মাঠে বাঁশি বাজাচ্ছে রাখাল বালক, বাংলার
আবহমান কোনো বর্ণনা এই চিত্র ছাড়া পূর্ণতা পায় না। অথবা এর চেয়ে সুখী দৃশ্য আর কী হতে
পারে! সেই রাখালদের সবাই যে ‘বাঘ বাঘ’ বলে মিথ্যা চিৎকার করে এমন নয়। কেউ কেউ
ভাবসাধক ‘পাগলা কানাইয়ের’ মতো কীর্তিমান হয়ে শতাব্দি পেরিয়েও জীবন্ত থাকেন। কেউ কেউ বাংলাদেশ ব্যাংকের
গভর্নরও হন। তবে এ অঞ্চলের রাখালদের রাজা শ্রীকৃষ্ণ। পৌরাণিক এই চরিত্র গরু চরানো বালক
থেকে অবতার হয়ে মানুষকে পথ দেখিয়েছেন।
এ ধরনের বর্ণনা খুঁজলে আরো পাওয়া যাবে। সহজ
যে বিষয়টি আমরা অনুধাবণ করতে পারি, বাংলার কৃষিভিত্তিক সমাজে গরু বা গবাদিপশু ও রাখাল
বিষয়টি খুবই সাধারণ বিষয় ছিল। এর কোনো বিকল্প চিত্র বা চরিত্র নেই। বরং এর আদর্শিক
চিত্র আঁকা আছে আমাদের মনে। এত সব ভাব-কল্পনার যে ‘রাখাল’; তা এ অঞ্চলে প্রাতিষ্ঠানিক
কোনো বিষয় ছিল না, যেভাবে খামার নির্ভর পশ্চিমে ‘কাউবয়’ নামে বিশেষ একটা
পরিচয়, তার মেজাজ ও চিহ্ন আছে। বরং পশুপালন কৃষির মতো অন্য আট-দশটা পারিবারিক কাজের
একটি।
আজ থেকে দুই দশক পেছনে ফিরলে আমরা প্রায়
গৃহস্থ বাড়িতে গোয়াল ঘর দেখি। যেখানে গবাদিপশু পরিবারের সদস্য বলেই গণ্য হতো। পরিবারের
কোনো না কোনো সদস্য এই পোষ্যদের সকালে মাঠে নিয়ে যান। বিকেলে ঘরে ফেরান। এর ফাঁকে পরিবারের
গরু চরানো বড় বা কনিষ্ঠ সন্তানের স্কুল-খেলাধুলাও চলত। সব পরিবার দরিদ্র বা বাস্তবে
সবাই সাহিত্যের গফুরের মতো নয়। বরং এই পশু চাষাবাদ ও পরিবারের শিশুদের পুষ্টি উৎসের
পাশাপাশি ছিল খেলার সঙ্গী। লালু-ভুলু বা এই ধরনের নামও থাকত তাদের। প্রকৃতি ও তার অন্যান্য
সত্তার সঙ্গে শিশুদের বেড়ে ওঠার মাঝে গবাদিপশুর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তারা বেড়ে
উঠতে উঠতেই দায়িত্ব নিতে শিখে যেত।
আজকাল পশুপালনকে যতটা খামারের সঙ্গে মিলিয়ে
দেখা হয়, তাতে ততটা থাকে না পশু ও মানুষের সহাবস্থান কেন্দ্রিক ঘনিষ্ঠতা। বরং শিক্ষা
পদ্ধতি ও অন্যান্য ক্ষেত্রে ‘রাখাল’ ও ‘পশুপালন’কে নেতিবাচক অর্থে
দেখানো হয়। পড়াশোনা না করা বালকদের রাখালের সঙ্গে তুলনা দেয়া হয়। রাখাল বালক আর যা-ই
হোক গাড়ি-ঘোড়ায় চড়ে না। যদিও এর ব্যতিক্রম আমরা বাস্তবে দেখেছি।
শুধু নেতিবাচক অর্থে দেখা নয়, আর্থসামাজিক
পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে গিয়ে আজকাল অপ্রাতিষ্ঠানিক পশুপালনকে ছাড় দিতে হয়েছে।
জীবনমান নয়, বরং জীবনযাত্রার পরিবর্তনে গরু চরানো বা যত্মআত্তির সময় কোথায়? পরিবার
ভেঙে ছোট হচ্ছে দিন দিন, বাড়ছে অভিবাসন। গ্রামীণ বাড়িগুলোর অবকাঠামোগত পরিবর্তন এর
সঙ্গে যুক্ত বলে জানালেন ‘প্রাকৃতিক কৃষি’ নামে অরগানিক এগ্রিকালচারের সঙ্গে যুক্ত
দেলোয়ার হোসেন।
তিনি বলছিলেন, পশুপালনের একটা প্রতিবন্ধকতা
হলো স্থানসংকুলান। আগের বড় পরিসর নিয়ে বা খোলামেলা উঠানের বাড়ি এখন কমে যাচ্ছে। এর
বদলে গ্রামে ফ্ল্যাট বাড়ির আদলে বাড়ি হচ্ছে। ওই ধরনের পরিবেশে গোয়ালঘর বেমানান। আবার
অনেক ক্ষেত্রে গোয়ালঘর তৈরির মতো স্থানও থাকে না।
অর্থাৎ, পশুপালনের সঙ্গে যুক্ত খোলামেলা
পরিবেশ। এমন পরিবেশ স্বাস্থ্যকরভাবে বেড়ে উঠার জন্যও প্রয়োজন। আজকাল গ্রাম থেকে সেই
পরিবেশটা উঠে যাচ্ছে। সেখানেও থাকছে না খেলার মাঠ বা খোলা প্রান্তর। পশু চরানোর ময়দান
নিশ্চিত করতে পারা মানে ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য উন্মুক্ত স্থান রাখতে পারা।
তবে দেলোয়ার ভিন্ন একটি তথ্যও দেন। অপ্রাতিষ্ঠানিকভাবে
পশুপালন বা কৃষির একটা দিক নতুন করে ফিরে আসছে কোনো কোনো ক্ষেত্রে। একে পুরোনো গ্রামীণ
কাঠামোর সঙ্গে মেলানো যায় না। কোনো কোনো পরিবার কৃষি বা প্রাণীপালনে জোর দিচ্ছে, কারণ
যেকোনো প্রতিকূল পরিবেশের জন্য খাপ খাইয়ে নিতে অন্তত একটি পেশাগত গুণ আয়ত্ব করা যেতে
পারে এর মাধ্যমে।
আমরা যে ধরনের পশুপালন ও রাখাল নিয়ে কথা
বলছি, তার সংখ্যা কমলেও অপ্রাতিষ্ঠানিক পশুপালনে গত এক দশকে বেশ ভালো জোয়ার দেখা যাচ্ছে
দেশে। এর কারণে পশুর সঙ্গে মানুষের সম্পর্কও বদলে যাচ্ছে দিন দিন।
সম্প্রতি ‘কৃষি শুমারি ২০১৯’ শিরোনামের একটি
রিপোর্ট প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)। সেখান থেকে জানা যায়, এক
দশকে অপ্রাতিষ্ঠানিকভাবে পালিত পশুর সংখ্যা শহর ও পল্লি দুই অঞ্চলেই বেড়েছে। ‘কৃষি
শুমারি ২০০৮’ বলছে গরুর সংখ্যা
২ কোটি ৫৬ লাখ ৭৮ হাজার। এর মধ্যে ২ কোটি ৫৩ লাখের বেশি পল্লি এলাকায়, ৩ লাখ ৫৬ হাজারের
বেশি শহরে। অন্যদিকে ‘কৃষি শুমারি ২০১৯’ অনুসারে এক দশক পর এই সংখ্যা হয়েছে ২ কোটি
৯৪ লাখ ৫২ হাজার। এর মধ্যে পল্লি এলাকায় ২ কোটি ৮২ লাখ ৮৩ হাজার ও শহর এলাকায় ১১ লাখ
৬৯ হাজার গরু।
তবে এ চিত্র যে পারিবারিকভাবে পালিত পশুর
সঠিক চিত্র তুলে ধরে এমন নয়। বরং গ্রামের সঙ্গে পরিচয় থাকলেই দেখা যাবে, অপ্রাতিষ্ঠানিক
পশুপালন মূলত খামারই। পাঁচ-দশটি গরু নিয়ে গড়ে উঠছে এ সব খামার। প্রায়শ আমরা সংবাদমাধ্যমে
এ ধরনের শিরোনামও দেখি, বড় ডিগ্রি নিয়ে কেউ খামার করছে। কেউ বিদেশ ফেরত বা বেকার।
এই পরিসংখ্যানের কৌতুককর একটি দিক আছে। বিবিএসের
শুমারিতে বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদিত গবাদিপশুকে বাদ দেয়া হলেও গরু উৎপাদনে প্রাণিসম্পদ
অধিদপ্তরের তথ্যের সঙ্গে বড় ধরনের গরমিল দেখা দিয়েছে। কৃষিশুমারিতে ২০১৯ সালে বাণিজ্যিক
খামারের গরু ছাড়াই গরুর সংখ্যা দেখানো হয়েছে ২ কোটি ৯৪ লাখ ৫২ হাজার। আর প্রাণিসম্পদ
অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, পারিবারিক ও বাণিজ্যিক খামার মিলে ২০১৯-২০ অর্থবছরে গরু ছিল
২ কোটি ৪৩ লাখ ৯১ হাজার। অথচ বিবিএসের পরিসংখ্যান অনুযায়ী অপ্রাতিষ্ঠানিক গরুর সংখ্যা
এর চেয়েও বেশি!
তবে যত গরমিল হোক বা গরুর সংখ্যা বাড়ুক-কমুক
সত্য হলো সনাতনী ধাঁচের পারিবারিক পশুপালন হারিয়ে যাচ্ছে। খামারি পশু ও বাড়ির পশুর
মধ্যে অনেক তফাৎ। মুক্ত পরিবেশের সঙ্গে মানানসই এমন দেশীয় জাতের বদলে বিদেশী বা হাইব্রিড
পশু যুক্ত হচ্ছে খামারে। যেখানে পশু যতটা না জীবন্ত সত্তা, তার চেয়ে বেশি খাদ্য উৎপাদন
বা বিনিয়োগ নিশ্চিতের উপকরণ। একইসঙ্গে ভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা প্রাণ অন্য একটি বাস্তুসংস্থানের
জন্য কতটা উপযুক্ত তা নিয়েও তেমন আলোচনা দেখা যায় না।
পশুপালন নিয়ে এই আলোচনার আরেকটি দিক হলো,
শিক্ষা সংক্রান্ত। আজকাল প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাও শুধু বই বা ক্লাশরুমের মধ্যে সীমাবদ্ধ
নয়। প্রাকৃতিক পরিবেশ বা ঐতিহ্য চর্চার ওপর জোর দেয়া হচ্ছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। একসময়
মানুষ যে ঐতিহ্য থেকে দূরে সরতে চেয়েছে, হালে তা-ই তার জন্য উপকারী বলে চিহ্নিত হচ্ছে।
প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতা অন্য সব সত্তার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে মানুষকে। যার প্রভাব পড়ছে জীবন ও শিক্ষণে। সেক্ষেত্রে অন্য সত্তাকে নিজের অংশ হিসেবে শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। মানবকেন্দ্রিক বিশ্ব ব্যবস্থা গড়ার মাধ্যমে আমরা প্রাণ-প্রকৃতির চরিত্রের মধ্যে বিলয় ঘটিয়েছি। এর ক্ষতিপূরণ সম্ভব অন্য প্রাণের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক তৈরি ও মানুষের মতো প্রকৃতিতে তার হিস্যা নিশ্চিতের মাধ্যমে। যার শুরু হতে পারে ‘রাখালের’ প্রতি শ্রেণিগত ঘৃণা না ছড়িয়ে নিজেদের রাখাল হওয়ার মধ্যে। রাখাল মূলত নেতৃত্বের ধারণা। যেভাবে মহাপুরুষরা ‘মেষপালক’ হয়ে হাজির হয়েছিলেন এবং পথ দেখিয়েছিলেন। একটু ভিন্ন অর্থেই বলি, রাখালের বাঁশি যতই উদাস করুক, সে সুর মূলত প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের হারানো সখ্য পুনরুদ্ধারের ডাক।
লেখক : সাংবাদিক










