২০০৯ সালে বিশ্ব অর্থনীতি যখন আর্থিক সংকটে ঘুরপাক খাচ্ছিল, তখন নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ রবার্ট লুকাস পর্যবেক্ষণ জানান, ‘শিয়ালের গর্তে প্রত্যেকেই কেইনেসিয়ান’। এর প্রতিফলন ফুটে ওঠে, কোনো অর্থনীতি ব্যাপক অর্থনৈতিক ধাক্কার মুখোমুখি হলে প্রথাগত রাজস্বনীতির আদর্শ স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ে। 

একটি দৃশ্য কল্পনা করুন, বিশ্ব অর্থনীতি ১৯২৯-৩২ সালের গভীর বিষণ্ন সময়ের মতো সংকটে নিমজ্জিত রয়েছে। বেকারত্ব ঊর্ধ্বমুখী হয়ে ২০ শতাংশে পৌঁছে গেছে। এমনকি কেইনসিয়ানবিরোধী উগ্র সমর্থকও রাজি হবেন যে সরকার এ পরিস্থিতিতে কেনাকাটায় কাটছাঁট করে বাজেটে ভারসাম্য রাখার চেষ্টা করবে, যা ভেঙে পড়া অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। যদিও জিইয়ে থাকা বদ্ধমূল ধারণা এ ধাক্কারই অনুগামী হবে যে রাজস্ব আদায়ে কঠোরতা ধারাবাহিকভাবে প্রয়োগ হওয়া উচিত। তথাপি নীতিনির্ধারকদের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী পুনরুদ্ধারের জন্য ভারসাম্যপূর্ণ বাজেট প্রয়োজন। কারণ শুধু এ উদ্যোগ ব্যবসায় বিনিয়োগ করতে আত্মবিশ্বাস জোগাবে না।

বৈরী সময়ে প্রচলিত বৃহৎ আকারের ঋণ-জিডিপি অনুপাত ‘জট পাকানো’ তত্ত্বের প্রতিফলন ঘটায়। যেটি আগেই ধরে নেয়, সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত বেসরকারি উদ্যোগের অর্থনীতি সহজলভ্য সম্পদ ব্যবহার করতে পারে। সর্বোপরি এটি মনে করে, বাজার নির্দেশকের তুলনায় সরকারি বিনিয়োগ অবাধ স্বাধীনতা পায়। এদিকে নিম্ন ফলাফল বা নেতিবাচক প্রত্যর্পণ ঘটলেও যা সাধারণভাবে বেসরকারি বিনিয়োগের তুলনায় কম কার্যকর হবে। এ যুক্তিতে সরকারি ঋণকে ‘শিয়ালের গর্ত’ থেকে বের করে আনা রাজস্বনীতিতে অবশ্যই প্রাধান্য পাওয়া উচিত। 

কেইনসিয়ান বিপ্লব, যা-ই হোক সরকারি ও বেসরকারি ব্যয়ে কঠিন বিভক্তিকে প্রশ্নের মুখে ধাবিত করে। প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান প্রসঙ্গে কেইনস যুক্তি দিয়েছিলেন, দুই ধরনের অপচয় প্রশমিত করা আয়ত্ত করতে হবে। প্রথমত, কিছু সম্পদের অকার্যকর ব্যবহার এবং অন্যদের মাঝে বিস্তারের ব্যর্থতা। যখন পুঁজিবাদ সমাজতন্ত্রকে নির্দিষ্ট কার্যকারিতার ভিত্তিতে অতিক্রম করে এবং অনির্দিষ্ট লভ্যাংশের ওপর নির্ভরতা সম্ভাব্য সম্পদকে অকার্যকর করে তোলে।

ফলত পুঁজিবাদী অর্থনীতির স্বাভাবিক অবস্থা ছিল অব্যবহৃত উৎপাদনক্ষমতার একটি। এ ধাঁধা কাটিয়ে ওঠার জন্য কেইনস একটি সমঝোতার প্রস্তাব করেছিলেন: কার্যকারিতার সুবিধা নিতে মুক্তবাজার ব্যবস্থা বজায় রাখুন, কিন্তু সম্পূর্ণ কর্মসংস্থান নিশ্চিতে স্বায়ত্তশাসিত সরকারি বিনিয়োগের ওপর নির্ভর করুন।

১৯৭০-এর দশক থেকে নিওক্ল্যাসিক্যাল অর্থনীতির পুনরুত্থান কেইনসীয় অর্থনীতিকে কোণঠাসা করে দেয়। এতে আজকের অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারকরা নিজেদের কোণঠাসা পরিস্থিতিতে আবিষ্কার করেন। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলার মতো বিভিন্ন বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সরকারগুলো বিভিন্ন ব্যয়বহুল প্রকল্প হাতে নিতে চাইলেও তারা একটি সংকীর্ণ অর্থনৈতিক চিন্তায় আবদ্ধ হয়ে পরামর্শ দেয় যে এ জাতীয় পদক্ষেপগুলো অনিবার্যভাবে সম্পদকে কম কার্যকর খাতে নিয়ে যায় বা এতে মূল্যস্ফীতি উসকে দেয়া হয়। যখন কোনো অর্থনীতি পুরো কর্মসংস্থান নিয়ে সচল থাকে তখন কথিত আছে যে তা একই সঙ্গে প্রতিরক্ষা ব্যয় ও সামাজিক সুরক্ষা ব্যয় বাড়াতে পারে না।

এখানেই আসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের মূল্যস্ফীতি হ্রাস আইন (আইআরএ)। এর মূল আকর্ষণ হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলা ও জ্বালানি নিরাপত্তা শক্তিশালী করতে ৩৬ হাজার ৯০০ কোটি ডলার বিনিয়োগ পরিকল্পনা। এছাড়া করপোরেশনগুলোকে অতিরিক্ত করারোপ ও ওষুধের মূল্য সংস্কারের মাধ্যমে পরবর্তী ১০ বছরে ৭৩ হাজার ৯০০ কোটি ডলারের মাধ্যমে এর বাজেট সমন্বয় করা হবে। 

আইআরএর পেছনে যে কৌশলগত রাজনৈতিক অবস্থান রয়েছে তা স্পষ্ট। এর ব্যয়ের প্রতিশ্রুতিগুলো অপরিহার্য পরিবেশগত লক্ষ্যগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যখন এর প্রক্ষিপ্ত কর বৃদ্ধি রাজস্ব খাতের কর্তাব্যক্তিদের খুশির জন্য প্রণয়ন করা হয়েছে। মূলত এটি আসলে কৃচ্ছ্রের ছদ্মবেশে একটি সম্প্রসারণমূলক বাজেট।  

প্যাকেজটিতে সুষম বাজেটের বীজ রয়েছে; সরকারি ব্যয় বৃদ্ধি অর্থনীতিতে আরো বেশি চাহিদা তৈরি করাবে, যা করের সমান বৃদ্ধি দিয়ে প্রত্যাহার করা হবে, যেহেতু ট্যাক্স দিয়ে নেয়া অর্থের কিছু অংশ থাকবে। সংরক্ষণ করা হয়েছে, ব্যয় করা হয়নি। 

ইউরোপীয়রা এ ধরনের বিপজ্জনক চিন্তা থেকে আরো দূরে। ২০২২ সালে চালু হওয়া ইউরোপীয় ইউনিয়নের টেমপোরারি ক্রাইসিস অ্যান্ড ট্রানজিশন ফ্রেমওয়ার্কের আওতায় কভিড মহামারী এবং ইউক্রেনের যুদ্ধের প্রভাব মোকাবেলায় সহায়তা করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে ঋণ পরিশোধের বোঝা পড়তে পারে ভবিষ্যৎ করদাতাদের ওপর। 

প্রতিবছর নিরাপদ জ্বালানি খাতে বিনিয়োগের জন্য বার্ষিক ২ হাজার ৮০০ কোটি পাউন্ড বা ৩ হাজার ৫৬০ কোটি ডলার ঋণ গ্রহণের নয়া পরিকল্পনা পেশ করেছেন লেবার পার্টির ছায়া অর্থমন্ত্রী রাচেল রিভস। সেখানে তিনি আর্থিক নীতিমালার উপর জোর দেন। রিভসের দাবি, ওই পরিকল্পনায় কর সংগ্রহের মাধ্যমে প্রাত্যহিক ব্যয় নির্বাহ করা যাবে এবং এর মাধ্যমে জিডিপির বিপরীতে ঋণের ফারাক কমবে। কিন্তু কীভাবে বর্ধিত ব্যয় ওই লক্ষ্য অর্জনে সহায়ক হবে তা ব্যাখ্যা করেননি তিনি। 

প্রতি বছর নিরাপদ জ্বালানি খাতে বিনিয়োগের জন্য বার্ষিক ২ হাজার ৮০০ কোটি পাউন্ড বা ৩ হাজার ৫৬০ কোটি ডলার ঋণ গ্রহণের নয়া পরিকল্পনা পেশ করেছেন লেবার পার্টির ছায়া অর্থমন্ত্রী রাচেল রিভস। সেখানে তিনি আর্থিক নীতিমালার ওপর জোর দেন। রিভসের দাবি, ওই পরিকল্পনায় কর সংগ্রহের মাধ্যমে প্রাত্যহিক ব্যয় নির্বাহ করা যাবে এবং এর মাধ্যমে জিডিপির বিপরীতে ঋণের ফারাক কমবে। কিন্তু কীভাবে বর্ধিত ব্যয় ওই লক্ষ্য অর্জনে সহায়ক হবে তা ব্যাখ্যা করেননি তিনি। 

কেইনসীয় অর্থনীতির হস্তক্ষেপ হ্রাসের ফলে সাম্প্রতিক নীতিগত আলোচনা পুরনো ধাঁচের তর্ক; বাজারভিত্তিক সরবরাহভিত্তিক অর্থনীতি বনাম শিল্পনীতিনির্ভর সরবরাহভিত্তিক অর্থনীতির মধ্যে লড়াইয়ে জায়গা নিয়েছে। এটা অনেকটা বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিনগুলোর পুঁজিবাদী-সমাজতান্ত্রিক লড়াইয়ের প্রতিধ্বনি করছে। এখনকার অর্থনৈতিক বিতর্ক এ জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে, সম্পদ সৃষ্টি ও তার সমতাপূর্ণ বণ্টন নিশ্চিতে সরকারি বা বেসরকারি ব্যয় বৃদ্ধি কার্যকর কিনা।   

সামষ্টিক অর্থনীতির ধারণায় জোর দিয়ে ব্যষ্টিক অর্থনীতির উভয় সংকট এড়াতে ভূমিকা রেখেছে কেইনসীয় চিন্তাধারা। যেখানে তারা সরবরাহের অপ্রতুলতার পরিবর্তে চাহিদার অপ্রতুলতার ওপর জোর দেন। আজকের অর্থনৈতিক-নীতি বিতর্ক থেকে এ আলাপটিই অনুপস্থিত। ফলে সরকারি বিনিয়োগের অঙ্গীকারগুলো আর্থিক নীতিমালা দিয়ে প্রণীত হয়, যা ধরে নেয় যে তারা ক্ষতিকারক। নীতিনির্ধারকদের অবশ্যই দৃঢ়ভাবে দেখাতে হবে যে তাদের প্রস্তাবিত শিল্প নীতিগুলো প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানকে শক্তিশালী করবে, যদিওবা তা নিজস্ব বাজেট নীতি লঙ্ঘন করবে।

এ সময়ে রিভসের ‌সিকিউরোনমিকসের সবচেয়ে সংকটময় দিক হচ্ছে, এটা স্পষ্ট করে আপৎকালীন পরিস্থিতি মাথায় নিয়ে করা। মনে করা হয়, যুক্তরাজ্য ও অন্যান্য দেশ কেবল মিত্রদের সঙ্গে বাণিজ্য করে এবং বাকি উৎপাদন কর্মযজ্ঞ অন্য দেশে স্থানান্তর করে। এখনকার শিল্পনীতির অন্তর্নিহিত রক্ষণশীল রূপ নিয়ে বাম মোর্চার ভাবার অবকাশ রয়েছে।      

পুঁজিবাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে চলমান বিতর্কগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিষয়টি অস্বীকারের সুযোগ নেই। গত দুই দশক যে অর্থনৈতিক বিপর্যয় দেখা গেছে তা কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়, বরং ত্রুটিপূর্ণ ও দুর্নীতিপরায়ণ ব্যবস্থার ফল। কিন্তু বাজার ব্যবস্থাপনায় চরমপন্থা ও সংরক্ষণবাদের ফলে গঠনমূলক নেতৃত্ব ব্যাহত হয়েছে। পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্রের অনিবার্য সংঘাতের কথা বলার চেয়ে কেইনসীয় অর্থ ব্যবস্থাকে আরেকটা সুযোগ দেয়া বুদ্ধিমানের কাজ হতে পারে।  


স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট

রবার্ট স্কিডেলস্কি: ব্রিটিশ হাউজ অব লর্ডসের সদস্য ওয়ারউইক ইউনিভার্সিটির পলিটিক্যাল ইকোনমির ইমেরিটাস অধ্যাপক

ভাষান্তর: তৌফিকুল ইসলাম