ফেব্রুয়ারি ১৯৭০। পৃথিবীর মানচিত্রে বাংলাদেশ আলাদা দেশ হিসেবে উদয় হতে বছরের খানিকটা অধিক সময় বাকি। গণহত্যায় যাবে লাখো প্রাণ; কোটি মানুষ এখনো জানে না তারা বাস্তুহারা হবে কিছু মাস পরই; শান্তির পায়রা প্রাণ দেবে পাক হানাদারদের নৃশংসতার ছোবলে। এমন সন্ধিক্ষণে শোক আগাম বার্তা দিয়ে গেল; ইহধাম ত্যাগ করলেন আপসহীন শান্তিবাদী, বহুবিদ, সাহিত্যে নোবেল বিজয়ী বার্ট্রান্ড রাসেল। দর্শন, যুক্তিবিদ্যা, গণিত থেকে শুরু করে ধর্মশাস্ত্র পর্যন্ত সর্বব্যাপী রাসেল রেখে গেছেন তার মেধার অনপনীয় স্বাক্ষর। তবে আজকের পোস্ট-ট্রুথ বিশ্ব, যেখানে মিথ্যা ও রাজনৈতিক কথার ক্ষীণ পার্থক্যের চোরাবালিতে থমকে দাঁড়াচ্ছে গণতন্ত্র, সেখানে রাসেলকে বেশি মনে পড়ে তার সত্য ও যুক্তির প্রতি অবিচল আস্থা, গণতন্ত্র ও বাক স্বাধীনতার প্রতি অগাধ ভালোবাসার জন্য। তিনি বিশেষভাবে ভেবেছেন কীভাবে আমরা বিভিন্ন মতের মানুষের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের সমাজ গড়ে তুলতে পারি; এ বিষয়ে নিউইয়র্ক টাইমসে তার একটা নিবন্ধ, ‘দ্য বেস্ট এনসার টু ফ্যানাটিসিজম: লিবেরালিজম’ প্রকাশিত হয়েছিল। সেই নিবন্ধের আলোকে তুলে ধরছি গণতন্ত্রের মানুষ হব কীভাবে; আরো বিশ্লেষণ করছি আজকের সমাজে রাসেলের গণতান্ত্রিক মানুষের আর কী কী বিষয় ভাবতে হবে। 

তত্ত্ব, তথ্য, ও বিশ্বাস: চরমভাবে কোনো কিছুতে বিশ্বাস করলে মিথ্যা, কুসংস্কার মানুষকে আচ্ছন্ন করতে পারে। তাই নিরঙ্কুশভাবে বিশ্বাস আঁকড়ে ধরার ব্যাপারে সাবধান হতে হবে। আবার মানুষ যখন কোনো বিশ্বাসকে ভালোবাসে, সর্বোত্তম মনে করে, তা অন্যের ওপরও চাপিয়ে দিতে চায়। রাসেল ভাবতেন, মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে কোনো বিশ্বাস প্রচার করা উচিত নয়। কারণ সত্য একদিন না একদিন প্রকাশ হবেই।

চিন্তা ও মত: রাসেল ভাবতেন চিন্তা-ভাবনাকে সহজেই নিরুত্সাহিত করা যায়। এতে অঙ্কুরে বিনাশ হতে পারে অনেক মেধা ও মনন। কোনো মতকে ক্ষতিকর মনে করলে তা দমন করবেন না। করলে সেই মত আপনাকেই দমন করবে। মতের দিক থেকে উদ্ভট হলে ভয় পাবেন না। কারণ আজকের গ্রহণযোগ্য ধারণা একসময় অদ্ভুত মনে করা হতো।

বিরোধিতা: যখনই কোনো বিরোধী মতের সম্মুখীন হবেন—সে নিজের স্বামী বা সন্তান হোক না কেন—চেষ্টা করবেন তা পদস্থান বলে নয়, বরং যুক্তিতর্কের মাধ্যমে সমাধান করতে। পদস্থানের ওপর নির্ভরশীল পাওয়া বিজয় অবাস্তব। নীরব সহমতের চেয়ে বুদ্ধিবৃত্তিক ভিন্ন মতের মধ্যে আনন্দ খুঁজে নিন; এটা আপনার উত্কৃষ্ট বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দেয়।

কর্তৃত্ব ও পদাধিকার: কর্তৃত্বের প্রতি অবারিত, প্রশ্নহীন মাথা নোয়ানো গণতান্ত্রিক আচারের মধ্যে নেই। তার সঙ্গে রাসেল আমাদের ভাবতে বলেছেন কর্তৃত্বের আছে স্তরবিন্যাস, সব কর্তার উপরে আছে আরো কর্তা। কোনো কর্তৃত্বকে চিরস্থায়ী, পরম ভাবার অবকাশ নেই। 

ঈর্ষা: বোকার স্বর্গে বসবাসকারীদের সুখ নিয়ে ঈর্ষান্বিত হবেন না; কারণ বোকারাই তাকে সুখ মনে করে। রাসেল খোলাসা করেননি বোকা কারা। তবে অনুমেয়, যারা তথ্য ও যুক্তির ধার ধারে না, মিথ্যা ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা বিশ্বাস আঁকড়ে ধরেন, তাদেরকেই রাসেল বোকা ধরে থাকবেন।  * সত্যবাদিতা: অকপটে সত্যবাদী হোন; যদিও সত্যটি অসুবিধাজনক হয়। মিথ্যা ঢাকা সত্যবাদিতার চেয়েও বেশি মুশকিলের কাজ।

আমি মনে করি, দ্রুত প্রতিক্রিয়াশীল সামাজিক মাধ্যমের যুগে রাসেলের প্রস্তাবিত গণতান্ত্রিক বৈশিষ্ট্যের কিছু বিষয় পুনর্মূল্যায়ন করতে হবে। তা পেশ করছি।

সত্য আর রাজনৈতিক বক্তব্যের পার্থক্য কী?
রাজনৈতিক তন্ত্র কিন্তু শুধু অতীতকেন্দ্রিক নয়, অনেকটা ভবিষ্যত্মুখী। তথ্য আসে অতীত থেকে। কিন্তু রাজনীতিবিদরা দেখান ভবিষ্যত্। তাই তথ্য ও রাজনৈতিক বক্তব্য পার্থক্য করার সমস্যা রয়েই যায়। এখানেই দেখতে হবে যুক্তির খেলা। মত ও রাজনৈতিক বক্তব্যের মধ্যেও ‘অভ্যন্তরীণ, গঠনমূলক সামঞ্জস্যতা’ আছে কিনা তা যুক্তির মানদণ্ডেই যাচাই করতে হবে।

ক্ষমতার উৎস কার হাতে?
সুন্দর মত, তথ্যভিত্তিক আলোচনা গণতন্ত্রের জন্য প্রয়োজন। কিন্তু গণতন্ত্র সর্বস্ব প্রোথিত। অনেক স্থানে এখনো গণতন্ত্র তৈরি হচ্ছে। যেমন ডিকলোনাইজেশনের বা বি-উপনিবেশীকরণের জন্য কলোনিস্টকে গালিগালাজ করে নিজের মনে দাসত্ব দূর করতে হবে বলে অনেকে মনে করতেন (যেমন ফ্রান্টজ ওমর ফেনন)। কারণ কলোনিস্টরা চলে গেলেও তাদের প্রতি আচরণগত গোলামির প্রথা সহজে যায়নি। তাই ওমর ফেননের মতে, ভবিষ্যত্মুখী মনঃজাগরণের জন্য দরকার অশ্রাব্য গালিগালাজ। ব্রিটিশরা গেছে কিন্তু আমাদের সৌন্দর্যের অনুভূতিগুলো সাদা ও ফরসাতেই ঘুরপাক খাচ্ছে। ডিকলোনাইজের জন্য গালিও দরকার; তা তথ্য, যুক্তি দিয়ে হয়তো সহজে আমলে আসবে না।

বিশ্বাস ছাড়া মানুষ কি দৃঢ় প্রত্যয়ের সঙ্গে কাজ করতে পারবে?
এ প্রশ্নের উত্তরে কবি উইলিয়াম বাটলার ইটে্সর কবিতা ‘দ্য সেকন্ড কামিং’-এর কিছু পঙিক্ত মনে পড়ে যায়—‘দ্য বেস্ট ল্যক অল কনভিকশন, হোয়াইল দ্য ওয়র্সট আর ফুউল অব পেশনেট ইন্টেনসিটি’। তাহলে কী গণতন্ত্রের মানুষ সংকল্পহীন, সদা ভয়, সদা লাজে থাকা মানুষ হবে। তিনি কি সংশয়ে আড়ষ্ট থাকবেন সব সময়। মোটেও না। গণতন্ত্রের নায়করা কিন্তু অনড় সংকল্পের সঙ্গে এ আদর্শের জন্য সংগ্রাম করেছেন। আর বোকারাই যে সব সময় সংকল্পের সঙ্গে পদক্ষেপ নেয় তাও নিশ্চিত সত্য নয়। 

ভার্চুয়াল ‘ইকো চেম্বার’ থেকে মুক্তি কীভাবে?
আগে মানুষ আঞ্চলিকতা, জাতীয়তাবাদের সংকীর্ণতার ভয় করত। এখন অঞ্চলের চেয়েও বেশি বড় হয়েছে মত ও আদর্শিক দলাদলি। তথ্যের অবারিত প্রাচুর্য ও বিশ্বায়নের যুগে এ ধরনের আদর্শিক তথ্য সংগ্রহের প্রবণতা বাড়বে বই কমবে না। আঞ্চলিকতার মধ্যেও কিন্তু মতপার্থক্য ও মত আদান-প্রদানের ব্যবস্থা থাকত। কিন্তু ভার্চুয়াল সামাজিক মাধ্যমে তৈরি হওয়া আদর্শিক দল বা ‘ইকো চেম্বার’-এ মানুষ কাঠামোগতভাবেই আলাদা হয়ে যায়। যেমন গবেষণায় এমনও পাওয়া গেছে যে, মানুষ কোন বইকে বিজ্ঞানের বই মনে করে, কোনটাকে তথ্য মনে করে তাও কিন্তু রাজনৈতিক ও আদর্শিক। তাই যোগাযোগের পাশাপাশি সামাজিক মাধ্যমে তৈরি হওয়া ইকো চেম্বার মেরুকরণেও বড় প্রভাব রাখছে, যা বিশ্বব্যাপী গণতন্ত্র ও সৌহার্দপূর্ণ সহাবস্থানের জন্য হুমকি। এক্ষেত্রে একটা আদর্শিক ও প্রাতিষ্ঠানিক জাগরণ দরকার, যার মাধ্যমে তথ্যকে সত্য-মিথ্যা যাচাইয়ের পরই সিদ্ধান্তে জরুরি হিসেবে দেখা হবে। এই সূত্রে, অনেক ফ্যাক্ট-চেকার গ্রুপ বের হচ্ছে। মনে হচ্ছে যেন, ব্যক্তির ইচ্ছা থাকলেও অবারিত তথ্যের যুগে রাসেলের মূলনীতিগুলো একার চেষ্টায় পালন করা সম্ভব হচ্ছে না। হয়তো ‘তথ্য নিরীক্ষক’ শ্রেণীর উত্তরণ ঘটতে পারে, যা শুধু করপোরেট তথ্যের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নয়। ব্যক্তির একার পক্ষে এই নিরীক্ষক শ্রেণীকে লালন-পালন সম্ভব নয়; এর দায় সামষ্টিক।

পরিশেষে, গণতান্ত্রিক মানুষ ও প্রতিষ্ঠান পরস্পরের পরিপূরক। সামাজিক বাস্তুসংস্থানে এ পরিপূরক সম্পর্ক বিকশিত হওয়ার সক্রিয় প্রচেষ্টার সংস্কৃতি জারি রাখতে হবে। পরিবার থেকে শুরু করে রাজনৈতিক সংগঠন ও আমলাতন্ত্র সবারই এ সংস্কৃতি ধারণ, বাহন ও সঞ্চালনের দায় আছে। 

লেখক: পিএইচডি গবেষক, সমাজবিজ্ঞান, কর্নেল ইউনিভার্সিটি, নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র