বাংলা আমাদের মাতৃভাষা। কিন্তু কারো কারো কাছে এটি একটি বিদেশী ভাষা। বাংলা যখন বিদেশী ভাষা, তখন এর নাম হয় বিদেশী ভাষা হিসেবে বাংলা ভাষা (Bangla as Foreign Language)। বিদেশী ভাষা হিসেবে বাংলা ভাষা সম্পর্কে এ দেশে কোনো ধারণাগত কাঠামো গড়ে ওঠেনি। কিন্তু প্রকৃতির অমোঘ নিয়মে নিজস্ব ধারায় বিদেশী ভাষা হিসেবে বাংলা ভাষার ব্যবহার চলছে এবং বিদেশী জ্ঞানরাজ্যে (academia) এর একটি ধারণাগত কাঠামো প্রতিষ্ঠিত হতে চলেছে। কিন্তু বাংলাদেশের কোনো ভাষানীতি না থাকায় দেশাভ্যন্তরে এর কোনো ধারণাগত কাঠামো তৈরি হয়নি। বাংলাদেশে বিদেশী ভাষা হিসেবে বাংলা ভাষার পঠন-পাঠন ও চর্চা চলছে এমন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে অন্যতম হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট, ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের বাংলা ভাষা ইনস্টিটিউট, ব্র্যাক ভাষা ইনস্টিটিউট ইত্যাদি। কিন্তু এসব প্রতিষ্ঠানেও বিদেশী ভাষা হিসেবে বাংলা ভাষার মর্যাদা ও প্রায়োগিকতা নিয়ে স্পষ্ট কোনো ধারণা নেই।

প্রসঙ্গত, বিষয়টি আরেকটু সবিস্তারে আলোচনা করা যাক। কোনো ভাষা স্থান, কাল ও পাত্রভেদে ধ্রুপদী ভাষা, জাতীয় ভাষা, রাষ্ট্রভাষা, দাপ্তরিক ভাষা, দ্বিতীয় ভাষা, তৃতীয় ভাষা, ঐতিহ্য ভাষা, বিদেশী ভাষা, আন্তর্জাতিক ভাষা ইত্যাদি নানা বিশেষণে বিশেষায়িত হতে পারে। পৃথিবীর লাখ লাখ বুলির মধ্যে কিছুসংখ্যক বুলিই এসব বিশেষণ লাভ করেছে। বাংলা ভাষা তার মধ্যে অন্যতম। বাংলা ভাষা বাংলাদেশের ভাষা-পরিস্থিতি ও আন্তর্জাতিক ভাষা পরিস্থিতিতে উল্লিখিত সব অভিধা লাভ করেছে। বাংলা ভাষা বাংলাদেশের জাতীয় ভাষা, রাষ্ট্রভাষা ও দাপ্তরিক ভাষা। আবার এ ভাষা বম, চাক, চাকমা, কোচ, গারো, হাজং, খাসিয়া, খিয়াং, খুমি, লুসাই, মাহাতো, মারমা, মণিপুরী, মুণ্ডা, মুরুং, ম্রো, পাহাড়ি, পাংখো, রাজবংশী, রাখাইন, সাঁওতাল, তঞ্চঙ্গ্যা, টিপরা, ওঁরাও ইত্যাদি নৃ-গোষ্ঠীর কাছে দ্বিতীয় বা তৃতীয় ভাষা। অন্যদিকে বিদেশে অভিবাসিত বাংলা ভাষাভাষীদের নতুন প্রজন্মের কাছে এটি একটি ঐতিহ্য ভাষা। উল্লেখযোগ্য, বিপুলসংখ্যক বাংলা ভাষাভাষী জনগোষ্ঠী ব্রিটিশ যুক্তরাজ্য, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া ও কানাডা এবং পশ্চিম এশিয়ার বিভিন্ন দেশে অভিবাসনের মাধ্যমে স্থায়ী আবাস গড়ে তোলেছে। সেখানে তারা সমাজবদ্ধ বা বিচ্ছিন্নভাবে বাস করছে। বিদেশে অভিবাসিত বাংলা ভাষাভাষী সমাজের মধ্যে দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রজন্মের যুব জনগোষ্ঠীর কাছে এটি হলো ঐতিহ্য ভাষা। অন্যদিকে বাংলা ভাষা বাংলাদেশে জাতীয় ভাষা এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, আসাম ও ঝাড়খণ্ড রাজ্যের রাজ্য ভাষা হিসেবে স্বীকৃত হয়েছে বিধায় এটি আন্তর্জাতিক ভাষার অভিধা লাভ করেছে। সম্প্রতি ভারতের   বিদ্যোৎসাহী শ্রেণী বাংলা ভাষার সাহিত্য সম্ভার, ঐতিহ্য ও রাজনৈতিক গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে বাংলা ভাষাকে ধ্রুপদী ভাষা হিসেবে স্বীকৃতিদানের জন্য দাবি তুলছে।

বাংলাদেশ ও ভারতে বাংলা ভাষার মর্যাদা ভিন্ন হলেও বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরা রাজ্য বাংলা ভাষাকে আন্তর্জাতিক মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করতে তত্পর রয়েছে। উল্লেখ্য, বাংলাদেশের ভাষা শহীদ দিবসের দিন ২১ ফেব্রুয়ারিকে ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর জাতিসংঘের অঙ্গ সংস্থা ইউনেস্কো আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে এবং ২০০০ সালের ২১ ফেব্রুয়রি থেকে দিবসটি জাতিসংঘের সদস্য দেশগুলোয় যথাযথ মর্যাদায় পালিত হচ্ছে। পরবর্তী সময়ে ২০০৯ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৬৪তম অধিবেশনে বাংলা ভাষাকে জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানানো হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ২০০৯ সালের ২১ ডিসেম্বর ও ২০১০ সালের ১১ জুন যথাক্রমে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরা রাজ্যের বিধানসভা বাংলা ভাষাকে জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে স্বীকৃতিদানের জন্য বাংলাদেশের দাবিকে সমর্থন জানিয়ে সর্বসম্মতিক্রমে প্রস্তাব গ্রহণ করে এবং প্রস্তাবটি জাতিসংঘে উপস্থাপনের জন্য ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারকে অনুরোধ করে। বাংলাদেশ ও ভারতের দুটি রাজ্য পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরা কর্তৃক একযোগে বাংলা ভাষাকে জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে চালু করার দাবির বিষয়টি ইঙ্গিত করে যে বাংলা ভাষা একটি আন্তর্জাতিক ভাষা হিসেবে গড়ে ওঠার মতো একটি প্রচ্ছন্ন ক্ষমতা রয়েছে।

ওই আলোচনা থেকে স্পষ্ট হয়েছে, বাংলা ভাষা মর্যাদা ও প্রায়োগিকতার মানদণ্ডে যুগপত্ভাবে ধ্রুপদী ভাষা, জাতীয় ভাষা, রাষ্ট্রভাষা, দাপ্তরিক ভাষা, দ্বিতীয় ভাষা, তৃতীয় ভাষা, ঐতিহ্য ভাষা, বিদেশী ভাষা ও আন্তর্জাতিক ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। পৃথিবীর অধিকাংশ ভাষারই একই সঙ্গে এতা অভিধা জোটেনি। আমাদের আশপাশের দেশের ভাষাগুলো সম্পর্কে এমন উদাহরণ সত্য। হিন্দি ভাষা ভারতের দাপ্তরিক ভাষা কিন্তু এটি ভারতের জাতীয় বা রাষ্ট্রভাষা নয়। আবার ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের জনগণ হিন্দিকে দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার বিপক্ষে সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিক পাকিস্তানের জাতীয় ভাষা ও রাষ্ট্রভাষা উর্দু হলেও এটি পাকিস্তানের ভাষা নয়। এটি মূলত ভারতের মুসলমানদের লিঙ্গুয়া-ফ্রাঙ্কা। ইন্দোনেশিয়ার ক্ষেত্রেও একই ঘটনা। ইন্দোনেশিয়ার কোনো জাতীয় ও রাষ্ট্রভাষা নেই। এর দাপ্তরিক ভাষা হলো ইন্দোনেশীয় ভাষা। ইন্দোনেশীয় ভাষা মূলত মালয় ভাষারই একটি ভিন্ন রূপ। সে হিসাবে এটি ইন্দোনেশিয়ার নানা ভাষাভাষী জনগণের জন্য একটি বহিরাগত ভাষা।

বাংলা ভাষার এত অভিধা জুটলেও খোদ বাংলাদেশেই বাংলা ভাষা অপাঙেক্তয় হয়ে উঠেছে। শিক্ষা ব্যবস্থায় ও দাপ্তরিক কার্যক্রমে বাংলা ভাষার পরিবর্তে ইংরেজি ভাষাকে প্রতিষ্ঠিত করার উদ্যোগ চলছে। কিন্তু বাংলা ভাষার যে প্রচ্ছন্ন শক্তি রয়েছে, সে শক্তিই যেন এ ভাষাকে বিদেশী ভাষার মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছে। ভাষাবিজ্ঞানী কাই চান (২০১৬) তার এক গবেষণায় দেখিয়েছেন, কোনো ভাষার বিদেশী ভাষা হিসেবে গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করে কয়েকটি সূচকের ওপর। সে সূচকগুলো হলো, কোনো নির্দিষ্ট ভাষার আঞ্চলিক বিস্তৃতি, অর্থনীতি, সংজ্ঞাপনের মাধ্যম হিসেবে কার্যকারিতা, জ্ঞান ও গণমাধ্যমে ভাষা হিসেবে ব্যবহারের বিস্তৃতি, সেই ভাষাসংশ্লিষ্ট দেশের কূটনৈতিক সক্ষমতা ইত্যাদি। তার প্রস্তাবিত এ সূচকগুলো বিবেচনায় নিলে বাংলা ভাষার যৎসামান্য হলেও ভাষিক সক্ষমতা রয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়। সেজন্য বিশ্বের নানা দেশে বিদেশী ভাষা হিসেবে বাংলা ভাষার পঠন-পাঠন ও গবেষণা চলছে। তার মধ্যে অনেকগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদেশী ভাষা হিসেবে বাংলা ভাষায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। এরূপ বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম হলো চীনের গুয়াংঝু বিদেশবিদ্যা বিশ্ববিদ্যালয় ও জাপানের টোকিও বিদেশবিদ্যা বিশ্ববিদ্যালয়। এছাড়া অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ইত্যাদি দেশের বিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে বিদেশী ভাষা হিসেবে বাংলা ভাষার পঠন-পাঠন চলছে। 

যেকোনো দেশই তার জাতীয় ভাষাকে ঐতিহ্য ও ঐশ্বর্যের প্রত্নরূপস্বরূপ বিদেশী ভাষা হিসেবে প্রচলনের উদ্যোগ গ্রহণ করে। সেই উদ্যোগ বাস্তবায়নের জন্য একটি ভাষানীতি প্রণয়ন করে। কিন্তু বাংলাদেশের কোনো ভাষানীতি নেই। এমনকি জাতীয় এ ভাষাকে জাতীয় পর্যায়ে প্রতিষ্ঠারও উদ্যোগ নেই। আবার ভারতের পক্ষে এ ভাষাকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিষ্ঠা করা বাস্তব কারণেই সম্ভব নয়। কারণ ভারতে বাংলাদেশের ন্যায় বাংলা ভাষার মর্যাদা সমান নয়। কারণ ভারত প্রজাতন্ত্র যুক্তরাজ্যের ব্যবস্থায় পরিচালিত একটি রাষ্ট্র, যার দাপ্তরিক ভাষা হলো ইংরেজি ও হিন্দি। কাজেই লক্ষণীয়, ভারতের ভাষা পরিস্থিতিতে বাংলা ভাষার মর্যাদা ইংরেজি ও হিন্দি ভাষার চেয়ে নিম্নে। সুতরাং বাংলা ভাষাকে বিদেশী ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক দায়িত্ব বর্তায় বাংলাদেশ সরকারের ওপর। এ দায়িত্বকে অবহেলা করা মানে বাংলা ভাষাকেই অবহেলা করা। কাজেই বাংলাদেশ সরকারের দায় ও দায়িত্ব হবে বিদেশী ভাষা হিসেবে বাংলা ভাষাকে প্রতিষ্ঠার জন্য ভাষানীতি প্রণয়ন এবং তা বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় বাজেট প্রণয়ন করা। উদ্দিষ্ট এ ভাষানীতি বাস্তবায়নে যেসব ভাষা পরিকল্পনা হাতে নেয়া প্রয়োজন তা হলো:

১) বিদেশী ভাষা হিসেবে বাংলা ভাষার শিক্ষা কার্যক্রম বৃদ্ধির লক্ষ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটে বিদেশী ভাষা হিসেবে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি বিভাগ নামে একটি পূর্ণাঙ্গ বিভাগ প্রতিষ্ঠা করা। ২) বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে (উদাহরণস্বরূপ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট) বিদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিষ্ঠিত বিদেশী ভাষা হিসেবে বাংলা ভাষা বিভাগের শিক্ষার্থীদের অধ্যয়নের সুবিধার্থে গবেষক ও অভ্যাগত অধ্যাপক পদ সৃষ্টি করে তাদের বৃত্তিসহ আমন্ত্রণ জানানো। ৩) বিদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিষ্ঠিত বিদেশী ভাষা হিসেবে বাংলা ভাষা বিভাগের শিক্ষার্থীদের জন্য অনলাইনে বাংলা ভাষা শিক্ষা সহায়তা প্রদানের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা। ৪) বিশ্বের অধিকাংশ দেশের শীত ও গ্রীষ্মকালীন ছুটির সঙ্গে মিল রেখে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিষ্ঠিত বিদেশী ভাষা হিসেবে বাংলা ভাষায় অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের জন্য তিন সপ্তাহব্যাপী শীতকালীন ও গ্রীষ্মকালীন আবাসিক শিক্ষা কার্যক্রম চালু করা। ৫) বিদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিষ্ঠিত বিদেশী ভাষা হিসেবে বাংলা ভাষা বিভাগের শিক্ষার্থীদের জন্য গবেষণা সহায়তা প্রদানের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

ওই বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে বিদেশী ভাষা হিসেবে বাংলা ভাষার পক্ষে একটি ভাষানীতি প্রণয়ন করা হলে তা বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হলে বিদেশী ভাষা হিসেবে বাংলা ভাষাকে তার যথাযোগ্য মর্যাদায় প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে। কাজেই বাংলাদেশ সরকারের উচিত হবে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিদেশী ভাষা হিসেবে বাংলা ভাষার পক্ষে একটি ভাষানীতি প্রণয়ন করা এবং তা বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দ করা।

 

ড. এ.বি.এম. রেজাউল করিম ফকির: অধ্যাপক ও পরিচালক, আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়