এবার সিলেট ও সুনামগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতির যে অবনতি দেখা গেল, তাকে প্রকৃতির এক সতর্কবার্তা বলাই শ্রেয়। স্মরণ করা যেতে পারে, ২০০৪ সালে সিলেট নগরের অনেক এলাকা বন্যায় প্লাবিত হয়েছিল। এরপর প্রতি বর্ষায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হলেও এবারের মতো সুরমা নদীর উপচে পড়া পানিতে সিলেট নগরী বন্যাকবলিত হয়নি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাটবাজারসহ অনেক সরকারি কার্যালয়েও বন্যার পানি ঢুকে পড়েছে। বন্যার পানিতে শত শত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও বাসাবাড়ির জিনিসপত্র নষ্ট হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে সিলেট, সুনামগঞ্জের মানুষের চরম জনদুর্ভোগ সহজেই অনুমেয়। উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি অঞ্চলে বন্যা দেখা দিয়েছে। মানুষ বন্যার পানিতে আটকা পড়েছে অথবা বন্যা কেন্দ্রগুলোয় আশ্রয় নিচ্ছে। খাদ্য ও অন্যান্য মৌলিক প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের অভাব তৈরি হয়েছে। এলাকার স্কুলগুলো হয় বন্ধ বা আশ্রয়কেন্দ্রে রূপান্তর করা হয়েছে। বন্যাকবলিত এলাকায় বিদ্যুৎ নেই। এ পরিস্থিতিতে মানুষ অবর্ণনীয় কষ্টে আছে। এখন যা দরকার, তা হলো সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ, যাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্তদের কাছে অবিলম্বে সাহায্য পৌঁছানো যায়। ত্রাণ ও চিকিৎসা দলগুলোর জন্য পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করে আশ্রয়কেন্দ্রগুলোয় পাঠানো প্রয়োজন। দীর্ঘমেয়াদে বন্যা নিয়ন্ত্রণের জন্যও সরকারের ব্যবস্থা নেয়া উচিত।
অবর্ণনীয় দুঃখ-কষ্টে দিনাতিপাত করছে সুনামগঞ্জ ও সিলেটের মানুষ। দুঃখের বিষয় সিলেটের অনেক অঞ্চলেই এখনো ত্রাণসামগ্রী পৌঁছেনি। বানভাসিদের পান করার বিশুদ্ধ পানি নেই; ঘরে শুকনো খাবার নেই; প্রয়োজনীয় ওষুধ নেই; মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই। বাঁচার আশায় আশ্রয় নিয়েছে উঁচু জায়গায়, বাসার ছাদে একটুখানি আশ্রয়কেন্দ্রে। সেসব জায়গায় পৌঁছাচ্ছে না প্রয়োজনীয় ত্রাণসামগ্রী। হাজার হাজার অসহায় মানুষ হাত বাড়িয়ে আছে ত্রাণের জন্য। ত্রাণ পৌঁছলে চলছে হুড়োহুড়ি, কাড়াকাড়ি। এ মুহূর্তে চ্যালেঞ্জ হলো ত্রাণ ও ওষুধ সরবরাহ এবং বন্যাকবলিত এলাকায় জীবনযাত্রা স্বাভাবিক করা। বন্যায় সিলেট শহরসহ প্রতিটি উপজেলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেখানে বেশ কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্র প্লাবিত হয়ে মানুষ অন্ধকারে বসবাস করছে। ব্যবসায়ীরা যদিও এর আগে বলেছিলেন, বাজারে পর্যাপ্ত খাদ্য এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিসের সরবরাহ রয়েছে, তবে অনেক দোকান ও গুদাম পানির নিচে চলে যাওয়ায় সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হচ্ছে। ফলে সেখানে শিগগিরই খাদ্য সংকট দেখা দিতে পারে। প্রত্যন্ত গ্রামগুলোর অবস্থা আরো ভয়াবহ বলে জানা গেছে। বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতি বিপজ্জনক মোড় নিতে পারে। সেক্ষেত্রে সরকারের প্রস্তুতিও হতে হবে জোরালো। প্রয়োজনে প্রশাসনের পাশাপাশি সব ধরনের নিরাপত্তা বাহিনীকে উদ্ধারকাজে পুরোপুরি সম্পৃক্ত করতে হবে। এ মুহূর্তে প্রধান করণীয় হলো বিপন্ন মানুষগুলোকে উদ্ধার করে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাওয়া। যেখানে সড়ক ও নৌ-যোগাযোগ বন্ধ আছে সেখানে হেলিকপ্টারে করে মানুষকে উদ্ধার করতে হবে।
দেশে বন্যার প্রকৃতি ও ক্ষয়ক্ষতি মূলত তিনটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করে। প্রথমত, উজান থেকে কী পরিমাণে পানি আসছে। দ্বিতীয়ত, কত দ্রুত বা ধীরগতিতে পানি আসছে আর কত দিন ধরে সেই পানি বাংলাদেশে থাকছে। তৃতীয়ত, দেশের নদী-নালা-খাল-বিলে পানির ধারণক্ষমতা। উজানের ভারতীয় অঞ্চলে এবং দেশের ভেতরের প্রাকৃতিক স্বাভাবিকতা বিনষ্ট হওয়ায় সাম্প্রতিক বছরগুলোয় এ তিন ক্ষেত্রেই জটিলতা বেড়েছে এবং ক্ষয়ক্ষতি বেশি হচ্ছে। বিশেষত উজান থেকে আসা পলির পরিমাণ কমে যাওয়ার কারণে বর্ষা মৌসুমে নদীর তলদেশের গভীরতা ও নদীর পাড় ভাঙা বাড়ছে। আবার শুকনো মৌসুমে নদীগুলোর পানি পরিবহন ক্ষমতা কমে যাওয়ার ফলে এ পলি নদীর তলদেশে জমা হয়ে নদী ভরাট করে ফেলছে। আবার দেশের ভেতরের নদ-নদীর নাব্যতা কমে যাওয়া, চ্যানেলগুলো বন্ধ হওয়ার কারণেও দিন দিন বন্যা বাড়ছে। এসব সংকটের সমাধান না করতে পারলে বন্যার দুর্ভোগ থেকে মুক্তি মিলবে না। বন্যা মোকাবেলায় সব কর্তৃপক্ষ সমন্বিতভাবে কাজ করবে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঘন ঘন বন্যা আরো তীব্র আকার ধারণ করছে। এটি একটি আপৎকালীন অবস্থা, যা প্রাকৃতিক ও মনুষ্যসৃষ্ট উভয় কারণেই আরো খারাপ হয়েছে। পুকুর, খাল ও হাওর, যেগুলো একসময় এ অঞ্চলজুড়ে বিস্তৃত ছিল এবং বন্যার সময় অতিরিক্ত পানির জলাধার হিসেবে কাজ করত, গত কয়েক দশকে সেগুলো বিলুপ্ত হয়ে গেছে। অবিবেচনাপ্রসূত উন্নয়ন, নগরায়ণ এবং ত্রুটিপূর্ণ সরকারি নীতির জন্য এমনটা হয়েছে। ওই এলাকায় অনেক নদ-নদীও দখল করা হয়েছে। এতে গ্রীষ্মকালে এগুলো শুকিয়ে যায় এবং স্বাভাবিকের চেয়ে একটু বেশি বৃষ্টি হলেই উপচে পড়ে।
মূলত প্রতি বছরই বাংলাদেশে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি কেন হচ্ছে—এর কারণ অনুসন্ধানেই অনেকটা ব্যর্থ দায়িত্বশীল মহল। তাদের মতে, অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত এবং ভারত উজান দেশ হওয়ার কারণে সেখান থেকে পানি এসে বন্যার সৃষ্টি করছে। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, বন্যার মূল কারণই হলো পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করা, নদী দখল করা, নদীর নাব্যতা কমে যাওয়া। দেশের নদ-নদীর স্বাভাবিক প্রবাহকে সবসময় যদি সাবলীল রাখা যায় তাহলে বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টির কোনো সুযোগই নেই। আর এটিই করে দেখিয়েছে নেদারল্যান্ডস। ১৯৫৩ সালে নেদারল্যান্ডসে ইতিহাসের এক ভয়াবহ বন্যা হয়েছিল। নর্থ সি থেকে পানি উঠে এসে প্রায় গোটা নেদারল্যান্ডস ভাসিয়ে দিয়েছিল। এতে লাখ লাখ নাগরিক মারা যায়। মারা যায় লাখ লাখ গবাদিপশু, যা ছিল দেশটির তৎকালীন অর্থনীতির মেরুদণ্ড। এছাড়া হাজার হাজার ভবন সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়েছিল। এ ক্ষতির যাতে পুনরাবৃত্তি না হয়, এজন্য ১৯৫৩ সালেই একটি গবেষণা ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা এবং তার আওতায় ডেল্টা ওয়ার্কস নামে কর্মসূচি চালু করা হয়। এ কর্মসূচির আওতায় হাতে নেয়া হয় রটারড্যাম হারবার প্রকল্প এবং রাষ্ট্রীয় নদীশাসন প্রকল্প। এ প্রকল্পের আওতায় রয়েছে অত্যাধুনিক একটি প্রযুক্তি, যার নাম মাজলাংক ইয়ারিং। এ প্রযুক্তিতে নদীর দুই পাশে দুই স্টিলের বাহু রয়েছে। বাহুর মাথায় রয়েছে হাতুড়ির মতো নিরেট ব্যারিয়ার। একেকটি বাহু দৈর্ঘ্যে আইফেল টাওয়ারের সমান। জোয়ারের সময় নদীর দুই পাশ থেকে দুই বাহু এসে নদীপথ বন্ধ করে দেয়, যাতে মূল ভূখণ্ডে প্লাবন না হয়। আবার জাহাজ প্রবেশের সময় খুলে দেয়া হয়। এসব কারণে নেদারল্যান্ডস সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এক মিটার নিচে অবস্থিত হওয়া সত্ত্বেও সাগর-নদীর ঢেউ এখন আর বন্যাকবলিত করতে পারে না। উল্টো বিভিন্নমুখী প্রকল্পের কারণে বর্তমানে দেশটির ভূভাগের ১৭ শতাংশ হচ্ছে সমুদ্র ও হ্রদ থেকে উদ্ধারকৃত জমি। দেশটির সরকার ও তাদের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো একযোগে কাজ করে বড় সব নদী ও সাগরের পানিরাশিকে নিয়ন্ত্রণ করে ফেলেছে। বাংলাদেশ সরকারও শতবর্ষমেয়াদি ব-দ্বীপ পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এর আওতায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং তা মোকাবেলায় দেশীয় উপযোগী কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হবে বলে প্রত্যাশা। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দেশে বন্যার প্রকোপ বাড়বে, সেটি মোকাবেলায় সরকারের সক্ষমতাও বাড়াতে হবে।
বর্তমানে উদ্ধার কর্মসূচির পাশাপাশি প্রয়োজনীয় ত্রাণসামগ্রীও দ্রুত পৌঁছাতে হবে বন্যা উপদ্রুত এলাকায়। যেসব স্থানে রান্নার সুযোগ থাকবে না, সেসব স্থানে শুকনা খাবার সরবরাহ করতে হবে। ত্রাণকেন্দ্রগুলোয় যাতে রোগ ছড়িয়ে না পড়ে, সে বিষয়েও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নজর দিতে হবে। সিলেটের সঙ্গে যত দ্রুত সম্ভব বিমান যোগাযোগ পুনঃস্থাপন করতে হবে। হেলিকপ্টার ব্যবহার করে খাদ্য ও ওষুধ পাঠানোর ব্যবস্থা করতে হবে। সর্বাগ্রে সবাইকে নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়ে আসতে হবে। সরকারের সংশ্লিষ্ট সব বিভাগ ও প্রতিষ্ঠানকে একযোগে কাজ করতে হবে। এগিয়ে আসতে হবে রাজনৈতিক নেতৃত্ব, স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ের জনপ্রতিনিধিদেরও। দেশে বহু বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা আছে, তাদেরও এ ত্রাণ ও উদ্ধারকাজে সম্পৃক্ত করা যেতে পারে। সরকারিভাবে অনেক এলাকায় ত্রাণ সহায়তা দেয়া হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে এসব মানুষের কাছে অতিদ্রুত ত্রাণসামগ্রী পৌঁছে দিতে হবে। বন্যার্তদের সাহায্যের জন্য নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র খুলতে হবে এবং নিয়মিত বিশুদ্ধ পানি, খাবার ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। শিশু ও বৃদ্ধদের নিরাপদ স্থানে রাখতে হবে। গৃহপালিত পশু-পাখি নিরাপদে সরিয়ে আনতে হবে। তবে এক্ষেত্রে সরকারের পাশাপাশি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী ও দেশের সামর্থ্যবানদের বন্যাদুর্গত মানুষের সাহায্যে এগিয়ে আসতে হবে।
যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ পানি ও খাবার সংকট। ডায়রিয়াসহ পানিবাহিত রোগের লক্ষণ এখনো দেখা না গেলেও অচিরেই আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে নদ-নদীর পানি উপচে বন্যার পদধ্বনি কেবল নয়, এমন পরিস্থিতি আমাদের জন্য দুর্ভাবনার। সামনে ভয়াবহ বন্যার যে আশঙ্কা করা হচ্ছে, তা আমলে নিয়েই সরকারের এখন থেকে পরিস্থিতি মোকাবেলায় ব্যবস্থা নেয়া উচিত। বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ এড়ানো আমাদের আয়ত্তের বাইরে। তবে যথাযথ প্রস্তুতি নিলে মানুষের দুর্ভোগ, ক্ষয়ক্ষতি নিশ্চয়ই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। বন্যার্তদের জন্য পর্যাপ্ত খাদ্যসহায়তার সংস্থানে সরকারের যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে। বিশুদ্ধ পানি, ওষুধপত্র এবং চিকিৎসা সেবাও প্রস্তুত রাখা দরকার। সরকার ও প্রশাসন এ বিষয়ে সচেতনতা ও দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেবে—এটাই প্রত্যাশা করি।










