কয়েক বছর ধরে দেশের প্রধান খাদ্যশস্য চালের সংকট দৃশ্যমান। চাহিদার তুলনায় জোগান কম। ঘাটতি মেটানো হচ্ছে আমদানি করে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০৩০ সালে দেশে চালের ঘাটতি ৩৬ লাখ টন ছাড়াতে পারে। জনসংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। কিন্তু আশানুরূপ বাড়ছে না খাদ্য উৎপাদন। সামনে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবসহ কৃষিতে বহুমাত্রিক প্রতিকূল পরিস্থিতির আশঙ্কা করা হচ্ছে। তেমনটা হলে খাদ্যনিরাপত্তায় বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হবে। এ ঝুঁকি মোকাবেলায় তাই এখন থেকেই কর্মপরিকল্পনা নেয়া প্রয়োজন।
গত বছর দেশে চালের চাহিদা ছিল ৩ কোটি ৫২ লাখ টন। স্বাভাবিক পরিস্থিতি অনুযায়ী জোগান ধরা হয় ৩ কোটি ৭৫ লাখ টন। কিন্তু প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে চালের জোগান নেমে আসে ৩ কোটি ৪৬ লাখ টনে এবং ঘাটতি হয় ছয় লাখ টন। এর আগের বছরও ঘাটতি হয় প্রায় ১০ লাখ টন। এবার ঘাটতি আরো বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। চলতি বছর বোরোতে ভালো ধান হয়েছিল। তবে হাওরে আগাম বন্যা এবং আরো কিছু জায়গায় কয়েক দফা বন্যায় শেষ মুহূর্তে একটা উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বোরো ধান ঘরে তোলা যায়নি। এখন চলছে চাল উৎপাদনের দ্বিতীয় বৃহত্তম মৌসুম আমন। খরা আর অনাবৃষ্টির কারণে অনেক জায়গায় আমন রোপণ করা হয়নি। আবার যেখানে লাগানো হয়েছে সেখানে ঠিকমতো সেচ দেয়া যাচ্ছে না। গ্রামগঞ্জে অনেক সময় বিদ্যুৎ থাকছে না। এর মধ্যে সার ও জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি আরো বিরূপ প্রভাব ফেলেছে। এক হিসাব বলছে, এতে কৃষকের খরচ বাড়বে ১ হাজার ৬০০ টাকা। একই কারণে সামনের বোরো মৌসুম নিয়েও রয়েছে অনিশ্চয়তা। এছাড়া ভবিষ্যতে কৃষি উৎপাদন জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রভাব, মাটির ক্ষয়-অবক্ষয়, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, সেচের পানির স্বল্পতা, অনাবৃষ্টিসহ বিরূপ আবহাওয়ার সম্মুখীন হবে বলে সংশ্লিষ্ট গবেষণায় উঠে এসেছে। বলা চলে, এসবই আমাদের কৃষির আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ।
আমরা দেখছি, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বের অনেক অঞ্চল ক্রমেই শুষ্ক হয়ে উঠছে। কৃষি উৎপাদনে পড়ছে নেতিবাচক প্রভাব। বাড়ছে অনাবৃষ্টি ও খরার প্রকোপ। সন্দেহ নেই, খরা একটা প্রাকৃতিক ঘটনা, কিন্তু ভূমি ও পানি ব্যবহারের অধিকতর বুদ্ধিদীপ্ত সিদ্ধান্ত এর অভিঘাত অনেকটাই কমাতে পারে। ব্রাজিল, ইথিওপিয়া, ভারত ও তিউনিসিয়ায় খরার বিরূপ প্রভাব কমাতে রেইন ওয়াটার হারভেস্টিং এবং টেকসই ভূমি ব্যবস্থাপনার কিছু ব্যবস্থা চর্চিত হচ্ছে। শুধু খরা নয়, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে অনেক জায়গায় ফসলে ‘হিট শক’ হচ্ছে। ব্যাহত হচ্ছে উৎপাদন। এজন্য উন্নত বিশ্বের অনেক দেশই জলবায়ু নিয়ন্ত্রিত বাণিজ্যিক কৃষি প্রবর্তন করেছে। গ্রিনহাউজের মধ্যে সারা বছর প্রয়োজনীয় খাদ্য উৎপাদন করছে। মেটাচ্ছে স্থানীয় চাহিদা। বৈশ্বিক অভিজ্ঞতাগুলো আমাদের জন্য শিক্ষাপ্রদ।
সন্দেহ নেই, সময়ের ব্যবধানে দেশে খাদ্য উৎপাদন অনেক বেড়েছে। স্বাধীনতার অব্যবহিত পর দেশে খাদ্য উৎপাদনের (প্রধানত ধান-গম) পরিমাণ ছিল প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ টন। বর্তমানে সেটি প্রায় ৪০ কোটি টন ছাড়িয়েছে। একইভাবে শস্যনিবিড়তাও আগের চেয়ে বেড়েছে। বাড়ছে প্রযুক্তির ব্যবহার ও কৃষির যান্ত্রিকীকরণও। এসব নিঃসন্দেহে ইতিবাচক অগ্রগতি। কিন্তু এখন কৃষিতে নতুন হুমকি হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তন। এরই মধ্যে আমাদের কৃষি খাতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব দৃশ্যমান। লবণাক্ততা, খরা, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়ের পৌনঃপুনিকতায় ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে খাদ্য উৎপাদনে। বীজ গজানো, পরাগায়ন ও পরিপক্ব হতে সুনির্দিষ্ট তাপমাত্রা, আর্দ্রতা, বৃষ্টিপাত ও সূর্যালোকের প্রয়োজন। জলবায়ুর এ উপাদানগুলো পরিবর্ধিত হচ্ছে, কিন্তু বীজ বপন ও চারা রোপণের সময় পরিবর্তন সম্ভব হয়নি। এ কারণে কৃষি মৌসুমের সঙ্গে ফসলের চাষাবাদ খাপ খাওয়ানো যাচ্ছে না। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে মিল রেখে স্থানভিত্তিক গবেষণা কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। তাছাড়া পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আরো দুটি চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে। একটি হলো প্রতিকূল পরিবেশে সহনশীল স্বল্পমেয়াদি উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবনের মাধ্যমে বেড়ে চলা জনসংখ্যার জন্য খাদ্যের জোগান দেয়া। অন্যটি পরিবর্তিত বিরূপ পরিবেশে কৃষিকে খাপ খাওয়ানো। ক্লাইমেট স্মার্ট প্রযুক্তি উদ্ভাবনের পাশাপাশি কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থাকে পরিবর্তিত জলবায়ুর সঙ্গে অভিযোজনে নিতে হবে কার্যকর কৌশল। প্রচলিত চাষ পদ্ধতি ও শস্যপর্যায় পরিবর্তন করে পানি কম লাগে এমন ফসলের চাষ, ধান চাষে এডব্লিউডি বা পর্যায়ক্রমে ভেজানো ও শুকানো প্রযুক্তির ব্যবহার, মালচিং ও ড্রিপ সেচের প্রবর্তন, অল্প চাষ বা বিনা চাষে উৎপাদন পদ্ধতিকে উৎসাহিত করা, ভাসমান ও উল্লম্ব চাষের মাধ্যমে প্লাবিত ও অনাবাদি জমি চাষের আওতায় নিয়ে আসা, ফসল চাষের সব পর্যায়ে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, স্বল্প জীবনকাল এবং তাপ-খরা-শীত-বন্যা-লবণসহিষ্ণু জাতগুলোর আবাদ এলাকা সম্প্রসারণ করতে হবে। কৃষির নতুন নতুন গবেষণায় রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ বাড়িয়ে তুলতে হবে। কিছু উদ্যোগ এরই মধ্যে নেয়া হয়েছে। সেগুলো আরো বেগবান করা প্রয়োজন।
কৃষি রূপান্তরের সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রীয়ভাবে খাদ্যশস্যের মজুদও বাড়ানো দরকার। যেকোনো আপত্কালীন পরিস্থিতি মোকাবেলায় অন্তত ১০-২০ লাখ টন চালের জরুরি মজুদের পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের। কিন্তু একে তো চাহিদা ও জোগানের সঠিক তথ্যের অপর্যাপ্ততা, আবার খাদ্য মন্ত্রণালয়ের ব্যর্থতায় বরাবরই লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ধান-চাল সংগ্রহ করা যায়নি, যাচ্ছে না। এর প্রভাব পড়ছে বাজারে। আমদানি করেইও চালের বাজারের উত্তাপ কমানো যাচ্ছে না। ফলে দুর্ভোগে পড়ছে, বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষ। ধীরে ধীরে যেভাবে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপতা বাড়ছে, ততই সরকারের খাদ্যশস্য কৌশলগত মজুদের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। জরুরি মুহূর্তে কারো কাছে যে খাদ্য পাওয়া যায় না, তা নিকট অতীতে বেশ কয়েকবার প্রমাণ হয়েছে। তাই টেকসই মজুদ গড়ে তুলতেও বিশেষ মনোযোগ দেয়া জরুরি।
সংশ্লিষ্ট গবেষণায় অদূর ভবিষ্যতে আমাদের চালের ঘাটতির যে প্রাক্কলন করা হয়েছে, তা আমাদের খাদ্যনিরাপত্তার জন্য অশনিসংকেত। বিরূপ আবহাওয়া, বৈশ্বিক আর্থ-রাজনৈতিক নানা প্রেক্ষাপটে খাদ্য সংকট যে আরো তীব্রতর হবে, তা সহজেই অনুমেয়। এর জন্য সার্বিকভাবে প্রস্তুত হওয়ার এখনই সময়।










