সম্প্রতি বাংলাদেশ এক স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ৫০তম বছর শুরু করেছে। স্বাধীন রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে এর থেকে অনেক প্রবীণ রাষ্ট্র এ পৃথিবীতে আছে। তেমনই নবীন রাষ্ট্রের সংখ্যাও কম নয়। জাতিসংঘের বর্তমান ১৯৭টি সদস্যের তালিকা পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, ৫৯টি রাষ্ট্র বাংলাদেশের পরে সদস্য হিসেবে গৃহীত হয়েছে। তবে একটি জাতির তারুণ্যের পরিচয় রাষ্ট্রের বয়স দিয়ে বিচার না করে তার চিন্তাধারা ও কার্যক্রম দিয়েও বিচার করা যায়।

এখানে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক প্রগতি বিশেষ উল্লেখের দাবি রাখে। আর এ প্রগতি শুধু প্রচলিত কর্মকাণ্ডের ওপর নির্ভরশীল নয়। এ প্রগতিতে শিল্প তথা প্রযুক্তিরও অবদান রয়েছে।  অনুমান করা যায়, বাংলাদেশ যত অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধশালী হয়ে উঠবে ততই তার শিল্পনির্ভরতা ও প্রযুক্তিনির্ভরতা বাড়তে থাকবে।

অথচ শিল্পের সঙ্গে দূষণের একটি আপাত প্রত্যক্ষ যোগ রয়েছে। কলকারখানার বর্জ্য পদার্থে বায়ু দূষিত হয়, পানি দূষিত হয় এবং সামগ্রিকভাবে জনস্বাস্থ্য বিঘ্নিত হয়। তদুপরি এর প্রভাব প্রাণী জগতে ও উদ্ভিদ জগতেও পরিলক্ষিত হয়। পৃথিবীব্যাপী উষ্ণায়নের সঙ্গেও এর প্রত্যক্ষ যোগ রয়েছে। অতএব, শিল্পোন্নয়নের সঙ্গে দূষণ নিয়ন্ত্রণের প্রয়াসও চালিয়ে যেতে হবে।

আশার কথা, নতুন প্রযুক্তির উদ্ভাবন এবং প্রচলিত প্রযুক্তির বিবর্তন প্রযুক্তি জগতে এক নতুন ধারার সূত্রপাত ঘটিয়েছে। প্রযুক্তি জগতে এর পরিচয় পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি, যা সবুজ প্রযুক্তি বা গ্রিনটেক, নির্মল প্রযুক্তি বা ক্লিনটেক অথবা জলবায়ুবান্ধব প্রযুক্তি বা ক্লাইমেট-টেক নামে পরিচিত। এগুলোর প্রতিটির সংজ্ঞায় খানিক তারতম্য থাকলেও মূল লক্ষ্য একটাই—উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রেখে দূষণ নিয়ন্ত্রণ। 

সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় অবস্থিত ইন্টার গভর্নমেন্টাল প্যানেল ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ বা আইপিসিসি একটি আন্তঃরাষ্ট্রীয় সংস্থা, যা সারা বিশ্বের নীতিনির্ধারকদের জলবায়ু পরিবর্তন-সংক্রান্ত বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন, তার প্রভাব ও ঝুঁকি-সংক্রান্ত তথ্যাবলি সরবরাহ করে তাদের অবগত করে। সেই সংস্থার পক্ষ থেকে ২০১৮ সালে প্রকাশিত রিপোর্ট অনুযায়ী বিশ্বের গড় উষ্ণতা প্রাক-শিল্পায়নের চেয়ে ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি বৃদ্ধি পেয়েছে এবং এ উষ্ণতা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ উত্তরোত্তর উষ্ণতা বৃদ্ধি বাংলাদেশের ভৌগোলিক চরিত্র ও জনজীবন ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করতে পারে। তাই সবুজ প্রযুক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে উন্নয়নের ধারা বজায় রেখে পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখা একান্ত জরুরি।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এড়াতে যে বিশ্বব্যাপী উদ্যোগের সূচনা হয়েছে, বাংলাদেশ সরকার তাতে শামিল হয়েছে। বাংলাদেশ সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগকে গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ডের (জিসিএফ) দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষ ন্যাশনাল ডেজিগনেটেড অথরিটি বা এনডিএ হিসেবে মনোনীত করা হয়। এনডিএ বাংলাদেশের বিভিন্ন সংস্থা ও সরকারি বিভাগের সঙ্গে জিসিএফের সমন্বয় সাধনের কাজ করে জিসিএফ সমর্থিত বিভিন্ন প্রকল্পের সুষ্ঠু বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কাজ করে। বাংলাদেশ সরকারের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু মন্ত্রণালয়ও একগুচ্ছ পরিকল্পনার মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকিগুলো নিরসনের লক্ষ্যে কাজ করে চলেছে। আধুনিক প্রযুক্তি ও সবুজ প্রযুক্তির আরো অধিক প্রয়োগ ও বাস্তবায়নের পরিকল্পনা গ্রহণ করে কাজ করলে এসব ঝুঁকির দ্রুত নিরসনের লক্ষ্যে এগিয়ে চলা সম্ভব। 

সাম্প্রতিককালে বিবিধ নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু হয়েছে, যাদের সবুজ প্রযুক্তি হিসেবে গণ্য করা হয়। এ প্রযুক্তিগুলোর একটি প্রাথমিক লক্ষ্য থাকে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার যথাসম্ভব হ্রাস করা এবং পুনর্নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি করা। বেশির ভাগ কারখানার যন্ত্র উত্তরোত্তর উন্নতির ফলে বর্তমানে অনেক বেশি জ্বালানি সাশ্রয়ী। শিল্পপতিরা যখন তাদের কারখানার জন্য নতুন যন্ত্র আমদানি করেন, তখন তারা এ জ্বালানি সাশ্রয়ের ক্ষেত্রটাও বিবেচনা করে দেখতে পারেন।

শিল্প ক্ষেত্রে কঠিন বর্জ্য বা সলিড ওয়েস্ট নিয়ন্ত্রণ করাও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিজনেস স্কুলের একটি নিবন্ধে দেখা যাচ্ছে যে করোনাকালে টেক্সটাইল বা বস্ত্র বয়ন শিল্পে কঠিন বর্জ্যের পরিমাণ যথেষ্ট বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রকাশিত নিবন্ধটি থেকে জানা যাচ্ছে যে কভিড-১৯ অতিমারীর আগেই বস্ত্র বয়ন শিল্পে সারা বিশ্বে প্রতি বছর ৯২ টন কঠিন বর্জ্য নির্গত হতো, যা প্রতি সেকেন্ডে একটি আবর্জনার ট্রাক ভর্তি করে ফেলার পক্ষে যথেষ্ট। করোনাকালে এর পরিমাণ যথেষ্ট বৃদ্ধি পেয়েছে এবং এ বর্জ্য বৃদ্ধি উৎপাদন থেকে বিপণন সর্বত্রই পরিলক্ষিত হয়েছে। যেহেতু বাংলাদেশ বস্ত্র বয়ন শিল্পের উৎপাদন ক্ষেত্রে সারা পৃথিবীতে দ্বিতীয় স্থানে অবস্থান করে, তাই অনুমান করা যায় যে এখানেও কঠিন বর্জ্যের পরিমাণ যথেষ্ট বৃদ্ধি পেয়েছে। আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির সাহায্যে সাপ্লাই চেইনের যথার্থ উন্নয়ন এবং অন্যান্য সবুজ প্রযুক্তির মাধ্যমে উৎপাদন ব্যবস্থায় বর্জ্যের পরিমাণ হ্রাসের পরিকল্পনা করার আশু প্রয়োজন। সামগ্রিক উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক প্রগতির ক্ষেত্রে এক উদীয়মান দেশ হিসেবে বাংলাদেশই পারে এ রূপান্তরের নেতৃত্ব দিতে।

শুধু বর্জ্যের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ নয়, বর্জ্য বস্তুকে পুনর্ব্যবহারযোগ্য করে তুলতেও যথেষ্ট উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। বর্জ্য বস্তুর যথাযথ পুনর্ব্যবহার পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় অনেকটাই কার্যকর। 

সবুজ প্রযুক্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো পুনর্নবায়নযোগ্য শক্তির উৎপাদন বৃদ্ধি ও তার ব্যবহার বৃদ্ধি। বর্তমানে বাংলাদেশে বেশ কয়েকটি তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ হচ্ছে। দেশের নিকট ভবিষ্যতে বিদ্যুতের বাড়তি চাহিদা মেটাতে তা কাজে লাগবে। কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী পরিকল্পনায় পুনর্নবায়নযোগ্য শক্তির উৎপাদন, সংবহন এবং ব্যবহার আরো বেশি গুরুত্ব পাওয়া উচিত। বিশেষ করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ও ব্যবহারের সময়সূচি এবং তত্সংলগ্ন পরিকল্পনায় তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার পুরো ব্যবস্থাটিকে উত্তরোত্তর পরিবেশবান্ধব করে তুলতে সাহায্য করবে। স্মার্টমিটারের মতন সবুজ প্রযুক্তির ব্যবহার সাধারণ গৃহস্থকেও বিভিন্ন ধরনের পুনর্নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ, যথা সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে উৎসাহী করে তুলবে। ফলে সাধারণ গৃহস্থের যেমন বিদ্যুৎ খরচ কমবে, তেমনি পরিবেশে দূষণের হারও কমবে। বাংলাদেশের বিদ্যুৎ নিয়ামক সংস্থা এ সবুজ প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধির জন্য বিশেষ ভূমিকা পালন করতে পারে। 

বাংলাদেশের জনসংখ্যার এক বৃহদাংশই নবীন। এ নবীন প্রজন্মের কর্মিদল ও উদ্যোক্তাদের সবুজ প্রযুক্তির ব্যবহারে উৎসাহিত করতে হবে। উচ্চ বিদ্যালয় এবং কারিগরি শিক্ষাকেন্দ্রগুলোয় কেবল পরিবেশ দূষণ ছাড়াও সবুজ প্রযুক্তির ওপর পাঠক্রম চালু করার আশু প্রয়োজনীয়তা আছে। সঙ্গে সঙ্গে বিদেশে উদ্ভাবিত সবুজ প্রযুক্তিগুলো কীভাবে বাংলাদেশের প্রয়োজনে সঠিক প্রয়োগ করা যায়, তার জন্য গবেষণামূলক উদ্ভাবনের পরিকল্পনা করতে হবে। এ ধরনের গবেষণার কাজে প্রথিতযশা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে প্রতিষ্ঠিত বাণিজ্যিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে নতুন নতুন উদ্ভাবনামূলক পরিকল্পনার বাস্তবায়ন করতে হবে। কাজে লাগাতে হবে নবীন প্রজন্মকে। শুরু করতে হবে আরো একটি দৃষ্টান্তমূলক রূপান্তরের জয়যাত্রা। (মতামত ব্যক্তিগত)

 

অরিজিৎ চক্রবর্ত্তী: প্রাইসওয়াটারহাউজকুপার্সের পার্টনার