রাষ্ট্র চালানোর জন্য অর্থের প্রয়োজন। সেই অর্থ রাষ্ট্রের সম্পদ থেকে আসবে। কিছু আসবে জনগনের আয়থেকে। অর্থনৈতিক পলিসিতে এই বিষয়টি স্বাভাবিক। প্রতিবছরের যখন বাজেট হয়, কিছু বিষয় নিয়ে তখন আলাপ হয়। এইবার বিশেষ করে শিক্ষাক্ষেত্র নিয়ে আলোচনায় সরব হয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এই করোনার মধ্যে যেসব সেক্টর বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তার মধ্যে শিক্ষাক্ষেত্র একটি। শিক্ষার্থীদের বড় একটি লার্নিং গ্যাপও হয়েছে।
অস্থায়ী বা স্থায়ী সম্পদ ছাড়া যে মানবসম্পদ রয়েছে, সেই মানবসম্পদ লার্নিং গ্যাপে পড়লো। ভবিষ্যতে সেখানে একটি বড় ঝাঁকুনি অপেক্ষা করছে। আমরা সকলেই জানি, সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আসন স্বল্পতার কারণে বা অন্য যে কোনো কারণে হোক বাংলাদেশের একটি বড় সংখ্যক শিক্ষার্থী বেসরকারি শিক্ষাপ্র্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করে। এই বিরাট সংখ্যক শিক্ষার্থীকে নিজেদের শিক্ষার জন্য মূল্য পরিশোধ করতে হয়। রাষ্ট্র নাগরিকের শিক্ষাসহ সকল মৌলিক চাহিদা মেটানোর কথা থাকলেও উল্টো আমরা দেখছি, করোনা ক্রান্তিকালে, ২০২১-২০২২ অর্থবছরে বেসরকারি শিক্ষাক্ষেত্রে ১৫ শতাংশ কর আরোপ করা হয়েছে। অথচ টাকার অঙ্কে এবারের বাজেটে শিক্ষার জন্যও বরাদ্দ বেড়েছে। ২০২১-২০২২ অর্থবছরে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জন্য ৭১ হাজার ৯৫১ কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব করা হয়েছে বলে সংবাদপত্রের খবর। টাকার হিসাবে বিদায়ী অর্থবছরের চেয়ে এবার ৫ হাজার ৫৫১ কোটি টাকা বেশি বরাদ্দ হলেও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য এই করের বোঝার পেছনে যুক্তি টিকছে না।
শিক্ষা নিয়ে আমরা অনেক কথা শুনি। অনেক সময় প্রশ্ন আসেÑ শিক্ষা কি ব্যবসা? ব্যবসায় হিসেবে শিক্ষাকে গালাগাল করার অধিকার অচিরেরাষ্ট্র হারাবে, জাতিও হারাবে। কর দিয়ে যেহেতু ব্যবসায় করতে হবে এখন থেকে, তাহলে কেন তারা খিস্তি-খেওর সইতে চাইবেÑসেটিও প্রশ্নের বিষয়।
সরকারি-বেসরকারি নির্বিশেষে সকল প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব সরকার নিতে চাইছে না।এখানে একটি দ্বৈত নীতি দৃশ্যমান হচ্ছে। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে থেকে করের প্রশ্ন তো দূরে থাক সেখানে সরকার বিশেষ প্রণোদনা দিয়ে জাগিয়ে তুলতে তৎপর। অন্যদিকে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোÑযারা এতদিন মহামারীর প্রকোপে ধুকে ধুকে টিকে আছে তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে বিশাল অঙ্কের কর। দিন শেষে এইসব করের বোঝা কিন্তু শিক্ষার্থীদের কাঁধে গিয়ে পড়বে। ছোটবেলা আমার দাদা একটি কথা বলতেন আমাকে, যা বলতেন তার অর্থ এমন যেÑযে জিনিসের বিজ্ঞাপন বেশি তা ক্রয় করো না। এর অর্থ এখন আমরা বুঝতে পারি। বিজ্ঞাপনের ব্যয় চাপানো হয় ভোক্তার ওপর অথবা পন্যের মান কমিয়ে বিজ্ঞাপনের ব্যয় অ্যাডজাস্ট করা হয়।
ঠিক তেমনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মালিক নিশ্চয়ই নিজের সম্পত্তি বিক্রি করে এই বিশাল অঙ্কের কর পরিশোধ করবেন না, শিক্ষার্থীদের কাছ থেকেই তা আদায় করা হবে। অথচ সরকার যদি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়াতে পারতো এই দুঃসময়ে, তবে কত সুন্দর হত সে দৃশ্য! দেশের নাগরিক সমাজ, অর্থনীতিবিদ ও বুদ্ধিজীবীকূল বিষয়টিকে কীভাবে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করেন সেটি দেখবার অপেক্ষায় রয়েছি আমরা।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসছে। আমরা কি এক ধরনের নিরীক্ষাধর্মীভবিষ্যত তৈরি করছি আমাদের শিক্ষার জন্য, শিক্ষার্থীদের জন্য। বিষয়টি নিয়ে আরো বেশি আলোচনার প্রয়োজন।যার সূত্রপাত আলোচনা আজকের এই লেখা থেকে করতে চাই।
বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে টিউশন ফি নিচ্ছে বা অনেকাংশে ছাড় দিচ্ছে, সেই সময় তাদের ওপরে ১৫ শতাংশ কর আরোপ শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার মত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। একথা অনুমান করা কঠিন নয় যে, এই কর আদায় শুরু হলে অনেক বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধও হয়ে যাবে। দেশের সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো দেশের সমস্ত দায়িত্ব নেবে ভেবে যারা বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে নিরুৎসাহিত করতে চাইছেন তারা হয়তো সঠিক চিন্তা থেকে দূরে অবস্থান করছেন। বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয় বা উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের ওপর এই নতুন করের বোঝা না চাপিয়ে বরং যদি প্রণোদনাসহ নানা প্যাকেজ সুবিধা দেওয়া যায় তবে এই বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী একদিন বড় সম্পদে পরিণত হবে। অন্যদিকে বৈষম্যমূলক আচরণের ফলে তারা হয়ে উঠতে পারে দেশের বোঝা। আমরা যদি আমাদের সন্তান-শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বৈষম্যমূলক আচরণ করি তবেশিক্ষা-গবেষণায় কীভাবে এগিয়ে যাবে দেশ?
অর্থ যোগানের সবচেয়ে উৎস মানবসম্পদ।সেই মানবসম্পদ গড়ার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যখন হুমকির মুখে, তখন সেসব প্রতিষ্ঠানে ভর্তুকির বদলে কর আরোপ কাম্য হতে পারে না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষার্থীদের প্রতি সরকারি সুদৃষ্টি শিক্ষাক্ষেত্রের এই ক্রান্তিলগ্নে দেশের নাগরিক হিসেবে আমাদের চাওয়া।
লেখক: ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টুডেন্ট অ্যাফেয়ার্সের পরিচালক।










