আবারো পানির দাম বাড়াতে চাইছে ঢাকা ওয়াসা। আইন অনুযায়ী বছরপ্রতি ৫ শতাংশ দাম সমন্বয়ের নিয়ম। কিন্তু আইনের ব্যত্যয় ঘটিয়ে এবার সর্বনিম্ন ২০ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে সংস্থাটি। ওয়াসার আইন লঙ্ঘনের প্রবণতা এটিই প্রথম নয়। গত বছরের মে মাসে সংস্থাটি নিয়ম মেনে ৫ শতাংশ পানির দাম বাড়ালেও ২০১৭ সালে, ২০১৮ সালের জুলাইয়ে, ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে এবং ২০২০ সালের এপ্রিলে পানির দাম বাড়ায় তুলনামূলক বেশি। তবে অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে এবার সর্বোচ্চ মূল্য সমন্বয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে। রাষ্ট্রীয় সেবা সংস্থাটির উপর্যুপরি আইনের লঙ্ঘন অনাকাঙ্ক্ষিত।
ঢাকা ওয়াসার প্রধান দুটি দায়িত্ব হলো পানি সরবরাহ ও পয়োনিষ্কাশন। প্রতিষ্ঠার পর থেকে রাজধানীতে পানি সরবরাহের কাজটি করছে সংস্থাটি। বরাবরই সংস্থাটি বিশুদ্ধ ও নিরাপদ পানি জোগানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসছে। অথচ কখনই বিশুদ্ধ পানযোগ্য পানি নগরবাসীকে সরবরাহ করতে পারেনি। এজন্য বাধ্য হয়ে নগরবাসীর মধ্যে গভীর নলকূপ স্থাপনের প্রবণতা বাড়ছে। পাশাপাশি ঢাকা ওয়াসায় দুর্নীতি বেড়েছে অসহনীয় মাত্রায়। সংস্থাটির বিভিন্ন প্রকল্প ও কার্যক্রম নিয়ে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ দীর্ঘদিন থেকেই। এমনকি সবচেয়ে বড় পানি শোধনাগার পদ্মা-জশলদিয়া প্রকল্পের পরিচালকসহ অনেককে মাঝেমধ্যেই দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ডেকে পাঠাচ্ছে। অতীতে সংস্থাটির ব্যবস্থাপনা পরিচালককেও দুর্নীতির অভিযোগে হাজিরা দিতে হয়েছে। প্রতি পদে পদে অদক্ষতা ও অব্যবস্থাপনার ছাপ। পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা উন্নয়নের কাজটি সংস্থাটির হলেও এক্ষেত্রে অগ্রগতি নেই। অনেক জায়গায় পয়োনিষ্কাশনের লাইন
নেই। আবার অনেক জায়গায় থাকলেও বিশেষ করে বর্ষাকালে ওয়াসার পানি ও পয়োনিষ্কাশন লাইন একাকার হয়ে যায়। ফলে বাড়ে নাগরিকদের দুর্ভোগ। সুষ্ঠু সেবা প্রদানের মাধ্যমে যেখানে রাজধানীবাসীকে স্বস্তি দেয়ার কথা, সংস্থাটির অপরিণামদর্শিতায় তার উল্টোটা ঘটছে। সাম্প্রতিক পানির মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাবেও নাগরিকদের প্রতি দায়হীনতার প্রতিফলন ঘটেছে। বর্তমান সংকটকালে রাষ্ট্রীয় সেবা সংস্থা হিসেবে জনবান্ধব পদক্ষেপ নেয়া প্রত্যাশিত হলেও তার বিপরীত প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এটা হতাশাজনক।
আমরা দেখছি বিশ্বের প্রতিটি শহরেই কম খরচে নিরাপদ ও মানসম্মত পানি সরবরাহ করছে নগর কর্তৃপক্ষগুলো। ভারতের দিল্লিতে আবাসিক গ্রাহকদের প্রতি ইউনিট পানির দাম সাড়ে ৯ টাকার কিছু বেশি। মুম্বাইয়ে সাড়ে ৬ টাকার মতো। আমাদের পার্শ্ববর্তী কলকাতায় প্রতি ইউনিট পানির দাম ৭ টাকার মতো। দেশটির প্রায় সব শহরেই ইউনিটপ্রতি গড় পানির দাম ৬ থেকে ৮ টাকার মধ্যে রয়েছে। এতে একদিকে নগরবাসী সাশ্রয়ী মূল্যে পানি পাচ্ছে, তেমনি এর মানও ভালো। এটা সম্ভব হচ্ছে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবস্থাপনাগত দক্ষতা, অপচয়-অনিয়ম রোধ এবং জনসাধারণের প্রতি তাদের দায়বদ্ধতা, স্বচ্ছতা, সেবা মানসিকতার কারণে।
দাম বাড়ানোর প্রস্তাবের যুক্তি হিসেবে ওয়াসার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, পানির উৎপাদন খরচ অনেক বেশি, প্রায় ২৫ টাকা। কিন্তু আবাসিক গ্রাহকদের কাছে পৌঁছে দেয়া হয় প্রায় ১৬ টাকায়। আর বাণিজ্যিক এলাকায় ৪২ টাকায়। ভর্তুকি দিয়েই প্রকৃত দামের ব্যয়টা মেটানো হয়। এখন ভর্তুকির পরিমাণ ১০ টাকা কমাতেই নাকি সর্বনিম্ন ২০ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে। কিন্তু অধিকারসংশ্লিষ্টরা বলছেন অন্য কথা। বর্তমানে ঢাকা ওয়াসার পরিচালন ব্যয় অনেক বেশি। সংস্থাটিতে দুর্নীতি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে। অদক্ষতা, সিস্টেম লস, অপচয় বিপুল। ব্যবস্থাপনা উন্নত করে পরিচালন ব্যয় কমিয়ে আনলে পানির দাম বাড়ানোর প্রয়োজন পড়ে না; বরং তার পরিবর্তে নগরবাসীকে আরো কিছুটা স্বস্তি দেয়া যায়।
পানি ছাড়া জীবন চলে না। গ্যাস, বিদ্যুৎ, জ্বালানিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু খাল-বিল-নদীর দেশে দাম চড়ছে পানির। দফায় দফায় বাড়ছে অন্য তিনটি পণ্যের দামও। ধীরে ধীরে এসব যেন চলে যাচ্ছে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। অতি প্রয়োজনীয় পণ্যগুলোর দাম গত ১২ বছরে বেড়েছে দুই থেকে আড়াই গুণ। দুর্বিষহ জীবনে পড়েছেন এমনকি মধ্যবিত্তরাও। খাদ্য, পোশাক-পরিচ্ছদ, বিনোদন, চিকিত্সা, লেখাপড়া প্রভৃতির খরচ কমিয়েই আর্থিক চাপ সামলাচ্ছেন তারা। করোনার কারণে এমনিতেই দুরবস্থার মধ্যে রয়েছে সবাই। কিছু ব্যবসায়ী ভালো ব্যবসা করলেও সাধারণ মানুষ জীবিকাই নির্বাহ করতে পারছে না। কাজেই নতুন করে পানির দাম বাড়ালে তাদের জীবন আরো যন্ত্রণাময় হয়ে উঠবে। শুধু আবাসিক গ্রাহক ক্ষতিগ্রস্ত হবে এমন নয়, বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড এবং শিল্পোৎপাদনে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বৈকি।
ঢাকা ওয়াসার পানি বিপজ্জনক মাত্রায় দূষণযুক্ত, যা মানুষের স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর। ফুটিয়ে বা অন্য উপায়ে বিশুদ্ধ না করলে এ পানি পানযোগ্য হয় না। ওয়াসার পানিতে কাদা-ময়লা, শ্যাওলা তো থাকেই, মাঝে মাঝে কীট-কেঁচোরও দেখা মেলে! সুতরাং পানির দাম বাড়ানোর আগে কর্তৃপক্ষের উচিত দাম বাড়িয়েও মানসম্মত পানি জোগাতে পারবে কিনা, সেটি ভেবে দেখা। গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর আগে গণশুনানির ব্যবস্থা আছে, কিন্তু ওয়াসার ক্ষেত্রে তেমন কোনো ব্যবস্থা রাখা হয়নি। ওয়াসার পরিচালনা বোর্ড তাদের ক্ষমতা ব্যবহার করে পানির দাম বাড়ায়। এ চর্চার পরিবর্তন করতে হবে। পানির দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রেও অবশ্যই গণশুনানির ব্যবস্থা করা চাই। আমরা দেখছি, একটি সেবাধর্মী প্রতিষ্ঠান হিসেবে ঢাকা ওয়াসার জনস্বার্থ প্রাধান্য দেয়ার কথা থাকলেও এখন প্রাধান্য পাচ্ছে বাণিজ্যিকতা। মূলত প্রতিষ্ঠানটির হর্তাকর্তাদের অদক্ষতা, অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার দায় চাপানো হচ্ছে নগরবাসীর ঘাড়ে। বেড়ে চলা পরিচালন ব্যয় মেটাতে বাড়ানো হচ্ছে পানির দাম। এটা অগ্রহণযোগ্য। এ প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। ব্যবস্থাপনাগত অদক্ষতা ও অনিয়ম দূরপূর্বক ওয়াসাকে একটা জনস্বার্থবান্ধব প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে সংশ্লিষ্টরা উদ্যোগী হবেন, এটাই প্রত্যাশা।










