জেলা শহরগুলোয় কভিড মহামারীর ধাক্কায় চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর যে বাড়তি চাপ সৃষ্টি হয়েছে, তা সাফল্যের সঙ্গে মোকাবেলা করতে হলে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র, চিকিৎসা সরঞ্জাম, চিকিৎসাসেবায় নিয়োজিত চিকিৎসক ও অন্যান্য লোকবলের ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম এবং রোগ শনাক্তকরণ কিটের মজুদ নিশ্চিত করা একান্ত প্রয়োজন। কিন্তু এমন সময়েই কেন্দ্রীয় ঔষধাগারে জরুরি উপকরণের মজুদ শেষ হওয়ার খবর মিলছে। গতকাল বণিক বার্তায় প্রকাশিত সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কেন্দ্রীয় ঔষধাগারে হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলা, রেমডিসিভির ইনজেকশন, কভিড-১৯ টেস্টিং কিট ও ভেন্টিলেটরের মতো গুরুত্বপূর্ণ উপকরণের মজুদ নেই। ঢাকার বাইরে বেড়ে চলা চাহিদা অনুযায়ী উপকরণ সরবরাহ করতে পারছে না প্রতিষ্ঠানটি। মহামারীর এ গুরুতর পর্যায়ে জরুরি উপকরণের মজুদ শেষ হওয়ার বিষয়টি খুবই উদ্বেগজনক।
করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের শুরুতে বিভিন্ন হাসপাতালে নানা ধরনের ঘাটতি লক্ষ করা গেছে। অথচ বিমানবন্দরে ১০ মাস ধরে পড়ে ছিল ১০২ কোটি টাকার জীবন রক্ষাকারী নানা সরঞ্জাম ও সামগ্রী। দেখা গেছে, শুধু উদ্যোগের অভাবে এসব খালাস করা হয়নি। যদিও সামগ্রীগুলো কেনা হয়েছিল জরুরি প্রয়োজন মেটাতে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের মধ্যে সমন্বয়ের প্রকট অভাব বিদ্যমান। কেন্দ্রীয় ঔষধাগার বলছে, গতিপ্রকৃতি পর্যবেক্ষণ করে মহামারী মোকাবেলায় প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণ ও প্রস্তুতির অংশ হিসেবে আগে থেকেই ভবিষ্যৎ ক্রয় পরিকল্পনা করার দায়িত্ব স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের। কিন্তু কভিড-১৯-এর দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবেলায় সিএমএসডি কোনো উৎস থেকেই নাকি কোনো ক্রয় পরিকল্পনা পায়নি। এমনকি মহামারীর আকস্মিক নাজুক অবস্থায়ও কোনো জরুরি ক্রয় পরিকল্পনা পাওয়া যায়নি। অভিযোগ গুরুতর। করোনা শুরুর দিকে গত বছর স্বাস্থ্য খাতে সুরক্ষাসামগ্রী ও চিকিৎসা সরঞ্জাম নিয়ে বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। এরপর দ্বিতীয় ঢেউ আসার আগে প্রস্তুতির বেশ সময় পেয়েছে সরকারি সংস্থাগুলো। কিন্তু স্বাস্থ্য খাতে চিঠি চালাচালিতে অনেক সময় নষ্ট করেছে। এর মাশুল দিতে হয়েছে করোনার রোগীদের। এবার যেন তেমনটি না ঘটে, তাই দ্রুতই জরুরি চিকিৎসা উপকরণের সরবরাহ ও মজুদ নিশ্চিত করতে হবে। আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার বিষয়টি নাকি অনেক আগেই জানানো হয়েছিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে। আমাদের পক্ষে দুর্বোধ্য কোন কারণে তারা এ জরুরি বিষয়টির প্রতি যথাসময়ে গুরুত্ব দেয়নি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলেছেন, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও সুরক্ষাসামগ্রীর বর্তমান মজুদ নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। কিন্তু তারা বলছেন না যে বিদ্যমান মজুদ দিয়ে তাদের হিসাবে আর কত দিনের চাহিদা পূরণ করা যাবে। খবর মিলছে, কেন্দ্রীয় ঔষধাগার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরেরই অধীন প্রতিষ্ঠান, তারা চিকিৎসা সরঞ্জাম ও সুরক্ষাসামগ্রীর মজুদ কমে আসার পরিপ্রেক্ষিতে মজুদ বাড়ানোর জন্য এসব সরঞ্জাম ক্রয়ের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে একাধিকবার অবগত করেছিল। কিন্তু স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সাড়া প্রদানে বিলম্ব করেছে। এটি উভয় প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়হীনতার প্রতিফলন, যা দূর করা প্রয়োজন।
দেশে করোনা প্রাদুর্ভাবের দেড় বছরের বেশি সময় অতিবাহিত হলেও কেন এসব জরুরি উপকরণের পর্যাপ্ত মজুদ গড়ে তোলা গেল না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। আশ্চর্যের বিষয়, জরুরি সরঞ্জাম ও উপকরণের জন্য বিভিন্ন দাতা সংস্থার ওপর নির্ভর করছে কেন্দ্রীয় ঔষধাগার। কিন্তু বাংলাদেশের মতো সমপর্যায়ের অর্থনীতির দেশগুলো নিজস্ব অর্থ ব্যয় করে আন্তর্জাতিক যোগাযোগ বৃদ্ধির মাধ্যমে জরুরি চিকিৎসা উপকরণ ক্রয় করছে। করোনা টেস্টিং কিট, রেমডিসিভির ইনজেকশন, হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলা কেনা বর্তমানে কঠিন নয়। ব্যক্তি উদ্যোগে এসব জরুরি উপকরণ ব্যাপক পরিমাণে কিনে আনার উদাহরণও আমাদের সামনে রয়েছে। বড় বিষয় হলো, মধ্যম আয়ের একটি দেশের জরুরি চিকিৎসা উপকরণের জন্য দাতা সংস্থার ওপর নির্ভরশীলতা গ্রহণযোগ্য কোনো যুক্তি হতে পারে না। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদের প্রস্তুতিতে বড় ধরনের ঘাটতি পরিলক্ষিত হচ্ছে। সুরক্ষা উপকরণের চাহিদা সম্পর্কে গুরুত্ব না দেয়ায় যে ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, তা দ্রুত পূরণ করা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে স্বাস্থ্য বিভাগের দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। এমনকি প্রয়োজনীয় চিকিৎসা উপকরণের ব্যাপারে মনোযোগ না বাড়িয়ে চিকিৎসাবহির্ভূত খাতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মনোযোগ বেশি বলে এতদিন ধরে যে অভিযোগ আমরা শুনে আসছি, এটাই কি তার প্রমাণ নয়? গত বছরই স্বাস্থ্য খাতের কেনাকাটায় দুর্নীতির চিত্র উন্মোচিত হয়। করোনা মোকাবেলায় মাস্ক, পিপিইসহ সুরক্ষা সামগ্রী ও যন্ত্রপাতি ক্রয়ে সীমাহীন অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে তদন্তক্রমে এর সত্যতাও পাওয়া যায়। এরপর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উচ্চপদস্থ কয়েকজন অসাধু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সরকার ত্বরিত পদক্ষেপ গ্রহণ করলেও অবস্থার উন্নতি না হওয়ার বিষয়টি খতিয়ে দেখা দরকার।
লক্ষণীয় বিষয়, নভেল করোনাভাইরাস মোকাবেলায় সরকার সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা নিয়েছে। এরই মধ্যে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধ করতে চলাচলে কঠোর বিধিনিষেধ জারি করেছে সরকার। মানুষের জীবন রক্ষায় সরকারের এসব উদ্যোগ সব মহলের প্রশংসা পেয়েছে। কিন্তু প্রয়োজনীয় চিকিৎসা উপকরণের অভাব এসব উদ্যোগকে প্রশ্নের মুখে ফেলবে এবং এর অভাবে মানুষের মৃত্যু ঘটবে, তা কাম্য নয়। এছাড়া অন্যান্য দেশের পরিস্থিতি বিবেচনা করলে বোঝা যায়, সামনে আরো খারাপ সময়ের আশঙ্কা রয়েছে। সুতরাং দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়ে এগিয়ে না এলে এজন্য বড় ধরনের বিপর্যয়ের মধ্যে পড়তে হতে পারে। জানা গেছে, সারা দেশে করোনা রোগীদের চিকিৎসায় সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বেশ কয়েক ধরনের চিকিৎসা উপকরণের চাহিদাপত্র সম্প্রতি তৈরি করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। দ্রুতই সেগুলো কেনা এবং দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে দেয়া আবশ্যক। কেন্দ্রীয় ঔষধাগারে যে পরিমাণ উপকরণের মজুদ রয়েছে, তাতে নিকট ভবিষ্যতে সম্ভাব্য সংকট মোকাবেলা করা যাবে না বলেই বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। দ্রুতই চাহিদা অনুযায়ী চিকিৎসা উপকরণ কেনা ও তা সরবরাহ প্রয়োজন। সার্বিক বিষয় পর্যালোচনা করলে এটি স্পষ্ট যে করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলায় স্বাস্থ্য বিভাগের ন্যূনতম পরিকল্পনাও নেই, দ্রুতই এক্ষেত্রে দৃষ্টি দেয়া প্রয়োজন। এক্ষেত্রে ব্যর্থতার জন্য সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহি নিশ্চিত করাও জরুরি। কারণ জবাবদিহির অভাবেই অতীতে নানা ধরনের সংকটে পড়তে হয়েছে।










