মুহুরী প্রজেক্ট দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সেচ প্রকল্প। উদ্দেশ্য ছিল বন্যার প্রকোপ কমানো ও আমন ফসল উৎপাদন বাড়ানো। দেশের প্রথম বায়ু বিদ্যুৎকেন্দ্রটিও এখানে অবস্থিত। অন্যতম পর্যটনকেন্দ্র ও দর্শনীয় স্থান হিসেবেও গড়ে উঠেছে। কিন্তু সবকিছুকে ছাপিয়ে মুহুরী প্রকল্প এখন দেশের অন্যতম বৃহৎ মৎস্য অঞ্চল হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। বণিক বার্তায় প্রকাশিত সংশ্লিষ্ট এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মুহুরী প্রকল্প এলাকায় প্রায় ছয় হাজার একর জমিতে বছরে প্রায় ৪২ হাজার টন মাছ উৎপাদন হচ্ছে। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে মৎস্য যাচ্ছে চট্টগ্রামেও। কয়েক হাজার মানুষের জীবিকার উৎসও এটি। একটি সেচ প্রকল্পকে ঘিরে একাধিক সুফল লাভ নিঃসন্দেহে আনন্দদায়ক সংবাদ। ফসল ও মৎস্য উৎপাদন এবং পর্যটনের মতো আয়-কর্মসংস্থান সৃষ্টির মতো বহুমুখী সুফল নিশ্চিত করার মতো প্রকল্পের উদাহরণ খুব একটা মেলে না। বিপুলসংখ্যক মানুষের আয়ের উৎসে পরিণত করতে পারাই প্রকল্পের বড় সাফল্য। এ ধরনের ফলাফলমুখী আরো প্রকল্প গ্রহণ করা প্রয়োজন।
মাছ উৎপাদন ও আহরণে বাংলাদেশের সাফল্য বিস্ময়কর। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার দ্য স্টেট অব ফিশারিজ অ্যান্ড অ্যাকুয়াকালচার-২০২০ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয়ে মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ তৃতীয়। এছাড়া স্বাদু পানির মাছ উৎপাদন বৃদ্ধির হারে দ্বিতীয় ও বদ্ধ জলাশয়ে চাষ করা মাছ উৎপাদনে পঞ্চম স্থানে বাংলাদেশ। এ সাফল্যের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে বেশকিছু অঞ্চল, যেগুলো মৎস্য হাব হিসেবে পরিচিত। তেমনি একটি হাব মিরসরাই উপজেলার মুহুরী প্রজেক্ট। দেশের অনেক করপোরেট প্রতিষ্ঠান এ প্রকল্পে মৎস্য চাষে সম্পৃক্ত হয়েছে। বিষয়টিকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখতে চাইবে সবাই। তবে করপোরেট প্রতিষ্ঠানের অতিমাত্রায় অংশগ্রহণের অভিজ্ঞতা কিন্তু খুব একটা সুখকর নয়। এক্ষেত্রে অতি মুনাফার লোভে প্রকৃতি ও পরিবেশ বিনষ্ট না করা হয়, সেজন্য কর্তৃপক্ষের তদারকিও জোরদার করতে হবে।
মৎস্য উৎপাদন বাড়ানোর অন্যতম উপায় পর্যাপ্ত অভয়াশ্রম গড়ে তোলা এবং মৎস্যক্ষেত্র সংরক্ষণ। যদিও অনেক নদী, খাল ও বিলে মাছের অভয়াশ্রম গড়ে উঠেছে এবং মৎস্য চাষ হচ্ছে, কিন্তু তা যথেষ্ট নয়। তাই এখন দেশের বিভিন্ন নদ-নদী, হাওর-বাঁওড়, বিল, প্লাবন ভূমি, উপকূলীয় অঞ্চলের উপযুক্ত স্থানে সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের মাধ্যমে বেশি করে মৎস্য অঞ্চল গড়ে তোলা এবং তা সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে মৎস্য অধিদপ্তরের ভূমিকা প্রশংসিত বটে। তবে ভবিষ্যতের চাহিদা ও সম্ভাবনা বিবেচনায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ আবশ্যক। নতুন ও পুরনো সব মৎস্য অঞ্চল সংরক্ষণ ও পরিচর্যায় অধিক মনোযোগ প্রত্যাশিত।
মাছের আবাসস্থল উন্নয়ন একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। প্রাকৃতিক ও মনুষ্যসৃষ্ট কারণে পুকুর-ডোবা, খাল-বিল, হাওর-বাঁওড়, নদী-নালায় পলি জমে ভরাট হয়ে মাছের প্রাকৃতিক প্রজনন, অবাধ বিচরণের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এসব জলাশয় সংস্কার ও খননের মাধ্যমে দেশীয় মাছের আবাসস্থল পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি পরিবেশ ও প্রতিবেশ উন্নয়নের কার্যক্রম অব্যাহত রাখা প্রয়োজন। সম্ভাবনাময় হাওরাঞ্চলের মৎস্য সম্পদ আজ ক্রমহ্রাসমান, যার অধিকাংশ মানবসৃষ্ট কারণে। মৎস্য সম্পদের উন্নয়ন ও উৎপাদন বৃদ্ধির ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখতে হলে টেকসই পরিবেশবান্ধব, জনগণের জীবন ও জীবিকার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ এবং বাস্তবমুখী কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি। হাওরে প্রায় পাঁচ মাস পানি থাকে। মৌসুমের শুরুতেই বিল, নার্সারি কার্যক্রম বাস্তবায়ন, পোনা মজুদ ও সমাজভিত্তিক সংরক্ষণের মাধ্যমে সহজেই মাছ উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব। মুহুরীর মতো অন্যান্য সেচ প্রকল্পও পরিকল্পিত উপায়ে মৎস্য চাষের আওতায় আনা যায় কিনা, তা খতিয়ে দেখা যেতে পারে। মুহুরী প্রজেক্টের সাফল্য ছড়িয়ে দেয়ার উদ্যোগও নিতে হবে।
গবেষণাভিত্তিক বিভিন্ন ম্যাগাজিন ও প্রবন্ধে মৎস্য বিজ্ঞানীরা বাংলাদেশকে মৎস্য চাষের জন্য পৃথিবীতে সবচেয়ে উপযোগী স্থানগুলোর একটি হিসেবে উল্লেখ করেন। এখানকার জলবায়ু, তাপমাত্রা, পানি, মাটি, জীববৈচিত্র্য সবই মৎস্য চাষের জন্য খুবই অনুকূল। সেই সঙ্গে দেশব্যাপী খাল, বিল, নদী-নালা, ডোবা ইত্যাদিসহ বিপুলসংখ্যক পুকুরের অবকাঠামো তো রয়েছেই। তার পরও হেক্টরপ্রতি মৎস্য উৎপাদনে বাংলাদেশ এখনো পিছিয়ে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভিয়েতনামে হেক্টরপ্রতি উৎপাদন হয় ৩০০ টনেরও বেশি, সেখানে বাংলাদেশে উৎপাদন হয় সর্বোচ্চ ৬০ টন। যে কেউ প্রশ্ন করতেই পারেন যে এত সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও আমরা কেন পারছি না? এর উত্তর হলো অধিক ঘনত্বে মৎস্য চাষ না করা ও রফতানি বৃদ্ধি না হওয়া। আমাদের দেশে সাধারণভাবে ট্রাডিশনাল, এক্সটেনসিভ, ইমপ্রুভড এক্সটেনসিভ ও নগণ্য পরিমাণে সেমি ইনটেনসিভ পদ্ধতিতে মাছ চাষ করা হয়। অন্যদিকে ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া ও থাইল্যান্ড অধিকাংশ ক্ষেত্রে সেমি ইনটেনসিভ, ইনটেনসিভ ও সুপার ইনটেনসিভ পদ্ধতিতে অর্থাৎ অধিক ঘনত্বে মাছ চাষ করে। অধিক ঘনত্বে মাছ চাষের জন্য সর্বাগ্রে সার্বক্ষণিক বিদ্যুতের প্রাপ্যতা নিশ্চিত হতে হবে। বাকি পদক্ষেপগুলোর কোনোটিই উচ্চ বিনিয়োগনির্ভর নয়। পানির গুণাগুণ বজায় রাখার জন্য প্রয়োজন অক্সিজেন প্রয়োগকারী যন্ত্র এরেটর, পানিপ্রবাহের জন্য পাম্প, পানি ও মাছের অবস্থা পর্যবেক্ষণের জন্য প্রয়োজন কিছু স্মার্ট টেকনোলজি, যা ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ ধারণার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এর সঙ্গে সঙ্গে গবেষণা জোরদার, উন্নত জাতের পোনা, মানসম্পন্ন মাছের খাবার, মৎস্যচাষীদের জন্য প্রশিক্ষণ ও দরিদ্র চাষীদের অর্থপ্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে হবে।
মাছ উৎপাদন বৃদ্ধির ক্ষেত্রে আমাদের যেমন আত্মতৃপ্তির সুযোগ আছে, ঠিক তেমনি সামনের বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে উৎপাদন বৃদ্ধির ধারা অব্যাহত রাখা। করোনার প্রভাবে মৎস্য সম্পদে যে ক্ষতিটুকু আমাদের হবে, তা পুষিয়ে উৎপাদন আরো বাড়াতে হলে অভ্যন্তরীণ উন্মুক্ত জলাশয়কে বিজ্ঞানভিত্তিক মৎস্য চাষের আওতায় আনতে হবে। মাছ উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং প্রতিযোগিতামূলক আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকার লক্ষ্যে নিরাপদ মৎস্য উৎপাদন এখন সময়ের দাবি। বাংলাদেশ কিছু দেশে মৎস্য ও মৎস্যজাত পণ্য রফতানি করছে। এর পরিমাণ বাড়াতে এবং বাজার বৈচিত্র্যকরণে মানসম্মত পণ্য রফতানির লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক মানের মান নিয়ন্ত্রণাগার প্রতিষ্ঠা প্রয়োজন। মৎস্য ও মৎস্যজাতীয় পণ্য রফতানির ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের গ্রহণযোগ্যতা বেড়েছে। একে আরো বেগবান করতে গবেষণা ও মান পরীক্ষার গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে হবে। বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো স্বাস্থ্যসম্মত মাছের খাবার নিশ্চিত করা। কারণ অনেক স্বাস্থ্যবিজ্ঞানীর অভিমত, মাছের খাবারের কাঁচামাল হিসেবে ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ ও বিষাক্ত প্রাণিজ বর্জ্য ব্যবহার করা হয়, যেগুলো মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। উৎপাদন খরচ বেশি হওয়ায় এবং সংরক্ষণ, পরিবহন ও বিপণন ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক প্রজাতির মাছের দাম বৃহৎ জনগোষ্ঠীর ক্রয়ক্ষমতার বাইরে রয়ে যাচ্ছে। এদিকে নজর দেয়া প্রয়োজন। মাছ সংরক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত হিমাগার নির্মাণ করা দরকার। একই সঙ্গে মৎস্য প্রক্রিয়াজাত শিল্প গড়ে তুলতে প্রণোদনা জোগানো প্রয়োজন। ব্যক্তি খাত এক্ষেত্রে এগিয়ে আসতে পারে।










