আকস্মিক বন্যায় ফসল তলিয়ে যাওয়া হাওরাঞ্চলের কৃষকের বড় সমস্যা। গত চার বছর বন্যা না হওয়ায় ফসল হয়েছে ভালো। চলতি বছর মাঘে বৃষ্টি শুরু হওয়ায় কৃষকের দুশ্চিন্তা বাড়ছে। আগাম বন্যার আশঙ্কাও করা হচ্ছে। এর মধ্যে খবর মিলছে, হাওরের অনেক জায়গায় এখনো প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) গঠন হয়নি। পিআইসি গঠন হলেও কাজ শুরু হয়নি। অথচ নীতিমালা অনুযায়ী নভেম্বরের মধ্যে প্রকল্প নির্ধারণ ও পিআইসি গঠনের কাজ সম্পন্ন করার কথা। কাজ শুরু করতে হবে ১৫ ডিসেম্বর থেকে। নির্ধারিত সময়সীমা পেরিয়ে গেলেও কাজ শেষ হয়নি। পিআইসি গঠন না হওয়ায় স্বাভাবিকভাবে বাঁধ নির্মাণ বা সংস্কারও পিছিয়ে যাচ্ছে। এতে উঠতি বোরো ফসল ঘরে তোলা নিয়ে সংশয় সৃষ্টি হচ্ছে। দেশের ফসলের ২০ ভাগের উৎস হাওরাঞ্চল। হাওরে বোরোর ফসলহানি ঘটলে দেশের খাদ্যনিরাপত্তা হুমকিতে পড়ে, অস্থির হয়ে ওঠে চালের বাজার। সুতরাং পিআইসি গঠনপূর্বক দ্রুত বাঁধ নির্মাণের কাজ শেষ করা জরুরি। প্রশাসনকে আরো সক্রিয় হতে হবে।

হাওরাঞ্চলে আগে ঠিকাদারি ভিত্তিতে ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণ-সংস্কার করা হতো। অনিয়ম রোধে বেশ কয়েক বছর ধরে সেখানে পিআইসি প্রথা চালু হয়েছে। পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও সংকট কাটেনি। এখনো সময়মতো প্রকল্প হয় না, বাস্তবায়ন কমিটি হয় না, বাঁধের কাজ সময়মতো শুরু হয় না, সময়মতো শেষও হয় না। সমস্যা শুধু সময়ের ক্ষেত্রে নয়। সমস্যা রয়েছে কমিটি গঠন প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রেও। সংশ্লিষ্ট নীতিমালায় সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রকাশ্যে গণশুনানি করে পিআইসি গঠন করতে হবে। ২০১৮ সালে এর কিছু বাস্তবায়ন দেখা গেছে। ২০১৯, ২০২০ ও ২০২১ সালে গণশুনানি অনেক জায়গায় হয়েছে বটে, কিন্তু কমিটি গঠন হয়েছে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বা স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের পছন্দ অনুসারে। রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে সংশ্লিষ্ট হাওরে জমি নেই বা কৃষক নন এমন লোকও পিআইসির সদস্য হয়েছেন, যা নীতিমালার লঙ্ঘন। এমনকি অতীতে বাঁধ কাটার দায়ে দণ্ডপ্রাপ্ত লোককেও পিআইসিতে সদস্য করার অভিযোগ মিলছে। এবারো এরই মধ্যে যেসব স্থানে পিআইসি গঠন হয়েছে, সেখানকার কোনো কোনোটিতে এ ধরনের অনিয়ম সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এটা হতাশাজনক। বাকি পিআইসিগুলো স্বচ্ছতার সঙ্গে গঠন করে মানসম্মতভাবে বাঁধ নির্মাণ করাটাই এখন চ্যালেঞ্জ।

নিয়ম অনুযায়ী, ১৩ সদস্যের পিআইসিতে দাপ্তরিক কর্মকর্তা ছাড়াও একজন গণ্যমান্য ব্যক্তি, গণমাধ্যম প্রতিনিধি, এনজিও প্রতিনিধি, নারী প্রতিনিধি, কৃষক প্রতিনিধি, মত্স্যজীবী প্রতিনিধি থাকার কথা। কিন্তু সমস্যা হলো, প্রতি বছরই কমিটিতে একই মানুষ বা একই পরিবারের সদস্যদের রাখা হয়। ফলে দিন দিন কেবল সিন্ডিকেটই শক্তিশালী হচ্ছে। এসব সিন্ডিকেট এতই শক্তিশালী যে, তাদের তৈরি করা কমিটি পিআইসিতে অন্তর্ভুক্ত না করলে কাজ করা কঠিন হয়ে পড়ে। শুধু পিআইসি নয়, তদারক কমিটি গঠনেও পক্ষপাতিত্ব দৃশ্যমান। যারা কমিটিতে থাকার যোগ্য তাদের না রেখে প্রভাশালীদের রাখা হচ্ছে। ফলে তদারকি ব্যবস্থায় থেকে যাচ্ছে দুর্বলতা। এ কারণে অনেক ক্ষেত্রে দায়সারাভাবে কাজ হচ্ছে। ফলে বন্যার পানিতে ফসল রক্ষার বদলে অনেক সময় উল্টো বাঁধ তলিয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটছে। কাজেই টেকসই বাঁধ নির্মাণ নিশ্চিতে পিআইসি গঠনে সিন্ডিকেট ভাঙতে হবে। স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় কমিটি গঠন করতে হবে। একই সঙ্গে তদারকি ব্যবস্থাও জোরদার করতে হবে।

বাঁধ নির্মাণের সঙ্গে হাওরবাসীর জীবন-জীবিকা যুক্ত। সুতরাং এক্ষেত্রে কোনো ধরনের দুর্নীতি কাম্য নয়। অনিয়ম ও দুর্নীতিতে জড়িতদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। অনিয়ম বন্ধ করতে হবে। জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে পিআইসি যেন নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই কাজ শেষ করে তাও নিশ্চিত করতে হবে। এর জন্য আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নিরসন করে সময়মতো অর্থছাড় করতে হবে। বলা হচ্ছে, কোথায় বাঁধ হবে এবং কত টাকা খরচ হবে সেই বিষয়গুলো নির্ধারণ করেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকৌশলীরা। সেক্ষেত্রেও বিস্তর অভিযোগ মেলে। একদিকে নির্মাণ অপ্রয়োজনীয় বাঁধ, অন্যদিকে বাঁধ হওয়া দরকার এমন সব জায়গায় বাঁধ হয় না। কোথাও অতিরিক্ত বরাদ্দ দেয়ার অভিযোগও রয়েছে। তাই প্রকল্প নির্ধারণে জনঅংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য প্রয়োজন কার্যকর গণশুনানির ব্যবস্থা করা। প্রকল্প নির্ধারণ ও পিআইসি গঠনে স্বচ্ছতা থাকলে কাজে দুর্নীতি ও অনিয়ম কম হয়।

স্থানীয় কৃষক ও হাওর আন্দোলনের নেতারা বলছেন, এবার বাঁধের কাজে শুরু থেকেই এক ধরনের ঢিলেমি লক্ষ করা যাচ্ছে। মাঠপর্যায়ে গণশুনানি করে প্রকল্প নির্ধারণ ও পিআইসি গঠনের দাবি থাকলেও সেটি করা হয় না। স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী ও রাজনৈতিক ব্যক্তিদের প্রভাবে পিআইসি গঠন করা হয়। এতে প্রশাসন ও পাউবো কর্মকর্তাদের একটা যোগসাজশ থাকে, যে কারণে ওই ব্যক্তিরা কাজে গাফিলতি করেন। অন্যদিকে সময়মতো বাঁধের কাজ শুরু করতে না পারার যুক্তি হিসেবে পাউবো কর্মকর্তারা বলছেন, হাওর থেকে পানি ধীরে নামায় জরিপের কাজ ও প্রকল্প নির্ধারণে সময় বেশি লেগেছে। অন্যদিকে ‘হাওর বাঁচাও আন্দোলন’-এর নেতারা বলছেন, পাউবোর কাগুজে হিসাবের সঙ্গে মাঠের অবস্থার কোনো মিল নেই। বহু প্রকল্পে কাজ শুরু হয়নি। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, হাওরে ফসলরক্ষা বাঁধ নিয়ে এখনো নয়ছয় চলছে। চলছে প্রভাবশালীদের দাপট, দুর্নীতি থামেনি। দায়সারাভাবে বাঁধের কাজ শেষ করারও পাঁয়তারা যথেষ্ট। এতে স্পষ্ট হয় কৃষি, অর্থনীতি ও কৃষকদের রক্ষায় এখন পর্যন্ত হাওর অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোতে চলমান প্রকল্পগুলোতে সরকারের নজরদারি কম।

সাংগঠনিক কিছু দুর্বলতার পাশাপাশি হাওরে বাঁধ নির্মাণের ক্ষেত্রে প্রকৌশলগত ঘাটতিও বিরাজমান। নিয়ম অনুযায়ী, বাঁধের ৫০ মিটার দূর থেকে মাটি কাটার কথা। কিন্তু বেশির ভাগ বাঁধের ক্ষেত্রেই বাঁধের পাড় থেকে মাটি কেটে বাঁধ দেয়া হয়। এতে বাঁধ দুর্বল হয়। বাঁধে একটি নির্দিষ্ট ঢাল থাকার কথা (২:১), কিন্তু অনেক বাঁধই খাড়া থাকায় পানির তোড়ে সহজেই ভেঙে যায়। ড্রেজার মেশিনে বাঁধের কাছ থেকে মাটি কেটে বাঁধ নির্মাণ করার কারণেও অনেক বাঁধ দুর্বল হয় এবং সহজেই ভেঙে যায়। হাওর এলাকা এমনিতেই নিচু। বছর বছর বাঁধের জন্য মাটি কাটার ফলে যেসব জায়গা একটু উঁচু ছিল, তা-ও নিচু হয়ে যাচ্ছে। তাই এখন অনেক হাওরে বাঁধ নির্মাণের জন্য বাঁধের ধারেকাছে মাটি পাওয়া যায় না। দূর থেকে নৌকায় করে মাটি আনতে হয়। এতে সময় যেমন বেশি লাগে, খরচও তেমন বেশি হয়। এ সংকট নিরসনে জুতসই বিকল্প উপায়ের সন্ধান করতে হবে।

হাওরে একসময় ঠিকাদারদের মাধ্যমে ফসলরক্ষা বাঁধের কাজ হতো। ২০১৭ সালের বন্যায় হাওরে ফসলহানির পর বাঁধ নির্মাণে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় ঠিকাদারি পদ্ধতি বাতিল করে পিআইসির মাধ্যমে কাজ করার সিদ্ধান্ত নেয়। বাঁধ নির্মাণে নতুন নীতিমালা করে ঠিকাদারি প্রথা বাতিল করে সরাসরি যুক্ত করা হয় জেলা ও উপজেলা প্রশাসনকে। এখন তারাও যদি ব্যর্থ হন তাহলে তা হতাশা ছাড়া আর কী এনে দিতে পারে? তবে খানিকটা আশার কথা, কর্মকর্তারা দ্রুত কাজ শেষ করার আশ্বাস দিয়েছেন। তড়িঘড়িতে কাজের মান যাতে নষ্ট না হয়, সেদিকেই এখন বিশেষ নজর রাখা দরকার। দুর্যোগের বিরূপ অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও নির্ধারিত সময়ে বাঁধ নির্মাণকাজ শেষ না হওয়া হতাশাজনক। নির্মাণকাজ বিলম্বিত হওয়ার কারণগুলো খুঁজে বের করতে হবে এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। আবারো হাওর আক্রান্ত হলে শুধু হাওরবাসীই নয় সারা দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই অতি দ্রুত বাঁধ নির্মাণকাজ শেষ করতে হবে। হাওরের বোরো ধান উৎপাদনের সঙ্গে সারা বছরের খাদ্যনিরাপত্তার প্রশ্ন জড়িত। হাওরে বাঁধ নির্মাণে ঢিলেমির কোনো সুযোগ নেই। গণশুনানি করে প্রকল্প নির্ধারণ এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ও মূল অংশীজন নিয়ে দ্রুত পিআইসি গঠনপূর্বক বাঁধ নির্মাণ করতে হবে।