শহরে বসবাসরত মধ্যবিত্তদের একটি অংশ আর্থিক সংকটের কারণে শহর ছেড়ে গ্রামের বাড়িতে ঠাঁই নিতে বাধ্য হয়েছে। অন্যদিকে বিদেশ থেকে চাকরি হারিয়ে দেশে আসা মানুষও গ্রামে অবস্থান করছে। করোনায় শহরের মতো গ্রামেও এখন কর্মসংস্থানের সুযোগ কমে এসেছে। এমন পরিপ্রেক্ষিতে কর্ম হারিয়ে গ্রামে ফেরা জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ৫০০ কোটি টাকার স্কিম হাতে নিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজ সুবিধার আওতায় এসব জনগোষ্ঠীকে আনার লক্ষ্যে এ কার্যক্রম হাতে নেয়া হয়েছে। সন্দেহ নেই, গ্রামে উপযুক্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা সম্ভব হলে গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙ্গা হবে। তবে তার জন্য প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত চিহ্নিত এবং অর্থের মসৃণ প্রবাহ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এ স্কিমের সাফল্য বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কর্মতত্পরতার ওপর নির্ভর করছে। বাংলাদেশ ব্যাংককেও তদারকি জোরদারের মাধ্যমে স্কিমের সর্বোচ্চ উপযোগ নিশ্চিত করতে হবে।

বাংলাদেশ এক দশকের বেশি সময় ধরে উচ্চ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করলেও কাঙ্ক্ষিত কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারেনি। বিশেষজ্ঞরা একে কর্মসংস্থানহীন প্রবৃদ্ধি হিসেবেও অভিহিত করে আসছিলেন। করোনার আঘাতে কর্মসংস্থান পরিস্থিতি আরো ভঙ্গুর হয়ে পড়ে। আনুষ্ঠানিক খাতে চাকরি হারানোর হার কম হলেও অনানুষ্ঠানিক খাতে এ হার অনেক বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। কাজ হারিয়ে অনেকেই গ্রামে ফিরে গেছেন। কিন্তু গ্রামে কর্মসৃষ্টির হার আগে থেকেই শ্লথ ছিল। করোনায় সেটি আরো কমে এসেছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প-কারখানাগুলোও বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে গ্রামে ফিরেও কাজ না পেয়ে মানবেতর জীবন অতিবাহিত করছেন অনেকে। তাদের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘ঘরে ফেরা বিষয়ক পুনঃঅর্থায়ন কর্মসূচি’ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এ ঋণ বিতরণে নানা জটিলতা রয়েছে। মূল সমস্যা হলো, ব্যাংকগুলো ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা পর্যায়ে ঋণ দিতে কম আগ্রহ দেখায়। কারণ এ ঋণ মনিটরিং ও আদায় করা কঠিন এবং তুলনামূলক ব্যয়সাপেক্ষ। তবে গ্যারান্টির আওতায় আসায় কিছুটা আগ্রহ বাড়তে পারে। কিন্তু শতভাগ বাস্তবায়ন নিয়ে শঙ্কা থেকেই যাচ্ছে। অতীতে আমাদের প্রণোদনা ব্যবহারের ইতিহাস ভালো নয়। যাদের প্রণোদনা প্রয়োজন তারা সবসময় এটা থেকে লাভবান হননি। তাই এবার প্রণোদনার উপকারভোগী কারা হবেন সেটা সুনির্দিষ্ট করা প্রয়োজন। নইলে প্রণোদনা মধ্যস্বত্বভোগীদের হাতে চলে যেতে পারে।

গ্রামে ফেরত যাওয়া বা কাজ হারানো জনগণের জন্য ভারতকে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করতে দেখা গেছে। দেশটি তাদের মডেল ভিলেজ প্ল্যান কিংবা গ্রামাঞ্চলে শহুরে সুবিধা নামের কর্মসূচির আওতায় গ্রামীণ কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে গ্রামে থাকাকে উৎসাহিত করেছে। তামিলনাড়ু, জম্মু ও কাশ্মীর কিংবা ঝাড়খণ্ডও ওই কর্মসূচির সফল বাস্তবায়নে অনেকটাই সক্ষম হয়েছে। আবহাওয়া ও এলাকাভেদে দেশটি বিভিন্ন ধরনের কার্যক্রম গ্রহণ করে। জম্মু ও কাশ্মীরের গ্রামগুলোয় বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে কৃষির বিকাশের লক্ষ্যে সেখানের কৃষিবিজ্ঞান কেন্দ্রের সঙ্গে স্থানীয় কৃষকের মোবাইল নম্বর যুক্ত করা হয়। এরপর কেন্দ্রের পক্ষ থেকে আবহাওয়া সম্পর্কিত বিভিন্ন পূর্বাভাসের খবর মোবাইল বার্তায় পাঠানো হয় কৃষিজীবী মানুষদের কাছে। শস্য উৎপাদন ও ফলন সম্পর্কেও বিভিন্ন ধরনের তথ্য পৌঁছে দেয়া হয়। শস্যবীজ বপনের ক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণ, মাটি পরীক্ষা, শস্য সুরক্ষা, ফসল তোলার পরবর্তী পর্যায়ে প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং বিপণন-সংক্রান্ত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেয়া হয় কৃষকদের। এদিকে তামিলনাড়ুতে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ব্যবস্থা করা হয় কর্মসংস্থানের। প্রশিক্ষণার্থীদের নিজস্ব শিল্পোদ্যোগ গড়ে তুলতে আর্থিক সহায়তা দেয়া হয়। কাজটি করতে প্রতিটি এলাকা থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্যকে বেছে নিয়ে তার হাতে কাজের দায়িত্ব অর্পণ করা হয়। একই সঙ্গে এ ধরনের বিভিন্ন প্রকল্পে যুক্ত করা হয় বেসরকারি খাতকেও।

জামানতবিহীন আলোচ্য ঋণ প্রদান কার্যক্রম জটিল প্রক্রিয়া। যাকে ঋণ দেয়া হবে, তার সেটি পরিশোধের সক্ষমতা আছে কিনা তা যাচাই করা কঠিন। তবে গ্রামে ফেরাদের আবাসনের ব্যবস্থা করার পাশাপাশি সহজ শর্তে ব্যাংকঋণের মাধ্যমে কৃষিকাজ ও কুটির শিল্পভিত্তিক কর্মকাণ্ড পরিচালনায় উৎসাহী করলে তা অর্থনীতির জন্য ফলপ্রসূ হতে পারে। গ্রামীণ অর্থনীতিতে অবদান রাখতে পারে এ রকম শিল্প, যেমন মৃিশল্প, মত্স্য চাষ, ইলেকট্রিক ওয়্যারিংয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা যেতে পারে। একই সঙ্গে গ্রামে উৎপাদিত পণ্য যাতে সহজেই শহরে আসতে পারে আবার গ্রামে যাতে কাঁচামালের সহজলভ্যতা নিশ্চিত হয়, সে ব্যবস্থা করতে বাজারজাতের সহজীকরণের প্রতি আমাদের নজর দিতে হবে। ডেলিভারি চ্যানেলকে শক্তিশালী ও বিস্তৃত করতে দেশের ব্যবসায়ী গোষ্ঠীগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে। তবে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়ন-সংক্রান্ত অভিজ্ঞতা খুব একটা সুখকর ছিল না। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে বলা হয়েছিল ঋণনির্ভর প্রণোদনার টাকা ব্যবসার চলতি মূলধন হিসেবে ঋণগ্রহীতাদের মাঝে বিতরণ করতে, যাতে তারা মূল ঘাটতি কাটাতে এটি ব্যবহার করতে পারেন। এ প্রণোদনা ঋণ বিতরণের মূল উদ্দেশ্য ছিল প্রতিষ্ঠানগুলো যেন তাদের মূলধন ঘাটতি মিটিয়ে যথাযথভাবে উৎপাদন প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত হতে পারে এবং এর ফলে শ্রমিকের কর্মহীন হওয়া বা ঝরে পড়াটা রোধ হবে। কিন্তু বাস্তবে এ প্রণোদনা ঋণ কতটা যথাযথভাবে ব্যবহার হয়েছে তা দেখার বিষয়। আগের দফায় এসএমই খাতের জন্য ঘোষিত প্রণোদনার অর্থ বিতরণে ব্যাংকগুলোর ব্যর্থতায় সরকার পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনসহ কিছু প্রতিষ্ঠানকে কাজে লাগানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কাজ হারিয়ে গ্রামে ফেরা জনগোষ্ঠীর জন্য ঘোষিত স্কিম বাস্তবায়নে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করা যেতে পারে। কারণ মাঠ পর্যায়ে তাদের বিচরণ থাকায় অর্থ প্রদান ও তা আদায় অনেক মসৃণ হবে। বেসরকারি ও সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গ্রামে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসছে। ব্যাংকের পাশাপাশি তাদের সম্পৃক্ত করার পদক্ষেপ নেয়া হলে কাঙ্ক্ষিত ফল মিলতে পারে। শুধু অর্থ দিলেই হবে না, সেটি সদ্ব্যবহারে প্রশিক্ষণ ও তদারকিও নিশ্চিত করতে হবে।

সরকারের মধ্যমেয়াদি আর্থিক নীতি বিবৃতি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, কর্মসংস্থান সৃষ্টি বিষয়ে বলা হয়েছে, স্বল্প সুদে ঋণ সহায়তা সম্প্রসারণের মাধ্যমে গ্রামাঞ্চলে, বিশেষ করে কৃষি খাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য রয়েছে। এটি গ্রামের দরিদ্র কৃষক, প্রবাসী শ্রমিক এবং প্রশিক্ষিত ও বেকার যুবকদের কৃষি ক্ষেত্রে, কৃষিসংশ্লিষ্ট উৎপাদন ও সেবা, গ্রামীণ অঞ্চলে ক্ষুদ্র ব্যবসা এবং আত্মকর্মসংস্থানে নিয়োজিত রাখতে উদ্বুদ্ধ করবে। সরকার দক্ষতা উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে, যার মাধ্যমে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর দক্ষতা, শ্রমের উৎপাদনশীলতা ও মজুরি বৃদ্ধি করা অন্যতম লক্ষ্য। এটি অর্জনে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ৫০০ কোটি টাকার ‘ঘরে ফেরা বিষয়ক পুনঃঅর্থায়ন স্কিম’ সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে। তবে তার জন্য স্কিমের সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। উপকারভোগীদের সক্ষমতা ও কর্মদক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রশিক্ষণ-পরবর্তী তারা তাদের দক্ষতা কতটা কাজে লাগাতে পারছেন তাও মনিটর করা জরুরি। প্রশিক্ষণ-পরবর্তী আয়বর্ধনকারী ব্যবসা বা পেশা চালুর জন্য যে ঋণ দেয়া হবে, উপকারভোগীরা সঠিক খাতে ব্যবহার করছেন কিনা দেখতে হবে তাও। সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ বিষয় হলো, প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত চিহূিত করা। এক্ষেত্রে কোনো ধরনের অনিয়ম হলে স্কিমের উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে, যা কারো কাম্য নয়।