গত বছরের ৮ মার্চ দেশে প্রথমবারের মতো করোনা রোগী শনাক্ত হয় এবং এর ঠিক ১০ দিনের মাথায় প্রথম কোনো ব্যক্তি এ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করে বলে সরকারের পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা হয়। যদিও এর উত্পত্তি ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে চীনের উহানে। অদৃশ্য ও অতি ক্ষুদ্র ভাইরাসটি আবির্ভাবের পর থেকে এখন পর্যন্ত পুরো পৃথিবীকে ওলটপালট করে দিয়েছে। বিপর্যস্ত করেছে জনজীবন। আমাদের দেশে সংক্রমণের পর দীর্ঘ সাত-আট মাসের তাণ্ডবের পর করোনার সংক্রমণ কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এলেও এ বছরের মার্চ থেকে আবারো আঘাত হানে করোনার দ্বিতীয় প্রবাহ; যা ক্রমেই তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে উঠছে। মৃত্যু ও আক্রান্তের স্কোর প্রতিনিয়তই লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। দেশেও আক্রান্তের সংখ্যা ৭ লাখ ২৭ হাজার এবং মৃত্যুর সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। বলার অপেক্ষা রাখে না, এটি কেবল অফিশিয়াল সংখ্যা মাত্র। বাস্তবে এ সংখ্যা হয়তো অনেক বেশি। গত কয়েক দিন থেকেই দৈনিক একশর অধিক মানুষ মারা যাচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, এ সংখ্যা আরো বৃদ্ধি পাবে। সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) এক গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, করোনার তীব্রতা বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আক্রান্ত রোগীরা খুব দ্রুত মৃত্যুবরণ করছে। দেশের একটি জাতীয় দৈনিকের তথ্য অনুযায়ী ২৮ জানুয়ারি থেকে ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত দেখা যায়, রোগীদের হাসপাতালে ভর্তির হার ছিল ৪৪ শতাংশ। মৃতদের মধ্যে ৫২ শতাংশ উপসর্গ শুরুর পাঁচদিনের মধ্যেই হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল। মৃত রোগীদের মধ্যে ৪৮ শতাংশ হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পাঁচদিনের মধ্যে মারা গেছে। ১৬ শতাংশ মৃত্যুবরণ করে ভর্তির ৫-১০ দিনের মধ্যে। গত বছরের চেয়ে নারীদের মৃত্যুহারও এ বছর বেশি। এছাড়া এ সময়ে দেশে মানসিক সমস্যাও বেড়ে যাচ্ছে।

শুধু বাংলাদেশ নয়, এ অঞ্চলের বেশ কয়েকটি দেশ যেমন ভারত, পাকিস্তানেও সংক্রমণ শনাক্তের সংখ্যা আকাশ ছুঁয়েছে। প্রতিদিনই নতুন নতুন রেকর্ড হচ্ছে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যার ক্ষেত্রে। যেমন ২০ এপ্রিল ভারতে একদিনে ২ লাখ ৯৪ হাজার মানুষের দেহে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে; যা বিশ্বে সর্বোচ্চ। এমন পরিস্থিতিতে দক্ষিণ এশিয়া দ্রুতই কভিড-১৯ মহামারীর বৈশ্বিক কেন্দ্রস্থল হয়ে উঠবে বলে মনে করছে ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব রেড ক্রস অ্যান্ড রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটিজ (আইএফআরসি)। সংস্থাটির ১৬ এপ্রিলের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ অঞ্চলের দেশগুলোয় প্রতিদিন অন্তত দুই লাখ মানুষ সংক্রমিত হচ্ছে। এছাড়া ভারতে বর্তমানে যে হারে মানুষ সংক্রমিত হচ্ছে, তা গত বছরের তুলনায় দ্বিগুণ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক পরিসংখ্যান বলছে, গত এক সপ্তাহে বিশ্বে অঞ্চলভিত্তিক দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৪৭ শতাংশ মৃত্যু বেড়েছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়। ভারতের প্রতিবেশী দুই রাষ্ট্র পাকিস্তান ও আমাদের দেশেও আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। বাংলাদেশে গত বছর জুনে সর্বোচ্চ মৃত্যুর যে সংখ্যা রেকর্ড করা হয়েছিল, এ বছর এপ্রিলেই সেই সংখ্যা প্রায় ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। শুধু তাই নয়, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাবে মৃত্যুর দিক দিয়ে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে ৩৭তম অবস্থানে রয়েছে। 

আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে যে চীনের উহানে নভেল করোনাভাইরাস সংক্রমণের পর প্রায় দেড় বছর হতে চললেও বিধ্বংসী এ ভাইরাস কবে এবং কীভাবে নির্মূল করা যাবে, সে সম্পর্কে বিজ্ঞানী বা সংশ্লিষ্টরা অনুমান করতে পারছেন না। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রঙ পাল্টাচ্ছে বিধ্বংসী এ ভাইরাস। চরিত্র বদল করে হয়ে উঠছে আরো বেশি ভয়ংকর এবং প্রাণঘাতী। তাই এটাকে যে সহজে বিদায় করা যাবে না, তা অনুমেয়। এরই মধ্যে এ ভাইরাসের কয়েকটি স্ট্রেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ভীতি ছড়িয়ে দিয়েছে। নতুন এ স্ট্রেনগুলোর মধ্যে রয়েছে ব্রিটেনের স্ট্রেন। যা আগের করোনাভাইরাসের চেয়ে প্রায় ৭০ শতাংশ বেশি দ্রুত ছড়াচ্ছে বলে বিজ্ঞানীরা প্রমাণ পেয়েছেন। ব্রিটেনের স্ট্রেনের পরে এসেছে দক্ষিণ আফ্রিকান স্ট্রেন। ব্রাজিলে সৃষ্ট নতুন স্ট্রেনের কথাও জানা গেছে, যা আরো বিধ্বংসী এবং ভয়ংকর। শুধু তাই নয়, সবচেয়ে আতংকের বিষয় হলো, প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের পশ্চিমবঙ্গসহ অন্তত ১০টি রাজ্যে করোনার ‘ডবল মিউট্যান্ট স্ট্রেনে’-এর অস্তিত্ব পাওয়া গেছে, যা আরো বেশি ছোঁয়াচে, খুব তাড়াতাড়ি একজনের শরীর থেকে অন্যজনের শরীরে ছড়াতে পারে। অর্থাৎ হিউম্যান ট্রান্সমিশন খুব দ্রুত হয়। বাংলাদেশে করোনার যে দ্বিতীয় ঢেউ চলছে, যা রীতিমতো সুনামির আকার ধারণ করেছে, তার পেছনে ব্রিটেন, ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকা এবং ইন্ডিয়ান ভ্যারিয়েন্টগুলো দায়ী বলে অনুমান করা হচ্ছে। 

তাহলে কীভাবে এই মরণব্যাধি করোনার সংক্রমণ থামানো সম্ভব? এ আলোচনায় শুরু থেকেই উঠে আসছে একটি শব্দ—‘হার্ড ইমিউনিটি’, যার আরেক নাম কমিউনিটি ইমিউনিটি বা দলগত অনাক্রম্যতা। বিজ্ঞানীদের ভাষ্য অনুযায়ী, করোনাভাইরাস সংক্রমণের রাশ টানতে মূল অস্ত্র হতে পারে এ হার্ড ইমিউনিটি। তাহলে এখন প্রশ্ন আসে কীভাবে আমরা হার্ড ইমিউনিটি অর্জনের মাধ্যমে করোনাভাইরাসকে নির্মূল করতে পারি। হার্ড ইমিউনিটি তৈরির জন্য ৬৫-৭০ শতাংশ মানুষের দেহে রোগ সংক্রমণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা বা অ্যান্টিবডি তৈরি করতে হবে। বিজ্ঞানীদের মতে, দুই পদ্ধতিতে তৈরি হতে পারে এ হার্ড ইমিউনিটি। প্রথমত, স্বাভাবিক বা প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ায়, যেখানে মানুষ বাইরের কোনো জীবাণু দ্বারা সংক্রমিত হলে শরীরের অভ্যন্তরস্থ ইমিউনিটি সক্রিয় হবে এবং ওই জীবাণুর বিরুদ্ধে লড়াই করতে থাকে। আর দ্বিতীয় পদ্ধতিটি হলো, ভ্যাকসিনেশন বা টিকা প্রদানের মাধ্যমে শরীরে সক্রিয় ইমিউনিটি তৈরি করা। এখন সংগতভাবেই প্রশ্ন আসে বাংলাদেশের মতো একটি জনবহুল দেশে কি টিকার মাধ্যমে স্বল্প সময়ের মাধ্যমে অধিকাংশ মানুষের দেহে হার্ড ইমিউনিটি তৈরি করা সম্ভব? দেশের সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে এটি অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং এবং দুরূহও বটে। এটি সম্ভব করতে হলে বাংলাদেশে অন্তত ১০ কোটি মানুষকে টিকার আওতায় আনতে হবে। 

করোনার বহুল প্রত্যাশিত টিকা বাজারে এসেছে। টিকা আবিষ্কৃৃত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সবাই ভেবেছিল করোনাকে এবার পৃথিবী থেকে বিদায় করে দেয়া যাবে। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় তৈরি হয়েছে নানা সংশয়। এখানেও স্পষ্ট হয়েছে ধনী আর গরিবের পার্থক্য। মুক্তবাজার অর্থনীতি আর স্বার্থপর পৃথিবীতে এক্ষেত্রেও এগিয়ে রয়েছে উন্নত দুনিয়ার বাসিন্দারা। ধনী ও প্রভাবশালী দেশগুলোর জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ টিকা নিতে পারলেও অনেক গরিব দেশ এখনো টিকা পায়নি। বাংলাদেশেও টিকা নিয়ে কিছুটা আশা সঞ্চার হলেও এখন তা হোঁচট খেয়েছে। ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট থেকে প্রতিশ্রুত টিকা পাওয়ার ব্যাপারেও জটিলতা তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে মাঠ পর্যায়ে টিকা কার্যক্রম সম্পাদন করাও সবচেয়ে বড় লজিস্টিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তার চেয়েও বড় উদ্বিগ্নতার বিষয় হলো, টিকা করোনার নতুন স্ট্রেনগুলোর বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করতে কতটা কার্যকরী বা এর কার্যকারিতা কতদিন থাকবে, সেই প্রশ্নের উত্তর এখন পর্যন্ত অজানা। তাই বলা যেতে পারে যে করোনাভাইরাস কবে নির্মূল হবে, সে বিষয়ে দুশ্চিন্তা না করে বরং এর সঙ্গে কীভাবে আমরা বাস করতে পারি, সেই পরিকল্পনা করাই শ্রেয়। এ প্রসঙ্গে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কর্মকর্তা হ্যান্স ঠিকই বলেছেন, ‘একবার টিকা পাওয়া মানেই মহামারীর সমাপ্তি নয়, মহামারী সেদিনই শেষ হবে, যখন সবাই দায়িত্বপূর্ণ আচরণ করতে শিখবে এবং ভাইরাসের বিরুদ্ধে কীভাবে চলতে হবে তা শিখে যাবে। এটি পুরোপুরি আমাদের ওপর নির্ভর করছে, সেই দিনটি আসলে কালও হতে পারে।

তাহলে এ অবস্থায় আমাদের করণীয় কী? প্রথমত, যথাযথভাবে সব স্বাস্থ্যবিধি সঠিকভাবে মেনে চলা। সামাজিক দূরত্ব, মুখে মাস্ক আর হাত সাবান বা স্যানিটাইজার দিয়ে বারবার পরিষ্কার করা। দ্বিতীয়ত, যে বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ তা হলো, আমাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা শক্তিশালী করার দিকে নজর দেয়া, অর্থাৎ প্রত্যেকের শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করা। কারণ সুস্থ থাকার জন্য শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর বিকল্প নেই। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম হলে একজন মানুষ খুব সহজেই যেকোনো রোগে আক্রান্ত হতে পারে। তাই করোনাভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির প্রতি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। কেননা একথা আমরা জানি, করোনাভাইরাস বা কভিড-১৯ সংক্রমণের সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা বা ওষুধ এখনো আবিষ্কৃত হয়নি। তাই আমাদের রোগ প্রতিরোধ করার দিকেই বেশি জোর দিতে হবে। 

শরীরের ইমিউনিটি বৃদ্ধি করতে পুষ্টিকর খাদ্যগ্রহণ একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অনেক খাবার স্বাস্থ্যকর, যা রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে সমৃদ্ধ করে। আবার অনেক খাবার এ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে সাংঘাতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য বেশি পরিমাণে অ্যান্টি-অক্সিডেন্টসমৃদ্ধ খাবার খেতে হবে প্রতিদিন। অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট একটি উপাদান, যেমন ভিটামিন সি অথবা ই, যা একটি জীবের (মানুষ) সম্ভাব্য ক্ষতিকর জারক এজেন্টগুলো (ফ্রি রেডিকেল) সরিয়ে ফেলে। সুস্বাস্থ্য ও শারীরিক ইমিউনিটি ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট খুব দরকারি। প্রধান অ্যান্টি-অক্সিডেন্টযুক্ত খাদ্য উপাদান হলো বিটা ক্যারোটিন, ভিটামিন এ, সি, ই, লাইকোপেন, লুটেইন সেলেনিয়াম ইত্যাদি। 

আরেকটি অতিগুরুত্বপূর্ণ খাদ্য উপাদান হলো ভিটামিন ডি, যা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ভিটামিন ডির প্রধান উৎস হচ্ছে সূর্যের আলো। প্রতিদিন বেলা ১১টা থেকে ৩টার ভেতর হাত-পা-মুখ খুলে কিছু সময়ের জন্য হলেও রোদে যেতে হবে। এছাড়া দেশীয় শাকসবজি ও ফলমূল খেতে হবে। ভিটামিন ডি-সমৃদ্ধ খাবার হলো চর্বিযুক্ত মাছ, ডিম, বাটার, মাশরুম, আলমন্ড মিল্ক প্রভৃতি। এর বাইরে টক দই খাওয়া যেতে পারে, এটি প্রোবায়োটিকস, যা শ্বাসযন্ত্র ও পরিপাকতন্ত্র সংক্রমণের ঝুঁকি প্রতিরোধ করে। এছাড়া চা তথা গ্রিন টি খাওয়ার অভ্যাস করা যেতে পারে, যা শরীরের ভেতরে জমা হওয়া নানা বিষাক্ত পদার্থ বের করে দিতে সহায়তা করে। এতে রয়েছে অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট ও পরিপাকতন্ত্রকে রোগব্যাধির হাত থেকে রক্ষা করার উপাদান। বহু বছর ধরে গ্রিন টি দারুণ স্বাস্থ্যকর হিসেবে সারা পৃথিবীতে জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। বিশেষ করে এ চায়ের অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট বহু রোগের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে পারে। শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য পুষ্টি বিশেষজ্ঞরা যে খাদ্য উপাদানের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করেন, তা হলো জিংক। এটি শরীরে অল্প পরিমাণে লাগলেও তা নিয়ে মোটেও হেলাফেলা করা উচিত নয়; বরং রক্তে জিংকের স্বাভাবিক মাত্রা যেন বজায় থাকে, সেদিকে বিশেষ নজর রাখা। জিংক-সমৃদ্ধ খাবারের মধ্যে রয়েছে বীচিজাতীয়, বাদাম, সামুদ্রিক খাবার, দুধ ইত্যাদি। খাদ্যাভ্যাসের অংশ হিসেবে প্রতিদিন পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান করতে হবে এবং এটি অপরিহার্য। এটি রক্তে প্রয়োজনীয় পুষ্টি এবং অন্যান্য উপকরণ সরবরাহ করে, শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে এবং শরীরে বিদ্যমান বিভিন্ন ধরনের ক্ষতিকর উপাদান বের করতে সহায়তা করে। এজন্য দিনে কমপক্ষে ৮-১০ গ্লাস পানি পান করতে হবে। পানি সবচেয়ে ভালো, তবে অন্যান্য পানীয় যেমন লেবুর রস, চা, কফি প্রভৃতিও গ্রহণ করা যেতে পারে। 

রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর সঙ্গে সম্পর্কিত খাবারগুলো সম্পর্কে যেমন আমাদের জানা থাকা জরুরি, ঠিক তেমনিভাবে যেসব খাবার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বা ইমিউনিটি কমিয়ে দেয়, সেসব খাবার সম্পর্কেও জানা জরুরি। প্রথমত, আপনার খাবারের তালিকা থেকে ফাস্টফুডজাতীয় খাবার, টেস্টিং সল্ট-সমৃদ্ধ খাবার, ক্যাফেইন ও অ্যালকোহলজাতীয় পানীয় প্রভৃতি বাদ দিতে হবে। ঠাণ্ডা পানীয় (কোল্ড ড্রিকংস) এবং মাত্রাতিরিক্ত চিনিজাতীয় খাবার খাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। পরিমিত পরিমাণে চর্বি ও তেল খেতে হবে। স্যাচুরেটেড ফ্যাটযুক্ত খাবারগুলো না খাওয়াই ভালো। এমনকি চর্বিমুক্ত মাংস খেতে পারেন। প্রক্রিয়াজাত মাংস এড়িয়ে চলতে হবে। কেননা এতে লবণ ও চর্বি বেশি থাকে। এছাড়া বিড়ি, সিগারেট, জর্দা, তামাক, সাদাপাতা, খয়ের প্রভৃতি খাওয়া বা পান করা থেকে বিরত থাকতে হবে। 

এবারে আলোচনা করা যাক কোন বিষয়গুলো আমাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস করে। প্রথমেই বলতে হবে বয়স সম্পর্কে। কেননা বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে শরীরে কখনো কখনো মাইক্রো নিউট্রিয়েন্ট ঘাটতি হলে তা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। দ্বিতীয় বিষয়টি হলো, পরিবেশগত টক্সিন (ধূমপান এবং বায়ুদূষণের সঙ্গে জড়িত অন্যান্য উপাদান, অতিরিক্ত অ্যালকোহল) শরীরের রোগ প্রতিরোধক কোষগুলোর স্বাভাবিক ক্রিয়াকলাপকে দুর্বল করে দেয় বা ধ্বংস করে দেয়। অতিরিক্ত ওজনও শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা হ্রাস করার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অপর্যাপ্ত বা পুষ্টিহীন খাবারও শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে দারুণভাবে হ্রাস করে। পুষ্টিহীনতা বা এক বা একাধিক পুষ্টির অভাবে শরীরে রোগ প্রতিরোধক কোষ এবং অ্যান্টিবডির উৎপাদন ও কার্যক্রম ব্যাহত করে। এছাড়া দীর্ঘস্থায়ী রোগ স্বয়ংক্রিয় প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং ইমিউনোডেফিসিয়েন্সি ডিজঅর্ডারগুলো শরীরের প্রতিরোধক কোষকে আক্রমণ করে এবং সেগুলো কার্যকরহীন করে। এছাড়া দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ এবং ঘুম ও বিশ্রামের অভাবও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নষ্ট করে। 

পরিশেষে বলা যায়, বিধ্বংসী করোনাভাইরাসের সংক্রমণ থেকে নিজেদের মুক্ত রাখতে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে উন্নত করতে হবে। সেক্ষেত্রে খাদ্যতালিকায় পুষ্টিকর খাবারগুলো নিশ্চিত করার পাশাপাশি অস্বাস্থ্যকর খাবার পরিহার করা বাঞ্ছনীয়। এছাড়া স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের প্রতিও বিশেষ মনোযোগী হতে হবে। 

 

ডা. মো. মতিউর রহমান: উপনির্বাহী পরিচালক

টিএমএসএস ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ