পৌষের সন্ধ্যা গড়িয়ে রাতে অফিস শেষে বাড়ির উদ্দেশে রওনা। চলমান বাসে দাঁড়িয়ে আছে ক্লান্ত-তন্দ্রাচ্ছন্ন শরীরখানা। চারপাশের মানুষের হট্টগোলের মাঝে থেকেও মনে বারবার আসছে মায়ের হাতে বানানো হরেক রকমের শীতের পিঠার সেই স্মৃতি। নিজ গন্তব্যে পৌঁছে বাস থেকে নেমে ফুটপাত ধরে এগোতে গিয়ে হঠাৎ নজর আটকে গেল ছোট্ট ছিমছাম পিঠার ভ্রাম্যমাণ স্টলে। গরম ধোঁয়া ওঠা ভাপা পিঠার লোভ সামলাতে না পেরে কাছে গিয়ে বসে পড়লাম। পিঠা খেতে খেতে বার্তালাপে জানা গেল পিঠার স্টলের মালিকের নাম মোহাম্মদ জসিম থাকেন মোহাম্মদপুরের বছিলায়। মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ডের কাছে মোহাম্মদ জসিমের এ ছোট্ট ভ্রাম্যমাণ ছিমছাম খাবার স্টল। ব্যবসা করছেন প্রায় পাঁচ বছর। করোনার সময়ে ব্যবসায় লস করে বসে ছিলেন অনেক দিন। গত বছর ধারদেনা ও নিজের জমানো পুঁজি নিয়ে আবারো শুরু করেছেন ব্যবসা। স্টলের দৈনিক রসদপাতি ও অন্যান্য খরচ দিয়েও কিছুটা লাভ থেকে যায়। জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাওয়ায় ব্যবসায় আগের মতো লাভ আসে না। তার পরও এ দিয়ে চলছে তার সংসার, যেখানে আছে মা, স্ত্রী, ও সন্তান। এ ব্যবসার আয় থেকে নিজের বোনের বিয়ের খরচ দিয়েছেন জসিম। তবে জসিমের শুরুটা ছিল একটা টেবিল দিয়ে মোবাইল রিচার্জ করার মাধ্যমে। নানা চড়াই-উতরাই পার করে আজ এ ব্যবসায় আছেন তিনি। মূলত মৌসুম অনুযায়ী খাবারের ব্যবসায় ভিন্নতা আনেন তিনি ছোট ফুড স্টলে কখনো ফলের জুস, লাচ্ছি, ঠাণ্ডা কফি, কখনো আবার মিনি বার্গার আর শীত মৌসুমে তো চলছে ভাপা, চিতই পিঠা সঙ্গে হরেক রকমের ভর্তা। স্বল্প মূলধনে পথখাবারের ব্যবসা করতে গিয়ে নানা বাধা ও প্রতিকূলতার মোকাবেলা করে চালিয়ে যাচ্ছেন ব্যবসা, সঙ্গে জীবন-যুদ্ধ।

রাজধানী ঢাকার ফুটপাত ও রাস্তায় এমন হাজারো জসিমের গল্প রয়েছে। নগরীর সড়কে রাস্তার ধারে ধারে গড়ে উঠেছে নানা ব্যঞ্জনের পথখাবার বা স্ট্রিট ফুড কার্ট ও স্টল। এসব ব্যবসা যারা করছেন তাদের বেশির ভাগই স্বল্পশিক্ষিত অথবা কাজের সন্ধানে গ্রাম থেকে শহরে আসা মানুষ। তবে এদের মাঝে আবার অনেকে আছেন যারা শিক্ষিত কিন্তু চাকরি না পেয়ে স্বল্প মূলধন দিয়ে উদ্যোক্তা হিসেবে শুরু করেছেন। ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের ঢাকা শহরে অনেকে যেমন শখ করে ফুটপাতের পথখাবার খেয়ে থাকেন, তেমনিভাবেই বিপুলসংখ্যক মানুষ নিতান্ত প্রয়োজনে পথের খাবার খেয়ে থাকে। চাকরিজীবী, শিক্ষার্থী, তরুণ-তরুণী, স্বল্প ও মধ্য আয়ের মানুষের কাছে সুলভ মূল্যে খাবার পাওয়ার অন্যতম জায়গা হলো এ পথ খাবারের স্টলগুলো। এখনকার মূল্যবৃদ্ধির সময়ে সাশ্রয়ী মূল্যে স্বাদ, সাধ্য এবং সময় বাঁচানোর খাতিরে লোকেরা এসব পথখাবারের দোকানে ভিড় জমায়। বিশেষ করে বাণিজ্যিক অফিস-আদালত এলাকায় স্বল্প আয়ের মানুষের অন্যতম ভরসা এ পথখাবার। বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের গবেষণায় প্রতিদিন প্রায় ৬০ লাখ মানুষ ঢাকায় পথখাবার খেয়ে থাকে, কিন্তু এখন আর শুধু বাণিজ্যিক এলাকায় নয়, শহরজুড়ে নানা জনপ্রিয় কেন্দ্র বা হাব তৈরি হয়েছে এ পথখাবারের কালচার ঘিরে। ঢাকার ধানমন্ডি, খিলগাঁও, মোহাম্মদপুর, মিরপুর ৬০ ফিট, বালুর ব্রিজ, কালশী, গুলশান, বনানী এবং পুরান ঢাকায় গড়ে উঠেছে স্ট্রিট ফুড কালচারের কেন্দ্র হিসেবে।

পথখাবার দিয়ে বিশ্বে বিভিন্ন দেশ বেশ জনপ্রিয় ও সমাদৃত, যেমন থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, ভিয়েতনাম, ফিলিপাইন, মালয়েশিয়া এসব দেশের স্ট্রিট ফুড বা পথখাবারের ব্যবসা তাদের অর্থনীতিতে যেমন সহায়তা করছে, তেমন করে সেখানকার সভ্যতা-সংস্কৃতি তুলে ধরছে। এমনকি সিঙ্গাপুরকে স্ট্রিট ফুডের রাজধানী বলে ডাকা হয়। থাইল্যান্ডে ২০২২ সালে এক জরিপ অনুযায়ী প্রায় সাড়ে চার লাখ পথখাবারের দোকান আছে। ২০২২ সালে পথখাবার দোকানগুলোর বাজারমূল্য প্রায় ১৮৬ মিলিয়ন থাই মুদ্রা ধরা হয়েছিল, যা থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় এ স্ট্রিট ফুড বা পথখাবারের সম্ভাবনা বাংলাদেশে কতটা রয়েছে।

নগরীর ফুটপাতের পথখাবার নিয়ে কথা এলেই এর নেতিবাচক দিক আলোচনায় বেশি থাকে, যদিও তার যথেষ্ট কারণ বিদ্যমান। পথখাবারের ক্ষুদ্র ব্যবসায় রয়েছে সম্ভাবনা ও সুযোগ। এ পথখাবার ব্যবসায় আগে থেকে থাকা সমস্যার সঙ্গে করোনা ও করোনা-পরবর্তী সময়ের নানা সীমাবদ্ধতা যুক্ত হয়েছে। পথখাবারের সবচেয়ে বড় সমালোচনা হলো এখানে অনিরাপদ, অপরিষ্কার পরিবেশ, অস্বাস্থ্যকর মানের খাবার পরিবেশন করা হয়। এর সঙ্গে রয়েছে ভেজাল, নকল ও ক্ষতিকর নিম্নমানের খাদ্যসামগ্রী ব্যবহার, যা দিয়েই খাবার প্রস্তুত করা হয়। আইসিডিডিআর,বি গবেষণা দেখা যায়, ঢাকার ৫৫ শতাংশ পথখাবারে নানা ধরনের জীবাণু রয়েছে আর খাবার বিক্রেতার ৮৮ শতাংশের হাতে জীবাণু থাকে। পথখাবার দোকানগুলোর আরেক অসুবিধা হচ্ছে রাস্তার বিরাট অংশ দখলের মাধ্যমে পথচারীদের জন্য বানানো ফুটপাত দখল করে রাখে তারা।

ঢাকার পথখাবারের কার্ট ও স্টলগুলো সাশ্রয়ী দামে বিভিন্ন শ্রেণী-পেশা মানুষের খাদ্য ব্যবস্থা করছে। একই সঙ্গে ক্ষুদ্র পর্যায়ে উদ্যোক্তা তৈরি করছে, যা একসঙ্গে বেকারত্ব ও কর্মসংস্থান সমস্যার সমাধান করছে। যদিও আমাদের দেশে পথখাবারের মান নিশ্চিত করা বর্তমানে বড় একটা চ্যালেঞ্জ। শুধু সময়ে সময়ে অভিযান, জরিমানা করে এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা কঠিন। বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ) থেকে স্ট্রিট ফুডকে আরো কীভাবে নিরাপদ করা যায়, সে লক্ষ্যে স্ট্রিট ফুড বিক্রেতাদের কীভাবে ট্রেনিং দেয়া যায়, তাদের কী কী সুবিধা অসুবিধা আছে তা সম্পর্কে একটা খসড়া গাইডলাইন তৈরির কথা থাকলেও সেটা আজও বাস্তবায়ন হয়নি। এখন পর্যন্ত পথের খাবার নিরাপদ করতে তেমন বিশেষ উদ্যোগ নেয়নি সরকার।

সরকারের উচিত হবে বাণিজ্যিক ও অন্যান্য এলাকায় নিরাপদ খাদ্য জোন তৈরি করা। পথখাবার নিরাপদ খাদ্য মান বজায় রাখতে সরকারকে সিটি করপোরেশনসহ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সংস্থার সমন্বয়ে পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রাথমিকভাবে ঢাকা সিটি করপোরেশনের আওতাধীন পথখাবারের দোকান বা কার্টগুলোর তালিকা করা যেতে পারে। সে তালিকা অনুসারে পথখাবার ব্যবসায়ীদের নিরাপদ স্বাস্থ্য ও মানসম্মত খাবারের সরবরাহ সুনিশ্চিত করতে প্রচারণা, প্রশিক্ষণ ও প্রাথমিক পর্যায়ে আর্থিক এবং সরঞ্জামাদির মাধ্যমে সহায়তা করা উচিত। তালিকাভুক্ত পথখাবার বিক্রেতাদের সাময়িক ট্যাক্স ছাড় দিয়ে পরবর্তী সময়ে ব্যবসায় অগ্রগতি এলে সরকার এ পথখাবার খাত থেকে কিছুটা হলেও ট্যাক্স পেতে পারে।

শেষে বাস্তবতা এই, প্রতিনিয়ত মানুষের কাছে বৃদ্ধি পাচ্ছে ভাসমান পথখাবারের চাহিদা। তৈরি হচ্ছে সম্ভাবনাময় ব্যবসার একটা পরিসর। এমনই লাভজনক ব্যবসা হচ্ছে পথখাবার বা স্ট্রিট ফুডের কার্ট বা খাবার গাড়ি। যা কিনা ক্রমে জনপ্রিয় হচ্ছে ক্রেতা-উদ্যোক্তা উভয়ের কাছে। বিশেষ করে তরুণ-তরুণী ও স্বল্পপুঁজির মানুষের আয়ের সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হয়ে উঠছে ফুড কার্ট ব্যবসা। তাই স্ট্রিট ফুড শুধু আমাদের মুখরোচক খাবারের স্বাদই দিচ্ছে না, পাশাপাশি কর্মসংস্থানও তৈরি করে অর্থনীতিতে অবদান রাখছে।

 

মো. আবিদ মঈন খান: সাংবাদিক