বিদেশী ঋণ পরিশোধে দেশের ব্যাংকগুলোর ওপর চাপ বাড়ছে। গত পাঁচ বছরে বিদেশী উৎস থেকে সরকারি ও বেসরকারি—উভয় খাতেই ঋণ নেয়ার পরিমাণ বেড়েছে। রফতানি আয় নেই, এমন ব্যবসায়ীরাও বিদেশী উৎস থেকে দেদার ঋণ নিয়েছেন বলে অভিযোগ মিলছে। কম সুদের প্রলোভনে নেয়া এ ঋণ এখন দেশের অনেক ব্যবসায়ীরই গলার ফাঁস হয়ে দাঁড়িয়েছে। আবার ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতার দায় বর্তাচ্ছে তহবিল জোগানদাতা ব্যাংকের ঘাড়ে। দেশের অনেক ব্যাংকই বিদেশী ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে খেলাপি হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে বিদেশী ঋণ পরিশোধে কোনো জটিলতা তৈরি হলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো আন্তর্জাতিক সুনাম হারাতে পারে। বাংলাদেশের ঋণমানেও অবনতি ঘটতে পারে। তাই বিদেশী তহবিল সংগ্রহ এবং সেটির যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোকে আরো সতর্ক হতে হবে। পাশাপাশি যথাসময়ে ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে গ্রাহকদেরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। হঠাৎ করে যেন বাড়তি ঋণ পরিশোধের চাপ না আসে, সেই মুদ্রা ব্যবস্থাপনা ঠিক করতে হবে। এক্ষেত্রে বেসরকারি খাতের বিদেশী ঋণ গ্রহণ, ব্যয় ও পরিশোধে তদারকি বাড়াতে হবে।

করোনাসৃষ্ট বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের সময়ে উন্নত দেশ ও বহুজাতিক সংস্থাগুলোর কাছে বিনিয়োগযোগ্য অলস তারল্যের পাহাড় গড়ে ওঠে। লন্ডন ইন্টার-ব্যাংক অফার্ড রেট (লাইবর) নেমে আসে ইতিহাসের সর্বনিম্নে। এর সুবাদে দেশের বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো সর্বোচ্চ ২ শতাংশ সুদেই বিদেশী ঋণ নিতে পেরেছে। লাইবর রেট কিছুটা ঊর্ধ্বমুখী হলেও এখনো বাংলাদেশী উদ্যোক্তারা ৩-৪ শতাংশ সুদে এ ঋণ নিতে পারছেন। এছাড়া উদ্যোক্তাদের বিদেশী ঋণ গ্রহণের প্রক্রিয়া এবং শর্তও এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় সহজ হয়েছে। পুরনো বিদেশী ঋণ পরিশোধে ডেফারেল সুবিধাও (ঋণ পরিশোধে বাড়তি সময়) পেয়েছেন উদ্যোক্তারা। বেসরকারি খাতে বিদেশী ঋণের উচ্চপ্রবৃদ্ধির পেছনে এসব সুবিধা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এখন বিশ্ববাজারে সুদহার ঊর্ধ্বমুখী। এ ধরনের পরিস্থিতিতে বিদেশীরা বাংলাদেশের মতো দেশগুলো থেকে ঋণ তুলে নিয়ে উন্নত দেশগুলোয় বিনিয়োগে উৎসাহী হয়। যদি পরিস্থিতি সে পর্যায়ে যায়, তাহলে বিদেশী ঋণ রোলওভার না করে পুরোপুরি পরিশোধ করে দিতে হতে পারে। সেটি হলে বাংলাদেশের ডলারের বাজারে বিদ্যমান অস্থিরতা আরো বেড়ে উঠবে। দেশে ডলারের বিনিময় হার যদি বেড়ে যায়, তাহলেও বিদেশী ঋণগ্রহীতারা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বেসরকারি খাতের বিদেশী ঋণের বড় অংশই স্বল্পমেয়াদি। গড়ে এসব ঋণের মেয়াদ তিন বছর ধরলে প্রতি বছরই প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলার রোলওভার করতে হবে। বেসরকারি খাতের এ ঋণের সঙ্গে সরকারি ঋণ যুক্ত করলে রোলওভারের পরিমাণ দ্বিগুণ হয়। প্রশ্ন হলো, প্রতি বছর ওই পরিমাণ ডলার ঋণ পরিশোধের জন্য সংস্থান করা সম্ভব কিনা?

পূর্ব এশিয়ার একাধিক দেশ বেসরকারি খাতে বিদেশী ঋণ নিয়ে বিপাকে পড়েছে। মালয়েশিয়া স্বল্পমেয়াদি বিদেশী ঋণ নিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেখান থেকে দেশটিতে অর্থনৈতিক সংকটও দেখা দেয়। মালয়েশিয়ার জনগণের কাছ থেকে চাঁদা তুলে ঋণ শোধ করা হয়। অর্থনীতির ভাষায় এর নাম দেয়া হয় ‘গণতহবিল মডেল’। তবে তাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ভালো। বাংলাদেশকে এমন পরিস্থিতিতে যেন পড়তে না হয়, তার জন্য আগে থেকেই সতর্ক হতে হবে। স্বল্পমেয়াদি বিদেশী ঋণের ভালো দিকের পাশাপাশি বেশকিছু ঝুঁকিও রয়েছে। যতগুলো আর্থিক সংকট তৈরি হয়েছে সেখানে স্বল্পমেয়াদি ঋণ কম খরচে নেয়া হলেও নানা কারণে তা বড় হয়। বড় করে যখন ফিরিয়ে দেয়ার সময় হতো তখন স্থানীয় মুদ্রার অবমূল্যায়ন হওয়ায় লেনদেন ভারসাম্যে সমস্যা দেখা দেয়। তাই বাংলাদেশকে যাতে এ ধরনের সমস্যায় না পড়তে হয় সেদিকটি বিবেচনা করতে হবে। বৈদেশিক বাণিজ্যিক ঋণের নানা উদ্বেগ রয়েছে। এর মধ্যে বৈদেশিক মুদ্রার ঝুঁকি, ঋণের খরচ, স্থানীয় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান হয়েও বৈদেশিক মুদ্রায় ঋণ, ঋণের সঠিক ব্যবহার, নীতিগত অনিশ্চয়তা, নীতি সহায়তা, ভেরিফিকেশন অব অ্যাপ্লিকেশন, বরোয়িং ফ্রম অফশোর ব্যাংকিং ইউনিট এবং ঋণ অনুমোদনে দীর্ঘসূত্রতা উল্লেখযোগ্য। নীতি প্রণয়নে এসব বিষয়ও বিবেচনায় রাখতে হবে

বেসরকারি খাতে বিদেশী দীর্ঘমেয়াদি ঋণে বড় ধরনের ঝুঁকি না থাকলেও স্বল্পমেয়াদি ঋণে বড় ধরনের ঝুঁকি রয়েছে। এজন্য স্বল্পমেয়াদি বিদেশী ঋণ নিতে কোনো বাণিজ্যিক ব্যাংক কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন ছাড়া গ্যারান্টর হতে পারবে না। কিন্তু তার পরও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন ছাড়াই কোনো কোনো ব্যাংক গ্যারান্টর হয়েছে। এতে কোনো কারণে ঋণ শোধে ব্যর্থ হলে এর দায় সংশ্লিষ্ট ব্যাংক ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর বর্তাবে। বিদেশী ঋণের অর্থে বিদেশ থেকে শিল্পের কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি আমদানি করার কথা। কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংক তদন্ত করে দেখতে পেয়েছে ওই অর্থে বিভিন্ন ধরনের বিলাসপণ্য আমদানি হচ্ছে দেশে। দেশের কয়েকটি ব্যাংক বিদেশী ঋণের অর্থ অপব্যবহার করে দেশের অর্থনীতিকে ঝুঁকিতে ফেলে দিচ্ছে। এক্ষেত্রে কারা কী কাজে ঋণ নিচ্ছে, তা তদারকিতে গাফিলতি রয়েছে কিনা, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তা না হলে কেউ ঋণ নিয়ে খেলাপি হলে দেশের ঋণমানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

বৈদেশিক ঋণের রাশ এখনই টেনে ধরতে হবে। বৈদেশিক দায় আরো বাড়লে চাপ বেড়ে যাবে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে। কেননা প্রতি মাসেই ৩০০-৩৫০ কোটি ডলার পরিশোধ করতে হচ্ছে আমদানির দায় মেটাতে। এর সমপরিমাণ বৈদেশিক ঋণের দায় মেটাতে হলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ প্রবল চাপের মুখে পড়বে, যা এক সময় সামলানো কঠিন হয়ে পড়বে। অফশোর ব্যাংকিংয়ে ঋণ বেড়ে যাওয়ায় সংকটে পড়ার শঙ্কা রয়েছে। চলমান পরিস্থিতিতে বিদেশী ঋণের সুদ পরিশোধ করতে তেমন সমস্যা হচ্ছে না। কিন্তু বিনিয়োগ চাহিদা আরো বাড়লে তখন বৈদেশিক মুদ্রার ব্যবহার বেড়ে যাবে। বিদেশী ঋণের সুদসহ আসল পরিশোধ করতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ চাপে পড়বে। ডলারের বিনিময় হার বেড়ে যাওয়া ব্যক্তি-উদ্যোক্তারা সমস্যায় পড়েছেন। সস্তা ঋণ এখন বহুগুণে সুদে-আসলে পরিশোধ করতে হবে। বিদেশী ঋণের প্রকৃত সুদও বেড়েছে। গত কয়েক বছরে সরকারি ও বেসরকারি খাতে যে পরিমাণ বিদেশী ঋণ এসেছে সেটি স্বাভাবিক ছিল না। প্রয়োজন নেই বা বৈদেশিক মুদ্রায় রিটার্ন আসবে না, এমন অনেক খাতেও বিদেশী ঋণ নেয়া হয়েছে। অন্যদিকে গত অর্থবছরে দেশে যে পরিমাণ আমদানি হয়েছে সেটিও অস্বাভাবিক। কিছুদিন আগেও দেশী ব্যাংকের ঋণের তুলনায় বিদেশী ঋণ ছিল তুলনামূলক সস্তা। সে সময় বিদেশী উৎস থেকে দেদার ঋণ নিয়েছে দেশের বেসরকারি খাতের বড় কোম্পানিগুলো। সস্তায় নেয়া সে ঋণই এখন কোম্পানিগুলোর বিপদ ডেকে আনছে বলে খবর মিলছে। ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নের ফলে কোম্পানিগুলোর তহবিল ব্যয় বেড়েই চলছে। বিদেশী ঋণ এখন বেসরকারি অনেক কোম্পানিকে বিপজ্জনক পরিস্থিতিতেও ঠেলে দিয়েছে। এটি কাটিয়ে উঠতে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন। পরিস্থিতি এমন জায়গায় গিয়ে ঠেকেছে যে বিদেশী ঋণের তহবিল ব্যয় দেশী ব্যাংকের ঋণের সুদহারেরও ঊর্ধ্বে চলে গিয়েছে। বিদেশী উৎসের এ ঋণ পরিশোধ করতে গিয়ে অনেক কোম্পানিকেই হিমশিম খেতে হচ্ছে। বিপদে পড়ছে মধ্যস্থতার দায়িত্ব পালনকারী ব্যাংকগুলোও। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের সক্রিয় ভূমিকা প্রত্যাশিত।

ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল। এ ভাবমূর্তি যাতে কোনোভাবেই ক্ষুণ্ন না হয়, সেটি খেয়াল রাখতে হবে। দেশে ব্যাংকঋণের তুলনায় বিদেশী ঋণ সস্তা হওয়ার কারণে বেসরকারি উদ্যোক্তারা বিদেশী উৎস থেকে ঋণ নিয়েছেন। বিদেশী ঋণের সঠিক ব্যবহার যেন নিশ্চিত হয়, সেটি খেয়াল রাখতে হবে। দিন শেষে বিদেশী যেকোনো ঋণ পরিশোধের দায়ভার রাষ্ট্রের ওপরই বর্তায়। সরকারি কিংবা বেসরকারি, যেকোনো বিদেশী ঋণই সঠিক সময়ে পরিশোধ করা দরকার। বিদ্যমান সুনাম ধরে রাখতে হলে কোনোভাবেই বৈদেশিক বাণিজ্যের ঋণপত্রের দায় কিংবা ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হওয়া যাবে না। এজন্য সস্তা হলেও বিদেশী ঋণ গ্রহণ ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে সতর্ক হতে হবে। ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান বিদেশী ঋণ নিলে তাকে বিদেশী মুদ্রায় পরিশোধের বিষয় নিয়ে ভাবতে হয় না। কারণ ব্যক্তির ঋণের গ্যারান্টর হিসেবে ব্যাংক থাকে। সেক্ষেত্রে ব্যক্তি ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে ব্যাংককে ঠিকই পরিশোধ করতে হয়। বর্তমান পরিপ্রেক্ষিতে রাষ্ট্রকে দেখতে হবে প্রতি বছর কত পরিমাণ ঋণ বৈদেশিক মুদ্রায় পরিশোধ করতে হবে এবং কোথা থেকে অর্থ আসবে। এক্ষেত্রে সুষ্ঠু মুদ্রা ব্যবস্থাপনাই পারে সম্ভাব্য সংকট থেকে বাংলাদেশকে রক্ষা করতে। তাই আর কালক্ষেপণ না করে বেসরকারি খাতের বৈদেশিক ঋণ ব্যবস্থাপনা নিয়ে স্বল্প-মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা দরকার। এক্ষেত্রে তদারকি আরো জোরদার করতে হবে। কে, কোন জায়গা থেকে, কত সুদে, কত মেয়াদে ঋণ গ্রহণ করছে এবং কোথায় তা ব্যয় করছে, পাশাপাশি পরিশোধ কীভাবে হবে প্রভৃতি বিষয় খতিয়ে দেখতে হবে।