কভিডকালে বেড়েছে ওয়ানটাইম প্লাস্টিকের ব্যবহার। সংক্রমণের ভয়ে দৈনন্দিন কাজে এখন এসব সামগ্রী বেছে নিচ্ছে মানুষ। পরিবহন থেকে খাদ্য পরিবেশন সব কাজে ব্যবহূত হচ্ছে প্লাস্টিকের ওয়ানটাইম গ্লাস, প্লেট ও কাপ। বর্তমানে রেস্তোরাঁ, অনলাইন কিচেন থেকে শুরু করে চায়ের দোকান সবখানে প্লাস্টিকের এসব উপকরণের জয়জয়কার। কিন্তু দুঃখজনকভাবে ব্যবহার শেষে অনেকে এসব উপকরণ ফেলছে যেখানে-সেখানে। সেগুলো সঠিক ব্যবস্থাপনায় অপসারণ হচ্ছে না; যা স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হচ্ছে। দেশে করোনার সঙ্গে ক্রমেই ভয়াবহ হয়ে উঠছে ডেঙ্গু পরিস্থিতি। প্রতিদিন বাড়ছে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা। বিশেষ করে রাজধানীতে এর প্রকোপ বেশ আশঙ্কাজনক। নানা কাজে ব্যবহূত ওয়ানটাইম প্লাস্টিক উপকরণ ঢাকায় ডেঙ্গু মশার নতুন প্রজননক্ষেত্র হয়ে উঠছে বলে খবর মিলছে। এটা ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এভাবে চললে পরিস্থিতির আরো অবনমন ঘটবে বৈকি। কাজেই ওয়ানটাইম প্লাস্টিক উপকরণের কার্যকর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা জরুরি।

বেশ অনেক দিন ধরে দেশে প্লাস্টিক পণ্যের ব্যবহার ঊর্ধ্বমুখী। কভিড পরিস্থিতিতে সেটি আরো বহুগুণ বেড়েছে। তবে সমস্যা হলো, এসব সামগ্রীর ব্যবহার-পরবর্তী ব্যবস্থাপনা। অনেকেই ব্যবহার শেষে প্লাস্টিকের ওয়ানটাইম উপকরণগুলো নির্দিষ্ট জায়গায় ফেলছেন না। ফেলছেন এমন গলি-ঘুপচি ও দুর্গম জায়গায়, যেখান থেকে সংগ্রহ করা সহজ নয়। পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা অনেক ক্ষেত্রে সেখানে যেতে পারছেন না। ফলে সেগুলো অনেক দিন পড়ে থাকছে সেসব জায়গায়। মশককর্মীরাও সেখানে যথাযথভাবে স্প্রে করতে পারছেন না। ফলে বর্তমানে সেগুলো হয়ে উঠছে ডেঙ্গুর প্রজননক্ষেত্র। এতে স্বাস্থ্যঝুঁকি যেমন বাড়ছে, তেমনি দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশগত ঝুঁকিও থেকে যাচ্ছে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় এমনিতেই আমাদের দুর্বলতা বিরাজমান; করোনাকালে প্লাস্টিকের ব্যবহার বৃদ্ধি সেই চ্যালেঞ্জ আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। প্লাস্টিকের মতো কঠিন বর্জ্যের যথাযথ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা না গেলে তা পরিবেশের জন্য সর্বনাশা বিপর্যয় ডেকে আনবে। বিভিন্ন গবেষণার তথ্য বলছে, প্লাস্টিকদূষণ এরই মধ্যে আমাদের সমুদ্র, নদী-নালা, জীব-অনুজীব, পরিবেশ-প্রকৃতি এবং জনস্বাস্থ্যে নানা নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। সুতরাং এটা আমলে নিয়ে  যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া চাই। 

শুধু বাংলাদেশ নয়, করোনা মহামারীতে বিশ্বের প্রতিটি দেশেই ওয়ানটাইম প্লাস্টিকের ব্যবহার বেড়েছে। চীন, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ সর্বত্র এটি বাড়ার তথ্য মিলছে। ওই দেশে সরকারি সংস্থাগুলোর পাশাপাশি বেসরকারি অনেক প্রতিষ্ঠানও এসব বর্জ্যের ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। খোদ প্লাস্টিক উৎপাদক প্রতিষ্ঠানগুলোও প্লাস্টিক পণ্যের ব্যবস্থাপনায় তাদের প্রচেষ্টা বাড়িয়েছে, যাতে জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের ক্ষতি প্রশমন করা যায়। উল্লিখিত দেশগুলোয় আগে থেকে প্লাস্টিক ব্যবস্থাপনা নীতি বিদ্যমান। সেখানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের এখতিয়ার ও দায়িত্ব সুস্পষ্টভাবে চিহ্নিত। তার পরও বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে প্রত্যেকেই নিজ নিজ অবস্থান থেকে প্লাস্টিক উপকরণের সঠিক ব্যবস্থাপনায় কাজ করছে, দায়িত্বশীল আচরণ করছে। ওইসব দেশের অভিজ্ঞতা আমাদের জন্য শিক্ষণীয় বৈকি।

বাস্তবতা হলো, বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আমাদের অবকাঠামোগত ও জনবলগত ঘাটতি আছে। সিটি করপোরেশনসহ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মীরা গৃহস্থালি বর্জ্য সংগ্রহে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছেন। তার মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে বেড়ে চলা ওয়ানটাইম প্লাস্টিক উপকরণের ব্যবহার তাদের কাজটি আরো কঠিন করে তুলছে। এ প্রেক্ষাপটে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অবকাঠামো ও জনবল তো বাড়াতে হবেই। এর সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে এর টেকসই ব্যবস্থাপনা নিশ্চিতে নীতিগত কিছু হস্তক্ষেপের বিষয়েও ভাবনা-চিন্তা জরুরি। প্লাস্টিক পরিবেশের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হলেও এখন পর্যন্ত দেশে কোনো প্লাস্টিক ব্যবস্থাপনা নীতি গ্রহণ করা হয়নি। এটি এখন সময়ের দাবি।

বিশ্বের কিছু দেশ প্লাস্টিক বর্জ্যের ব্যবস্থাপনায় উদ্ভাবনী কিছু অ্যাপ্রোচ নিচ্ছে। এমনকি ভারতও এক্ষেত্রে পিছিয়ে নেই। এসব অ্যাপ্রোচের মধ্যে একটি হলো এক্সটেনডেড প্রডিউসার্স রেসপন্সিবিলিটি (ইপিআর)। ইপিআর এমন এক নীতি, যা ভোক্তা-পরবর্তী ব্যবস্থাপনায় প্লাস্টিক উৎপাদক প্রতিষ্ঠান বা প্যাকেজিংয়ে প্লাস্টিক ব্যবহার করা কোম্পানিগুলোর মধ্যেও দায়িত্ব ভাগাভাগি করে। এ দায়িত্ব পালন হতে পারে দৈহিক বা আর্থিক দুভাবে। অর্থাৎ উৎপাদককে অর্থ প্রদান করতেও হতে পারে কিংবা বর্জ্য সংগ্রহ-ব্যবস্থাপনায় তারা সম্পৃক্তও হতে পারে। ভারতে ইপিআরভিত্তিক একটি গাইডলাইন প্রণীত হয়েছে। ওই গাইডলাইন অনুযায়ী উৎপাদক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সেন্ট্রাল পলিউশন কন্ট্রোল বোর্ড (সিপিসিবি) থেকে লাইসেন্স নিতে হয়। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য তাদের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা জমা দিতে হয়। এসব কাজে সমন্বয়ের জন্য এবং সব অংশীজনের সঙ্গে ইপিআর প্রক্রিয়া পরিচালনার জন্য একটি নিবেদিত ওয়েবসাইট/পোর্টালও প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। আমাদের দেশেও ইপিআর মডেল অনুসরণ করা যেতে পারে। পরিবেশ অধিদপ্তর বাংলাদেশে ইপিআর প্রবর্তনে ২০১৮ সালে একটি এসআরওর খসড়া করেছিল। কিন্তু এখনো তা চূড়ান্ত হয়নি। এটা জরুরি ভিত্তিতে প্রণয়ন এবং কার্যকর করা প্রয়োজন।

প্লাস্টিক বায়োগ্রেডেবল নয়, পরিবেশে মিশে যায় এবং ভেঙে ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণায় পরিণত হয়। সেজন্য মোটামুটি সব দেশই প্লাস্টিকের পুনর্ব্যবহার নিশ্চিত করেছে। গড়ে তুলেছে এর চক্রাকার অর্থনীতি। অর্থাৎ পণ্য তৈরি, ব্যবহার, বর্জ্য সংগ্রহ এবং পুনরায় এর ব্যবহার। চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া প্লাস্টিক রিসাইক্লিংয়ের অনেক শিল্প প্রতিষ্ঠা করেছে। আমাদেরও সেটি করতে হবে। কিছু দেশ প্লাস্টিক পণ্য সংগ্রহ ডিপো এবং ফেলার স্থান নির্দিষ্ট রাখার জন্য ভোক্তাদের অর্থ প্রদানেরও ব্যবস্থা করেছে। যাতে ব্যবহার শেষে পণ্যগুলো যথাস্থানে ফেরত দিতে ভোক্তারা উৎসাহিত হয়। যেহেতু আমাদের দেশের মানুষ অনেক অসচেতন, সেহেতু এ ধরনের কিছু উৎসাহমূলক পদক্ষেপ নিতে হবে। একই সঙ্গে শাস্তির ব্যবস্থাও থাকতে হবে। যারা যেখানে-সেখানে ওয়ানটাইম প্লাস্টিক পণ্য ফেলছে, তাদেরকে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে জরিমানা করতে হবে। বাড়াতে হবে এ-বিষয়ক সচেতনতা। সর্বোপরি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বাড়াতে হবে সক্ষমতা। সরকার, স্থানীয় সরকার কর্তৃপক্ষ এবং অন্য অংশীজনদের সম্মিলিত প্রয়াসে প্লাস্টিক বর্জ্যের টেকসই ব্যবস্থাপনা গড়ে উঠবে, এটিই প্রত্যাশা।