বর্তমানে দেশের সব ই-কমার্স বিশ্বস্ত নয়। কিছু প্রতিষ্ঠান সঠিক পণ্য, সঠিক সময়ে সরবরাহ, সঠিক দাম নিশ্চিত করছে না বলে ক্রেতারা প্রতারিত-বিড়ম্বিত হচ্ছেন। এতে অনলাইন প্লাটফর্মের ওপর থেকে ক্রেতার আস্থা কমে যাওয়ার শঙ্কা তৈরি হচ্ছে। তাই এ ধরনের বাজারে মনিটরিং বাড়ানো আবশ্যক। প্রয়োজন ই-কমার্স ব্যবসা পরিচালনার নির্দেশিকা। সমস্যা রয়েছে পেমেন্ট সিস্টেম নিয়েও। আশার কথা হলো, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে এ-সংক্রান্ত একটি নির্দেশনা তৈরি করা হচ্ছে, বর্তমান প্রেক্ষাপটে এটি খুবই প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছিল। ইতিবাচক বিষয় হলো, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এ-সংক্রান্ত বৈঠকটি ছিল বহুপক্ষীয়। এতে ক্রেতা-বিক্রেতা-সরকার সব মহলের অংশগ্রহণ ছিল। এ সময় সিদ্ধান্ত হয়, আগে পণ্য দিতে হবে, পরে টাকা নিতে হবে (ক্যাশ অন ডেলিভারি)। অগ্রিম অর্থ নেয়ার পাঁচদিনের মধ্যে পণ্য সরবরাহ করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকও ই-কমার্স পেমেন্টের নীতিমালা ঘোষণা করেছে। ই-কমার্স বিকাশ ও ভোক্তাস্বার্থ রক্ষায় উভয় উদ্যোগকে স্বাগত জানাতে হবে। দ্রুতই এর বাস্তবায়ন প্রয়োজন।
অনলাইন কেনাকাটায় অনেক ফাঁকফোকর রয়েছে। তাই প্রতিনিয়ত ক্রেতারা ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। হচ্ছেন প্রতারিত। প্রতিনিয়তই গ্রাহকের অভিযোগ বাড়ছে। যদিও অনেক ক্ষেত্রে গ্রাহকের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের বোঝাপড়ার মাধ্যমে অনেক অভিযোগ নিষ্পত্তি হচ্ছে। তার পরও ভোক্তা নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। এক ধরনের পণ্য দেখিয়ে অন্য ধরনের পণ্য সরবরাহ করা, নকল পণ্য দেয়া বা মান ভালো না হওয়া, সঠিক সময়ে সরবরাহ না করা কিংবা প্রলোভন দেখিয়ে হয়রানি—এমন নানা অভিযোগ থেকে ভোক্তার মুক্তি মিলছে না। ই-কমার্সে সবচেয়ে বড় বিষয় হলো গ্রাহকের আস্থা। তা রক্ষা করা না গেলে তাতে দু-একটি প্রতিষ্ঠান নয়, গোটা শিল্পের ওপরই মানুষ আস্থা হারাবে। সেজন্য যেসব অভিযোগ আসছে, প্রশাসনিকভাবেই সেগুলো দ্রুত খতিয়ে দেখা দরকার। কেবল ভোক্তার স্বার্থেই নয়, বরং ই-কমার্স খাতের শৃঙ্খলা আনয়নে অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া জরুরি। ই-কমার্স খাতের পেশাদারিত্ব রক্ষা এবং গ্রাহকের আস্থা ফেরাতে হলে এ খাতের অন্যান্য দিকও দেখতে হবে। দু-একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য ই-কমার্স খাত ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তা কারো কাম্য নয়। ভোক্তা যাতে প্রতারিত না হন, বাজারে যাতে প্রতিযোগিতা থাকে বা সব প্রতিষ্ঠানের জন্য সমান সুযোগ থাকে, সেজন্য এ খাতে স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর বা পরিচালন নীতিমালা দ্রুত বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।
প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়ন আর সঠিক নীতি—এ দুটিই ছিল চীনে ই-কমার্সের উন্নতির মূল চাবিকাঠি। ফলে শুরুতে নকল পণ্য কিংবা গ্রাহকদের ঠকানোর মতো ঘটনা ঘটলেও এখন ই-কমার্সে বিশ্বের রোল মডেলে পরিণত হয়েছে দেশটি। চীনে প্রতি বছর ৩৫ শতাংশ হারে প্রসারিত হচ্ছে ই-কমার্স খাত, যা দেশটিকে বিশ্বের অন্যতম দ্রুত বর্ধনশীল ই-কমার্স বাজারে পরিণত করেছে। বিশ্বের এক নম্বর ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান আলি বাবার সৃষ্টি চীনে। ভোক্তা সুরক্ষায় কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার উপযোগী নীতিমালা রয়েছে প্রতিবেশী দেশ ভারতেও। দেশটিতে নতুন করে ই-কমার্স নীতিমালা তৈরি করা হয়েছে, যেখানে সুষ্ঠু প্রতিযোগিতা, গ্রাহকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা থাকছে। এসব কারণে ফ্লিপকার্ট, স্ন্যাপডিলের ভারতীয় ই-কমার্সগুলো স্থানীয় বাজার ছাড়িয়ে বিশ্ববাজারেও বেশ পরিচিতি পেয়েছে। অন্যদিকে দ্রুত বড় হওয়ার পর্যায়ে থাকলেও দেশে ই-কমার্স নিয়ে এখন পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ আইন করা হয়নি। ডিজিটাল কমার্স নীতিমালা নামে একটি নীতিমালা থাকলেও সেটা পুরোপুরি মানা হচ্ছে না। দেশে ভোক্তা অধিকার আইন থাকলেও সেটা কোনো প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণের আইন না হওয়ায় এটি দিয়ে ই-কমার্স খাত নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। এ বাজার ব্যবস্থায় প্রতারণা এড়াতে সরকারের দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া উচিত। এ-সংক্রান্ত আইন প্রণয়ন করে তা বাস্তবায়নের মাধ্যমে ভোগান্তি এড়ানো সম্ভব। ডিজিটাল বাজার ব্যবস্থায় কারসাজি করলে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়ে প্রতিকার করতে হবে।
ই-কমার্স খাতকে সরকারিভাবে কঠোর নিয়ন্ত্রণের পক্ষপাতী নন অনেকে। তাদের মত, খাতটি নিয়ন্ত্রণ করা হলে তা নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। গত কয়েক বছরে ই-কমার্স খাতটি যেভাবে বড় হচ্ছে, যে হারে প্রবৃদ্ধি হচ্ছে, নতুন নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হচ্ছে, রেগুলেশন করা হলে এসব বিষয়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এখন যদি সরকার রেগুলেশন করে ই-কমার্স খাতের ব্যবসায়ীদের লাইসেন্স গ্রহণ বাধ্যতামূলক করে দেয়, তাহলে এখন যে হারে খাতটিতে উদ্যোক্তা তৈরি হচ্ছে, তাতে ভাটা পড়বে। একথার আন্তর্জাতিক ভিত্তি খুঁজে পাওয়া যায় না। চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড যেসব দেশে ই-কমার্স বিকাশ লাভ করেছে, সেখানেই শক্তিশালী আইনি কাঠামো রয়েছে। বাংলাদেশের মতো স্বল্পশিক্ষিত মানুষের দেশে শুধু ভোক্তা সচেতন করে ই-কমার্সের প্রতারণা রোধ করা যাবে না। এজন্য চাই শক্তিশালী আইনি কাঠামো ও তার সুষ্ঠু প্রয়োগ।
ভোগান্তি এড়াতে অনলাইন বাজার ব্যবস্থা অর্থাৎ ই-কমার্স সহায়ক উপযুক্ত পরিচালন নীতিমালা দ্রুত বাস্তবায়ন প্রয়োজন। এজন্য চাই সুনির্দিষ্ট পথনকশা। আর্থিক লেনদেনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ইন্টারনেটের গতি বাড়ানো। আস্থাশীল ই-কমার্স পরিবেশ সৃষ্টি করা। এজন্য সরকার ও অনলাইন বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে আসতে হবে। ভোক্তা অসন্তোষ নিরসনে টেকসই কৌশল প্রণয়ন করতে হবে। ব্যাংকের মাধ্যমে লেনদেনের খরচ পুনর্নির্ধারণ এবং দ্রুততম সময়ে অভিযোগ নিষ্পত্তি করা। সবসময় যে বিষয়টি খেয়াল রাখতে হয়, সেটি হলো সুযোগের সমতা। সবার জন্য এক নীতি। এখন যে যার যোগ্যতা অনুযায়ী এগিয়ে যাও। একটা নির্দিষ্ট নীতিমালা থাকলেই কেবল তা সম্ভব। ডিজিটাল বাংলাদেশ নির্মাণে যা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে, আরো গতি দেবে অর্থনীতিতে। তাই ই-কমার্সের ক্ষেত্রে নয়া বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দ্রুত সুনির্দিষ্ট নীতিমালা ও আইন প্রণয়ন এবং তার বাস্তবায়নে তদারকি বাড়াতে হবে। আইন করার পাশাপাশি সরকারেরও ই-কমার্স-সংক্রান্ত বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান থাকা দরকার, যারা এখানকার সার্বিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করবে। করোনা মহামারীর মধ্যে ই-কমার্স মানুষের কতটা উপকার করছে তা বলা বাহুল্য। বিকশিত খাতটি যাতে গুটিকয়েক প্রতিষ্ঠানের কারণে কলঙ্কিত না হয় এবং গ্রাহকের আস্থা না হারায়, সেদিকে এখনই দৃষ্টি দেয়া চাই। ই-কমার্স খাতে পেশাদারিত্ব ও শৃঙ্খলা এলে তা ব্যবসার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।










