মিয়ানমারের আরাকান অঞ্চলের মুসলিম নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর বাংলাদেশের শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় গ্রহণের ইতিহাস নতুন নয়। ১৯৭৮ সালের দিকে প্রথম দলগতভাবে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী নিজেদের জীবন বাঁচানোর তাগিদে মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে এসেছিল। ১৯৮২ সালের মিয়ানমারের নাগরিকত্ব আইনের মাধ্যমে রোহিঙ্গা নৃতাত্ত্বিক মুসলিম জনগোষ্ঠীকে নাগরিক হওয়া থেকে বঞ্চিত করেছিল জান্তা সরকার। সেখানকার জান্তা সরকারের অত্যাচার-নিপীড়নমূলক নীতি রোহিঙ্গাদের সংকট তৈরি করেছিল, যা আজকে গোটা অঞ্চলের জন্য সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরবর্তী সময়ে ১৯৯০ সালের দিকে আবারো রোহিঙ্গাদের একটা বড় অংশ বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করে।
২০১৭ সালে আরাকানে নতুন করে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি হলে প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নেয়। এত বিশালসংখ্যক শরণার্থীদের আশ্রয় দেয়ার ইতিহাস বাংলাদেশের মতো অধিক জনবহুল দেশের জন্য বিশ্বদরবারে নজির সৃষ্টি হয়েছে। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের সীমান্ত এলাকায় বিভিন্ন সময়ে রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশ নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার ছিল, যা স্থানীয়দের সঙ্গে আলাপকালে জানা যায়। তবে গুরুত্বপূর্ণ এই যে রোহিঙ্গাদের একটা বড় অংশই আবার বিভিন্ন সময়ে মিয়ানমার সরকারের সহায়তায় বাংলাদেশ থেকে সেখানে প্রত্যাবাসন করেছে।
আন্তর্জাতিক শরণার্থী আইনের ক্ষেত্রে যখন কোনো দেশে একটা নির্দিষ্ট সংখ্যক শরণার্থী অবস্থান করে তখন তাদের সমাধানের ক্ষেত্রে নিজ দেশে প্রত্যাবাসন করাকে সর্বোচ্চ টেকসই সমাধান হিসেবে বিবেচনা করা হয়। প্রত্যাবাসন ছাড়াও আন্তর্জাতিক আইনে শরণার্থীরা বর্তমানে অবস্থানকালীন দেশে নাগরিক হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে অথবা তৃতীয় অন্য কোনো দেশে গিয়ে নাগরিকত্ব গ্রহণ করতে পারে। রোহিঙ্গাদের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশে দীর্ঘ সময় থাকার সম্ভাবনা বা অন্তর্ভুক্ত হওয়ার বিষয়টি জটিল। যেহেতু এক মিলিয়নের অধিক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অবস্থান করছে, এ বিশালসংখ্যক জনগোষ্ঠীকে তৃতীয় কোনো দেশে পাঠানোর প্রক্রিয়া সম্ভব নয়, কেননা এত সংখ্যক জনগোষ্ঠীকে স্বাভাবিকভাবে আশ্রয় দিতে কোনো রাষ্ট্র রাজি হবে না। উপরন্তু রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে ইউরোপে যে সংকট তৈরি হয়েছে সেটি পুরো পশ্চিমা বিশ্বের মনোযোগ ওইদিকে ধাবিত করেছে এবং রোহিঙ্গাদের বিষয়ে তারা অতীতে যে গুরুত্ব দিত তা অনেকাংশে কমেছে। কাজেই প্রত্যাবাসনই একমাত্র কার্যকর সমাধান, যেহেতু অতীতে বিভিন্ন সময় রোহিঙ্গাদের মিয়ানমার সরকার বাংলাদেশ থেকে প্রত্যাবাসন করে নিয়েছে।
রাষ্ট্রীয়ভাবে বাংলাদেশ এখন জাতীয় নির্বাচনসহ বিভিন্ন ধরনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ব্যস্ত। তবে বাংলাদেশের কোনো অবস্থাতেই রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের আলোচনার জায়গা থেকে সরে আসা উচিত হবে না। বিভিন্ন প্রতিবেদনের আলোকে জানা যাচ্ছে যে বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে, যা এখন প্রায় ১২ লাখের কাছাকাছি হবে। প্রতিনিয়ত জন্ম নিচ্ছে অগণিত শিশু। এদের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎকে মোটামুটি নিশ্চয়তার দিকে নিয়ে যেতে প্রত্যাবাসনই হতে পারে সমাধানের অন্যতম উপায়। উপরন্তু বাংলাদেশের অর্থনৈতিক, নিরাপত্তা ও পরিবেশগত যে প্রভাব শরণার্থীদের আশ্রয় দেয়ার ফলে হচ্ছে তাতে ভবিষ্যতে বাংলাদেশ বিভিন্ন ধরনের সংকট ও দুর্ভোগের সম্মুখীন হতে পারে। এখানে বলা প্রয়োজন যে রোহিঙ্গারা শুধু বাংলাদেশেই নয়, বরং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে বৈধ বা অবৈধভাবে আশ্রয় নিয়ে আছে। কাজেই রোহিঙ্গাকেন্দ্রিক সংকট আদতে প্রতিটি দেশের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সংশ্লিষ্টতার প্রশ্ন জড়িত। জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনের তথ্যমতে, থাইল্যান্ডে ৯২ হাজার এবং ভারতে ২১ হাজার রোহিঙ্গা রয়েছে। এছাড়া মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় বিশালসংখ্যক রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বসবাস। মূলত তারা নৌকা বা জাহাজে ইন্দোনেশিয়ায় পৌঁছে এবং সেখান থেকে মালয়েশিয়ায় প্রবেশ করেছে। চীনেও কিছু সংখ্যক রোহিঙ্গা রয়েছে। এখানে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে যে অত্র অঞ্চলের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার জন্য প্রতিটি ভুক্তভোগী রাষ্ট্রকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক স্বার্থেই রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে সমন্বিত উদ্যোগ দরকার। তা না হলে ভবিষ্যতে পুরো অঞ্চলের অস্থিতিশীলতার জন্য হয়তো রাষ্ট্রগুলোকে চরম খেসারত দেয়া লাগবে।
বাংলাদেশের ২০১৭ সালে আগত প্রায় এক মিলিয়ন শরণার্থী রোহিঙ্গার ক্যাম্পগুলোতে নিরাপত্তাসংক্রান্ত যে ধরনের উদ্বেগ দেখা দিচ্ছে তাতে মনে হচ্ছে অদূরভবিষ্যতে সমস্যা আরো বাড়তে পারে। বিভিন্ন ধরনের অপরাধের ঘটনাবলি স্থানীয়দের আতঙ্কিত করছে। যদিও ২০১৭ সালের নভেম্বরের দিকে মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের জন্য বাংলাদেশের সঙ্গে চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছিল এবং পরবর্তীকালে মিয়ানমার, জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক অফিস ও ইউএনডিপি ত্রিপক্ষীয় চুক্তি করেছিল। দুঃখজনক হলেও সত্যি যে এ ধরনের বিভিন্ন উদ্যোগ গত ছয় বছরে কখনই সুফল বয়ে আনেনি। এ বছরের শুরুর দিকে চীনের উদ্যোগে রোহিঙ্গাদের একটি নির্দিষ্টসংখ্যক জনগোষ্ঠীর প্রত্যাবাসনের বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা এবং মিয়ানমার সরকারকে অন্তর্ভুক্ত করার প্রয়াস দেখেছিলাম। ওই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বাংলাদেশ থেকে প্রতিনিধি দল মিয়ানমার পরিদর্শন করে আসছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশে অবস্থানরত পশ্চিমা বিশ্বের এনজিওগুলো এ প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার গুরুতর বিরোধিতা করে আসছে। বাংলাদেশকে অবশ্যই ভাবতে হবে যেন কোনো অবস্থাতেই রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের সুযোগ এলে সেটি ব্যর্থ না হয়। রোহিঙ্গা প্রত্যাবসনের যথাযথ পরিবেশ সৃষ্টিতে মিয়ানমারের ওপর সব মহল থেকে চাপ সৃষ্টিও করতে হবে।
আমি মনে করি, বাংলাদেশ গুরুত্ব সহকারে চীন ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোকে সঙ্গে নিয়ে মিয়ানমারকে আলোচনার টেবিলে নিয়ে আসুক। যদিও চীন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর উপস্থিতি কতটুকু বিবেচনায় নেয় সেটি ভাবনার বিষয়। তবে তাদের উপস্থিতি পুরো রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে কার্যকর ভূমিকা রাখত, বিশেষ করে মিয়ানমারকে বিভিন্ন শর্তে রাজি করানোর ক্ষেত্রে। মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে কিছুদিন আগে একটি আন্তর্জাতিক সেমিনারে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নীতিনির্ধারক এবং বিশেষজ্ঞ বক্তারা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সহযোগিতার বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে উপস্থাপন করেছিলেন। সেখানে বাংলাদেশের নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরাও প্রত্যাবাসনের বিষয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর অংশগ্রহণের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন। বক্তারা উল্লেখ করেছিলেন যে বিশেষত যেসব দেশে রোহিঙ্গাদের দলবদ্ধভাবে বেআইনি অনুপ্রবেশ ওই দেশের আইন-শৃঙ্খলার পরিস্থিতিতে সমস্যা দেখা দিচ্ছে। তাদের উচিত বাংলাদেশের প্রত্যাবাসনের প্রক্রিয়াকে সমর্থন দিয়ে অত্র সমস্যার সমাধানের প্রচেষ্টায় অংশগ্রহণ করা। এখানে অবশ্যই বলা প্রয়োজন যে অনেক ক্ষেত্রেই মিয়ানমারের সামরিক সরকার বহির্বিশ্বের প্রস্তাবকে যথাযথভাবে গুরুত্ব দেয়ার প্রয়োজন মনে করে না। তবে চীনের পাশাপাশি আসিয়ানের সদস্যরা প্রত্যাবাসনের বিষয়ে বাংলাদেশকে সমর্থন করলে অত্র সমস্যার সমাধানের সবচেয়ে কার্যকর সমাধান হতে পারে বলে মনে করি। ভারতকেও প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় সমর্থন দেয়া উচিত, কেননা ভারতে এ নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর ২০ হাজারের অধিক সদস্য অবস্থান করছে। তবে বাংলাদেশ যদি ওই প্রচেষ্টাগুলোকে সামনে এগিয়ে না নিয়ে অপেক্ষা করতে থাকে, অদূরভবিষ্যতে নিরাপত্তা, অর্থনীতি এবং আরো বিভিন্ন ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হলে সেটি মোটেও কোনো আকস্মিক ঘটনা হবে না। কাজেই দেশের এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার স্বার্থে বিশেষ করে রোহিঙ্গাদের অনিশ্চিত ভবিষ্যতের ভয়াবহতা থেকে মুক্তি দিতে সামগ্রিকভাবেই প্রত্যাবাসনের বিষয়টির ওপর যথাযথ গুরুত্ব আরোপ করে অনতিবিলম্বে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া এগিয়ে নেয়া প্রয়োজন।
মোস্তফা হোছাইন: পিএইচডি গবেষক, ইউনিভার্সিটি মালায়া
এবং সহকারী অধ্যাপক, স্কুল অব ল, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়










