নতুন বছরের চাষাবাদ, বিভিন্ন দুর্যোগ, মহামারী, দুঃসহ আচার-আচরণ, রোগবালাই থেকে মুক্তিলাভের জন্য বিশেষ প্রার্থনা করা হয়। এ সময়ে আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, প্রিয়জন, শ্রদ্ধাভাজন, স্নেহভাজন সবার সঙ্গে মিলিত ও পরিচিত হওয়ার সুযোগ ঘটে। পরস্পরের সঙ্গে সৌহার্দ ও কৌশল বিনিময়ের সুযোগ পাওয়া যায়। আবার প্রবীণদের শ্রদ্ধা নিবেদন করে আশীর্বাদ কামনা, নিজেকে পরিশুদ্ধ, সম্পদশালী, বিত্তবানদের মহৎ কর্ম ও দানশীলতায় অনুপ্রেরণায় নিজেরও আত্মপ্রকাশের সুযোগ সৃষ্টি হয়। উৎসবের মধ্য দিয়ে মানুষের মধ্যে প্রেম-ভালোবাসা জাগ্রত হয় ও সৃষ্টিকর্তা লাভ করা যায়। বৈসু উৎসবের সৃষ্টির কিছু উপাদান ত্রিপুরার বৈসু উৎসবকে বিশেষ তাত্পর্য প্রদান করে যেমন— ১. জল: পবিত্র ও জীবন প্রতীক। জলদান ও প্রবীণদের স্নান করানোর মাধ্যমে পরজন্মের নিজে শুচি, শুভ্র ও পবিত্র হওয়া আর সুখ-শান্তি লাভ করা। ২. হলুদ দান: হলুদ রং দিয়ে প্রবীণদের কপালে তিলক এঁকে দিলে পরজন্মের সুন্দর রূপ ও জ্ঞানী ব্যক্তি হিসেবে জন্মলাভ করবে। ৩. ফুলদান : ফুল অত্যন্ত সুন্দর এবং তা পরের জন্য বিলিয়ে দেয়। তাই পরজন্মের সুন্দর রূপ ও দানশীল হয়ে জন্মলাভ হবে। ৪. খাদ্যসামগ্রী দান: খাদ্যসামগ্রী দান করলে পরজন্মের বিত্তবান ও দানশীল ব্যক্তি হওয়া যায়।
ত্রিপুরা সমাজে বৈসু
বাংলা বারো মাস শেষে চৈত্র ও বৈশাখের মধ্যস্থানে বৈসু উৎসব উদযাপিত হয়। এ উৎসবের জন্য মৃত পিতা-মাতা আত্মার শান্তি লাভের জন্য তৈদাং নির্মাণ করা হয়। নির্মিত তৈদাং ঘরে দুটি কলস জলপূর্ণ করে রাখা হয়। তৈদাং তৈরি মূল অর্থ হচ্ছে দানশীল মৃত ব্যক্তির বা পিতা-মাতার তাদের আত্মার চিরশান্তি লাভের উদ্দেশ্যে বিশেষ জল পানের ব্যবস্থা। কিন্তু জলদান (তৈদাং) করতে হলে পরপর তিন বছর করতে হবে। প্রথম বর্ষ এক জোড়া কলসি জল, দ্বিতীয় বর্ষে ২ জোড়া কলসি জল, তৃতীয় বর্ষে ৩ জোড়া কলসি জল। এ তৈদাং দেখে মানুষ বুঝে উঠতে পারে যে, বৈসু খুবই সন্নিকট বা কাছে, এছাড়াও যদি দেখা যায় যে, বাগানে নাগেশ্বর ফুল, চম্পা ফুল ও বাগান বিলাশ ফুল ফুটলে বৈসু সন্নিকট বলে ত্রিপুরারা ধরে নিয়ে থাকে। তাই তখন সবার মনে একটা আনন্দ ও উৎসবের চিন্তা জাগ্রত জয়। উৎসবের প্রস্তুতিস্বরূপ বাড়ির গৃহিণীরা যাবতীয় আসবাবপত্র, পুরনো কাপড়-চোপড় বিভিন্ন ধরনের অলংকার ও ঘরদোর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ে। শিশু-কিশোররাও বাড়ির আঙিনা পরিষ্কার করার কাজে লেগে যায়। বাড়ির কর্তা পরিবারের সদস্যদের যাবতীয় প্রয়োজনীয় দ্রব্য যেমন- নতুন জামাকাপড়, বিশেষ করে কিশোরী যুবতীদের নতুন অলংকার, গুরুজন ও প্রবীণদের আহার দানের জন্য ভালো খাবার, বিভিন্ন মিষ্টান্ন দ্রব্য, কিশোরদের পটকা বা আতশবাজি, ক্রয়ের জন্য বাজারে গমন করে। বৈসু উৎসবের মনের মানুষের সঙ্গে অনেক আলোচনা হবে এজন্যই যুবক-যুবতীদের এত আনন্দ। এর পেছনে রহস্য নিহিত রয়েছে, প্রথাগত কারণে নারী-পুরুষ কিংবা যুবক-যুবতীরা সাধারণ দিনে অবাধ মেলামেশা করার সুযোগ পায় না। তবে উৎসবের সময় সবার জন্য উন্মুক্ত হয়ে থাকে। এ উৎসবের সবার সমবেত প্রার্থনা, নাচ-গান কীর্তন, পিঠা-পায়েস তৈরি ও একসঙ্গে খাওয়া-দাওয়া করার মাধ্যমে পালিত সার্বজনীন একটি আনন্দময় উৎসব।
ত্রিপুরাদের বৈসু উৎসব মূলত তিনদিন উদযাপিত হয়ে থাকে। ১. হারি বৈসু ২. বৈসু ম্মা ৩. বৈসু বিনাংম:
প্রথম দিন: হারি বৈসু
বৈসু প্রথম দিন সবাইকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হয়ে সৃষ্টিকর্তার বিশেষ আশীর্বাদ লাভের জন্য নিজেকে আধ্যাত্মিকভাবে প্রস্তুত থাকতে হয়। যুবক-যুবতীরা ভোর থেকে ফুল ও বিভিন্ন রকমের পিঠা তৈরির জন্য চালের গুঁড়ার কাজে জমায়েত হয়ে যায়। একদল যুবক-যুবতী হরেক রকমের ফুল সংগ্রহ কাজে চলে যায়, যে ফুল বৈসুর মধ্যে প্রযোজ্য বা অর্থবহ করে সেগুলো তুলে আনে যথা : (খুঁ-মুদাই) মধু ফুল, (খুঁ থাই) নাগেশ্বর ফুল, (খুঁ চাওকু) বাগান বিলাস ফুল, (খুঁচাও খ্মা) চাম্পা ফুল ইত্যাদি। পুরুষেরা চুল কামাই করে। যুবক-যুবতী নবীন-প্রবীণ মহিলাসহ সব শিশু, কিশোর-কিশোরী খালে, ঝরনায় সুগন্ধি সাবান দিয়ে গোসল করে এবং বুড়া-বুড়ীদের গোসল করানো হয়। গোসলের সময় হাসি-তামাশায় কেউ কারো প্রতি হিংসা, বিদ্বেষ, শত্রুতা, বৈরীভাব পুষে রাখে না। আরেক দল বনে চোঙাং পিঠার জন্য নরম বাঁশ, কলাপাতা সংগ্রহ করে আনে। এটা ছাড়াও পিঠা তৈরি করার জন্য বিন্নি চাল গুঁড়া করতে যুবক-যুবতী-গৃহিণীরা দলে দলে জমায়েত হয়ে ঢেঁকিতে বিন্নি চাল গুঁড়া করে (আওয়াঁ পেইন) চোঙাঁ পিঠা, (আওয়াঁ বাংগু) পিরামিড পিঠা, (আওয়াঁ থাও সেমঃ) পুরি পিঠা, (মাইমি জা:গু) চাল পায়েস. (মাইশৈ জা:গু) কাঁকন চালের পায়েস, সেমাইয়ের পায়েস (মাইমি পংম) ভাপা বিন্নি তৈরির কাজে ধুম লেগে যায়। এভাবে বিভিন্ন খেলাধুলা ও পিঠা-পায়েস তৈরি করার মধ্য দিয়ে প্রথম দিনটি চলে যায়।
দ্বিতীয় দিন: বৈসু ম্মা
এদিন প্রবীণরা ভোর সকাল থেকে স্নান করে, ধুতি জামা ও পাগড়ি পরিধান করেন। তারা উপাসনার জন্য একটি ঘরে জমায়েত হন। ১০-১২ যতজন হোক ঘরের বারান্দায় বৈদী (সিংদাং নো:মা) উপাসনালয় তৈরি করেন। সেদিন তারা পুরোহিত করে পৃথিবীর সব মানব জাতির কল্যাণে প্রার্থনা করেন। গ্রামবাসী সামর্থ্য অনুসারে ধনী-গরিব এ সময় দান-দক্ষিণা দেন, পূর্ব প্রস্তুত করা পিঠা-পায়েস টাকা-পয়সা ইত্যাদি দানসহ জল দান, হলুদ দান, ফুল দান, কাঁকন দান, খাদ্যদ্রব্য দান করে থাকেন। এগুলো দানের সময় বয়স্করা বা পুরোহিতরা দানকারীদের আশীর্বাদ প্রদান করেন। এখানে জল দান ও হলুদ দান সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যেমন- জল দান, উৎসবের এক মাস আগে থেকে জল দানের ছোট ঘরে তৈরি করে দুটি কলসিতে প্রতিদিন পূর্ণ জল রাখতে হবে যে কোনো অতিথি এলে জল দান ঘরে বসে বিশ্রাম করে এবং জল পান করে থাকেন। এখানে আরেকটি বিষয় হলো, চেঁপাই খাইয়ে (ছোট ঝুড়িতে) কাঁধে ঝুলিয়ে সংরক্ষিত ধানের বীজ পাড়ার প্রতিটি উঠানে ছিটিয়ে দেয়—এ অর্থ হচ্ছে নতুন বছর এলে আবার জুম চাষাবাদ করতে হবে। সে কারণে জগ্যমাতাকে এভাবে দান ও শ্রদ্ধা করে চাষাবাদের জন্য জগ্যমাতার কাছে আশীর্বাদ কামনা করে নতুন বছরে ভালো ফসলের যাঞা করা হয়। এ সময় গ্রামে হাঁস-মুরগি খাঁচামুক্ত করে দেয়া হয় এবং গরু-ছাগলের বাঁধনও খুলে দেয়া হয়।
এখানে উল্লেখ্য যে, যিনি তৈদাং (জল দান) নির্মাণ করেন তিনি হচ্ছেন—নৌওথা (উৎসব কর্তা)। পাড়া কারবারি কিংবা হেডম্যান হলেও তৈদাং মালিক না হলে উৎসব কর্তা হতে পারে না তৈদাং মালিক বা উৎসব কর্তা তৈদাং-এর সামনে গর্ত করে পুকুরের মতো বানিয়ে দেন। এ গর্তে কলাপাতা বিছিয়ে জল ঢালা হয়। এখানে কাঁচা হলুদ সাত টুকরো ও রূপার টাকা চুবিয়ে রাখা হয়। পাশে নৃত্যের জন্য খুঁফাং-মাইফাং (তুলা ও ধানের গাছ) স্থাপন করা হয়। এছাড়াও চুওয়াক (কলসীতে রক্ষিত কাঁচা মদ) ও চুতৈ (এক বোতল মদ) তার পাশে রেখে দেয়া হয়। এদিন সকাল থেকে ঢোল বাজিয়ে উৎসবকে প্রাণবন্ত করে রাখা হয়।
আর সন্ধ্যাকালে ১০০-২০০ গজের আলোকসজ্জার জন্য বাঁশ গেড়ে থাকে আর একজন পুরোহিতের সুমন্ত্র বা প্রার্থনার মাধ্যমে মোমবাতি প্রজ্বলন হয় এবং অন্যরাও নিজ নিজ উদ্দেশ্য পূরণের স্বার্থে মোমবাতি ছাড়া সুতাকে টুকরো টুকরো করে কাটবে এবং সরিষার তেলে ভিজিয়ে তা ঝুলিয়ে রাখবে, খুঁটির সঙ্গে বাঁশ বাঁধা থাকে, এভাবে সরিষার তেল ভেজানো সুতা সারিভাবে ঝোলানো হয়। সন্ধ্যাকালীন পাড়াবাসী সবার আনন্দের সঙ্গে বাতি জ্বালিয়ে আলোকসজ্জা সম্পন্ন করা হয়। আর রাতে তৈদাং থেকে তৈদাং মালিক অনুমতি বা আশীর্বাদ গ্রহণ করে শুরু হয় কীর্তন বা নৃত্য। শেষে যদি ব্যবস্থা থাকে, তাহলে ফানুশ ওড়ানো হয়। এভাবে পাড়ার সবাই নিজ তত্ত্বাবধানে সক্রিয় অংশগ্রহণ করে আনন্দ সহভাগিতা করে থাকেন।
তৃতীয় দিন: বৈসু বিনাংম
বিনাংম অর্থাৎ বৈসু শেষ দিন। এদিন মর্তে ভগবানের আশীর্বাদের দিন। এদিন অপদেবতাকে সুঁব্রাই (সৃষ্টিকর্তা) কর্তৃক বিতাড়নের দিন। পাড়ার সব পরিবার অংশগ্রহণে ত্রিপুরা রীতিনীতি অনুসারে চুওয়াক, চুতৈ, মদ ঘরে যা আছে তা একত্র হয়ে সবাই আনন্দচিত্তে গ্রহণ করে বৈসু উৎসবকে বিদায় জানানোর জন্য প্রস্তুত হয়। এছাড়া সবাই মিলে-মিশে আনন্দচিত্তে মাছ, মাংস, পিঠা-পায়েস খাওয়া হয়ে থাকে। পাড়ার সব যুবক-যুবতী ও নবীনরা দলে দলে আনন্দপূর্ণ পরিবেশে পানাহার ও নাচ, গান, ঘরে ঘরে কীর্তন করে এবং বৈসু উৎসবকে বিদায় জানায়।
বৈসু উৎসবের কতিপয় নির্দেশনা: এ উৎসব চলাকালে ঝগড়া-বিবাদ, মারামারি, চুরি, জঙ্গলে যাওয়া, কাপড় বা বাড়ি নির্মাণ অসমাপ্ত করা যাবে না, যা পরজন্মে অলক্ষণ হয় ও অস্বাভাবিক প্রকৃতিস্থ মানুষ হয়ে জন্ম লাভ করতে পারে।
পরিশেষে, বৈসু উদযাপন সম্পর্কে যেসব রীতি-নীতি উল্লেখ করা হলো, সেটা অতীতে সমাজ ধর্ম নির্দেশনা হিসেবে পালন করত। বর্তমানে তা সর্বজনীন উৎসব হিসেবে পালন করা হয়। কারণ বর্তমানে ত্রিপুরা সমাজ খ্রিস্ট ধর্ম অনুসারী। খ্রিস্ট ধর্মে পুনর্জন্ম নেই। তাই আগের আলোচনায় নির্দেশনা ও মর্মার্থ বিষয়গুলো খ্রিস্টান হিসেবে বিশ্বাস করানো। আনন্দময় বৈসু উৎসব পালন করতে কোনো বাধা নেই। তবে কিছু ক্ষেত্রে সনাতন বা বৌদ্ধ ধর্মের অনুশাসন রয়েছে। এমন স্থলে খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীরা গির্জায় বা উপাসনালয়ে প্রার্থনা করেন। এরপর ঐতিহ্যবাহী উৎসব পালন করেন। এ নিয়ম-নীতি বর্তমানে ও ভবিষ্যতেও চলবে।
সত্যহা পানজি ত্রিপুরা: সদস্য, বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদ










