দেশের প্রধান রফতানিমুখী শিল্প পোশাক-বস্ত্র। এ শিল্পের উৎপাদন প্রক্রিয়ায় তৈরি হয় বিপুল পরিমাণ বর্জ্য। তথ্য বলছে, বছরে এ খাতে উৎপাদিত বর্জ্যের পরিমাণ প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ টন। এর মধ্যে অর্ধেকই তুলা ও তুলাজাত পণ্যের বর্জ্য। বর্তমানে এ ধরনের বর্জ্যের মাত্র ৫ শতাংশ পুনর্ব্যবহার হয়। বড় অংশ রফতানি হয়, বাকিটা ফেলে দেয়া হয় প্রকৃতিতে। আলোচ্য বর্জ্যের পুনর্ব্যবহার নিঃসন্দেহে অর্থনীতির জন্য নানা দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। এতে তুলা আমদানি কিছুটা হলেও কমে আসবে। সাশ্রয় হবে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রার। পাশাপাশি সৃষ্টি হবে নতুন কর্মসংস্থানও। কাজেই এ ধরনের বর্জ্যের পুনর্ব্যবহারযোগ্য শিল্প বিকাশে রাষ্ট্রীয় প্রণোদনা ও সহায়ক ইকোসিস্টেম গড়ে তোলা জরুরি।

দেশে পোশাক শিল্পের যাত্রা স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে। সময়ান্তরে এ শিল্প ক্রমেই বড় হয়েছে। বর্তমানে এ শিল্পে সক্রিয় কারখানার সংখ্যা সাড়ে তিন হাজার। এ খাতের কাঁচামাল সরবরাহকারী সুতা-কাপড়ের কারখানা আছে ১ হাজার ২০০-এর কিছু বেশি। কিন্তু এসব কারখানা ঘিরে পুনর্ব্যবহারযোগ্য বা রিসাইক্লিং শিল্প ইউনিটের সংখ্যা মাত্র গোটা পঞ্চাশেক। সম্ভাবনা অনুযায়ী এ শিল্পের বিকাশ না হওয়ার পেছনে বেশকিছু কারণ দায়ী। পোশাক খাতে বর্তমানে বর্জ্য রফতানির সুযোগ বিদ্যমান। বর্জ্য বিক্রি করে নগদ অর্থ পান উদ্যোক্তারা। আবার পুরনো কাপড় আমদানি করে সুতা উৎপাদনের কথা ভাবা হলেও উচ্চ আমদানি শুল্কের কারণে তা লাভজনক নয়। এখানে ক্রেতাদের দিক থেকেও একটা বিষয় রয়েছে। আমাদের বস্ত্র ও পোশাক শিল্প মূলত ক্রেতার চাহিদানির্ভর। সেই চাহিদা মেটাতেই শিল্পোদ্যোক্তারা মনোযোগী ছিলেন বেশি। ক্রেতাপক্ষ থেকে বর্জ্য পুনর্ব্যবহার নিশ্চিতের তাগিদ সেভাবে ছিল না। তাছাড়া বর্জ্য যে সম্পদ হয়ে উঠতে পারে, সেই দূরদর্শিতাও ছিল না আমাদের শিল্পোদ্যোক্তাদের। বলতে গেলে এসব কারণে বর্জ্য পুনর্ব্যবহারে শিল্পোদ্যোগ এখনো অকিঞ্চিত্কর।

পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক দৃশ্যপটে বিশ্বের অনেক দেশই পুনর্ব্যবহার শিল্পে মনোযোগ দিয়েছে। ইউরোপীয় দেশগুলো এক্ষেত্রে বেশ এগিয়ে গেছে। বিশেষ করে আয়ারল্যান্ড, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস প্রভৃতি দেশ উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বর্জ্য ব্যবহার করে পোশাক ও বস্ত্র উৎপাদন করছে। বিশ্বের শীর্ষ পোশাক রফতানিকারক দেশ চীন বর্জ্য পুনর্ব্যবহারের নীতি নিয়েছে। আগে দেশটিতে প্রতি বছর উৎপাদিত মোট বস্ত্রের প্রায় ৪০ শতাংশের কাছাকাছি বর্জ্য হতো। এটা পুনর্ব্যবহার করতে তারা সহায়ক শিল্প গড়ে তুলেছে। ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়াও এ পথে এগোচ্ছে। ভারতও পোশাক বর্জ্য দেশটির সংশ্লিষ্ট খাতে কাজে লাগাচ্ছে। দেশটি অভ্যন্তরীণ বর্জ্যের পাশাপাশি প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকেও আমদানি করছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ঝুট কাপড়। দেশগুলো রাষ্ট্রীয় প্রণোদনা, নীতিসহায়তা এবং উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে গড়ে তুলতে উদ্যোগী হচ্ছে সর্বাধুনিক ও পরিবেশবান্ধব পুনর্ব্যবহারযোগ্য শিল্প। এসব দৃষ্টান্ত আমাদের এগিয়ে যাওয়ার পাথেয়।

শিল্পোদ্যোক্তারা বলছেন, পরিবেশগত বিষয়গুলোয় ভোক্তাসচেতনতা বাড়ছে। স্বাভাবিকভাবে বিশ্বব্যাপী বর্জ্য পুনর্ব্যবহারের তত্পরতা শুরু হয়েছে। ক্রেতার পক্ষ থেকেও এ বিষয়ে চাহিদা আসছে। এরই ধারাবাহিকতায় দেশে ধীরে ধীরে গড়ে উঠছে পুনর্ব্যবহারযোগ্য শিল্প। কিন্তু এর গতি এখনো মন্থর। বর্তমানে অনেকেই এ শিল্পে আগ্রহ দেখাচ্ছে। তবে সরকারি সংস্থাগুলোর নানা ধরনের বাধ্যবাধকতা, উচ্চব্যয়, আমলাতান্ত্রিক শৈথিল্য ও দেশে শিল্প-ব্যবসা করার চিরাচরিত জটিলতায় তারা খুব একটা এগোতে পারছে না। তার ওপর থাকছে সামাজিক, রাজনৈতিক, পারিপার্শ্বিক নানা চাপ। ফলে এ ধরনের শিল্পোদ্যোগ থেকে বড় এক প্রতিষ্ঠানকে পিছিয়ে আসতে হয়েছে বলে খবর মিলছে। কাজেই উল্লিখিত সমস্যাগুলোর দ্রুত সমাধান প্রয়োজন।

সরকারি সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, রিসাইক্লিং শিল্পগুলোর কার্বন নিঃসরণের হার বেশি। মূলত এজন্যই তারা পরিবেশগত নানা বাধ্যবাধকতার বেড়াজালে আটকে রাখতে চাইছে এ শিল্পকে। কিন্তু উন্নত যন্ত্রপাতি ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে যে পরিবেশগত ঝুঁকি অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব, সে বিষয়ে পর্যাপ্ত সচেতনতা গড়ে ওঠেনি তাদের মধ্যে। বিশ্বের অনেক দেশে পরিবেশগত ঝুঁকি ন্যূনতম মাত্রায় রেখে পুনর্ব্যবহারযোগ্য শিল্প গড়ে উঠেছে। বৈশ্বিক দৃষ্টান্তগুলো আমলে নিয়ে প্রথমত আমাদের নীতিনির্ধারক ও প্রশাসকদের মধ্যে এ বিষয়ে একটা ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি গঠন করতে হবে। রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবেও একটা সহায়ক পরিবেশ বিনির্মাণ করতে হবে। সন্দেহ নেই, পরিবেশসম্মত রিসাইক্লিং শিল্প স্থাপন অনেক ব্যয়বহুল। এজন্য প্রয়োজনীয় উন্নত প্রযুক্তি, মূলধনি যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশ ক্রয় এবং আমদানিতে প্রণোদনার পাশাপাশি শুল্ক সুবিধা দিতে হবে। উপরন্তু, এ ধরনের শিল্প স্থাপনে সহায়তার জন্য পর্যাপ্ত ব্যাংকঋণের সুব্যবস্থা থাকাও দরকার। টেকনোলজি আপগ্রেডেশনের জন্য সরকারের একটি তহবিল রয়েছে ১ হাজার কোটি টাকার। প্রয়োজনে এ তহবিল থেকে উদ্যোক্তাদের ঋণ দেয়া যেতে পারে। যেহেতু পরিবেশগত ঝুঁকি থাকছে, সেহেতু বিচ্ছিন্নভাবে না করে রিসাইক্লিং শিল্পগুলো যতটা সম্ভব একই ক্লাস্টারে রাখা যায় কিনা, সেটিও দীর্ঘমেয়াদে ভাবতে হবে।

বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বর্জ্য পুনর্ব্যবহারের বিষয়টি প্রাধান্য পেতে শুরু করেছে। এর ব্যাপ্তি ক্রমেই আরো বাড়বে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। প্রতিযোগিতা সক্ষমতায় টিকে থাকতে আমাদেরও সেদিকে এগোতে হবে। ভবিষ্যতে আমাদের রফতানিমুখী পোশাক খাতকে আরো সুসংহত ও টেকসই করতে পুনর্ব্যবহারযোগ্য শিল্পের উন্নয়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তুলা আমদানিনির্ভরতা কমানো, দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের মানদণ্ড থেকে এটা বিশেষ বিবেচনার দাবি রাখে। সরকারের নীতি সমর্থন ও উদ্যোক্তাদের সক্রিয়তায় উল্লিখিত শিল্পে দ্রুত উন্নতি ঘটবে বলে প্রত্যাশা।