চলাচলে বিধিনিষেধ, চাহিদা কমে যাওয়াসহ নানা কারণে হিমাগারে ৫৫ লাখ টন আলু মজুদ রয়েছে। বাজারদর নিম্নমুখী থাকায় হিমাগার থেকে আলু খালাসও হচ্ছে না। এ অবস্থায় চলতি বছর ২০ লাখ টন আলু নষ্ট হওয়ার আশাঙ্কা করছে বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশন। এদিকে নতুন আলু রোপণের মৌসুম এসে গেছে। কিন্তু এই বিপুল পরিমাণ আলু এখনই বিক্রি করতে না পারলে তা খাবার অনুপযোগী হয়ে পড়বে, এ কথা নিশ্চিত করে বলা যায়। এতে ব্যবসায়ী, কৃষক সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। পরিস্থিতি উন্নয়নে হিমাগারে সংরক্ষিত আলু দ্রুত বিক্রির পদক্ষেপ নিতে হবে। সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, কৃষি মন্ত্রণালয়ের  মাধ্যমেই কাজটি করা যেতে পারে।

খাবার তালিকায় ভাতের পরই আলুর স্থান। আলু বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম খাদ্যশস্য। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার সর্বশেষ পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে, আলু উৎপাদনে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান সপ্তম। আবার ইন্টারন্যাশনাল পটেটো কাউন্সিলের তথ্যমতে, বাংলাদেশ পৃথিবীর সপ্তম বৃহত্তম আলু উৎপাদনকারী দেশ এবং এশিয়া ও প্যাসিফিক অঞ্চলে বাংলাদেশের স্থান তৃতীয়। বিশ্বের অনেক দেশেই আলু প্রধান খাদ্য। আমাদের দেশে ভাতের বিকল্প হিসেবে আলু খেতে বলা হলেও তা খুব একটা জনপ্রিয়তা পায়নি। বাংলাদেশে আলু উৎপাদনে নীরব বিপ্লব ঘটেছে। উৎপাদন বেড়েছে ২৬ গুণ। মাথাপিছু আলু খাওয়ার পরিমাণ বেড়েছে ১০ গুণ। আলুচাষীদের পরিশ্রম, কৃষিবিজ্ঞানী ও কৃষি বিভাগের সহযোগিতায় এটির উৎপাদনে ব্যাপক অগ্রগতি হয়েছে। কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হলো উৎপাদন বাড়লেও এর বিপণন, ব্যবহার, পরিভোগ ও রফতানি আশানুরূপ বাড়েনি। প্রক্রিয়াজাত শিল্পও গড়ে ওঠেনি। এর জন্য অবশ্য সরকারের নীতির দুর্বলতা ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতাকেই দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। এ পর্যায়ে রফতানির দিকে মনোযোগ বাড়াতে হবে। রফতানি বাড়াতে হলে আলুর উন্নত জাত সম্প্রসারণ ও মান নিশ্চিতে পরীক্ষাগার তৈরি করতে হবে। উন্নত বীজের জন্য গবেষণাও জোরদার করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্রক্রিয়াকরণ শিল্প গড়ে তুলতে হবে। উৎপাদন বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে আলুর ব্যবহার, পরিভোগ, বৈচিত্র্যকরণ বাড়ানো প্রয়োজন। এসবই দীর্ঘমেয়াদি সমাধান। স্বল্প মেয়াদে হিমাগারে সংরক্ষিত আলু সরকারকেই কিনে দ্রুত বিতরণের ব্যবস্থা করতে হবে। নইলে বিনষ্ট হওয়ার শঙ্কা এড়ানো যাবে না।

ভারতের পশ্চিম বাংলা, পাঞ্জাব, উত্তর ও মধ্য প্রদেশসহ আলুপ্রধান অঞ্চলগুলো গুদামজাত ব্যবস্থা উন্নত করেছে এবং প্রক্রিয়াজাত শিল্প গড়ে তুলেছে। শুধু তা-ই নয়, আকার ও রঙের বৈচিত্র্য আনাসহ উন্নত বীজের ব্যবস্থা করে আলুর গুণগত মান নিশ্চিত করেছে ভারতের কৃষি ও কৃষক কল্যাণ মন্ত্রণালয়। মানসম্মত আলু রফতানির জন্য জোর দেয়া হয়েছে অবকাঠামো শক্তিশালী করার দিকে। গত প্রায় তিন দশকে বিশ্বব্যাপী আলুর চাহিদা বেড়েছে প্রায় ৪০ শতাংশ। জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে পণ্যটির ব্যাপক বাজার চাহিদাকে গুরুত্ব দিয়ে তা কাজে লাগাতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করেছে ভারত। তার সুফলও পেয়েছে তারা, আলু রফতানিতে বিশ্বের দ্বিতীয় অবস্থানে এখন দেশটি। ভারত আলুর উৎপাদন বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে এর বিপণন ও ব্যবহার বাড়ানোর দিকে দৃষ্টি দিয়েছে। আর বাংলাদেশ শুধু উৎপাদন বৃদ্ধির দিকে দৃষ্টি দিয়েছে। ফলে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ আলু অবিক্রীত থাকছে ও নষ্ট হচ্ছে। কৃষি মন্ত্রণালয়কে তাই বিপণন, বিকল্প ব্যবহার, রফতানি ও প্রক্রিয়াজাত জোরদার করার উদ্যোগ নিতে হবে। বেসরকারি খাতকেও প্রণোদনা জোগানো যেতে পারে স্বল্প সুদে ঋণ প্রদান ও রফতানি সহায়তা প্রদানের মাধ্যমে।

চাহিদা ও উৎপাদন উভয়ই বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশেই আলু প্রক্রিয়াজাত কারখানা স্থাপিত হয়েছে এবং উৎপাদিত চিপস ও ফ্রেঞ্চ ফ্রাই বিদেশে রফতানিও হচ্ছে। রফতানি হচ্ছে ভিয়েতনাম, রাশিয়া, কাতার, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুরসহ প্রায় ৩০টি দেশে। উন্নত কলাকৌশল প্রয়োগের মাধ্যমে আলু বিপ্লব ঘটাতে পটেটো ক্লাস্টার গঠনের পরিকল্পনা নিয়েছে নেদারল্যান্ডসের কিছু প্রতিষ্ঠান। আলু উৎপাদনের এ অগ্রগতিতে, আলুর গুণগত মান আর প্রক্রিয়াকরণের সাফল্যে পিছিয়ে থাকা বাংলাদেশের জন্য নেদারল্যান্ডস হতে পারে অন্যতম সহযোগী। আমাদের দেশ থেকে আলু নিয়ে থাইল্যান্ড উন্নতমানের চিপস তৈরি করে বাংলাদেশেই বিক্রি করছে কয়েক গুণ বেশি দামে। মালয়েশিয়া ও দুবাইয়ের উদাহরণও এক্ষেত্রে বিবেচনায় নেয়া যেতে পারে। দেশেই উন্নতমানের চিপস কারখানা স্থাপনের মাধ্যমে অধিক আয়ের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এতে কৃষকও আলুর অধিক দাম পাবে। হিমাগার মালিকরা দীর্ঘদিন ধরে আলুর বহুমুখী ব্যবহার বৃদ্ধির জন্য সরকারি উদ্যোগের কথা বলে আসছেন। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে তেমন উদ্যোগ চোখে পড়ছে না। একজন মানুষের দৈনিক ১০০ গ্রাম আলু পরিভোগের প্রয়োজন রয়েছে। যদিও দেশে মাথাপিছু আলু পরিভোগ হচ্ছে ৬৫ গ্রাম। পরিভোগ বাড়াতে প্রচারণা জোরদার করা যেতে পারে। রাষ্ট্রীয় সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের মাধ্যমে আলু ক্রয় করে তা ট্রাকের মাধ্যমে অন্যান্য পণ্যের সঙ্গে বিক্রি এবং সরকারের কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচিতে আলুকে যুক্ত করা যেতে পারে। বিশেষজ্ঞরাও দীর্ঘমেয়াদে সরকারের নানা কর্মসূচিতে চাল-গমের সঙ্গে আলু বিতরণের প্রস্তাব দিয়েছেন, যা বিবেচনা করা যেতে পারে।

হিমাগারে অবিক্রীত আলু ত্রাণ হিসেবে কাজে লাগানো যেতে পারে। বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের জন্য ত্রাণ হিসেবে আলু দেয়া যেতে পারে। বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণে জানা গেছে, দেশের সব হিমাগারে যে পরিমাণ আলু আছে তার আর্থিক মূল্য কয়েকশ কোটি টাকা। অন্যদিকে রফতানিকারকদের কাছে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত পরিবহন না থাকায় আলু রফতানি অলাভজনক এবং ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। যেভাবেই বলি না কেন, এই বিপুল পরিমাণ আলু যেকোনো মূল্যে কাজে লাগাতে হবে। সরকারের বিভিন্ন ত্রাণ কর্মসূচি, বিভিন্ন বাহিনী ও বিভিন্ন সংস্থার রেশনের মধ্যে আলুকে সংযুক্ত করলে এ বিপুল পরিমাণ আলু বিক্রির খাত তৈরি হবে। রোহিঙ্গাদের খাদ্য চাহিদা মেটাতে এখন থেকে আলুকে প্রাধান্য দিলে আগামী মৌসুমের আগে এ অবিক্রীত আলু কাজে লাগবে। বিশ্বের অনেক দেশেই রুটি বা ভাতের বদলে আলু খাওয়ার প্রচলন আছে। তবে আমাদের দেশে আলু এখনো পরিপূরক বা সহায়ক খাবার। আলু ভাতের চেয়ে পুষ্টিকর। শর্করার জোগান দেয়ার পাশাপাশি আলু নানা ধরনের ভিটামিন ও খনিজ লবণের চাহিদা মেটায়। তবে অতিরিক্ত আলু খেলে ওজন বেড়ে যেতে পারে। ভাতের বিকল্প হিসেবে আলুর বিভিন্ন ব্যবহার জনপ্রিয় করে তোলাই হচ্ছে সময়ের দাবি।