনগণের জন্য দুর্যোগ তহবিল ট্রাস্ট গঠন করতে হবে।
আমাদের দেশের সামাজিক পরিবর্তনের ধারক যেমন—ক্ষুদ্র চাষী, প্রবাসী শ্রমিক, ক্ষুদ্র শিল্প মালিক, গার্মেন্টস ও টেক্সটাইল শ্রমিক, কামার, কুমার, জেলে, তাঁতি ও পেশাজীবী গোষ্ঠী এদের যথাযথ ক্ষমতায়ন করতে হবে। এদের বাদ দিয়ে দেশে দারিদ্র্য বিমোচন সম্ভব নয়। তাই রাষ্ট্রের উচিত দারিদ্র্য বিমোচনে এদের আরো শক্তিশালী করা।
আমরা দেখছি, রাষ্ট্র ধনিক গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষা করে চলেছে। সাধারণ জনগণ রাষ্ট্রীয় দৃষ্টির বাইরে রয়ে যাচ্ছে। এভাবে দারিদ্র্য হ্রাস সম্ভব না। এ দৃষ্টিভঙ্গির বদল ঘটাতে হবে। দারিদ্র্য বিমোচনে নীতি প্রাধিকার দিতে হবে। এজন্য প্রয়োজনীয় কৃষি ব্যবস্থার সংস্কার, সার্বজনীন আধুনিক শিক্ষা, কৃষি ও কারিগরি শিক্ষা সবার জন্য নিশ্চিত যেমন করতে হবে, তেমনি স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করতেম হবে। কাজেই সংগত কারণে স্থানীয় পর্যায়ে উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ ও স্থানীয় উন্নয়নে স্থানীয় প্রশাসন দ্বারা বাজেট প্রণয়ন জরুরি। শুধু বাজেট প্রণয়ন নয়, তা যথাযথ বাস্তবায়নও করা চাই। দরিদ্র মানুষের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়াতে হবে, যেন তারা দারিদ্র্য ফাঁদ থেকে বেরিয়ে আসতে পারে।
এ কাজটি বাস্তবায়নে সরকারকে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সব পর্যায়ের ব্যক্তির মতামত ও ঐকমত্যের ভিত্তিতে নতুন অর্থনৈতিক দর্শনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে এবং দারিদ্র্য বিমোচনে উদ্যোগী হতে হবে। এক্ষেত্রে নিজেদের সমস্যা নিজেদের সমাধানের পথ সুগম করতে হবে।
গত পঞ্চাশ বছরের যাত্রায় আমাদের এ ছোট দেশের ঈর্ষণীয় অগ্রগতি ও বড় বড় সাফল্য অর্জিত হয়েছে, যা অন্য দেশকে ভাবিয়ে তুলছে। অগ্রগতিকে টেকসই করতে প্রয়োজন বৈষম্য রোধ। এক্ষেত্রে আমাদের সামাজিক পুঁজি কাজে লাগাতে উদ্যোগী হতে হবে। উন্নয়নশীল দেশগুলো যেভাবে নিজেদের ভাগ্য নিজেরা রচনা করেছে—এ দর্শনে আমাদের কর্মপরিধি ঠিক করতে হবে। দেশে বিরাজমান টলমলে রাষ্ট্রীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা কায়েমের চেয়ে সামাজিক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দিকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। সামাজিক গণতন্ত্র যেসব দেশে বিরাজমান সেসব দেশের জনগণ তাদের সর্বনিম্ন চাহিদা মিটিয়ে বেঁচে থাকতে পারে। যার কোনো কর্মসংস্থান নেই সেও দারিদ্র্যের কশাঘাত টের পান না। এক্ষেত্রে সমাজই এগিয়ে আসে ওইসব দুস্থ ও দারিদ্র্যদের সাহায্যে এবং তাদের প্রয়োজন মেটাতে। আমাদের দুর্ভাগ্য, দেশের নীতি-নির্ধারকরা এ ধরনের সৃষ্টিশীল উদ্যোগ গ্রহণের দিকে নজর দেননি। ইউরোপের সমাজ গণতন্ত্রের দেশগুলোর অভিজ্ঞতা বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত। এগুলো পর্যালোচনার এখন সময় এসেছে।
মনে রাখতে হবে, গ্রামীণ অবহেলিত জনমানুষের ভাগ্য নির্মাণে গ্রামীন অবকাঠামো উন্নয়ন এবং স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা ছাড়া দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নসহ জাতীয় উন্নয়ন সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছে অনুরোধ, দেশের সার্বিক উন্নয়নে দেশকে ভালোবাসুন। ক্ষমতার উৎস জনগণের সার্বিক মঙ্গলে সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করুন, দারিদ্র্য বিমোচনই হোক আমাদের দেশ ও জাতির অর্থনীতির মুক্তির প্রধান এজেন্ডা।
মো. আতিকুর রহমান: গবেষক










