দেশে অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণের হার বাড়ছেই। যে অঞ্চলের মানুষের মধ্যে সচেতনতা ও শিক্ষার ঘাটতি রয়েছে, সেখানে এটি আরো বেশি। স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের বরাত দিয়ে গতকাল বণিক বার্তায় প্রকাশিত সংশ্লিষ্ট এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণে শীর্ষ ময়মনসিংহ বিভাগ, গ্রহণকারী রোগীর হার ৮৩ শতাংশ। এরপর যথাক্রমে খুলনা, চট্টগ্রাম, রংপুর জেলার অবস্থান। বিশেষ করে নিবন্ধনহীন চিকিৎসকরাই রোগীদের অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণের পরামর্শ দিচ্ছেন বেশি। অদক্ষ ও অপেশাদার হাতুড়ে চিকিৎসকরা কোনো ভাবনা-চিন্তা ছাড়াই সামান্য অসুখেও অ্যান্টিবায়োটিকের অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার করেন। লাইসেন্সপ্রাপ্ত ফার্মেসি ছাড়াও দেশের আনাচে-কানাচে গড়ে উঠেছে হাজারো অনুমোদনহীন ওষুধের দোকান। এসব ওষুধের দোকানের অনভিজ্ঞ, অশিক্ষিত ও অর্ধশিক্ষিত বিক্রয়কর্মীরা কোনো ব্যবস্থাপত্র ছাড়াই চাহিবামাত্র অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রয় করেন। এসব অনুমোদনহীন অবৈধ ওষুধের দোকানের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য অফিস এবং কর্মকর্তাদের অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার ও অতিব্যবহার রোধে আরো তত্পর হতে হবে। 

অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স একটি বৈশ্বিক সমস্যা। উন্নত দেশ থেকে শুরু করে নিম্ন আয়ের দেশগুলোয় এ বিপর্যয় প্রকট আকার ধারণ করেছে। দেশে অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ও নির্বিচার ব্যবহারের কারণে এখন আর সাধারণ মানের কোনো অ্যান্টিবায়োটিকের সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে বেড়ে যাচ্ছে চিকিৎসা ব্যয় ও মৃত্যুঝুঁকি। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে ৬০-৭০ শতাংশ প্রথম জেনারেশন অ্যান্টিবায়োটিক প্রায় অকার্যকর হয়ে পড়েছে। শিশু ও বৃদ্ধদের মধ্যে অ্যান্টিবায়োটিকের অতিরিক্ত ও অপপ্রয়োগ লক্ষণীয়। অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের ক্ষেত্রে অধিকাংশ সময়ই পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয় না; এক রোগীর জন্য একই সময় একাধিক অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার এবং সাধারণ জ্বর, সর্দি-কাশি, ডায়রিয়া ইত্যাদিতে প্রায় ১০০ শতাংশ ক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিকের প্রয়োগ করা হয়। ৫০ শতাংশ রোগীই অ্যান্টিবায়োটিকের ডোজ সম্পূর্ণ শেষ করে না। ৩০-৪০ শতাংশ রোগী নিজস্ব উদ্যোগেই বিভিন্ন কারণে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করে। এছাড়া অধিকাংশ পোলট্রি ও গবাদিপশু খামারে প্রচুর পরিমাণ অপ্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার হয়। ফলে রেজিস্ট্যান্স ক্ষমতাপ্রাপ্ত জীবাণুগুলো খাবারের সঙ্গে এবং পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে। বৈশ্বিক, আঞ্চলিক, জাতীয়, প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যক্তিগত উদ্যোগ এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি ও অ্যান্টিবায়োটিকের যথাযথ ব্যবহার ও নতুন অ্যান্টিবায়োটিক উদ্ভাবনের প্রচেষ্টার মাধ্যমেই এ বিপর্যয় রোধ করা সম্ভব। প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি বন্ধ করতে হবে। নিবন্ধনকৃত চিকিৎসকের লিখিত প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি করা যাবে না মর্মে বিজ্ঞ হাইকোর্ট যে রায় দিয়েছেন, তা সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হলে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স অনেকাংশে কমানো সম্ভব হবে। এ-সংক্রান্ত আইনগুলো সুনির্দিষ্ট হতে হবে এবং কঠোর শাস্তির বিধান উল্লেখ থাকতে হবে। বলার অপেক্ষা রাখে না, মৌসুমি জ্বর, সর্দি, কাশি প্রধানত ভাইরাসজনিত হলেও অ্যান্টিবায়োটিক সেবন, আবার দু-তিন ডোজে ভালো হওয়ার পরই হঠাৎ তা বন্ধ করে দেয়া এবং এভাবে জীবাণুকে আগ্রাসী হতে সহায়তা করার রূঢ় বাস্তবতা প্রায় সবারই জানা। এর মধ্যে কভিড-১৯-এ বিশ্বের আরো অনেক অঞ্চলের মতো বাংলাদেশীরাও সহজলভ্য অ্যান্টিবায়োটিকে ঝুঁকে পড়েছে। অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রির মাত্রা বেড়ে গেছে। অথচ জীবন রক্ষাকারী অতি প্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার হওয়া উচিত পরিমিত, সীমিত ও প্রয়োজন অনুযায়ী।

উন্নত বিশ্বে খেয়ালখুশিমতো অ্যান্টিবায়োটিক কেনাবেচা করা যায় না। বাংলাদেশেও যাতে এগুলো খেয়ালখুশিমতো ক্রয়-বিক্রয় করা না যায়, সেজন্য প্রশাসনিক উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সামনে রোগ সারানোর উপকরণগুলো সহজলভ্য করতে হবে। উৎপাদন বাড়াতে দেশের পোলট্রি, ডেইরি, চিংড়ি ও ফিশারিজ শিল্পেও ক্ষতিকারক অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার হ্রাস করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে। ওয়ান হেলথ গ্লোবাল লিডার্স গ্রুপের সহসভাপতি হিসেবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ছয়টি প্রস্তাব দিয়েছিলেন। এগুলো হলো—এক. সম্ভাব্য বিপর্যয় রোধ করতে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল এজেন্ট উৎপাদন, মান নিয়ন্ত্রণ এবং বিপণন নিয়ন্ত্রণের জন্য কঠোরভাবে আইন ও বিধি প্রয়োগ; দুই. মানব, মত্স্য ও প্রাণীর জন্য ব্যাপকভাবে পরীক্ষাগারভিত্তিক নজরদারি ব্যবস্থা স্থাপন করা দরকার; তিন. অনুমোদিত ব্যক্তির প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল পণ্য বিক্রয় কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা; চার. এএমআর সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দসহ মৌলিক, পরীক্ষামূলক এবং পরিচালনামূলক গবেষণা জোরদার; পাঁচ. অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল পণ্যের অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের জন্য উচ্চপর্যায়ের অ্যাডভোকেসি, যোগাযোগ এবং সামাজিক উদ্বুদ্ধকরণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা; ছয়. নীতিগুলোর কঠোর বাস্তবায়নের জন্য বৈশ্বিক নেতাদের রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও দৃষ্টিভঙ্গি গুরুত্বপূর্ণ এবং এফএও, ওআইই, ডব্লিউএইচও, জাতিসংঘ পরিবেশ সংস্থা এবং অন্য আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক সংস্থাগুলোকে এ প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত করা। দেশের সরকারের উচিত দেশের জায়গা থেকে বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা। বলতে দ্বিধা নেই, দেশের স্বাস্থ্য খাত বড় ধরনের বিপর্যয় মোকাবেলায় সক্ষম নয়। ফলে যেকোনো ধরনের প্রতিরোধই প্রতিকারের চেয়ে উত্তম।

সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেছিলেন, অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহার মানুষকে বিপদগ্রস্ত করছে। কিন্তু মানুষ এ ব্যাপারে যথেষ্ট সচেতন নয়। অনেকেই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নিজেদের ইচ্ছামতো ওষুধ কিনে খাচ্ছেন। যাতে উপকারের চেয়ে অপকার বেশি হচ্ছে। এক্ষেত্রে সবাইকে অধিকতর সতর্ক থাকতে হবে। বিশ্বের কোথাও প্রেসক্রিপশন ছাড়া কোনো অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ বেচা বা কেনা সম্ভব নয়, কেবল বাংলাদেশেই এটা সম্ভব হচ্ছে। যে কেউ যখন-তখন ওষুধের দোকানে গিয়ে যেকোনো অ্যান্টিবায়োটিক কিনতে পারছে প্রেসক্রিপশন ছাড়া। এ কারণেই ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। দেশে মানসম্পন্ন চিকিৎসকের অপর্যাপ্ততা, ফার্মেসির মান নিশ্চিত না করে ড্রাগ বিক্রি করার অনুমোদন, অনুমোদনহীন প্রচুর ফার্মেসি এবং সেখানে কাজ করা অপ্রশিক্ষিত-অদক্ষ জনবল পরিস্থিতি আরো জটিল করে তুলেছে। বাংলাদেশ সরকার অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের ব্যাপারটি গুরুত্বসহকারে নিয়ে এ থেকে উত্তরণের জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে, যার মধ্যে অন্যতম ২০১৬ সালে ওষুধ বিক্রির নীতিমালায় ‘মডেল ফার্মেসি’ ও ‘মডেল ফার্মেসি শপ’-এর প্রবর্তন। যেখানে সুনির্দিষ্টভাবে চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ। ওই নীতিমালায় ফার্মেসিগুলোয় ফার্মেসি কাউন্সিল অব বাংলাদেশের লাইসেন্সপ্রাপ্ত ফার্মাসিস্ট (গ্রেড এ, বি ও সি) ব্যতীত ওষুধ ক্রয়-বিক্রয় নিষিদ্ধ করা হয়েছে। উল্লিখিত নীতিমালা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন হলে অনেকাংশে অ্যান্টিবায়োটিকের রেজিস্ট্যান্স বন্ধ করা যাবে। কিন্তু যে উদ্দেশ্যে মডেল ফার্মেসি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল, বাস্তবে সেগুলো সেভাবে কাজ করছে না। এক্ষেত্রে নজরদারির অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে এবং মডেল ফার্মেসি থেকেও ব্যবস্থাপত্র ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি হচ্ছে। এক্ষেত্রে কঠোর নজরদারি এবং আইনি ব্যবস্থা নেয়ার পাশাপাশি প্রয়োজনে ড্রাগ লাইসেন্স বাতিলের মতো কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।

অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স মোকাবেলা এবং সীমিত করার ক্ষেত্রে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক যে গ্লোবাল অ্যাকশন প্ল্যান ২০১৫ করা হয়েছে, সেটাকে বাংলাদেশে সফলভাবে প্রয়োগ করা গেলে নিরাপদ অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, গ্লোবাল অ্যাকশন প্ল্যানে পাঁচটি অভীষ্ট নির্ধারণ করেছে—ক. কার্যকর যোগাযোগ, শিক্ষা ও ট্রেনিংয়ের মাধ্যমে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স-সংক্রান্ত সচেতনতা বৃদ্ধি করা এবং এর সম্পর্কে সঠিক তথ্য জানা; খ. নজরদারি ও গবেষণা শক্তিশালী করা; গ. সংক্রমণের হার হ্রাস করা; ঘ. অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার যুক্তিসংগত করা; ঙ. অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স প্রতিরোধে টেকসই বিনিয়োগ নিশ্চিত করা। বাংলাদেশে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের কোনো স্ট্যান্ডার্ড নীতিমালা এখন পর্যন্ত প্রণয়ন করা হয়নি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০১১ সালে একটি গাইডলাইন প্রণয়ন করে। এর আলোকে বাংলাদেশের আর্থসামাজিক ও অন্যান্য প্রেক্ষাপট বিবেচনায় স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের একটি বাস্তবসম্মত নীতিমালা প্রণয়ন করা জরুরি। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের বড় সীমাবদ্ধতা হলো নীতিমালা প্রণয়নের পর সেটার সঠিক বাস্তবায়ন, কঠোরভাবে প্রয়োগ ও নজরদারি নিশ্চিত করা। পাশাপাশি জনগণকেও সচেতন করে তুলতে ব্যাপক প্রচারণাও চালাতে হবে।