সম্প্রতি করোনা সংকট মোকাবেলায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘ফেডারেল রিজার্ভ’ প্রচুর পরিমাণ ডলার বাজারে ছেড়েছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে গত ত্রৈমাসিকে আমেরিকার মূল্যস্ফীতি ৫ দশমিক ৪ শতাংশে এসে ঠেকেছে, যা এক যুগের সর্বোচ্চ। এমনকি বিশ্বের অন্যান্য উন্নত দেশের তুলনায় আন্তর্জাতিক বাজারেও ডলারের দর নিম্নমুখী। কিন্তু বাংলাদেশে এর সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে। সম্প্রতি ডলারের বিপরীতে টাকার দর ক্রমে নিচের দিকে যাচ্ছে। কেন, কারণ কী, তা ব্যাখা করতে প্রথমে আমার ছেলেবেলা থেকে একটি উদাহরণ টানছি।

ছোট থাকতে আমাদের বাড়ি ছিল সাগরের পাড়েই। সে সময় আমরা ছোটরা শামুক-ঝিনুক ইত্যাদি দিয়ে নিজেদের মধ্যে খেলনা, বাটি কেনাবেচা করতাম। অর্থাৎ শামুক-ঝিনুকই ছিল আমাদের মুদ্রা। যে প্রজাতির ঝিনুক সবচেয়ে দুর্লভ ছিল, তার মূল্য ছিল আমাদের কাছে তত বেশি এবং যে প্রজাতির ঝিনুক সবচেয়ে সহজলভ্য ছিল, তার মূল্য ছিল তত কম। তখন আমাদের মাঝে এক্সচেঞ্জ রেটও চালু ছিল। যেমন তিনটি মাঝারি সাইজের ঝিনুকের বিপরীতে একটি ছোট সাইজের শঙ্খ।

আমাদের ছোটবেলার শামুক-ঝিনুকের মতোই বর্তমান বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ভিন্ন মুদ্রা ব্যবস্থা চালু আছে, যেমন নরওয়েতে ক্রোনা (মুকুট), রাশিয়ায় রুবল এবং ভারতে রুপি। কোনো কারণে একটি দেশের মুদ্রা সহজলভ্য হয়ে গেলে তার দাম পড়ে যায়। আবার কোনো মুদ্রা দুর্লভ হয়ে গেলে তার দাম বেড়ে যায়। সে হিসেবে বাংলাদেশে ডলারের দাম কমে যাওয়ার কথা থাকলেও বিশেষ কিছু কারণে এর দাম ঊর্ধ্বমুখী।

লক্ষ করুন, বাংলাদেশের নাগরিকরা যখন একই দেশের ভেতরে এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে বাণিজ্য করে তখন তারা টাকায় লেনদেন করে। কারণ টাকা হচ্ছে বাংলাদেশে লেনদেনের সাধারণ মাধ্যম। কিন্তু বাংলাদেশের নাগরিকরা যখন বহির্বিশ্বের সঙ্গে লেনদেন করে তখন তা কোন মুদ্রায় করবে? উত্তর হচ্ছে ডলারে। অভ্যন্তরীণ সাধারণ মুদ্রার মতোই আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও লেনদেনের সাধারণ মুদ্রা হচ্ছে ডলার (অতীতে ছিল স্বর্ণ)। তাই বাংলাদেশ যখন বিদেশ থেকে পণ্য বা সেবা আমদানি করে কিংবা বাংলাদেশের কোনো কোম্পানি বিদেশে বিনিয়োগ করে তখন তাদের ডলার কিনতে হয়। এভাবে বাংলাদেশে ডলারের চাহিদা সৃষ্টি হয়। কিন্তু এ চাহিদা পূরণ করতে ডলারের সরবরাহ লাগবে। ডলারের সরবরাহ করতে ডলার আয় করতে হয় এবং এ আয়ের খাত হচ্ছে বাংলাদেশ থেকে পণ্য বা সেবা রফতানি করা অথবা বিদেশে কর্মরত শ্রমিকদের পাঠানো রেমিট্যান্স এবং বিদেশ থেকে বাংলাদেশে বিনিয়োগ করা।

পরিসংখ্যানের দিকে লক্ষ করলে আমরা দেখতে পাই, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে আগস্টে আমদানি বেড়েছে দেড় গুণ, অথচ একই সময়ে রফতানি বৃদ্ধি আশানুরূপ ছিল না। সব মিলিয়ে অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৪১২ কোটি ডলার। অক্টোবরে বাংলাদেশ ভালো করেছে। তবে মুদ্রার বাজারে তার প্রভাব পড়েনি। কারণ বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সর্বপ্রধান খাত রেমিট্যান্সের চিত্র অত্যন্ত ধূসর। চলতি অর্থবছরের প্রথম ত্রৈমাসিকে রেমিট্যান্সপ্রবাহ কমেছে ২০ শতাংশ এবং বাংলাদেশে ব্যাংকের পাওয়া সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে রেমিট্যান্সপ্রবাহ আরো কমে গেছে। চলতি বছরের অক্টোবরে দেড় বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন রেমিট্যান্স অর্জন করেছে বাংলাদেশ (সূত্র: বাংলাদেশ ব্যাংক)।

সম্প্রতি বিদেশী বিনিয়োগও ছিল নিম্নমুখী। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, চলতি বছরের জানুয়ারি-জুন মেয়াদে নিট বৈদেশিক বিনিয়োগ ছিল ১ দশমিক ১৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা গত বছরের তুলনায় ৫০ মিলিয়ন ডলার কম।

সব মিলিয়ে আমরা ডলার সংকটে আছি। এ কারণে টাকার বিপরীতে ডলারের দাম বেড়ে যাচ্ছে। সব শিল্পের কাঁচামাল, জ্বালানি তেল, ভোজ্যতেল থেকে শুরু করে প্রায় সব আমদানি পণ্য ডলারে কেনা হয়। ডলারের দাম বেড়ে যাওয়া মানে মূল্যস্ফীতি সৃষ্টি হওয়া। 

এ পরিস্থিতি থেকে মুক্তির উপায় কী তা এ মুহূর্তের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। ডলার সংকট সমাধানের স্বল্পমেয়াদি কৌশল হচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ ভাঙিয়ে ডলার খরচ করা, যা এরই মধ্যে চালু হয়েছে অথবা বিদেশ থেকে ডলার ঋণ নেয়া। তবে ঋণ নিয়ে বা সঞ্চয় ভেঙে আমরা কখনো বেশিদিন চলতে পারব না। তাই ডলার সংকট নিরসনে দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ গ্রহণ করাটা জরুরি এবং এ দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপগুলো হচ্ছে রফতানি খাতের উন্নয়ন, বিদেশে শ্রমিক প্রেরণ এবং বিনিয়োগ আকৃষ্টকরণ। 

 

মোহাইমিন পাটোয়ারী: অর্থনীতিতে ডাবল মাস্টার্স, নরওয়ে স্কুল অব ইকোনমিক্স ও মানহাইম ইউনিভার্সিটি, জার্মানি