বন্যায় সিলেট ও সুনামগঞ্জের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা বিপর্যয়ের মুখে। সিলেট বিভাগের ও সুনামগঞ্জের প্রায় ৯০ শতাংশ স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান প্লাবিত হয়েছে। ফলে ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক স্বাস্থ্য পরিষেবাও। তাছাড়া বন্যা-পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন রোগের প্রকোপ বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহেও সংকট দেখা দিতে পারে বলে জানা যাচ্ছে। কারণ যোগাযোগ ব্যবস্থা স্বাভাবিক না হওয়ায় জরুরি পণ্য পৌঁছে দেয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। সব মিলিয়ে বন্যা-পরবর্তী সময়ে ওই অঞ্চলের মানুষকে ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে পড়তে হতে পারে বলে ধারণা করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা এমনিতেই দুর্বল, তার মধ্যে বন্যার প্রকোপে সেটি ভেঙে পড়লে পরিস্থিতি আরো খারাপ হবে বলে ধারণা। বন্যাকবলিত এলাকার মানুষ স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের জন্য কেন্দ্রে আসতেও পারছে না। এমন অবস্থায় ভাসমান স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রের মাধ্যমে সেবা দেয়া যায় কিনা, তা ভেবে দেখা যেতে পারে। স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে পর্যাপ্ত ওষুধ ও জরুরি সামগ্রীর সরবরাহ শৃঙ্খল নির্বিঘ্ন রাখতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকেই যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে। হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোকে দ্রুত চিকিৎসাসেবা প্রদান উপযোগী করে তোলা হোক।
বন্যার সময়ে পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যু, সাপের কামড়, বিভিন্ন রাসায়নিক পানিতে মিশে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়। বন্যা-পরবর্তী ১০ দিনে বিভিন্ন ব্যাকটেরিয়ার কারণে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, কলেরা, গ্যাস্ট্রিক ও শ্বসনতন্ত্রের রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিতে পারে। দুর্গত এলাকার মানুষ মানসিক ব্যাধিতেও আক্রান্ত হতে পারে। পানি নেমে গেলে বিভিন্ন সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাব বাড়বে। এজন্য পর্যাপ্ত পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট, খাবার স্যালাইন ইত্যাদির সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট, খাবার স্যালাইন, অ্যাজিথ্রোমাইসিন, ডক্সিসাইক্লিন ওষুধের সংকট হতে পারে। সাধারণত বছরের জুনে ওষুধ কেনা হয়। এখন ওষুধের স্বল্পতা সব জায়গায়ই রয়েছে। বন্যায় যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় এ সংকট আরো বাড়তে পারে। তাছাড়া পানির নিচে থাকায় জরুরি স্বাস্থ্যসেবা ব্যাহত হচ্ছে। আহত হওয়া, হার্ট অ্যাটাক, প্রসূতিসেবার মতো জরুরি সেবা নিতেও কেউ হাসপাতালে আসতে পারছেন না। তাছাড়া বন্যা-পরবর্তী নানা রোগের সংক্রমণ বাড়বে। এ কারণে দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় সংকট সৃষ্টি হবে। পানি নামতে শুরু করেছে। কিছু হাসপাতাল ও চিকিৎসা কেন্দ্রে পানি নেমে গেছে। দ্রুতই সেগুলো প্রস্তুত করা প্রয়োজন। ওষুধ সরবরাহ নিশ্চিত করতে বিকল্প পথগুলোও খোলা রাখা প্রয়োজন।
বাংলাদেশে বন্যা নতুন কোনো বিষয় নয়, যদিও এবার সুনামগঞ্জ ও সিলেটে প্রকোপ বেশি দেখা গেছে। কিন্তু দুশ্চিন্তার বিষয় হলো, মানুষের নিরাপদ স্থানান্তর, খাদ্যসহায়তা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে গিয়ে গলদ্ঘর্ম হওয়া। সুনামগঞ্জ ফি বছরই বন্যার কবলে পড়ে। ফলে সেখানকার স্বাস্থ্য অবকাঠামো বন্যার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তৈরি করা আবশ্যক। স্থলভাগ থেকে উঁচুতে সেগুলো তৈরি এবং বর্ষা মৌসুম আসার আগেই ওষুধসহ পর্যাপ্ত উপকরণের মজুদ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোর জন্য আলাদা জলযানের ব্যবস্থা করা আবশ্যক। মাঝে হাওর ও নিম্নাঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কিছু নৌকা ও ছোট লঞ্চের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। কিন্তু রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সেগুলোও বিনষ্ট হয়েছে। বন্যার সময় সাধারণ ভ্রাম্যমাণ স্বাস্থ্যসেবা চালু করা জরুরি। এক্ষেত্রেও অভিজ্ঞতা খুব একটা সুখকর নয়। বন্যাপ্রবণ বাংলাদেশে ভ্রাম্যমাণ স্বাস্থ্যসেবার কোনো ব্যবস্থা বা সুযোগই নেই। দেশে প্রতি বছর বন্যা হয় কিন্তু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নিজস্ব কোনো হেলিকপ্টার, পানিতে চলার অ্যাম্বুলেন্সসহ কোনো পরিবহন ব্যবস্থা নেই। প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় বাংলাদেশকে বিশ্বের রোল মডেল হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। অন্যদিকে দু-তিনদিনের বন্যা মোকাবেলা করার মতো স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনাই গড়ে তোলা হয়নি, যা কাম্য নয়।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী সোমবার এক অনুষ্ঠানে স্বীকার করেছেন, বন্যা মোকাবেলার উপযোগী করে দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ও ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা হয়নি। এ কারণে ভাসমান চিকিৎসা কেন্দ্রের জন্য পর্যাপ্ত উপকরণও তাদের নেই। বিষয়টি একই সঙ্গে হতাশার ও দুশ্চিন্তার। তবে সেখানে মেডিকেল টিম পাঠানো ইতিবাচক। সুনামগঞ্জ ও সিলেটের ভয়াবহ বন্যা দেশের সব খাতের জন্য একটি সতর্কবার্তা। দেশের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাপনা ও অবকাঠামোগুলো নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। পর্যাপ্ত শেল্টারহোম ও সেখানে স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের মতো সুবিধা গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে বন্যার সময়ে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা প্রটোকল তৈরি করতে হবে। কীভাবে ওষুধ সরবরাহসহ অন্যান্য চিকিৎসা নিশ্চিত করা হবে, তার বিস্তারিত তাতে লিপিবদ্ধ থাকতে হবে। একই সঙ্গে ভাসমান কয়েকটি হাসপাতালও তৈরি করতে হবে। খুলনা শিপইয়ার্ডকে দিয়ে আন্তর্জাতিক মানের ডিজাইনে ভাসমান হাসপাতাল নির্মাণ কঠিন কোনো বিষয় নয়। সেগুলো স্বাভাবিক সময়ে হাওরসহ নিম্নাঞ্চলে সেবা প্রদান করবে, বন্যার সময়ে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে সেবা দেবে। বাংলাদেশেই বেসরকারি উদ্যোগে ভাসমান বিদ্যালয় গড়ে উঠেছে। ভাসমান স্বাস্থ্য ব্যবস্থাও গড়ে তোলা কঠিন হবে না।
বন্যা মোকাবেলা একটি দীর্ঘমেয়াদি বিষয়। দেশের বিশেষ ভৌগোলিক পরিবেশ ও প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই এখানে অবকাঠামো নির্মাণ করা প্রয়োজন। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো অনেক ক্ষেত্রে এমন ভাবনা মাথায় রাখা হলেও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান নির্মাণের ক্ষেত্রে এমন কোনো বিশেষ চিন্তা ও পরিকল্পনার প্রতিফলন দেশে বিরল। দেশের ঋতুবৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলার বিষয়টি আমলে নিয়েই এসব বিষয়ে পরিকল্পনা প্রণয়ন করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে নিরবচ্ছিন্ন স্বাস্থ্যসেবা প্রদানে উপকরণের সরবরাহ নিশ্চিত করাও জরুরি। সেক্ষেত্রে বন্যা উপদ্রুত এলাকাগুলোয় প্রয়োজনীয় ওষুধ ও উপকরণের মজুদ সবসময়ই রাখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নিজস্ব হেলিকপ্টার, পানিতে চলার অ্যাম্বুলেন্সসহ ভাসমান চিকিৎসা কেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে।










