করোনায় শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়া রোগীদের জন্য হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলা একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। এমন একটি যন্ত্র প্রতি মিনিটে একজন রোগীকে ১০০ লিটার পরিমাণ অক্সিজেন সরবরাহ করতে সক্ষম। যেসব ক্ষেত্রে রোগীকে আইসিইউ সেবা দেয়া সম্ভব হচ্ছে না সংকটের কারণে সেক্ষেত্রে হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলা সংকটাপন্ন রোগীর জীবন বাঁচাতে ভূমিকা রাখতে পারে। গত বছর করোনার প্রাদুর্ভাব বেড়ে উঠলে হাসপাতালগুলোয় ডিভাইসটি সরবরাহ বাড়ানো হয়। তার পরও সারা দেশে মাত্র এক হাজার হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলা রয়েছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় নগণ্য। এর আবার কিছু ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। করোনার প্রাদুর্ভাবের সময় জেলা হাসপাতালগুলোয় আইসিইউ সুবিধা তৈরিসহ প্রয়োজনীয় কভিড চিকিৎসাসংক্রান্ত যন্ত্রপাতি সরবরাহের উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে এ কার্যক্রম স্তিমিত হয়ে আসে করোনা শনাক্ত কমে আসায়। সাম্প্রতিক সময়ে করোনা রোগীর সংখ্যা এবং উচ্চমাত্রার অক্সিজেনের চাহিদা বেড়ে ওঠায় আইসিইউ সুবিধাসংবলিত বেড ও হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলা-স্বল্পতার বিষয়টি আলোচনায় আসছে। পর্যাপ্ত সময় পাওয়ার পরও সংশ্লিষ্ট সুবিধা নিশ্চিত করতে না পারা দুঃখজনক। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী অগ্রগতি না হওয়ার কারণ চিহ্নিতপূর্বক তা সমাধানে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে এক্ষেত্রে কারো উদাসীনতা ও গাফিলতি থাকলে তাদের বিরুদ্ধেও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া দরকার। 

করোনা চিকিৎসা ও ব্যবস্থাপনাবিষয়ক জাতীয় নির্দেশিকায়ও অক্সিজেনের গুরুত্বের কথা বলা হয়েছে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলছেন, করোনায় আক্রান্ত ব্যক্তিবিশেষ অসুবিধা বোধ করার আগেই শরীরে অক্সিজেনের পরিমাণ কমে যেতে পারে। সুতরাং অক্সিজেনের জোর প্রস্তুতি থাকা জরুরি। করোনাভাইরাসের সংক্রমণের কারণে ফুসফুস ক্ষতিগ্রস্ত হয়, ক্ষমতা হারায়। তখন বাতাস থেকে পরিমাণমতো অক্সিজেন নিয়ে রক্তে দিতে পারে না। রক্তে অক্সিজেন কমে গেলে শরীরের গুরুত্বপূর্ণ কিছু অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দ্রুত অকেজো হয়ে পড়ে। এ কারণে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ৯৫ শতাংশ রোগীর অক্সিজেন দেয়ার দরকার হয়। করোনার সংক্রমণ বেড়ে উঠলে ৫৩টি হাসপাতালে কেন্দ্রীয় অক্সিজেন সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ গ্রহণ এবং নতুন এক হাজার হাই ফ্লো অক্সিজেন সিলিন্ডার কেনার কথা বলা হয়। কিন্তু এর অগ্রগতি যেন সুখকর নয়, তা গতকালের বণিক বার্তার প্রতিবেদনে স্পষ্ট। রাজধানীতে সরকারি সুবিধায় ১৫৭টি হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলা রয়েছে। অথচ দুই কোটির বেশি মানুষের বসবাস এখানে।

হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলা সহজলভ্য হলেও কেন এর সরবরাহ বাড়ানো গেল না, তা পর্যালোচনার বিষয়। একথা সত্য, ডিভাইসটি কার্যকরের জন্য সেন্ট্রাল অক্সিজেন সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। কেন্দ্রীয় অক্সিজেন ব্যবস্থা তৈরি করতে ১০০ শয্যার হাসপাতালে লাগে দুই থেকে আড়াই মাস, ২৫০ শয্যার হাসপাতালে চার থেকে পাঁচ মাস আর ৫০০ শয্যার হাসপাতালে আট থেকে নয় মাস। করোনার প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়ার এক বছর পার হয়েছে। এ সময়ের মধ্যে প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী জেলা হাসপাতালগুলোয় কেন্দ্রীয় অক্সিজেন সরবরাহ ব্যবস্থা কেন গড়ে তোলা গেল না, তা তদন্তের দাবি রাখে। দ্রুতই জেলা হাসপাতালগুলোয় এ সুবিধা তৈরির জন্য বিশেষ উদ্যোগ নেয়া জরুরি।

বাংলাদেশে অর্থনৈতিক উন্নয়ন হচ্ছে, পরিবার পরিকল্পনা, মাতৃ ও শিশুর মৃত্যু, টিকাদান কর্মসূচির মতো স্বাস্থ্যসেবায় অনেক সফলতা বাংলাদেশের রয়েছে, এসব বিষয়ে বাংলাদেশের অর্জন বিশ্বের যেকোনো দেশের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ায় খুবই ভালো। শিক্ষায় বাংলাদেশের অর্জন ঈর্ষণীয়। কিন্তু দেশ প্রাথমিক হেলথ কেয়ারে যতটা সফল, সেকেন্ডারি বা টারশিয়ারি লেভেলে তার চেয়ে বেশি ভঙ্গুর অবস্থায় রয়েছে। দেশের স্বাস্থ্য খাতের বহুমুখী সংকট সুতীক্ষভাবে দৃশ্যমান করেছে কভিড-১৯। এসব সংকটের কিছু উপাদান আগে থেকেই ছিল। কিছু নতুন যুক্ত হয়েছে। এ দেশে স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় হচ্ছে জাতীয় আয়ের শূন্য দশমিক ৯ শতাংশ এবং মোট বাজেটের ৫ শতাংশ। এই অপ্রতুল বরাদ্দ দেশের স্বাস্থ্য খাতকে ঝুঁকির মুখে ফেলে দিয়েছে। এ বরাদ্দ দিয়ে প্রথাগত চাহিদাই মেটানো সম্ভব নয়, মহামারী মোকাবেলা তো অসম্ভব। স্বাস্থ্য খাতে ভৌতিক অবকাঠামোর যত বিস্তার ঘটেছে, মানবসম্পদ ও গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতির সংযোজন তত বাড়েনি। পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা ও ব্যবস্থাদি ছাড়াই বিভিন্ন জেলায় গড়ে উঠেছে হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজ।

গত বছর সংশ্লিষ্ট ডিভাইসটি আমদানির পাশাপাশি হাসপাতালগুলোয় কেন্দ্রীয় অক্সিজেন সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে উদ্যোগ নেয়া হয়। এ সিদ্ধান্তের পর অনেক সময় অতিবাহিত হলেও প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী অগ্রগতি হয়েছে সামান্য। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা প্রয়োজন। সরকারের উচ্চপর্যায়ের নির্দেশনা সত্ত্বেও কেন অতিগুরুত্বপূর্ণ এ অনুষঙ্গের জোগান ও অবকাঠামো সুবিধা নিশ্চিত করা গেল না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। পাশাপাশি দ্রুতই সরকারি প্রতিটি হাসপাতালে পর্যাপ্ত হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলা সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। অবকাঠামো সীমাবদ্ধতা থাকলে সেটি কাটিয়ে ওঠা বর্তমান সময়ে কঠিন কিছু নয়। শুধু কর্তৃপক্ষের সদিচ্ছা প্রয়োজন। আমরা চাইব সরকার বিষয়টি দ্রুত অনুধাবনপূর্বক জরুরি ভিত্তিতে সংকট কাটিয়ে উঠতে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে।