অর্থনীতির ব্যবস্থাপনায় অনেক ধরনের পলিসি রয়েছে। তার মধ্যে সামষ্টিক অর্থনীতি ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ দুটি পলিসি হলো মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতি। এ দুই পলিসিই যেমন আলাদাভাবে কাজ করে, আবার তাদের কাজ পারস্পরিকভাবে সংযুক্তও বটে। তাদের মধ্যে অনেকটা ভাই ভাই সম্পর্ক রয়েছে। কখনো কখনো এটাকে সৎ ভাইয়ের সম্পর্কও বলতে পারেন। সৎ ভাই কেন বলা যাবে তার কারণ রয়েছে। সাধারণত রাজস্বনীতির নিজস্ব একটি ক্ষেত্র আছে। এর মধ্যে রাজস্ব আয় ও রাজস্ব ব্যয় দুটোই রয়েছে। এখানে ঋণের বিষয়টিও যে সম্পৃক্ত, আমরা অনেক সময় এ কথা ভুলে যাই। সাধারণত রাজস্বনীতি নিয়ে কথা বললে রাজস্ব ও সরকারি ব্যয় ব্যবস্থাপনাকে বোঝা হয়। রাজস্ব খাতের গুরুত্বপূর্ণ অংশ কিন্তু ঋণও। এটা স্থানীয় ও বৈদেশিক ঋণ দুটোই হতে পারে। 

একই কথা প্রযোজ্য মুদ্রানীতির ক্ষেত্রেও। মুদ্রানীতিরও নিজস্ব ক্ষেত্র ও গণ্ডি রয়েছে। কোনো অর্থনীতিতে মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতি যখন ঠিকভাবে কাজ করে সে অর্থনীতিতে গতিশীলতা দেখা যায়। কোনো অর্থনীতির গতিশীলতা বোঝানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হচ্ছে মোট জাতীয় উৎপাদন বা জিডিপি। যদিও এখন অনেক অর্থনীতিবিদ জিডিপিকে মুখ্য প্যারামিটার বা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্যারামিটার হিসেবে স্বীকৃতি দিতে রাজি নন।

রাজস্বনীতির গুরুত্বপূর্ণ সূচক হলো রাজস্ব ঘাটতি এবং মুদ্রানীতির গুরুত্বপূর্ণ সূচক চলতি হিসাবে ঘাটতি। যদি দুটো ক্ষেত্রেই ঘাটতি দেখা যায় তখন অর্থনীতিবিদরা এটাকে ‘‌টুইন ডেফিসিট’ (যমজ ঘাটতি) হিসেবে অভিহিত করেন। রাজস্ব ঘাটতি সহনীয় পর্যায়ে রাখার বিষয়ে আমাদের উদ্বেগ দীর্ঘদিনের। ড. মোহাম্মদ তারেক যখন অর্থ সচিব ছিলেন তখন রাজস্ব ঘাটতি ছিল জিডিপির ৫ শতাংশের মতো। কভিডকালে তা ৬ শতাংশের ওপরে ছিল। সাধারণত আমাদের প্রকৃত রাজস্ব ঘাটতি ৩-৪ শতাংশের মধ্যে থাকছে। সম্পদ ব্যবস্থাপনা (রিসোর্স মোবিলাইজেশন) আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ করের ফারাক আরেকটি চিন্তার বিষয়। 

আমাদের রাজস্ব আয়ের দুই-তৃতীয়াংশ আসছে পরোক্ষ করের মাধ্যমে। প্রত্যক্ষ করের মাধ্যমে আদায় হচ্ছে মাত্র এক-তৃতীয়াংশ রাজস্ব। পরোক্ষ করের পরিমাণ বেশি হলে সেটি বৈষম্য তৈরি করে। অন্যদিকে প্রত্যক্ষ কর প্রগ্রেসিভ হারে বাড়াতে পারলে সেটি সমতা নিশ্চিত করে। প্রত্যক্ষ কর বাড়াতে আমাদের পদক্ষেপ নিতে হবে। এক কোটির বেশি টিআইএনধারী থাকলেও রিটার্ন জমা পড়েছে ৩০ লাখের বেশি। এক্ষেত্রে করজাল বিস্তৃত করতে আমাদের অনেক করণীয় রয়েছে। সরকারি ব্যয়ের ক্ষেত্রে বরাদ্দের যৌক্তিকতা নিয়ে বড় ইস্যু রয়েছে। আমাদের পরিচালন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার কারণে রাজস্ব আয়ের উদ্বৃত্ত ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এর মানে হচ্ছে, আমাদের রাজস্ব উদ্বৃত্ত না থাকলে উন্নয়ন ব্যয়ের শতভাগই ঋণের মাধ্যমে করতে হবে। বিদেশী ঋণের চেয়ে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে নেয়া ঋণের পরিমাণ বেশি। উচ্চ সুদে সরকার সে ঋণ নিয়েছে। ব্যাংক খাত থেকে সরকার ঋণ নেয়ার কারণে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমছে কিনা সে বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে নজর রাখতে হবে। 

সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অনুসরণ সত্ত্বেও সার ও বিদ্যুতের ভর্তুকির বিপরীতে ২০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ ট্রেজারি বন্ড ইস্যু করা হয়েছে বা হচ্ছে। এতে সরকারের তহবিল থেকে নগদ অর্থ না গেলেও রাজস্ব ঘাটতি কিন্তু তৈরি হচ্ছে। মানি মাল্টিপ্লায়ার যেহেতু পাঁচের অধিক, সেহেতু এসব বন্ড ইস্যুর কারণে বাজারে ১ লাখ কোটি টাকারও বেশি অর্থের সরবরাহ বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি করবে। অথচ সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির লক্ষ্য হচ্ছে মুদ্রা সরবরাহ সীমিত রাখা। 

আমাদের মনে রাখতে হবে, যদি আমরা সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি গ্রহণ করি তাহলে পুরোপুরি সংকোচনমূলক নীতিই নিতে হবে। আমরা যদি পাশ কাটিয়ে বিভিন্ন পলিসি যুক্ত করতে যাই তাহলে তা অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ যেমনটা বলেছেন, রাজস্বনীতির প্রভাবটা পড়ে দ্রুত কিন্তু মুদ্রানীতির প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে অনুভূত হয়। এজন্যই মুদ্রানীতি গ্রহণের ক্ষেত্রে আমাদের দূরদর্শী ও সতর্ক থাকতে হবে। 

সরকারি ব্যয়ের যথাযথ ব্যবহারের দিকে যদি তাকাই, সামাজিক সুরক্ষা ব্যয়ের ক্ষেত্রে অর্থ বরাদ্দ কমছে। অথচ চরম মূল্যস্ফীতিতে এ খাতে বেশি বরাদ্দ সবচেয়ে জরুরি ছিল। কারণ মূল্যস্ফীতিতে সবচেয়ে ভুক্তভোগী হয় দরিদ্র শ্রেণীর মানুষ। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় থাকা সুবিধাভোগীর সংখ্যা বাড়লেও ভাতার পরিমাণ বাড়েনি। অন্যদিকে সরকারের পরিচালন ব্যয়ে সামাজিক অবকাঠামোর অবদান কমছে। স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে আমাদের ব্যয় লক্ষণীয়ভাবে কম। চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ও বিভিন্ন কারণে সফট ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্টে আমাদের বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি। ভৌত অবকাঠামোয় আমাদের বিনিয়োগের প্রবণতা বেশি। আমি বলছি না যে এক্ষেত্রে বিনিয়োগ করার প্রয়োজন নেই। তবে একদিকে যেমন আমাদের অবকাঠামো খাতে ব্যয়ের গুণগত মান রক্ষা করতে হবে, অন্যদিকে তৈরি অবকাঠামোর সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।

আমরা যখন ব্যালান্স অব পেমেন্টের (বিওপি) বিভিন্ন আইটেমের পরিসংখ্যানে অবনতি দেখি তখন আমাদের সবারই ধারণ হয় যে, এর জন্য একমাত্র বাংলাদেশ ব্যাংক দায়ী। অথচ প্রতিটি আইটেমের জন্যই আলাদা আলাদা সম্পর্কিত পক্ষ রয়েছে। এক্ষেত্রে সব পক্ষের কাছে গিয়ে এর কারণ জানতে চাওয়া উচিত। আমাদের ডাটার গুণগত মানও উন্নত করতে হবে। তা না হলে আমাদের বড় সমস্যার মধ্যে পড়তে হবে। ডিজিটালাইজেশনের মাধ্যমে সিস্টেমের মধ্যে মানুষের সম্পৃক্ততা কমিয়ে আনতে হবে। কৌশল নির্ধারণের ক্ষেত্রে মানুষের সম্পৃক্ততার প্রয়োজন রয়েছে। তবে জনসেবার ক্ষেত্রে যতটা সম্ভব মানুষের সম্পৃক্ততা কমিয়ে আনতে হবে। রাষ্ট্র ও মানুষের মধ্যে মধ্যস্থতাকারীর কাজ করছে বিভিন্ন সংস্থা। এখন সময় এসেছে প্রযুক্তির সহায়তা নিয়ে এ মধ্যস্থতাকারীদের হস্তক্ষেপ কমিয়ে আনার।

ছয় মাসের মুভিং অ্যাভারেজ রেট অব ট্রেজারি বিল বা স্মার্ট বেঞ্চমার্ক—এটা বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি সাহসী উদ্যোগ। বেঞ্চমার্কিং করা মার্কেট রেটের সঙ্গে, বিশেষ করে প্রতিযোগিতামূলক রেটকে ভিত্তি করে ট্রেজারি বিল মার্কেটে দাম পাচ্ছে। এই বেঞ্চমার্কটি অর্থনীতিতে বড় একটি প্রভাব ফেলেছে। তবে যেহেতু আমাদের দেশের একটি সমস্যা হলো চাহিদা ও জোগান সবকিছু নির্ধারণ করে না, এখানে কতগুলো পক্ষ তাদের নিজস্ব স্বার্থের জন্য অযাচিত হস্তক্ষেপ করে থাকে। যার কারণে এসব বিল-বন্ডের সঠিক প্রাইজ ডিসকভারি হচ্ছে কিনা তা নির্দিষ্ট সময় অন্তর অন্তর পর্যবেক্ষণ করতে হবে। কেননা এ অযাচিত হস্তক্ষেপগুলো অনেক সময় অর্থনীতিকে ভুল পথে পরিচালিত করে। 

এবার ডিজিটালাইজেশন নিয়ে কথা বলার আগে ভিন্ন একটা প্রসঙ্গ দিয়ে কথা শুরু করা যাক। আমরা যখন লেনদেন ভারসাম্যের (বিওপি) হিসাব দেখি, তখন এ হিসাবে অনেকগুলো চলক দেখতে পাই। যেমন আমদানি-রফতানি, প্রবাসী আয়, প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই), পোর্টফলিও ইনভেস্টমেন্ট ও ট্রেড ক্রেডিট। বিওপির অ্যাকাউন্টটা বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে তৈরি হয় বলে এর মধ্যে কোনো হেরফের দেখলে এমন একটা মনোভাব দেখা যায়, যেন প্রতিটি অসংগতির জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক দায়ী। অথচ প্রতিটি চলকের আলাদা আলাদা কর্তৃপক্ষ আছে। আমদানি, রফতানি, এফডিআই, ব্যবসা—সবকিছুরই আলাদা আলাদা কর্তৃপক্ষ আছে। প্রতিটি চলকের নিয়ন্ত্রক হিসেবেও কর্তৃপক্ষ আছে। এসব কর্তৃপক্ষ যদি সঠিক সমন্বয়ের মাধ্যমে যথাযথভাবে কাজ না করে এবং অর্থনীতিতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা না হয়, তাহলে বিওপি অ্যাকাউন্ট প্রস্তুতকারী হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংককেই সবকিছু মোকাবেলা করবে—এটা যৌক্তিক নয়। চলতি হিসাবে ঘাটতি হয়েছে কিংবা আর্থিক হিসাবে ঘাটতি—সেগুলো বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকেই মূলত মোকাবেলা করতে হচ্ছে। যেখানে প্রতিটি অর্থনৈতিক চলকের ভিন্ন ভিন্ন কর্তৃপক্ষ আছে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক মুদ্রানীতি প্রয়োগের মাধ্যমে চলকগুলোর আচরণে পরিবর্তন আনতে ভূমিকা রাখে। 

আমি সাংবাদিকদের অনুরোধ করছি, আপনারা প্রতিটি চলকের সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর সঙ্গেও যোগাযোগ করবেন। আপনারা কেবল কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে তথ্য নেবেন সেটা ঠিক হবে না। চলতি হিসাবে ঘাটতির বিষয়ে শুধু কেন্দ্রীয় ব্যাংককে প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে কেন? এটার প্রতিক্রিয়া জানানোর জন্য বিভিন্ন কর্তৃপক্ষ রয়েছে। আর অর্থনীতিসংশ্লিষ্ট সাংবাদিকতার সঙ্গে যারা জড়িত তারা প্রতিটি বিভাগকে চিহ্নিত করবেন এবং তাদের কাছেও যাবেন। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকে যাবেন না সেটা বলছি না, বাংলাদেশ ব্যাংকেও যেতে হবে।

আমার সবিনয় অনুরোধ, রাজস্ব আয়ের খাতকে সম্পূর্ণ ডিজিটালাইজেশন করুন। রাজস্ব আয়ের ব্যবস্থাপনা ও হিসাবাদিকে শিগগিরই সম্পূর্ণ ডিজিটালাইজেশনের আওতায় আনা দরকার। ব্যাংকিংয়ের সঙ্গে রাজস্ব খাতের যে সম্পর্কটা আছে সেখানে একটি বৈপ্লবিক উন্নয়ন হয়েছে। এখানে নাম উল্লেখ করে বলতে চাই, ড. মোহাম্মদ তারেকের (তৎকালীন অর্থ সচিব) নেতৃত্বে আব্দুর রউফ তালুকদার ও আমি মিলে বেশকিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলাম। ইন্টিগ্রেটেড বাজেট অ্যান্ড অ্যাকাউন্টিং সিস্টেম (আইবাস) এবং ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার (ইএফটি) চালু করা তার মধ্যে অন্যতম। ইএফটি চালুর বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সহযোগিতা ছিল। আমি, ড. তারেক ও আব্দুর রউফ তালুকদার—সবাই মিলে ট্রেজারি সিঙ্গেল অ্যাকাউন্টকে (টিএসএ) সম্প্রসারণ ও শক্তিশালী করেছি। এর মাধ্যমে দুটি সুবিধা হয়েছে। বর্তমানে সেভিং সার্টিফিকেট অটোমেটেড সিস্টেমের মাধ্যমে ক্রয়-বিক্রয় ও হিসাব হচ্ছে। আগে ট্রেজারি চালান একমাত্র সোনালী ব্যাংকে জমা দিতে হতো। এখন অটোমেটেড চালান সিস্টেম হয়েছে। দেশের যেকোনো ব্যাংকের মাধ্যমে গ্রাহকরা ঘরে বসে অথবা যেকোনো ব্যাংকের মাধ্যমে সরকারের অর্থ জমা দিতে পারেন। 

আমাদের এই অটোমেটেড চালানের সঙ্গে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সংযুক্ত হয়েছে। কিন্তু কর নির্ধারণ (অ্যাসেসমেন্ট) প্রক্রিয়াটা অটোমেশন অনলাইনে খুবই ধীরগতিতে চলছে। কাস্টমসের যে সফটওয়্যার চট্টগ্রাম ও খুলনায় চলছে তা আরো উন্নত ও বিশ্বস্ত করতে হবে। অনলাইনে আয়কর জমাদানের বিষয়ে আরেকটু বেশি গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন। 

বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন গভর্নর ড. আতিউর রহমানের সময়ে সরকারি চেকগুলোয় ট্র্যাডিশনাল চেক থেকে ম্যাগনেটিক ইংক ক্যারেক্টার রিডার (এমআইসিআর) চেক চালু করেছি। এই এমআইসিআর চেক বেসরকারি ব্যাংকের জন্য চালু হয়েছিল। সরকারি চেক কীভাবে এমআইসিআর চেক করা হবে—এটা নিয়ে তৎকালীন গভর্নর খুব উদ্বিগ্ন ছিলেন। তবে খুব স্বল্পতম সময়ে সরকারি চেকগুলোকে এমআইসিআর চেকে কনভার্ট করে চালু করা হয়। 

চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের যুগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) অনেক দূর এগিয়েছে। এআইয়ের যুগে আমাদের ডাটাকে সমৃদ্ধ করতে হবে। ডাটার মান ঠিক না করলে আমাদের অনেক রকমের সমস্যার মুখোমুখি হতে হবে এবং অনেক ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিব্রতকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হওয়াসহ সুনামহানির আশঙ্কা আছে। তাই আমাদের অর্থনীতি ও রাজস্ব প্রতিবেদনগুলোয় তথ্যের মান উন্নয়নে এআইয়ের সহায়তা নিতে হবে। ডিজিটালাইজেশনের ক্ষেত্রে সিস্টেমের প্রয়োজনে যতটুকু দরকার ততটুকুই হিউম্যান ইন্টারফেস থাকবে; এর চেয়ে বেশি নয়। সেটিই আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত। কারণ সংবিধানের ৭ নং অনুচ্ছেদ বলছে, রাষ্ট্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ। রাষ্ট্রের কাজ হচ্ছে জনগণের সেবা দেয়া। রাষ্ট্র ও জনগণের মাঝখানে বাংলাদেশ ব্যাংক বলেন, অন্যান্য মন্ত্রণালয় বলেন, সংস্থা বলেন—সবাই কিন্তু মধ্যবর্তী। এখন সময় এসেছে চতুর্থ বিপ্লবের সাহায্য নিয়ে এ মধ্যবর্তীদের প্রভাব কমানোর, যাতে রাষ্ট্র ও জনগণ সরাসরি সরলরেখায় আসে। 

কাজেই রাজস্ব, ব্যয় ও বরাদ্দ—সব জায়গায়ই রাষ্ট্র ও জনগণের মাঝখানে মধ্যবর্তীদের দাপট কমিয়ে আনতে হবে। এ কাজে প্রযুক্তির ব্যবহার করতে হবে। বিভিন্ন খাতে এ প্রযুক্তির বাস্তবায়নের জন্য তা সমন্বিত পলিসির আওতায় আনা প্রয়োজন। মুদ্রানীতি, রাজস্বনীতি, ম্যাক্রো পলিসি ও খাতভিত্তিক বিভিন্ন পলিসিতে এআইয়ের পরিকল্পিত ব্যবহার বাড়াতে হবে যাতে মানবীয় হস্তক্ষেপ কমে। মানবীয় হস্তক্ষেপ একমাত্র কৌশলগত পর্যায়ে থাকবে। পরিচালন (অপারেশনাল) পর্যায়ের কোনো কিছুতেই মানুষের অংশগ্রহণ থাকবে না। এটাই আমাদের স্লোগান হওয়া উচিত। এর মাধ্যমেই এ সময়ে আমাদের সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে।

মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী: সাবেক অর্থ সচিব ও সাবেক কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল (সিএজি)

[দৈনিক বণিক বার্তা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের যৌথ আয়োজনে দুই দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক সম্মেলনের প্রথম দিনে (৫ মে, ২০২৪) রাখা আলোচনায়। ভাষান্তর: সাবরিনা স্বর্ণা ও দিদারুল হক]