বিশ্বে ভোজ্যতেলের বাজার আগামীতে কেমন হবে? তেলের দাম আরো বাড়বে না কমে আসবে? এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা অয়েল ওয়ার্ল্ড আশার বাণী শুনিয়েছে। তাদের জরিপে বলা হয়েছে, ২০২১-২২ অর্থবছরে ভোজ্যতেলের দাম কমে সহনীয় পর্যায়ে থাকবে।
গত
বছর অর্থাৎ ২০২০ সালের শুরু থেকেই সারা বিশ্ব করোনা মহামারীর কবলে পড়ে। কোনো দেশ বা অঞ্চল এই প্রাণঘাতী রোগের আক্রমণ থেকে রেহাই পায়নি। করোনায় এ পর্যন্ত বিশ্বে প্রায় ৪০ লাখ মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে, আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা প্রায় ১৭ কোটি ৮২ লাখ। বাংলাদেশে প্রাণহানি ১৩ হাজার ছাড়িয়ে গেছে, আক্রান্ত প্রায় সাড়ে আট লাখ। করোনার কারণে সারা বিশ্বে শিল্প ও বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ব্যাপকভাবে। শিল্পে উৎপাদন কমেছে, পণ্যের আমদানি-রফতানি হ্রাস পেয়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশও এ পরিস্থিতির শিকার হয়েছে।
বাংলাদেশে
করোনা সংক্রমণ শুরু হয় ২০২০ সালের মার্চে। করোনাকালের শুরুতে দেশে ভোজ্যতেলের বাজার মোটামুটি স্থিতিশীল ছিল। কারণ দেশে আগে আমদানীকৃত ভোজ্যতেলের মজুদ ছিল পর্যাপ্ত। এর পরই আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্যতেলের দাম বাড়তে থাকে, যার প্রভাব পড়ে বাংলাদেশেও। দেশে আমদানীকৃত প্রধান দুটি ভোজ্যতেল—সয়াবিন ও পাম তেল। এ দুই পণ্যের পাইকারি ও খুচরা মূল্য ক্রমে বাড়তে থাকে। আমদানিকারকরা বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেড়েছে, তাই বেশি দামে আমদানি করতে হচ্ছে। অতএব, স্থানীয় বাজারে দাম বাড়বেই।
আন্তর্জাতিক
বাজারে দাম বাড়ার কারণ সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলেন, করোনা পরিস্থিতির কারণে সয়াবিন ও পাম তেলের উৎপাদন কমেছে। সেজন্য সরবরাহ কমেছে, দামও বেড়েছে। মূল্যবৃদ্ধির কারণে সবচেয়ে বেশি ভুগতে হয়েছে ভোক্তাদের। উচ্চমূল্যের কারণে ভোক্তারা ভোজ্যতেলের ব্যবহারও কমিয়ে দিয়েছেন যথেষ্ট পরিমাণে। অয়েল ওয়ার্ল্ডের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২০ সালে দেশে মোট ভোজ্যতেলের ব্যবহার ২০১৯ অপেক্ষা ৪ দশমিক ৪৮ শতাংশ কম হয়েছে। এ অবস্থায় স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে, আগামীতে বিশ্বে ভোজ্যতেলের বাজার কেমন থাকবে? ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে, নাকি ভোক্তাদের দুর্ভোগ চলতেই থাকবে?
ভোক্তাদের
জন্য কিছুটা স্বস্তির খবর দিয়েছে অয়েল ওয়ার্ল্ড। তাদের পর্যবেক্ষণ বলছে, ২০২১-২২ অর্থবছরে ভোজ্যতেলের দাম সহনীয় পর্যায়ে থাকবে, অর্থাৎ দাম আর বাড়বে না, বরং কমবে। সারা বিশ্বে ভোজ্যতেলের মজুদ বাড়তে শুরু করেছে। দাম কমার ক্ষেত্রে বড় অবদান রাখতে যাচ্ছে পাম ও সূর্যমুখী তেল।
বিশ্ব
স্বাস্থ্য সংস্থা এবং খাদ্য ও কৃষি সংস্থা অনুমোদিত ১৭টি তেল ও চর্বির মোট উৎপাদন ২০২০-২১ সালে দাঁড়াবে ২৫ কোটি টন, যা পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় ৪ দশমিক ৩ শতাংশ বেশি। আনুমানিক ব্যবহারের পরিমাণ হবে ২৪ দশমিক ৮ কোটি টন। অর্থাৎ আগের বছরের তুলনায় ৩ দশমিক ৪ ভাগ বেশি। ১৭টি তেল ও চর্বির, ১৪টি আসে উদ্ভিজ উৎস থেকে এবং তিনটি আসে প্রাণিজ উৎস থেকে। এগুলোর মধ্যে শীর্ষ চারটি হলো পাম তেল (৩০%), সয়াবিন
তেল (২৩%), সরিষা
তেল (১০%) ও
সূর্যমুখী তেল (৮.৫%)।
আগামী
অক্টোবর (২০২১) থেকে সেপ্টেম্বর (২০২২) পর্যন্ত সময়কালে বিশ্বে পাম অয়েল উৎপাদন ৩৮ লাখ টন বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা যায়। ফলে পাম অয়েল সরবরাহের ক্ষেত্রে স্বস্তিকর অবস্থা ফিরে আসবে। তবে কিছুটা অনিশ্চয়তা থেকেই যাবে, কারণ মালয়েশিয়ায় বিদেশী শ্রমিকের ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে। এ ঘাটতি ২০২২ সালের মধ্যেই পূরণ করতে হবে, তাহলেই সেখানে পাম তেলের উৎপাদন স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসবে। করোনা মহামারীর অবনতির ফলে এখন মালয়েশিয়ায় লকডাউন চলছে, পরিস্থিতির উন্নতি হলে সেখানে পাম তেলের উৎপাদন বাড়বে বলে আশা করা যায়। উল্লেখ্য, ২০২০ সালে বিশ্বে ৭ কোটি ৪১ লাখ টন পাম তেল উৎপাদন হয়েছিল এবং এর বিপরীতে ব্যবহার হয়েছিল ৭ কোটি ৫৩ লাখ টন।
আগামীতে
বিশ্বে সূর্যমুখী তেলের উৎপাদন ও রফতানি বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। অক্টোবর (২০২১) থেকে সেপ্টেম্বর (২০২২) সময়কালে সূর্যমুখী তেলের উৎপাদন ও রফতানি যথাক্রমে ২৯ লাখ ও ৩১ লাখ টন বাড়বে বলে প্রাক্কলন করা হয়েছে। সূর্যমুখী তেলের রফতানি মূল্যে এরই মধ্যে নিম্নমুখী প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। নতুন ফসল ওঠার ফলে সূর্যমুখী তেলের দাম আরো কমবে, যার প্রভাব পড়বে সয়াবিন ও পাম তেলের ওপর। ২০২০ সলে বিশ্বে সূর্যমুখী তেল উৎপাদন ছিল ২ কোটি ১৩ লাখ টন এবং এর বিপরীতে মোট ব্যবহার ছিল ২ কোটি ১৪ লাখ টন।
আর্জেন্টিনায়
উৎপাদিত সয়াবিন তেলের চাহিদা এরই মধ্যে আংশিক কমেছে সূর্যমূখী তেলের কারণে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সয়াবিন তেল উৎপাদন পরিস্থিতি কী দাঁড়াবে তা এখনই বোঝা যাচ্ছে না। মার্কিন প্রশাসন বায়োফুয়েল উৎপাদনে সাময়িক সুবিধাদানের বিষয়টি বিবেচনা করছে। সেক্ষেত্রে সয়াবিন তেল উৎপাদনে এর প্রভাব কতটা পড়বে তা দেখার বিষয়। দক্ষিণ আমেরিকার সয়াবিন উৎপাদনকারী অন্যান্য দেশ, যেমন ব্রাজিল, উরুগুয়ে, প্যারাগুয়েতে সয়াবিন উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য তেমন কোনো পরিবর্তন হবে না। উল্লেখ্য, ২০২০ সালে বিশ্বে সয়াবিন তেলের মোট উৎপাদন ছিল ৫ কোটি ৮৬ লাখ টন এবং এর বিপরীতে মোট ব্যবহার ছিল ৫ কোটি ৮৩ লাখ টন।
২০২১-২২ মৌসুমে বিশ্বে ১৭টি তেল ও চর্বির উৎপাদন ১ কোটি ৩ লাখ টন বাড়বে বলে অয়েল ওয়ার্ল্ড বলেছে। এ বৃদ্ধি পূর্ববর্তী মৌসুমের তুলনায় ৪ দশমিক ৩ শতাংশ বেশি এবং চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। ২০২০-২১ অর্থবছরে উৎপাদন প্রবৃদ্ধি পর্যাপ্ত ছিল না। ফলে সারা বিশ্বে তেল ও চর্বি সরবরাহে ঘাটতি দেখা দেয়; যা এখনো রয়েছে। আলোচ্য ১৭ রকমের তেল ও চর্বির ব্যবহারও সারা বিশ্বে আগামী অর্থবছরে ৮১ লাখ টন অর্থাৎ পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় ৩ দশমিক ৪ শতাংশ বাড়বে।
২০২২
সালে তেল ও চর্বির মূল্য পরিস্থিতি সম্পর্কে অয়েল ওয়ার্ল্ড বলেছে, ওই বছরের প্রথম ছয় মাস (জানুয়ারি-জুন) মালয়েশিয়ায় উৎপাদিত আরবিডি পাম অলিনের দাম কমে প্রতি টন এফওবি মূল্য প্রায় ৭৯০ মার্কিন ডলারে দাঁড়াবে। ২০২১ সালের একই সময়ে এ মূল্য ছিল ১ হাজার ৪৫০ মার্কিন ডলার। একই সময়ে অর্থাৎ ২০২২ সালে দক্ষিণ আমেরিকায় উৎপাদিত সয়াবিন তেলের এফওবি মূল্য দাঁড়াবে প্রতি টন প্রায় ৯৩০ মার্কিন ডলার। ২০২১ সালে এ মূল্য ছিল ১ হাজার ১৯০ মার্কিন ডলার।
এ. কে. এম.
ফখরুল আলম:
রিজিওনাল
ম্যানেজার, বাংলাদেশ
ও নেপাল
মালয়েশিয়ান পাম অয়েল কাউন্সিল










