কেইনসীয় তত্ত্ব অনুসারে সুদের হার মূলধনের উৎপাদনশীলতা কিংবা সঞ্চয়ের ত্যাগ স্বীকারের ওপর নির্ভর করে না, এটা নির্ভর করে সমাজে নগদ পছন্দ বা টাকার চাহিদা ও জোগানের ওপর। যে সুদের হারে টাকার চাহিদা ও জোগান পরস্পর সমান হয়, তাই ভারসাম্য সুদের হার। কিন্তু বাংলাদেশে কৃত্রিম উপায়ে আমানত ও ঋণের সুদের হার নির্দিষ্ট করে রাখা হয়েছে। যে সময়ে সুদহার নির্ধারণ করা হয় তখন মূল্যস্ফীতি ও অর্থনীতি ছিল স্থিতিশীল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে মূল্যস্ফীতি ও ডলারের দাম বেড়ে ওঠায় সুদহার আগের অবস্থানে বেঁধে রাখা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে, বিশেষত বাংলাদেশ ব্যাংক যেখানে অর্থের প্রবাহের রাশ টানতে চাইছে। বাংলাদেশ ব্যাংক এরই মধ্যে নীতি সুদের হার বাড়িয়ে সে উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু মাঠ পর্যায়ে বাস্তবতা হলো, ঋণের সুদের হারের সিলিং এখনো ৯ শতাংশই রয়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে আমানতের সুদের হার বাড়াতে হচ্ছে, কিন্তু ঋণের সুদের হার একই থেকে যাওয়ায় বাজার থেকে অর্থ কমিয়ে আনার লক্ষ্য অর্জন নিয়ে সংশয় রয়েই যাচ্ছে।

অর্থনীতির সূত্র মোতাবেক ভারসাম্য সুদের হার যেভাবেই প্রতিষ্ঠিত হোক না কেন, এটা সর্বজনবিদিত, ঋণের সুদহার নির্ধারণে উদ্যোক্তার ঋণের চাহিদার তীব্রতা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, আমানতকারী বা সঞ্চয়কারীর আকাঙ্ক্ষাও তেমনি গুরুত্বপূর্ণ। সঞ্চয়কারীরা চান বেশি সুদ উপার্জন করতে, উদ্যোক্তারা চান কম সুদে ঋণ পেতে। ব্যাংক উভয়ের মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠায় প্রভাবক হিসেবে কাজ করে। মুক্তবাজার অর্থনীতিতে বাজারই সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে। পণ্যের দাম কী হবে, বাজারে ওই পণ্যের চাহিদা ও সরবরাহই তা ঠিক করে। ওই হিসেবে সুদের হারও বাজারই ঠিক করে দেয়ার কথা। কিন্তু জনস্বার্থে সব পণ্যের দাম ঠিক করার ক্ষেত্রে সরকার লাগামটা ছেড়ে দেয় না। চালের দাম দোকান, স্থান, বাজার ও জেলাভেদে একেক রকম হলেও সরকার তাতে হস্তক্ষেপ করে না, কিন্তু পেট্রল, অকটেন, ডিজেলের দাম সবখানে একই। অর্থাৎ এ পণ্যগুলোর দাম সরকার জনস্বার্থে বাজারের হাতে ছেড়ে দেয় না। কিন্তু এসবের দাম বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই নির্ধারণ করা হয়। সরকার যখন সুদহার নির্ধারণ করেছিল তখন মূল্যস্ফীতি ও বাজার পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন। আজ তার অনেক কিছুরই পরিবর্তন হয়েছে। মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৭ শতাংশ অতিক্রম করেছে। টাকার অবমূল্যায়ন হয়েছে বেশ খানিকটা, রিজার্ভেও চাপ বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে সরকার অর্থ সরবরাহের রাশ টেনে ধরতে চাইছে। কিন্তু ঋণের সুদহার ৯ শতাংশের সিলিং শিথিল করা হয়নি। অন্যদিকে আমানতের সুদহার মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নির্ধারণের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এতে বেশি সুদে আমানত নিয়ে অল্প সুদে ঋণ দিতে গিয়ে ব্যাংককে বেগ পেতে হচ্ছে। আবার ঋণের সুদের হার মূল্যস্ফীতির কাছাকাছি হওয়ায় অর্থপ্রবাহও বেড়ে ওঠার শঙ্কা রয়েছে, যা আবার মূল্যস্ফীতিতে স্ফুলিঙ্গের মতো কাজ করতে পারে। বাজারকে হস্তক্ষেপ করলে অর্থনীতির স্বাভাবিক গতি বাধাগ্রস্ত হয়। অর্থনৈতিক শক্তি আবেগ-রাগ-অনুরাগ দিয়ে নির্ধারিত হয় না, আর্থিক পারঙ্গমতাই এর নির্ধারক। দারিদ্র্য, বেকারত্ব, অসম বণ্টন ইত্যাদি ব্যবস্থাকে যেমন রাতারাতি নিয়ন্ত্রণে আনা যায় না, সুদের হারকেও কাঙ্ক্ষিত স্তরে আনার জন্য সুদের নিয়ামকগুলোকে আগে কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে আনার প্রচেষ্টা জরুরি।

আফ্রিকায় কেনিয়ার পার্লামেন্ট ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে ঋণের ওপর ৪ শতাংশের (যা নীতিহারের সামান্য ওপরে) সুদহার বেঁধে দিয়ে একটি বিল পাস করেছিল। ২০১৯ সালের নভেম্বরে ওই বেঁধে দেয়া সুদহার বাতিল হয়। কারণ এটি লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। আলোচ্য পদক্ষেপ দেশটির অর্থনীতি ও মানুষের কল্যাণে প্রভূত ক্ষতিসাধন করেছে। বিশেষত অতি ক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগগুলো (এমএসএমই) উল্লেখিত পদক্ষেপের সবচেয়ে বড় ক্ষতির শিকার। কেনিয়ায় ব্যাংকগুলোর জন্য ঋণ প্রদান অলাভজনক হয়েছে এবং বেঁধে দেয়া সুদহার বাস্তবায়ন হওয়ার অব্যবহিত পরই প্রকৃত ঋণ প্রবৃদ্ধি (রিয়েল ক্রেডিট গ্রোথ) দ্বিগুণ থেকে প্রায় ঋণাত্মকে চলে গেছে। বিশেষ করে ব্যক্তি উদ্যোক্তা ও এমএসএমইকে ঋণ দেয়া ছোট ব্যাংকগুলো বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ঋণপ্রাপ্তির ঘাটতিতে দেশটির অর্থনীতি ব্যাপকভাবে ভুগেছে। খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়েছিল। কারণ ঋণ প্রদানকারীর চলতি মূলধন ও মূলধন ব্যয়ের চাহিদা ব্যাহত হয়েছে। প্রবৃদ্ধি উন্নয়নের (যেমনটা বেঁধে দেয়া সুদহারে আশা করা হয়েছিল) পরিবর্তে এটি বিপুলসংখ্যক খেলাপি গ্রাহক সৃষ্টি করেছিল এবং প্রকৃত ব্যবসায়ী ও ব্যক্তি উদ্যোক্তাদের কষ্ট বাড়িয়েছিল। কেনিয়া বিচ্ছিন্ন কোনো উদাহরণ নয়। বিশ্বব্যাংক বিশ্বজুড়ে সুদহার বেঁধে দেয়া নিয়ে একটি গবেষণা করেছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাটি সেখানে সিদ্ধান্ত টেনেছে যে সুদহার বেঁধে দেয়ার প্রায় ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অপ্রত্যাশিত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকে। সেগুলোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হলো দামে স্বচ্ছতা কমানো, ঋণপ্রবাহ ঘাটতির সংকট তৈরি, ক্ষুদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ ঋণদাতার জন্য ঋণ অনুমোদনের হার হ্রাস, প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কমানো ও ব্যাংকের শাখা নিবিড়তা হ্রাস এবং সর্বোপরি ব্যাংকের মুনাফাযোগ্যতার ওপর প্রতিকূল প্রভাব ফেলা।

বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে দেশের অর্থনীতিও এখন করোনার ভয়াবহতা কাটিয়ে উঠতে শুরু করেছে। আমদানি, রফতানি, অভ্যন্তরীণ চাহিদা সবকিছুতে গতিসঞ্চার হতে শুরু করেছে, ঠিক তখনই রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের দামামা সবকিছুকে একদম ওলট-পালট করে দিয়েছে। বিশ্ববাজারে আমদানিপণ্যের দাম রেকর্ডের পর রেকর্ড ভাঙছে। যার প্রভাব অভ্যন্তরীণ বাজারে পড়তে বাধ্য এবং তাই হয়েছে। দেশের মূল্যস্ফীতির পরিমাণ বিশ্ববাজারের মতো লক্ষ্যমাত্রা থেকে অনেকখানি ছাড়িয়ে গিয়েছে। অর্থনীতির স্বাভাবিক সূত্র অনুযায়ী, আমানতের সুদের হার গড় মূল্যস্ফীতির ওপরে থাকা বাঞ্ছনীয়। সুতরাং আমানতের সুদের হার আর ৬ শতাংশে বেঁধে রাখা যাচ্ছে না, আর এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সুস্পষ্ট নির্দেশনা আছে— মেয়াদি আমানতের সুদের হার গড় মূল্যস্ফীতি পর্যায়ের নিচে নামানো যাবে না। যেহেতু আমানতের সুদহার ৬ শতাংশে বেঁধে রাখা যাচ্ছে না, তাই ঋণের সুদহারও আর ৯ শতাংশে বেঁধে রাখা যাবে না।

এরই মধ্যে আমানত ও ঋণের সুদহারের সীমা তুলে দেয়া নিয়ে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা শুরু হয়ে গিয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো বেঁধে রাখা যাচ্ছে না বলেই কি পুরোপুরি ছেড়ে দিতে হবে? পশ্চিমা ঘরানার অর্থনীতিবিদদের তরফ থেকে দাবি এসেছে, ঋণের সুদের হার বাজারের ওপর ছেড়ে দেয়ার। তারা প্রথম থেকে ঋণের সুদহার বেঁধে দেয়ার বিপক্ষে শক্ত অবস্থান নিয়েছিলেন, যদিও সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সরকারের দৃঢ়তার কাছে তাদের এ অবস্থান তেমন সুবিধা করতে পারেনি। কিন্তু এবার তাদের অবস্থান আগের তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী এবং সরকারও সম্ভবত কিছুটা নমনীয় তাদের কথা শুনতে। আরেক পক্ষ বলছে, একবার ছেড়ে দিলে আমানতের সুদহার মূল্যস্ফীতির থেকে সর্বোচ্চ ১-২ শতাংশ বেশি হবে কিন্তু ঋণের সুদহার কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে তার কোনো সীমানা থাকবে না। এক্ষেত্রে উভয় পক্ষের মতামত বিবেচনায় নিয়ে অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক সিদ্ধান্ত গ্রহণই কাম্য। 

ঋণের সুদের হার কমানো ও বাড়ানোর উভয় সংকট রয়েছে। সুদহার বাড়ানো হলে বেসরকারি খাত ক্ষতিগ্রস্ত হবে, কমে আসবে বিনিয়োগ। এতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও অর্থনীতির গতি স্তিমিত হয়ে যেতে পারে। অন্যদিকে অর্থের সরবরাহ বেশি থাকলে মূল্যস্ফীতি আরো বাড়বে। এমন উভয় সংকটে বাংলাদেশ ব্যাংকই পারে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে। কারণ তার কাছেই সব তথ্য-উপাত্ত রয়েছে, প্রয়োজন সুষ্ঠু বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নেয়া। সবচেয়ে ভালো প্রক্রিয়া হলো হঠাৎ করে ঋণের সুদহার বড় আকারে না বাড়িয়ে ধীরে ধীরে বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নির্ধারণ করা। বিশ্বের প্রায় দেশেই বাজারে অর্থের চাহিদা ও জোগানের ভারসাম্যের মাধ্যমেই সুদের হার নির্ধারিত হয়ে থাকে। বাংলাদেশেও এ প্রক্রিয়ায় সুদের হার সুষ্ঠুভাবে নির্ধারণ হয়ে আসছিল। কিন্তু জটিলতা তৈরি হয়েছে জোরপূর্বক এটি নির্দিষ্ট করে দেয়ায়। এখন এমন পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পেতে বাজার অর্থনীতির নিয়মানুযায়ী সুদের হার বাজারের হাতেই ছেড়ে দেয়া উচিত। প্রয়োজনে মুদ্রা সরবরাহ ব্যবস্থার টুলস ব্যবহার করে বাংলাদেশ ব্যাংক সুদের হার পরোক্ষভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। বাজারে অর্থের চাহিদা না থাকলে সুদের হার কমে আসবে, আবার চাহিদা বাড়লে সুদের হারও বেড়ে উঠবে, এটিই অর্থনীতির প্রকৃত বিষয় হওয়া উচিত। কৃত্রিমভাবে চাপিয়ে দেয়া নীতি সবসময়ই জটিলতা তৈরি করে। আশা করি, কর্তৃপক্ষ বিষয়টি অনুধাবন করবে। এক্ষেত্রে কারো চাপের কাছে নতিস্বীকার করে নয়, বাজার চাহিদা অনুযায়ী আমানত ও ঋণের সুদের হার নির্ধারণের বিষয়টি আগের মতো বাজারের হাতে ছেড়ে দেয়া হোক।