বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবায় বেসরকারি খাত ক্রমেই শক্তিশালী হচ্ছে। ২৭ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে এর আকার। সাড়ে চার হাজার বেসরকারি হাসপাতাল এ সেবার সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এ প্রবণতা আমরা সম্ভাবনা হিসেবে দেখব নাকি সমস্যা? এর কোনো সহজ উত্তর নেই। প্রথমত, এটা নির্ভর করছে দৃষ্টিকোণের ওপর। লাভজনক ও বাণিজ্যিক চিকিৎসা ব্যবসায়ীদের দৃষ্টিকোণ থেকে এটা অবশ্যই একটা সম্ভাবনাময় দিক। এমনকি ভারত, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, তুরস্কের মতো অনেক দেশ মেডিকেল ট্যুরিজমকে বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনের একটা উৎস হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত করেছে। কিন্তু বাংলাদেশের নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্তসহ সীমিত আয়ের স্বাস্থ্যসেবাপ্রত্যাশীদের দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টিকে মনে হতে পারে সম্পূর্ণ বিপরীত। এ বিচার আরো নির্ভর করে বেসরকারি খাত কী ধরনের স্বাস্থ্যসেবা দিচ্ছে, তার মান কেমন, সাশ্রয়ী কিনা, ইকুইটি বা স্বাস্থ্য সমতা বিধানে সহায়ক কিনা, তারা মানুষের সরলতার সুযোগ গ্রহণ করছে কিনা, এমন বেশকিছু চলকের ওপর। গতকাল বণিক বার্তায় প্রকাশিত সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অবকাঠামো, জনবল ও যন্ত্রপাতির ঘাটতিসহ সার্বিক সক্ষমতায় দুর্বলতা থাকায় সেবাগ্রহীতারা সঠিক ও মানসম্পন্ন চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হওয়ার পাশাপাশি আর্থিক ও স্বাস্থ্যগতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। দেশের চিকিৎসাসেবার প্রতি আস্থা হারিয়ে সেবাগ্রহীতাদের বিদেশে চিকিৎসা গ্রহণের প্রবণতা বাড়ছে। এটি উন্নয়নশীল দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। 

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় বেসরকারি খাত শক্ত অবস্থান তৈরি করে নিলেও জনগণের স্বাস্থ্য অধিকারের দৃষ্টিকোণ থেকে এর ভূমিকা এখনো আশানুরূপ নয়। সারা বিশ্বে কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল, ইনসেনটিভ বা প্রণোদনা এবং সেলফ রেগুলেশন বা স্বনিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা নিয়ন্ত্রণ করা হয়। বাংলাদেশের লাইসেন্স পদ্ধতি কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোলের একটা উদাহরণ, যা অনেক দেশের মতো বাংলাদেশেও খুব একটা কার্যকর পদ্ধতি হিসেবে প্রমাণিত হয়নি। কেবল প্রয়োগের দুর্বলতাই নয়, খোদ লাইসেন্সের আওতাভুক্ত আবশ্যিক শর্তগুলোও ত্রুটিপূর্ণ। লাইসেন্সের জন্য আবেদনকারী প্রতিষ্ঠান যে নথিপত্র দাখিল করে, তার ভিত্তিতেই লাইসেন্স দেয়া ও নবায়ন করা হয়; ইনপুট, প্রসেস, আউটপুট নিরীক্ষা করার কোনো বিধান বা পদ্ধতি এখানে নেই। ফলে সেবার মান আশানুরূপ না হলে নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানের তেমন কিছুই করার থাকে না। দেশে কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল পদ্ধতির ব্যর্থতার প্রধান কারণগুলো হলো সরকারি নিয়ন্ত্রক সংস্থার সক্ষমতার অভাব, বেসরকারি খাতের বিশাল কলেবর, অর্থনৈতিক সংগতিহীনতা এবং বেসরকারি খাতের সঙ্গে নিয়ন্ত্রক সংস্থার সমন্বয়হীনতা। পাশাপাশি প্রণোদনা এবং স্বনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি প্রয়োগ করে দেখা যেতে পারে তা কাজ করে কিনা। প্রণোদনা হতে পারে অর্থনৈতিক অথবা অন্য কিছু, যা সাধারণত প্রত্যন্ত অঞ্চলে বেসরকারি সেবার প্রসার ঘটানো, বিশেষ কোনো সেবা প্রদানে উৎসাহিত করা ইত্যাদি উদ্দেশ্যে প্রযুক্ত হতে পারে। স্বনিয়ন্ত্রণের জন্য পেশাজীবী সংগঠনগুলো বিভিন্ন দেশে ভূমিকা রাখে, কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে পেশাজীবী সংগঠনগুলোর ভূমিকা নিয়ন্ত্রকের মতো না হয়ে বরং ট্রেড ইউনিয়নের মতো। তারা নিজ পেশার মানুষদের সুবিধা ও দাবিদাওয়া আদায়ে যতটা নিয়োজিত, সেবার মানোন্নয়ন ও ন্যায্যতা নিশ্চিতকরণে ঠিক ততটাই নিশ্চুপ। এজন্য বিশেষ অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিলও গঠন করা যেতে পারে, যারা বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর সেবার মান যাচাই করে তাদের মানের ভিত্তিতে বিন্যস্ত করবে এবং ভোক্তাকে এর বিভিন্ন সেবার মান সম্পর্কে ধারণা দেবে।

মান উন্নয়ন এবং এর ধারাবাহিকতা রক্ষা করা না গেলে সাধারণ মানুষ স্বাস্থ্যসেবা দানকারী প্রতিষ্ঠানবিমুখ হয়ে পড়বে। উন্নত বিশ্ব, এমনকি ভারতেও এখন সব হাসপাতাল ও ল্যাবের জন্য ন্যাশনাল অ্যাক্রেডিটেশন বডি ফর হসপিটাল (এনএবিএইচ) ও ন্যাশনাল অ্যাক্রেডিটেশন বডি ফর ল্যাবরেটরির (এনএবিএল) সার্টিফিকেট গ্রহণ বাধ্যতামূলক করে দেয়া হয়েছে। এ সার্টিফিকেট আবার প্রতি দুই বছর পর অডিটের মাধ্যমে নবায়ন করা হয়। এতে প্রতিষ্ঠানগুলোয় প্রতিনিয়ত উন্নতি সাধন এবং মান নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা থাকে। এভাবে ধারাবাহিক তদারকির মাধ্যমে ভুল চিকিৎসা, অতিচিকিৎসা, বিনা চিকিৎসা, অনিয়ম-অপকর্ম ইত্যাদি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। এতে সাধারণ জনগণও বিড়ম্বনাহীন স্বাস্থ্যসেবা পেয়ে থাকে। পাশাপাশি ডাক্তার বা স্বাস্থ্যকর্মীরাও তাদের মর্যাদা নিয়ে স্বাস্থ্যসেবা দিতে পারেন। দেশে মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমডিসি) বলে একটা সরকারি প্রতিষ্ঠান আছে। ভুল চিকিৎসা বা অপচিকিৎসা, ডাক্তার বা স্বাস্থ্যকর্মীদের অনিয়ম প্রভৃতি দেখার দায়িত্ব আসলে বিএমডিসির। কেউ অন্যায় করলে এমনকি তার রেজিস্ট্রেশন পর্যন্ত বাতিলের ক্ষমতা বিএমডিসিকে দেয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, বিএমডিসি কখনই তার ওপর অর্পিত সেই দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে পারেনি। চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী ও হাসপাতালের কর্মকাণ্ডকে ঠিকভাবে মনিটর করা গেলে বেসরকারি স্বাস্থ্য খাতে জবাবদিহিতা অনেকটাই বাড়ানো সম্ভব।

ক্রমবর্ধমান বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবার বিকাশ, নিয়ন্ত্রণ এবং নজরদারির বিষয়টিকে রাষ্ট্রীয়ভাবে গুরুত্বের সঙ্গে ভাবা হয়নি। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এটিকে দশকের পর দশক উপেক্ষা করে এসেছে। ফলে দিনে দিনে অভিযোগের পরিমাণ বাড়ছে। যেহেতু নজরদারি অনুপস্থিত, তাই মান নিয়ন্ত্রণের কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। প্রতিটি প্রতিষ্ঠান নিজের মতো করে পরিচালিত হয়। এক ধরনের বিশৃঙ্খল অবস্থার ভেতর দিয়ে বেসরকারি স্বাস্থ্য খাতের বিকাশ ঘটছে। তাই এখানে কোনো ধরনের পেশাদারিত্ব গড়ে ওঠেনি। স্বাস্থ্যসেবায় স্বাধীন ও স্বতন্ত্র কোনো মান নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা হয়নি। তাই সরকারি ও বেসরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানেই সেবা মানের নিয়ন্ত্রণ নেই। ব্যবস্থাপনা বলে যে একটা বিষয় আছে, সেটা দেশের স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের কেউ বিবেচনায়ই রাখে না। এক্ষেত্রেও কার্যকর পেশাদারিত্বের বিকাশ ঘটেনি। তাই বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক বা ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সেবা নিয়ে অধিকাংশ সেবাগ্রহীতার ব্যাপক অভিযোগ রয়েছে।

বেসরকারি খাতের সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর অনুমোদন, সেবা ও ব্যবস্থাপনার মান উন্নয়ন এবং সেবামূল্য নিয়ন্ত্রণ এখন সময়ের দাবি। কিন্তু এক্ষেত্রে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জনবল অত্যন্ত কম। হাতেগোনা কয়েকজন মাত্র। বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা খাতের ব্যাপক বিস্তৃতি ঘটেছে। এর শাখা-প্রশাখা আগের চেয়ে অনেক গুণ বেড়েছে। ফলে খাতটির বিকাশ ও নিয়ন্ত্রণের জন্য বিপুল জনবলের প্রয়োজন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল সরকারিভাবে স্বাস্থ্যসেবা প্রদান ও সরকারি সেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার জন্য। বর্তমান বাস্তবতায় বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবার কলেবর সরকারি সেবার প্রায় দ্বিগুণ। তাই নির্দ্বিধায় বলা যায় বিদ্যমান স্বাস্থ্য অধিদপ্তর দ্বারা বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা খাতের সার্বিক নিয়ন্ত্রণ ও বিকাশ সম্ভব নয়। এজন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে সরকারি ও বেসরকারি সেবা বিভাগে বিভক্ত করা প্রয়োজন। স্বাস্থ্যসেবাকে কখনো শুধু মুনাফা অর্জনের হাতিয়ার হতে দেয়া ঠিক হবে না। এজন্য মানসম্মত সেবার প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে নিরন্তর নজরদারি প্রয়োজন। জনস্বাস্থ্য রক্ষার প্রয়োজনে বেহাল বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা খাতের হাল ফেরানো অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।

মনে রাখা দরকার, সময়ের প্রয়োজনেই বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও বেসরকারি স্বাস্থ্য খাতের উদ্ভব ও বিকাশ হয়েছে এবং শিগগিরই তারা এখান থেকে চলেও যাচ্ছে না। এ বাস্তবতা মাথায় রেখেই আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সরকারের জন্য সর্বোত্তম উপায় হলো বেসরকারি খাতের জন্য এমন প্রণোদনা খুঁজে বের করা, যা তাদের আচরণ পরিবর্তন, সেবার মান বৃদ্ধি এবং বাণিজ্যিক লাভের চেয়ে স্বাস্থ্য সমতাকে গুরুত্ব দিতে উৎসাহিত করবে। আমাদের দেশে কোনো অবাঞ্ছিত ঘটনা ঘটলেই বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোয় অভিযান চালানো হয়। এভাবে বিচ্ছিন্নভাবে অভিযান না চালিয়ে বরং গোটা স্বাস্থ্য ব্যবস্থা, বিশেষ করে বেসরকারি খাতের নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির আমূল সংস্কার, নীতি প্রণয়ন, সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ এবং সে অনুযায়ী সমন্বিত ব্যবস্থা নেয়া জরুরি।