চট্টগ্রামের দীর্ঘদিনের সমস্যা জলাবদ্ধতা। সামান্য বৃষ্টিতেও ডুবে যায় নগরীর অনেক এলাকা। জলাবদ্ধতা নিরসনে তিনটি প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। দুঃখজনকভাবে প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন হচ্ছে ঢিমেতালে। এর মধ্যে ২০১৭ সালে নেয়া দুটি প্রকল্পের বাস্তবায়ন হার এখনো ৪০ শতাংশ, আর ২০১৮ সালে নেয়া প্রকল্পের অগ্রগতি ৪ শতাংশেরও কম বলে খবর মিলছে। প্রতি বর্ষায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হলে প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে বলা হয়, এবার নয়, আগামী বর্ষায় আর জলাবদ্ধতা থাকবে না। কিন্তু কথার সঙ্গে বাস্তবতার মিল নেই। চলতি বর্ষায়ও ঠিকই নগরের প্রধান প্রধান সড়ক, উপসড়ক, অলিগলিসহ অধিকাংশ এলাকায় ভয়াবহ জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। এতে অবর্ণনীয় দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে নগরবাসীকে। প্রকল্পগুলো যথাযথ সময়ে বাস্তবায়ন হলে এমনটি হতো না। তাই আর দীর্ঘসূত্রতা নয়, জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রকল্পগুলো দ্রুত শেষ করতে হবে। এক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের সচেষ্টতা জরুরি।

সমস্যার প্রকটতা বিবেচনায় চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতার বিষয়টি সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অনেক দিন ধরে বড় ইস্যু হিসেবে হাজির। মেয়র প্রার্থীরা বরাবরই এটিকে নির্বাচনী ইশতেহারে নিজস্ব প্রাধিকার তালিকায় রাখছেন। জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসছেন। বর্তমান মেয়রেরও অন্যতম নির্বাচনী ওয়াদা এটি। এর আগে বিদায়ী মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনও নির্বাচনের আগে প্রতিশ্রুতি দিয়ে বলেছিলেন, জলাবদ্ধতা একটি সমাধানযোগ্য সমাধান। আন্তরিকভাবে চেষ্টা করলে এবং কয়েকটি বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নিলে জলাবদ্ধতা থেকে নগরবাসীকে মুক্তি দেয়া সম্ভব। অথচ তার পুরো সময়েই জলাবদ্ধতার সমাধান তো হয়নি, বর্তমান মেয়র দায়িত্ব গ্রহণের পাঁচ মাস অতিক্রান্ত হলেও এক্ষেত্রে দৃশ্যমান কোনো উন্নতি নেই। বছরের পর বছর জলাবদ্ধতায় ভুগছে চট্টগ্রামবাসী। বন্দরনগরীর জলাবদ্ধতার প্রধান কারণ নাজুক ড্রেনেজ ব্যবস্থা। পাহাড় কাটার কারণে এর মাটি ও বালি বৃষ্টির পানির সঙ্গে এসে নালা-নর্দমা ভরাট হয়ে যাচ্ছে। আবার যেসব নালা-নর্দমা আছে, সেগুলো বেদখল করে অবৈধ স্থাপনা তৈরি করা হচ্ছে এবং সেখানে ময়লা-আবর্জনা ফেলা হচ্ছে। এতে পানি চলাচলে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়েছে। সর্বোপরি, খাল দিয়ে প্রবাহিত হয়ে পানি কর্ণফুলী নদীতে পড়ার মুখগুলো উঁচু হয়ে গেছে। ফলে জোয়ারের সময় নদীর পানি সহজে প্রবেশ করছে, পরে আর বের হতে পারছে না। সব মিলিয়ে সৃষ্টি হচ্ছে জলাবদ্ধতা।

জলাবদ্ধতা কেবল ঢাকা বা চট্টগ্রাম শহরের নয়, ভারতসহ বিশ্বের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শহরের সমস্যা। এক্ষেত্রে বড় সমাধান হলো টেকসই ও স্মার্ট পানি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা। নগরের জলাবদ্ধতা নিরসনে উন্নত দেশগুলোয় আজকাল অটোমেটেড সিস্টেম গড়ে তোলা হয়েছে, যা রাস্তা বা অন্য যেকোনো স্থানের জলাবদ্ধ পরিসরগুলো চিহ্নিত করা, ব্যাপক রিয়েল টাইম তথ্য ও চিত্র প্রদান, মডেলিং এবং জলাবদ্ধতা নিরসনে তাত্ক্ষণিক বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে সহায়ক। ভারতের মুম্বাইয়েও এ ধরনের স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা গড়ে তোলার  উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। পানি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে আরো কিছু উত্তম চর্চা বিদ্যমান। সেগুলোর মধ্যে রয়েছে গ্রিন রুফ, ফিল্টার স্ট্রিপ, বৃষ্টির পানি হার্ভেস্টিং, জলাধার গড়ে তোলা, জলভেদ্য ফুটপাত, গ্রাস চ্যানেল, বায়ো রিটেনশন পন্ড ইত্যাদির ব্যবহার বাড়ানো। অনেক দেশই এ ধরনের উদ্যোগগুলো গ্রহণ করেছে এবং তাদের জাতীয় নীতিমালার সঙ্গে অঙ্গীভূত করেছে। বিশেষত যুক্তরাষ্ট্র ও জার্মানির কিছু শহরে গ্রিন রুফ ও পানির পুনর্ব্যবহার পদ্ধতির মাধ্যমে টেকসই নগর পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা (এসইউডিএস) গড়ে তোলা হয়েছে। ফলে সেখানে জলাবদ্ধতা নেই বললেই চলে। আমাদের জন্য ওইসব দেশের অভিজ্ঞতাগুলো শিক্ষণীয় বৈকি।

আমরা দেখছি আমাদের শহরগুলো, বিশেষ করে ঢাকা ও চট্টগ্রামের অপরিকল্পিত সম্প্রসারণ ঘটছে। মানুষ বাড়ছে। যেখানে-সেখানে তৈরি করা হচ্ছে অবকাঠামো। কংক্রিটের আচ্ছাদনে ভরে যাচ্ছে সর্বত্র। সবুজের আচ্ছাদন বা পানি শোষণের ব্যবস্থাগুলো ম্রিয়মাণ হচ্ছে। নগরে জলাধার, বন্যাপ্রবাহ এলাকা কমছে। আগে ফুটপাতগুলো ছিল জলভেদ্য। এখন সেগুলো পানি প্রবেশ অনুপযোগী ফুটপাতে (ইমপারমিয়েবল পেভমেন্ট) রূপান্তর করা হয়েছে। ফলে ভূগর্ভে পানি যাওয়ার সুযোগ হ্রাস পেয়েছে। আজকে চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা সমস্যা এসবের সম্মিলিত ফলই বৈকি।

প্রকল্পগুলো নেয়া হয়েছিল খাল খনন, সম্প্রসারণ, উন্নয়ন, মহানগরীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ, পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা উন্নয়নের মাধ্যমে জলাবদ্ধতা নিরসনে। এ প্রকল্পগুলোর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে চট্টগ্রাম নগর কর্তৃপক্ষ (সিডিএ), সিটি করপোরেশন, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও পানি উন্নয়ন বোর্ড। কিন্তু ভূমি অধিগ্রহণে জটিলতা ও প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যকার সমন্বয়হীনতার কারণে প্রকল্পগুলো দীর্ঘসূত্রতায় আটকা পড়েছে। সন্দেহ নেই, প্রকল্পগুলো যথাসময়ে বাস্তবায়ন হলে চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতার একটা সামাধান মিলবে। কাজেই সমন্বয়হীনতা দূর ও তদারকি ব্যবস্থা জোরদার করে প্রকল্পগুলো দ্রুত শেষ করা বাঞ্ছনীয়।

অস্থায়ী নয়, চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতার একটা দীর্ঘস্থায়ী সমাধান দরকার। এজন যথেষ্ট গবেষণা ও সময়োপযোগী পরিকল্পনা নিতে হবে। কর্ণফুলী নদী নিয়মিত ড্রেজিং করে গভীরতা বাড়াতে হবে। নদীসংলগ্ন অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করতে হবে। নগরের সব খাল নিয়মিত খনন এবং রাস্তার পাশে নালার প্রশস্ততা ও গভীরতা বাড়াতে হবে। বন্ধ করতে হবে জলাশয়, ডোবা ও পুকুর ভরাট। টেকসই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে। পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার প্রতিবন্ধকতা, খাল ও নালা-নর্দমার অপদখল এবং ড্রেনেজ ব্যবস্থার ত্রুটিগুলো চিহ্নিত করা প্রয়োজন। বৈশ্বিক অভিজ্ঞতাগুলো পর্যালোচনা করে টেকসই পানি ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে। রেইনওয়াটার হার্ভেস্টিংয়ে জোর দিতে হবে। সর্বোপরি ড্রেনেজ মহাপরিকল্পনার বাস্তবায়ন জরুরি। এটি প্রণয়নের পর অনেক সময় চলে গেছে। এখন এ মহাপরিকল্পনা সংশোধন ও পরিমার্জন করতে হবে এবং সুষ্ঠু বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। সেবা সংস্থাগুলোর সমন্বিত প্রয়াসে চট্টগ্রাম নগরের জলাবদ্ধতার অবসান হোক, এটিই প্রত্যাশা।