বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন করছে বাংলাদেশ। এ সময়ে শিল্প-কারখানা কয়েক গুণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হলেও কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু নিয়ন্ত্রণে আনা যায়নি। নিরাপত্তার বিষয়টি এখনো প্রশ্নবিদ্ধ। সোমবার বণিক বার্তায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ (বিলস) সূত্রে বলা হয়েছে, গত বছর ১ হাজার ৫৩ জন শ্রমিক প্রাণ হারিয়েছেন, আহত হয়েছেন ৫৯৪ জন। ২০২০ সালে কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় ৪৩৩ জন প্রাণ হারান। উল্লেখ্য, লকডাউনে অধিকাংশ কল-কারখানা বন্ধ থাকায় এ সংখ্যা ছিল কম। এক বছরের তুলনামূলক বিশ্লেষণে কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় হতাহতের পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। এটা স্পষ্ট, অবকাঠামোগত নিরাপত্তা নিশ্চিতের পাশাপাশি কর্মীদের নিরাপত্তা বাড়াতে সরকার ও উদ্যোক্তাদের আরো মনোযোগ দেয়া প্রয়োজন।

উন্নত-অনুন্নত প্রায় সব দেশেই কর্মক্ষেত্রে কমবেশি দুর্ঘটনা ঘটে থাকে। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। তবে আমাদের দেশের পরিস্থিতি যে খানিকটা ভিন্ন তা এড়ানোর অবকাশ নেই। কর্মক্ষেত্রে কর্মীদের প্রাণহানির কারণগুলোর মধ্যে বিদ্যুত্স্পৃষ্ট, অগ্নিকাণ্ড, বয়লার বা সিলিন্ডার বিস্ফোরণ, দেয়াল-ভবন-ছাদ-মাটিধস, ভবন থেকে পড়ে যাওয়া ইত্যাদি মুখ্য। প্রতিটি ক্ষেত্রে যথাযথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও উদ্যোগ নেয়া হলে বহুলাংশেই দুর্ঘটনাজনিত প্রাণহানি কমিয়ে আনা সম্ভব। এ ব্যাপারে বিশ্বস্বীকৃত নীতি হলো—‘সেফটি ফার্স্ট’ বা নিরাপত্তাই প্রথম। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নিরাপত্তামূলক আনুষঙ্গিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না বলে শিল্প দুর্ঘটনায় মৃতের সংখ্যা বাড়ছে। দুঃখজনক বাস্তবতা হচ্ছে, এজন্য প্রয়োজনীয় আইন ও বিধিবিধান থাকলেও তা যথাযথভাবে কার্যকর হয় না। বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এর আওতায় স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা বিধানের যে নিয়ম রয়েছে, তার যথাযথ বাস্তবায়ন এবং জাতীয় পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নীতিমালা, ২০১৩ সঠিকভাবে প্রয়োগ করা গেলে পরিস্থিতির নিশ্চিতভাবেই উন্নতি সম্ভব। এক্ষেত্রে নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার দায়িত্ব কারখানা মালিক ও সরকারের।

কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করার তাগিদ নানা মহল থেকেই বারবার দেয়া হচ্ছে। এসব ক্ষেত্রে তদারকির দায়দায়িত্ব যাদের রয়েছে, তাদের উদাসীনতা কিংবা যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন না করার অভিযোগও কম নয়। অর্থনৈতিক অগ্রগতি কিংবা উন্নয়ন গতি যতই বাড়ছে, এর সঙ্গে কর্মপরিবেশের উন্নয়ন ও কর্মীদের নিরাপত্তার বিষয়টি ততই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। টেকসই উন্নয়নের অন্যতম পূর্বশর্ত হচ্ছে, কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এ ব্যাপারে কোনো রকম শৈথিল্য কাম্য নয়। এক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের কর্ণধারদের তাদের কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তামূলক উপকরণ সরবরাহ করা উচিত। একই সঙ্গে কর্মীদের সচেতনতা ও সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলের নিবিড় তদারকিও জরুরি। শিল্প-কারখানা কিংবা যেকোনো প্রতিষ্ঠানের কাজের ধরন অনুযায়ী নিরাপত্তার ব্যাপারে কর্মীদের প্রশিক্ষণের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের নীতিমালায় স্পষ্টভাবে কর্মস্থলে নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিতকরণের কথা বলা থাকলেও তার যথাযথ প্রয়োগ না হওয়াটা দুঃখজনক। শ্রম আইনের নিয়মনীতির যথাযথ প্রয়োগ জীবনের নিরাপত্তার প্রয়োজনেই বাঞ্ছনীয়।

শ্রম আইন ২০০৬ ও ইপিজেড শ্রম আইন ২০১৯-এ নিরাপদ কর্মপরিবেশকে গুরুত্ব দিয়ে মোট ৪১টি ধারা সংযুক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি এ আইনগুলোতে দুর্ঘটনার কারণে ক্ষতিপূরণের বিধান রাখা হয়েছে। অনানুষ্ঠানিক খাতের অসংগঠিত শ্রমিকদের কল্যাণ ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে ২০১৫ সালে অসংগঠিত শ্রমিক কল্যাণ ও সামাজিক নিরাপত্তা (অনানুষ্ঠানিক খাত) আইন প্রণীত হয়। গৃহকর্মে নিযুক্ত বিপুল জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা ও কল্যাণার্থে আইন প্রণয়নের প্রাথমিক ধাপ হিসেবে ২০১৫ সালে প্রণীত হয়েছে গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতি। কল-কারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর ২০১৬ সালে শ্রম পরিদর্শনসংক্রান্ত জাতীয় কৌশলপত্র প্রণয়ন করে। এর প্রধান উদ্দেশ্য হিসেবে বর্ণিত হয়েছে পরিদর্শন ব্যবস্থার মাধ্যমে শোভন কর্মপরিবেশ তৈরি করা ও শ্রমিকদের কার্যকর সুরক্ষা প্রদান করা। কল-কারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের বিধান অনুযায়ী যেসব  কল-কারখানা বা শিল্পপ্রতিষ্ঠানে ৫০ বা তার অধিক শ্রমিক নিয়োজিত আছেন, তাদের সেফটি কমিটি গঠন করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু আইনের এসব বিধান অধিকাংশ কল-কারখানাই মানছে না, যার কারণে দুর্ঘটনায় প্রাণহানি বাড়ছে।

কারখানা নির্মাণের চেকলিস্ট থাকে। চেকলিস্ট অনুযায়ী কারখানায় অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক ক্ষেত্রে বেশকিছু কাজ ও নিয়ম মানার বিষয় থাকে। এক্ষেত্রে কারখানা শুরুর আগের কিছু বিষয় থাকে, কিছু বিষয় কারখানা চলমান বা চালু অবস্থায় করতে হয়। এটা কারখানার ধরন ও অবস্থার আলোকে হয়ে থাকে। যেমন কারখানা প্রতিষ্ঠার জন্য ট্রেড লাইসেন্স, কারখানা লে-আউট প্ল্যান, পরিবেশ ছাড়পত্র, যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন, যোগাযোগ ব্যবস্থা, নিজস্ব অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি প্রবেশের জন্য রাস্তা, প্রয়োজনীয় জেনারেটর, বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা, পয়োনিষ্কাশন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, শ্রমিকদের প্রবেশ ও বহির্গমনসহ মালিকদের ২০১৫ সালের শ্রম আইন ও বিধি বিধানসহ কতগুলো পূর্বশর্ত মানতে হয়। এসব ঠিকঠাক করে কারখানা প্রতিষ্ঠা করার পাশাপাশি কল-কারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর (ডিআইএফই), ফায়ার সার্ভিস ও বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষসহ (বিডা) যথাযথ কর্তৃপক্ষের তদারকি ও কার্যকর পরিদর্শন হলে কারখানার টেকসই পরিবেশ রক্ষা ও অগ্নির ঘটনা ও বিস্ফোরণসহ নানা ধরনের দুর্ঘটনা এড়ানো যায়।

শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের কাঠামোগত দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করে পরিদর্শনের আলোকে অগ্নি ও অন্যান্য দুর্ঘটনা নিরোধের বিদ্যমান অবস্থা পর্যালোচনা করতে হবে। নিতে হবে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ, যাতে কারখানায় নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত হয়। এটি করা না গেলে বহির্বিশ্বে আমাদের ভাবমূর্তি নেতিবাচকই থেকে যাবে। পোশাক রফতানিসহ আমাদের চামড়া রফতানি, কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য, জুতা ও বাইসাইকেলসহ রফতানি পণ্যগুলো বিদেশে নির্বিঘ্নে রফতানিতে যে ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে, তাতে সব কারখানা ও তার পরিবেশের প্রতিবন্ধকতা দূরকল্পে সরকারি নীতিসহায়তা ও তদারকি আরো জোরদার করা উচিত।

কর্মক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মান অর্জনে বাংলাদেশ এখনো পিছিয়ে। নিরাপত্তা সম্পর্কিত আইএলও কনভেনশনগুলো অনুমোদন এবং সে অনুযায়ী আইন সংস্কার জরুরি। প্রবাসী শ্রমিকসহ বেসরকারি খাতে যেসব শ্রমিক রয়েছেন, তাদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় আনতে হবে। কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনা এড়াতে সেফটি অ্যান্ড রাইটস শ্রম আইন অনুসরণ করে কারখানায় নিরাপত্তা কমিটি গঠন, প্রয়োজনে খাতভিত্তিক নিরাপত্তা আইন প্রণয়ন, বাংলাদেশ বিল্ডিং কোড ২০০৬ যথাযথ বাস্তবায়ন, আইন বাস্তবায়নে রাজউক, কল-কারখানা প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরসহ অন্যান্য নিয়ন্ত্রক সংস্থার তদারকি বাড়াতে হবে।