রাজধানী ঢাকায় বায়ুদূষণের মাত্রা মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। এতে বসবাসকারী জনগোষ্ঠী মারাত্মক সব রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। গত বুধবার সকাল ১০টা ১১ মিনিটে ঢাকার বাতাসের মান সূচক (একিউআই) ২৬৯ রেকর্ড করা হয়েছে। তালিকায় এরপর রয়েছে যথাক্রমে চীনের উহান ও ভারতের দিল্লি। উহান ও দিল্লির একিউআই স্কোর যথাক্রমে ২৫২ ও ২১৪। এ অবস্থায় পর্যবেক্ষণটিকে গুরুত্বের সঙ্গে আমলে নিতে হবে। দূষণের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সরকারকে এখনই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া উচিত। ঢাকা সিটিতে বায়ুদূষণের বিভিন্ন কারণ রয়েছে। তার মধ্যে তিনটি কারণ প্রধান। যাতে ঢাকাসহ সারা দেশে বায়ুদূষণের মাত্রা বাড়ছে। সেগুলো হলো ইটভাটা, মোটরযানের কালো ধোঁয়া ও যথেচ্ছ নির্মাণকাজ। দূষণ নিয়ন্ত্রণে আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে সরকারকেই সক্রিয় হতে হবে।
বায়ুদূষণ রোধে অনেক সংস্থা নানা ক্ষেত্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত। কিন্তু বায়ুদূষণ রোধে তাদের কোনো ভাবনা আছে বলে মনে হয় না। কালো ধোঁয়াসহ ক্ষতিকর বস্তুকণা বাতাসে ছড়ানো ফিটনেসহীন মোটরযানগুলোর চলাচল বন্ধ করার দায়িত্ব বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সংস্থার। ঢাকার চারপাশের ইটভাটাগুলোর পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ব্যবহার নিশ্চিত করার দায়িত্ব পরিবেশ অধিদপ্তরের। রাস্তাঘাট খোঁড়াখুঁড়ি ও অন্যান্য নির্মাণকাজের সময় ধুলা ওড়ানো বন্ধ করার ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বাধ্য করার দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের। তারা যদি সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করত তাহলে বায়ুদূষণ এত মারাত্মক আকার ধারণ করত না। কর্তৃপক্ষ চাইলে এ সমস্যার ৮০ শতাংশ রোধ করতে পারে আইনি কঠোরতার মাধ্যমে। রাস্তাঘাট, বাড়িঘর নির্মাণে যার দ্বারা ধুলার উত্পত্তি, তাকে দিয়েই সঙ্গে সঙ্গে সেটা অপসারণ করাতে হবে। ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে বালির ব্যবহার সিমেন্টের মতো বস্তায় ভরে নির্মাণস্থলে আনা-নেয়া ছাড়াও রাস্তার পাশে ঢেলে রাখা যাবে না। একদিকে লক্কড়ঝক্কড়-মার্কা ট্রাকে বালি পরিবহনে পুরো রাস্তায় বালি ছিটিয়ে রাখা, অন্যদিকে রাস্তায় বালি স্তূপ করে রেখে কাজ করা সভ্য পৃথিবীর কোথাও আছে বলে জানা যায় না। সিটি করপোরেশনের ময়লার গাড়িগুলো রাস্তায় ময়লা ফেলতে ফেলতে যায়। আজ ওয়াসা তো কাল ডেসা, কাল ডেসা তো পরশু তিতাস, এর পরের দিন সিটি করপোরেশন, তার পরের দিন বিদ্যুৎ কিংবা টিঅ্যান্ডটির সমন্বয়হীন কাটাকাটি চলছে তো চলছেই। এক্ষেত্রে দুঃখজনক বিষয় হলো, উচ্চ আদালতের আদেশ ও নির্দেশনাও উপেক্ষিত থাকছে।
ঢাকা শহর বসবাসের অযোগ্য হয়ে গেছে। কিন্তু কর্তৃপক্ষ নির্বিকার। দূষণের উৎস নিয়ন্ত্রণে যেমন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি, তেমনি জলাশয় সংরক্ষণ ও নতুন করে তা গড়ে তোলারও কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না সরকার। বর্তমানে ঢাকার বায়ুর মান এমন অবস্থায় পৌঁছেছে যে বায়ুদূষণকে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ সংকট হিসেবে ঘোষণা ও পরিবেশগত ‘জরুরি অবস্থা জারি’ করার সময় হয়েছে। চলতি মাসের প্রথম দিকে ভারতের রাজধানী দিল্লিতে বায়ুদূষণের কারণে সেখানকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পর্যন্ত বন্ধ করে দিতে হয়েছে। সর্বাগ্রে দূষণের উৎসগুলো চিহ্নিত করে তা কমিয়ে আনতে হবে। ঢাকার আশপাশের ইটভাটা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। আগুনে পোড়ানো লাল ইটের বিকল্প সিমেন্ট-বালির ব্লক ইটের ব্যবহার বাড়াতে হবে। ইটভাটাগুলোয় উন্নত ও দূষণমুক্ত প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। মেয়াদোত্তীর্ণ গাড়ি চালানো বন্ধ করতে হবে। সপ্তাহের ভিন্ন দিনে জোড়-বিজোড় পদ্ধতিতে গাড়ি চলার ব্যবস্থা করতে হবে। ফিটনেসবিহীন যানবাহন ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। সমন্ব্বয়হীনভাবে রাস্তার খোঁড়াখুঁড়ি বন্ধ করতে হবে। সেবাদানকারী সংস্থার সংস্কারকাজে সমন্বয় এনে স্বল্প সময়ে সংস্কার শেষ করতে হব। নির্মাণসামগ্রী উন্মুক্তভাবে ফেলে রাখা যাবে না। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত করতে হবে, যাতে যেখানে-সেখানে নগর বর্জ্য বা কৃষি বর্জ্য উন্মুক্তভাবে পোড়ানো না হয়, সেদিকে নজর রাখতে হবে। অন্যদিকে প্রচলিত আইন যথাযথভাবে প্রয়োগ করতে হবে।
চীনের বেইজিংসহ হুবেই প্রদেশের বিভিন্ন শহর আর ভারতের দিল্লির বায়ুদূষণের ব্যাপকতার কথা আমরা জানি। শহরগুলোয় বায়ুদূষণ সংকটজনক মাত্রায় পৌঁছলে নগর কর্তৃপক্ষ তা জরুরি স্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে ঘোষণা করে বিভিন্ন ক্লস্টার প্রজেক্ট গ্রহণ করে। দিল্লিতে ব্যক্তিগত গাড়ির পরিবর্তে গণপরিবহনের ব্যবহার উৎসাহিত করা হচ্ছে। পাশাপাশি যত্রতত্র বর্জ্য পোড়ানো, ডিজেল, পেট্রল কিংবা কেরোসিনচালিত বৈদ্যুতিক জেনারেটর নিষিদ্ধ করেছে দিল্লি বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ কমিটি। পাওয়ার ব্যাকআপের জন্য ইনভার্টার ব্যবহারের পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। বেইজিং যেমন তাদের চারটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প প্রাকৃতিক গ্যাসে প্রতিস্থাপন করেছে। তিন দশক আগে এশিয়ার অন্যতম দূষিত শহর ছিল সিঙ্গাপুর। সে সময় দেশটির সরকার গাড়ি ক্রয় ও ব্যবহারের ওপর বিধিনিষেধ জুড়ে দেয়। রাস্তায় ব্যক্তিগত যানবাহনের সংখ্যা কমানোর প্রচেষ্টায় ইচ্ছাকৃতভাবে গাড়ির মালিকানার খরচ বাড়ানো হয়। সিঙ্গাপুর এখন বিশ্বের অন্যতম বিশুদ্ধ শহর। দিল্লি, মুম্বাই, বেইজিংয়ে বায়ুর মান অস্বাস্থ্যকর অবস্থায় পৌঁছে গেলে সেসব দেশের সরকার বিশেষ স্বাস্থ্য সতর্কবার্তা জারি করে। নাগরিকদের বায়ুদূষণ থেকে রক্ষা পেতে নানা সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেয়ার পরামর্শ দেয় স্বাস্থ্য বিভাগ। অথচ বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষের ক্ষেত্রে বিভিন্নভাবে দায় এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতাই দেখা যায়, যা কাম্য নয়।
বায়ুদূষণ রোধে দেশে পর্যাপ্ত আইন রয়েছে, আছে অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয়। পরিবেশ অধিদপ্তর, সিটি করপোরেশনসহ অন্যরা মাঝেমধ্যেই অভিযান পরিচালনা করছে। কিন্তু এসবের ফল দৃশ্যমান হয়ে উঠছে না। কারণ এসব ব্যবস্থা খুবই সাময়িক। বছরব্যাপী বা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অনুপস্থিতিতে ঢাকার বায়ুর মান উন্নত হচ্ছে না। বাতাস দূষণমুক্ত রেখে সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনযাপনের জন্য জরুরি নির্মাণাধীন নতুন ভবন ও রাস্তাঘাটের ধুলাবালি নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। শিল্প-কলকারখানা শহর থেকে দূরে স্থাপন, কালো ধোঁয়া নিয়ন্ত্রণসহ শিল্পবর্জ্যের নিরাপদ অপসারণ নিশ্চিত অত্যাবশ্যক। ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন চলাচলে নিষেধাজ্ঞা আরোপসহ যানবাহনে সিসামুক্ত জ্বালানি ব্যবহার নিশ্চিত করা চাই। সর্বোপরি পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের যথাযথ প্রয়োগ ও বাস্তবায়ন সুনিশ্চিত করতে পরিবেশ অধিদপ্তরের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি।
ঢাকা শহরের বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্ট সব সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা, প্রতিষ্ঠান ও বড় বড় অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প, অর্থাৎ এলিভেটেড এক্সপ্রেস হাইওয়ে, মেট্রোরেলসহ অন্যান্য প্রকল্পে কার্যকর পরিবেশগত ব্যবস্থাপনা প্রতিপালন, সঠিক ব্যবস্থাপনা অনুসরণপূর্বক মাটি, বালি ও অন্যান্য সামগ্রী পরিবহন ও সংরক্ষণ, কার্যকর কর্মপরিবেশ রক্ষা, সময়মতো রাস্তাঘাট সংস্কার ও মেরামত এবং বিভিন্ন প্রকল্পে নিয়মিত পানি ছিটানোসহ কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ প্রয়োজন। আমাদের সামনেই চীনের বেইজিং বায়ুদূষণ কমিয়ে এনেছে কলকারখানা স্থানান্তর ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে। এক্ষেত্রে শুধু পরিবেশ আইন দিয়ে বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ করা যাবে এমনটা ভাবার কোনো যৌক্তিকতা নেই। কেননা পরিবেশের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আইনগুলোর কঠিন প্রয়োগ প্রয়োজন, যা কিনা অন্যান্য উন্নত রাষ্ট্র অনুসরণ করে। শিল্পাঞ্চল শহরগুলোয় পরিবেশ অধিদপ্তর দ্বারা চিহ্নিত শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোয় দূষণ নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।










