চলছে করোনা মহামারী। সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে নেয়া সরকারি বিধিনিষেধে এ সময় পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রমে অনেকটা ভাটা পড়েছে। ফলে অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ, বাল্যবিবাহ ও শিশুজন্মের তালিকা দীর্ঘ হচ্ছে বলে খবর মিলছে। আমাদের মোট জনসংখ্যায় যা বাড়তি ও অনাবশ্যক চাপ সৃষ্টি করছে। এমন এক প্রেক্ষাপটে রোববার দেশে অনাড়ম্বরভাবে পালিত হলো বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস। বিগত সময়ে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য অর্জন থাকলেও এখন তা কিছুটা ঝুঁকিতে। জনসংখ্যা দিবস উপলক্ষে আয়োজিত ভার্চুয়াল সভায় বক্তাদের ভাষ্যেও বিষয়টি উঠে এসেছে। দ্রুত সময়োপযোগী কর্মকৌশল না নিলে জন্মহার নিয়ন্ত্রণ আবারো কঠিন হবে। তাই বিষয়টি আমলে নিয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি।
দেশে একটি কাম্য জনসংখ্যা নিশ্চিতে গত শতকের আশির দশক থেকে সুপরিকল্পিত উদ্যোগ নেয়া হয়। বেগবান করা হয় পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম। সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থার সম্মিলিত প্রয়াসে জনসাধারণকে জন্মনিয়ন্ত্রণে উদ্বুদ্ধ করা হয়। বিভিন্ন জন্মনিয়ন্ত্রণের উপায়-পদ্ধতি সম্পর্কে প্রচারাভিযান চালানো হয়। তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত জন্মনিয়ন্ত্রণ উপকরণ করা হয় সুলভ ও সহজলভ্য। এর সুফল মেলে ধীরে ধীরে। গত শতকের নব্বইয়ের দশকের প্রথম থেকে আমাদের দেশে প্রজনন হার কমতে থাকে। আগে মোট প্রজনন হার (টিআরএফ) যেখানে ৬ দশমিক ৪ ছিল, বিবিএসের হিসাবে এখন তা ২ দশমিক ৩। বাস্তবসম্মত জনসংখ্যা নীতি গ্রহণ, নারীশিক্ষার প্রসার প্রভৃতি কারণে এটি সম্ভব হয়েছে। এর হাত ধরে লক্ষণীয় মাত্রায় শিশু ও মাতৃমৃত্যুও কমেছে। ফলে বাংলাদেশ উচ্চ মরণশীল ও প্রজননক্ষম সমাজ থেকে নিম্ন মরণশীল ও প্রজননক্ষম সমাজে পরিণত হয়েছে। জনসংখ্যাবিদরা একে জনমিতিক রূপান্তর বলেছেন। নিঃসন্দেহে এটা এক বড় অর্জন। দুঃখজনকভাবে করোনাকালে এ অর্জন হুমকিতে পড়ছে। বিভিন্ন গবেষণায় এ সময় অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ, গর্ভপাত, অনিরাপদ সন্তান প্রসবের মতো ঘটনাগুলো বাড়ার তথ্য উঠে এসেছে। এটি একটি নতুন চ্যালেঞ্জ বৈকি। জরুরি ভিত্তিতে এদিকে দৃষ্টি দেয়া প্রয়োজন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিবেদনে অনেক দেশে মহামারীতে অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণের ফলে শিশু ও মাতৃমৃত্যুর পাশাপাশি জনসংখ্যা বাড়ার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোয় এ সমস্যা আরো প্রকট হচ্ছে। আগে থেকে এসব দেশে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ রাষ্ট্রীয় নীতি-পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। এখন চ্যালেঞ্জটি আরো বাড়ছে। মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ভারত, ইরান, শ্রীলংকা প্রভৃতি দেশ এ স্বাস্থ্য দুর্যোগের মধ্যেও এজন্য পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম জোরদার করেছে। এখন সেখানে মাঠকর্মীরা আগের মতো ফিল্ড ভিজিট করতে না পারলেও তারা সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নানা সচেতনতামূলক প্রচারাভিযান চালাচ্ছেন। কমিউনিটি রেডিওতে প্রজনন স্বাস্থ্যবিষয়ক প্রয়োজনীয় তথ্যগুলো তুলে ধরছেন। বলতে গেলে প্রতিটি যোগাযোগ মাধ্যমই তারা এক্ষেত্রে কাজে লাগাচ্ছেন। বর্তমান প্রেক্ষাপটে এগুলো আমাদের জন্য শিক্ষণীয় বৈকি। পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের সুখী পরিবার নামের কল সেন্টারে এরই মধ্যে ‘১৬৭৬৭’ একটি নম্বর বিদ্যমান। এতে ফোন করলে চিকিৎসকের কাছ থেকে সরাসরি পরিবার পরিকল্পনা-সংক্রান্ত সেবা ও তথ্য পাওয়া যায়। এজন্য আলাদা একটি অ্যাপও করা যেতে পারে। বলা চলে, নানা উদ্ভাবনী উপায়ে জন্মনিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম বেগবান করার বিকল্প নেই।
ছোট আয়তনের দেশে আগে থেকেই জনসংখ্যা বেশি। আবার ১২ লাখ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী বর্তমানে এখানে শরণার্থী হিসেবে রয়েছে। তার মধ্যে হঠাৎ করে অনিয়ন্ত্রিতভাবে জনসংখ্যা বাড়ার বিষয়টি বেশ উদ্বেগজনক। এতে কর্মসংস্থানে বাড়তি চাপ সৃষ্টি হবে। এখন শিক্ষিত তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার বেশি। জনসংখ্যা বাড়লে তাদের জন্য অভ্যন্তরে কর্মসংস্থান সৃষ্টি সহজ হবে না। তদুপরি বাইরে বাংলাদেশের শ্রমবাজারও আরো চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। একে তো আমাদের শ্রমিকদের দক্ষতার ঘাটতি প্রবল, আবার চাহিদার ভিত্তিতে নতুন বাজার সন্ধানেও ঘাটতি আছে। শ্রীলংকা, ভারত, ফিলিপাইন যেভাবে বাইরে শ্রমিক পাঠাচ্ছে, আমরা সেভাবে পারছি না। বড় কথা, করোনার অভিঘাতে প্রতিটি দেশের অর্থনীতিই মন্দাক্রান্ত। এ অবস্থায় অনেক দেশে অভিবাসন রাষ্ট্রীয়ভাবে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। সুতরাং বাড়তি জনসংখ্যা অভ্যন্তরীণ ও বহিস্থ উভয় শ্রমবাজারের জন্য চাপের বৈকি। রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বের এটা মাথায় রাখা চাই।
জনসংখ্যার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জন্য আরেকটি চ্যালেঞ্জ হলো বয়স কাঠামোর দ্রুত পরিবর্তন। বর্তমানে দেশের মোট জনসংখ্যায় ১৫ থেকে ৬৫ বছর বয়সীরাই বেশি। তারা বেশি কর্মক্ষম ও উৎপাদনশীল হয় এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নে মূল অবদান রাখে। আমাদের এখানে জনসংখ্যাভিত্তিক এ উন্নয়নের শুরু হয়েছিল ১৯৭৮ সালে। প্রক্ষেপণ অনুযায়ী এটা চলবে ২০৩৩ সাল পর্যন্ত। অর্থাৎ বাংলাদেশের সামনে সুযোগটি ছিল ৫৫ বছরের। বর্তমানে ২০২১ সালে এসে দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশের হাত থেকে ৪৩ বছর চলে গেছে। অর্থাৎ ৭৮ শতাংশ সময় শেষ হয়ে গেছে। হাতে আছে আর মাত্র ১২ বছর। এ সময়কে দ্রুত কাজে লাগাতে হবে। দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, হংকং, তাইওয়ান, জাপানসহ এশীয় অর্থনৈতিক বিস্ময়ের দেশগুলো জনমিতিক বোনাস যথাযথভাবে কাজে লাগিয়েছে। ফলে দেশগুলোর দ্রুত অর্থনৈতিক অগ্রগতি ঘটেছে। ওইসব দেশের নীতি ও অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করে জুতসই পরিকল্পনা নেয়া যেতে পারে।
প্রাকৃতিক নিয়মেই দেশ একসময় প্রবীণ সমাজে পরিণত হবে। ইউনিসেফের হিসাবে তা ২০২৯ সালের মধ্যেই ঘটতে শুরু করবে। সে হিসেবে সময় খুব বেশি নেই। প্রবীণের সংখ্যা বৃদ্ধি মানে সামাজিক নিরাপত্তায় বাড়তি চাপ সৃষ্টি হবে। সুতরাং এখন থেকেই এক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় প্রস্তুতি নিতে হবে। জাপান, ইতালি, চীন, সিঙ্গাপুরসহ কিছু দেশে প্রবীণ জনগোষ্ঠী বাড়ছে। ওইসব দেশ কীভাবে এ সমস্যা মোকাবেলা করছে, কী ধরনের নীতি ও কৌশল নিচ্ছে, তা আমাদের জন্য সহায়ক হবে।
সীমিত সম্পদের দেশে একদিকে জনসংখ্যার অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধি ঘটছে, অন্যদিকে দ্রুতই বয়োবৃদ্ধ জনগোষ্ঠী বেড়ে যাবে। এ প্রেক্ষাপটে প্রথমত করোনাকালে কত শিশু জন্মগ্রহণ করেছে, শিশু ও মাতৃমৃত্যু কতটা হয়েছে সরকারিভাবে তা নিয়ে একটি জরিপ হওয়া প্রয়োজন। সামনে জনশুমারি শুরু হতে যাচ্ছে। এতে বয়সকাঠামোর পরিবর্তনের বিষয়টি যথাযথভাবে তুলে আনতে হবে। নতুন বাস্তবতায় নির্ভরযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে একটি সময়োপযোগী জনসংখ্যা নীতি গ্রহণ ও তার সুষ্ঠু বাস্তবায়নই কাম্য।










