করোনার প্রাদুর্ভাব হ্রাস-বৃদ্ধির সঙ্গে বিশ্বের সচেতন দেশগুলো লকডাউন শিথিল ও কঠোর করছে। জনগণের বড় অংশ, যারা করোনায় অধিক ঝুঁকিপূর্ণ, তাদের টিকার আওতায় আনার আগ পর্যন্ত মাস্ক পরিধান নিশ্চিত করা, শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখাসহ লকডাউনের মতো পদক্ষেপের বিকল্প এখনো তৈরি হয়নি। বাংলাদেশও প্রায় একই ধরনের প্রক্রিয়াই অনুসরণ করছে শুরু থেকেই। সংক্রমণ বেড়ে উঠলে চলাচল সীমিত করে আনা হচ্ছে। গত দুই সপ্তাহে সংক্রমণের হার ও মৃত্যু বেড়ে উঠলে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করে সরকার। সম্প্রতি ঈদুল আজহা সামনে রেখে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কঠোর বিধিনিষেধ শিথিল করার ঘোষণা এসেছে। ব্যবসায়ী-শ্রমিকের জন্য এটি সুখবর হলেও উদ্বেগের বিষয় হলো, এমন এক সময়ে চলাচলে শিথিলতার ঘোষণা এল, যখন মৃত্যু ও করোনা শনাক্তের হারে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা বিদ্যমান। করোনার এ সময়ে এ সিদ্ধান্ত কোন পরিণতি ডেকে আনবে, তা বুঝতে হয়তো আরো কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। যে কারণেই বিধিনিষেধ শিথিল করা হোক না কেন, সবাই যেন যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলে, তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
নভেল করোনাভাইরাস এমনই এক পরিস্থিতি দাঁড় করিয়েছে যে একদিকে লকডাউনের বিকল্প নেই, অন্যদিকে জনস্বার্থ বিবেচনারও দাবি রাখে। এমন পরিপ্রেক্ষিতে উভয় দিক চিন্তা করতে হচ্ছে সংশ্লিষ্টদের। ঈদ সামনে রেখে ব্যবসা-বাণিজ্যসহ নানা খাত চাঙ্গা হয়। কিন্তু গত বছরের মতো এবারো সব খাত মন্দাক্রান্ত। এসব বিবেচনায় বিধিনিষেধ কিছুটা শিথিল হলেও শঙ্কা থেকে যায়। কারণ আমরা সর্বাত্মক লকডাউনের মধ্যেও অসচেতনতা দেখেছি। স্বাস্থ্যবিধি মানাতে প্রশাসনকে অনেক বেগ পেতে হচ্ছে। এছাড়া গণপরিবহন চালু হলেও সেখানে যে স্বাস্থ্যবিধি মানা হবে, এর কোনো নিশ্চয়তা নেই। ইউরোপ-আমেরিকার কথা আমরা প্রায় সবাই জানি। উন্নত দেশেও করোনার প্রভাবে সঙ্গিন অবস্থা। এমনকি আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত এখনো নাজুক অবস্থায় রয়েছে। আমরা যদি সেই অবস্থায় যেতে না চাই, তাহলে আমাদের এখনই সচেতন হতে হবে। এজন্য মাস্ক পরা, বিনা প্রয়োজনে বাইরে বের না হওয়া এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার কোনো বিকল্প নেই।
কভিড-১৯ সংক্রমণ বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। এ অবস্থায় দোকানপাট ও ব্যবসা-বাণিজ্য খুলে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে মিশ্র আলোচনা চলছে। এ মুহূর্তে এমন সিদ্ধান্ত ঠিক হলো কিনা, এ প্রশ্ন উঠেছে। আবার বিপুলসংখ্যক মানুষের দৈনন্দিন জীবিকাসহ অর্থনৈতিক বাস্তবতাও যে আর অস্বীকার করা চলে না, সেকথাও বলা হচ্ছে। একই বিবেচনায় পৃথিবীর অনেক দেশে লকডাউন শিথিল করা হয়েছে। তবে ঝুঁকির বিষয়টি কোথাও খাটো করে দেখা হচ্ছে না। যুক্তরাষ্ট্রের কোনো কোনো এলাকায় লকডাউন শিথিল করার সময় কর্তৃপক্ষ নাগরিকদের বলে দিয়েছে, এ শিথিলতার ফলে যদি সংক্রমণ আবার বাড়ে তাহলে আবারো লকডাউনের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুরের মতো দেশে সংক্রমণ বেড়ে ওঠায় লকডাউন দেয়া হয়েছে। আমাদের অর্থনৈতিক বাস্তবতা উন্নত দেশগুলোর মতো নয়। এ দেশে বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবনধারণ নির্ভর করে দৈনিক আয়-রোজগারের ওপর। তাদের আয় বন্ধ। সরকারি-বেসরকারি ত্রাণ তাদের জন্য পর্যাপ্ত নয়। অনেক মানুষ খাদ্যকষ্টের মধ্যে পড়েছে বলে খবর মিলছে। হতদরিদ্র, নিম্নমধ্যবিত্ত এমনকি মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানুষের পক্ষেও অনির্দিষ্টকাল ধরে কর্মহীন, রোজগারহীন থাকা সম্ভব নয়। এ বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে লকডাউন শিথিল করা বা কোথাও কোথাও তুলে নেয়া হলে স্বাস্থ্যগত দিকে যে বাড়তি ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে, তা-ও খেয়াল রাখা উচিত।
কোনো পরিস্থিতিতেই শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখার ক্ষেত্রে কোনো রকমের শিথিলতার সুযোগ নেই। গত ঈদুল ফিতরের আগে-পরে বিধিনিষেধের মধ্যে জনগণ নানা ভোগান্তি মাথায় নিয়ে ঈদযাত্রা করেছিল। জনগণের সিদ্ধান্ত ও সরকারের ভূমিকা নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনা হয়েছিল। কেউ কেউ বলেছিলেন, জনগণের মোটেও উচিত হয়নি বিধিনিষেধের মধ্যে যাত্রা করা। আবার কেউ কেউ বলেছিলেন, সরকারের উচিত ছিল স্বাস্থ্যবিধি মেনেই গণপরিবহন চালু রাখা। সেই পরিপ্রেক্ষিতেই হয়তো এ সিদ্ধান্ত। সাম্প্রতিক সময়ে করোনার ভারতীয় ধরন ডেল্টার ভয়াবহ প্রকোপে বেহাল সারা দেশে। সীমান্তবর্তী জেলাগুলো ছাড়াও প্রায় প্রতিটি জেলায়ই সংক্রমণ ও মৃত্যু দুই-ই বাড়ছে। অনেক হাসপাতালে আইসিইউ খালি নেই, নেই সাধারণ করোনা বেডও। অক্সিজেনের অভাব ও সরবরাহ বাড়াতে সরকারি-বেসরকারি তত্পরতা গণমাধ্যমে উঠে আসছে। সব মিলিয়ে এ পরিস্থিতি খুব একটা অনুকূল নয়। স্বাস্থ্যবিধি মেনে গণপরিবহন চলাচল, শপিংমল ও দোকানপাট খোলা থাকার কথা থাকলেও তা কতটুকু কার্যকর হবে, এ নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। যেহেতু এবারের সংক্রমণ ও মৃত্যুর ঢেউ রাজধানীর বাইরের জেলাগুলোয় বেশি, তাই ঈদের আগে-পরে তা বহুগুণ বেড়ে যেতে পারে বলে শঙ্কা। সাধারণ জনগণকে সচেতন হওয়ার পাশাপাশি মানতে হবে স্বাস্থ্যবিধি। তা নাহলে হয়তো করোনা যুক্তরাষ্ট্র-ভারতের মতো বাংলাদেশেও করুণ পরিণতি ডেকে আনতে পারে।
সবকিছু খুলে দেয়ার মধ্য দিয়ে মানুষের কাছে যেন এ বার্তা না যায় যে বিপদ কেটে গেছে। বরং আরো জোরালোভাবে বার্তা পৌঁছতে হবে যে বিপদ একটুও কমেনি; স্বাভাবিক কাজকর্ম চলাকালে মানুষে মানুষে সংস্পর্শের মাধ্যমে ভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকি আরো বেড়েছে। এখন প্রতিটি মানুষকে নিজের সুরক্ষার বিষয়ে আরো সচেতন হতে হবে। সংক্রমণ থেকে মুক্ত থাকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে নিজেকেই। আমাদের দেশে এখনো বিপুলসংখ্যক মানুষের মধ্যে নভেল করোনাভাইরাসের ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতনতা গড়ে ওঠেনি। ভাইরাসটির সংক্রমণের প্রক্রিয়া সম্পর্কে ধারণার অভাবে অনেক মানুষ সামাজিক ও শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখার গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পারে না। তাদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর লক্ষ্যে ব্যাপক প্রচারণার উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। গ্রাম, ইউনিয়ন ও পৌর শহরগুলোর ওয়ার্ড পর্যায়ে জনসচেতনতা বাড়ানোর ওপর বাড়তি জোর দিতে হবে। নতুনভাবে প্রচারণা শুরু করতে হবে প্রধানত এ বার্তা ছড়িয়ে দিতে যে প্রত্যেককে নিজের স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে স্বাস্থ্যবিধি যথাযথভাবে মেনে চলার মাধ্যমে। কোরবানি পশুর হাটে স্বাস্থ্যবিধি মেনে কেনাকাটা নিশ্চিত করতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সতর্ক থাকতে হবে। একই সঙ্গে টিকাদান কার্যক্রম আরো সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন।










