বাজারে চালের দাম ঊর্ধ্বমুখী। মোটা চালের দাম এরই মধ্যে কেজিপ্রতি ৫০ টাকা ছাড়িয়েছে। অথচ সরকারের গুদামে থাকা আট লাখ টন চাল মানহীন হয়ে পড়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। দুস্থ ও নিম্ন আয়ের মানুষের মাঝে চাল বিতরণ কর্মসূচিসহ অন্যান্য কর্মসূচি স্বাভাবিকভাবে চললে এ অবস্থা সৃষ্টির কথা নয়। বাজারে চালের দর বাড়লেও ওএমএস কর্মসূচি শুরু করার তাগিদ নেই। চলতি অর্থবছরে জিআর, ভিজিডি, ভিজিএফ, টিআর, স্কুলফিডিং, ওএমএস, সুলভ মূল্যে কার্ড—এসব আর্থিক ও অনার্থিক খাতে খাদ্য সহায়তার জন্য সরকার খাদ্যশস্য বিতরণের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে, তার বেশির ভাগ কর্মসূচি কার্যকর না থাকায় চাল বিতরণ হয়েছে কম। দীর্ঘদিন খাদ্যশস্য সংরক্ষণের ফলে নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। এক্ষেত্রে বোরোর মজুদকৃত আট লাখ টন চাল মানহীন হওয়ার আগেই জেলা ও আঞ্চলিক পর্যায়ে দ্রুত চাল ছাড় করে ওএমএসসহ অন্যান্য কার্যক্রমের মাধ্যমে বিতরণের পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি দেশের খাদ্যগুদামগুলোয়ও খাদ্যশস্য সংরক্ষণের উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
দেশের অধিকাংশ গুদাম ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। খাদ্য অধিদপ্তর অত্যন্ত জরাজীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে কয়েকটি গুদামকে শনাক্ত করেছে। ওইসব গুদামে খাদ্যশস্য রাখাও ঝুঁকিপূর্ণ। সামান্য বৃষ্টিতে গুদামের ভেতর পানি প্রবেশ করে। ফলে নষ্ট হয়ে যায় খাদ্যশস্য। পুরনো গুদামের অবস্থা খুবই করুণ। পাশাপাশি নতুন খাদ্যগুদামের মান নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। নির্ধারিত সময়ে নতুন সাইলো ও খাদ্যগুদাম তৈরিও শেষ হয়নি। ফলে খাদ্যশস্য সংরক্ষণ নিয়ে জটিলতা দেখা দিয়েছে। সহসা এ জটিলতা কাটবে বলেও মনে হচ্ছে না। দেশের সরকারি খাদ্যগুদামের অধিকাংশ স্থাপনাই বেশ পুরনো। এসব খাদ্যগুদামে খাদ্যশস্য সংরক্ষণের উপযুক্ত পরিবেশেরও অভাব রয়েছে। ফলে এসব খাদ্যগুদামে কীটের আক্রমণের শঙ্কা থেকে যায়। আবার সংরক্ষণের উপযুক্ত পরিবেশ না থাকায় বিভিন্ন সময়ে গুদামজাত খাদ্যের মান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতের দিক থেকে বিষয়টি দুশ্চিন্তার বৈকি।
মজুদ খাদ্যের মান রক্ষায় মানসম্পন্ন গুদাম নির্মাণের বিকল্প নেই। এটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। সরকার এরই মধ্যে আধুনিক সাইলো ও গুদাম নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে বটে, তবে তা প্রয়োজনের তুলনায় সামান্য এবং কাজের গতি অপেক্ষাকৃত শ্লথ। স্বল্পমেয়াদে বিদ্যমান খাদ্য সংরক্ষণে গুদামের অভ্যন্তরীণ পরিবেশ উন্নত করার বিকল্প নেই। জেলা পর্যায়ের অধিকাংশ গুদামে আর্দ্রতা বজায় রেখে খাদ্য মজুদ করা কঠিন বলে খবর মিলছে। জরাজীর্ণ গুদামগুলোর মেঝে, ছাদ এমনকি দেয়ালগুলো খাদ্য মজুদের উপযুক্ত নয়। এ কারণে প্রায়ই সরকারি খাদ্য বিতরণের সময় নিম্নমান বা পোকাসহ খাদ্যশস্য প্রদানের অভিযোগ মেলে। গুদামের ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত খাদ্য রাখতে গিয়েও বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয় না, যা খাদ্যের আর্দ্রতা বিনষ্ট করে। আর্দ্রতা না থাকায় কীটপতঙ্গের আক্রমণের শঙ্কাও বেড়ে যায়। এখান থেকে খাদ্যশস্য রক্ষায় খাদ্যগুদামের অভ্যন্তরীণ পরিবেশ উন্নত করতে হবে। খাদ্যশস্য মজুদের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ রক্ষায় এর ব্যবস্থাপনাও উন্নত করতে হবে। আবার স্থাপনা নির্মাণে বৈজ্ঞানিকভাবে স্বীকৃত পদ্ধতি ব্যবহার করতে হবে, যাতে সাইলোয় কীটপতঙ্গ জন্মানোর সুযোগ কমে। এছাড়া বাতাসের আর্দ্রতা ও উষ্ণতা নিয়ন্ত্রণের জন্য উপযুক্ত কারিগরি সক্ষমতাও বাড়াতে হবে। সংরক্ষণাগার ব্যবহারে নির্দিষ্ট বিধি রয়েছে, সেটিও মানা জরুরি। সক্ষমতার অতিরিক্ত মজুদ না রাখা, মানসম্পন্ন ব্যাগের ব্যবহার নিশ্চিত করাও এর আওতায় পড়ে।
সরকারি খাদ্যগুদামে কীটপতঙ্গের আক্রমণ এবং অন্য কারণে খাদ্যশস্যের ক্ষতি এড়াতে একই সঙ্গে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ নিতে হবে। পাকা মেঝে স্থাপন এবং যথাযথ উচ্চতা বজায় রাখার মাধ্যমে বিদ্যমান খাদ্যগুদামগুলোকে আর্দ্রতা প্রতিরোধী করতে হবে, যাতে কীটের আক্রমণের সুযোগ সৃষ্টি না হয়। খাদ্যশস্য সংরক্ষণে বৈশ্বিকভাবে অনুসরিত যথাযথ বিজ্ঞানসম্মত উত্তম চর্চাগুলো নিশ্চিত করতে হবে। সব খাদ্যগুদামে পোকা দমনে কীটনাশক স্প্রে করার পাশাপাশি ফামিগেশনের মতো ব্যবস্থাগুলো জোরদার করতে হবে। বস্তাগুলো সুনির্দিষ্টভাবে তৈরি নিম্নঘনত্বের পানিরোধী পলিথিন দিয়ে ঢেকে রাখতে হবে এবং নাইলন দড়ি দিয়ে সেগুলো শক্তভাবে বেঁধে রাখতে হবে। যোগ্য ও প্রশিক্ষিত কর্মকর্তাদের মাধ্যমে গুদামগুলো নিয়মিত পরিদর্শন করতে হবে। মজুদকৃত খাদ্যশস্যের স্বাস্থ্য ঠিক আছে কিনা তা নিয়মিত বিরতিতে তদারক করতে বিভিন্ন পর্যায়ে একটি নিবিড় যাচাই ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটাতে হবে। কারিগরি সহযোগীদের মাধ্যমে গুদামগুলো ১৫ দিন বা এক মাস পরপর শতভাগ পরীক্ষা করতে হবে। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে সরকারি গুদামে খাদ্যশস্য বিনষ্ট হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে গঠিত কমিটির সুপারিশেও এ বিষয়গুলো রয়েছে। দেশটি খাদ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত করতে এ সুপারিশের ওপর নির্ভর করে পদক্ষেপ নিচ্ছে। খাদ্য সংরক্ষণের জন্য ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুর বিশেষ সুনাম অর্জন করেছে। খাদ্য মজুদ ব্যবস্থাপনার দিক থেকে সিঙ্গাপুর এখন মডেল। তাদের মডেলটি কেমন, তা যাচাই-বাছাই ও পর্যবেক্ষণপূর্বক আমাদের এখানে প্রয়োগ করা যেতে পারে। দেশগুলো খাদ্য মজুদের ক্ষেত্রে আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তা নেয়। কম্পিউটারাইজড ব্যবস্থায় সবকিছু নিয়ন্ত্রণ হয় বলে কোন গুদামের খাদ্যের মান কেমন তা প্রতিদিনই তারা একটি স্থানে বসেই দেখতে পারে। ফলে সিদ্ধান্ত নিতে সহজ হয়। কোন গুদামের পণ্য আগে বাজারে ছাড়তে হবে বা কোন মজুদের মেয়াদ উত্তীর্ণ হচ্ছে প্রভৃতি তথ্য সামনে থাকলে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়া যায়। বাংলাদেশও এটি অনুসরণ করতে পারে।
খাদ্য অধিদপ্তর এরই মধ্যে খাদ্য নিয়ন্ত্রকদের চিঠি দিয়ে চাল দ্রুত ছাড় করার অনুরোধ জানিয়েছে। এক্ষেত্রে চাল যাচাই-বাছাই করে সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রমে চাল প্রদানের উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। এতে চালের মূল্যবৃদ্ধির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত নির্দিষ্ট আয়ের দরিদ্র মানুষ উপকৃত হবে। ধান-চাল সংগ্রহের সময় মানহীন চাল নেয়ার প্রবণতা লক্ষ করা যায়। তাছাড়া আর্দ্রতা কমিয়ে চাল সংরক্ষণের বিধানও সরকারি গুদামগুলোয় ঠিকমতো মানা হয় না। বেসরকারি গুদামে মাসের পর মাস চাল থাকলেও সেগুলো পোকায় খাওয়া বা নষ্ট হওয়ার খবর মেলে না। কিন্তু সরকারি গুদামে এটি ফি বছরই ঘটে। এক্ষেত্রে সরকারি গুদাম ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। কোন সময়ে চাল সংগ্রহ করে কতদিন তা রাখা হবে এবং কীভাবে এটি ব্যবস্থাপনা ও বণ্টন হবে, তার সঠিক গাইডলাইন থাকা আবশ্যক।
বাজারে চালের বর্ধিত দামের এ সময়ে সরকারি মজুদকৃত আট লাখ টন চাল মানহীন হয়ে পড়ার বিষয়টি উদ্বেগজনক। এক্ষেত্রে কারো গাফিলতি রয়েছে কিনা, তা খতিয়ে দেখাও প্রয়োজন। প্রতি বছরই সরকারি গুদামে বিপুল পরিমাণ চাল নষ্ট হওয়ার খবর মেলে। কিন্তু যারা এজন্য দায়ী তাদের চিহ্নিত করে শাস্তির আওতায় আনা প্রয়োজন। চাল সংগ্রহ ও সংরক্ষণের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের অনিয়ম হয়েছে কিনা, তাও তদন্ত করে দেখা দরকার। বড় বিষয় হলো, সরকারি গুদামে চালের ব্যবস্থাপনা উন্নত করতে হবে। কত সময় চাল সংরক্ষণ করা হবে, কীভাবে এটি বিতরণ ও বিক্রি করা হবে ইত্যাদি বিষয় পরিষ্কার হওয়া আবশ্যক। গুদাম খালি না করা গেলে সরকারি চাল সংগ্রহ অভিযানও সফল করা কঠিন হয়ে পড়বে। একই সঙ্গে গুদামে চাল সংগ্রহের সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করা আবশ্যক। নতুন গুদাম নির্মাণ ও মেয়াদোত্তীর্ণ গুদাম সংস্কারের পদক্ষেপ নিতে হবে।










