নববর্ষ বা বৈশাখ মাস এলেই বাঙালি জনগোষ্ঠীর মাঝে উৎসব-আনন্দের অনুভূতি পরিলক্ষিত হয়। বৈশাখী মেলার আয়োজনে বাংলাদেশকে মেলার আমেজে মেতে উঠতে দেখা যায়। যদিও বাংলাদেশে বৈশাখী মেলা ছাড়াও অঞ্চলভেদে ঋতুকেন্দ্রিক বিভিন্ন মেলার উপস্থিতিও বিশেষভাবে লক্ষণীয়। মেলা উৎসব হলেও এর সঙ্গে গ্রামীণ জনজীবনের জীবিকা ও দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা বিদ্যমান। মেলাকে কেন্দ্র করেই কিছু পেশাজীবী মানুষ সারা বছরের জীবিকা নির্বাহ করেন। কেউ উৎপাদকের কাছ থেকে পণ্য কিনে মেলায় বিক্রির জন্য নিয়ে আসেন, আবার কেউ উৎপাদনকারী বা প্রস্তুতকারী হয়ে নিজেই পণ্য বিক্রির উদ্দেশ্য নিয়ে মেলায় উপস্থিত হন। মৃিশল্পসামগ্রী প্রস্তুতকারী কুমারপাল বা মুড়ি-মুড়কির মতো খাদ্যসামগ্রীর প্রস্তুতকারীদের অনেকেই বংশগতভাবে দীর্ঘদিন ধরে এ পেশার সঙ্গে নিযুক্ত আছেন। কালের বিবর্তনে মেলা সংস্কৃতির কাঠামোগত ও পরিবেশগত পরিবর্তনও সাধিত হয়েছে। গ্রামীণ মেলায় মুড়ি, মুড়কি, বিন্নি খই, রেশমি চুড়ি, নাগর দোলনা বা মৃিশল্প সামগ্রী সরবরাহকারীদের অভিজ্ঞতার আলোকে নিবন্ধটি লিখিত।

আঞ্চলিকভাবে বিখ্যাত বিভিন্ন গ্রামীণ মেলার সঙ্গে স্থানীয় মানুষের সম্পর্ক শুধু উৎসবকেন্দ্রিক নয়। শুধু শখের পণ্য কিনতে মেলায় যায় না, গ্রামবাসী মেলা থেকে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদিও সংগ্রহ করে। শখের বশে মুড়ি, বিন্নি খই, চিনির তৈরি সাজ বা বাচ্চার জন্য খেলনা কিনলেও অনেক গ্রামের মানুষ সারা বছরের ভোগ্যপণ্য যেমন খাবার মসলা, রান্নার তৈজসপত্রসহ নানা পণ্য মেলা থেকে সংগ্রহ করে। উত্তরাঞ্চলের কিছু প্রত্যন্ত এলাকা এমনকি গাজীপুর, টাঙ্গাইল, মানিকগঞ্জের বিভিন্ন গ্রামবাসীর কাছে মেলা এখনো উৎসবের পাশাপাশি নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি সংগ্রহের একটি ইভেন্ট।

গ্রামের মানুষের সঙ্গে আলোচনায় জানা যায়, তিন দশক আগেও গ্রামে সারা বছর সব ধরনের ভোগ্যপণ্য সহজলভ্য ছিল না। মেলাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন পণ্যের আগমন ঘটত এবং মেলার পাশের এলাকার মানুষজন ওইসব পণ্য সংগ্রহ করে রাখত। সাম্প্রতিক দশকে বাজার, তথ্যপ্রযুক্তি ও যোগাযোগ ব্যবস্থার সম্প্রসারণ গ্রামেও পণ্য আদান-প্রদানকে সহজলভ্য করে তুলেছে। পণ্যের জন্য মেলা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয় না। গ্রামীণ বাজারে পণ্যের উপস্থিতি মেলার নিত্যপণ্যের বাজারকে অনেকটাই সংকুচিত করে। গ্রামীণ জনগোষ্ঠীরও আধুনিক পণ্য ব্যবহারের অভ্যাস ঐতিহ্যবাহী নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি যেমন মৃৎ শিল্প বা মাটির তৈরি তৈজসপত্রের মতো পণ্যের প্রতি নির্ভরশীলতা হ্রাস করে। দিনে দিনে আধুনিক জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর কাছেও মেলার আবেদন শুধু উৎসবেই রূপান্তরিত হতে দেখা যায়। 

মেলাকে কেন্দ্র করে জীবিকা নির্বাহকারীরা পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে কীভাবে খাপ খাওয়াচ্ছে বা মেলার পরিবর্তনটাই বা কী? উল্লেখ্য যে করোনা-১৯ প্রেক্ষাপটে দুই বছর দেশের বিভিন্ন প্রান্তে মেলা জমে ওঠেনি। মেলাকে কেন্দ্র করে জীবিকা নির্বাহকারী এ শ্রেণীর মানুষজন অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পত্রপত্রিকায় খবর এসেছে এ ধরনের পেশার মানুষজনকে কেন্দ্র করে কোনো প্রণোদনা দেয়া হয়নি। তাদের জীবিকাও হুমকির মুখে পড়েছে।

সাম্প্রতিক দশকে গ্রামীণ বা মফস্বলের মেলায় আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে। মেলায় পণ্যের ধরন থেকে শুরু করে বিক্রেতা, বিক্রির ধরন পর্যন্ত অনেক বিষয়েরই পরিবর্তন ঘটছে। ভাববার সময় এসেছে সনাতনী পেশায় নিয়োজিত এসব জনমানুষ কীভাবে আধুনিকতার সঙ্গে নিজেদের অভিযোজিত করছে। 

২০১৭ সালে মানিকগঞ্জের সাটুরিয়ার একজন কুমারপালের সঙ্গে আলাপ হয়। তার জীবনগল্প এ আলোচনায় প্রাসঙ্গিক। ৬০ বছর বয়সী দীপক পাল বাপ-দাদাকে অনুসরণ করে মাটির হাঁড়ি-পাতিল, খেলনা তৈরি করাকে নিজের পেশা হিসেবে ধরে রেখেছেন। পড়ালেখায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গণ্ডি পার হননি। এক ছেলে, দুই মেয়ের সবাই বিবাহিত হয়ে অন্যত্র পরিবার গঠন করেছেন। ছোটবেলা থেকে বাবার সঙ্গে হাঁড়ি-পাতিল, পুতুল, খেলনা তৈরি করতেন। বাবার সঙ্গে মেলায় গিয়ে বিক্রি করতেন। শুধু মানিকগঞ্জে নয়, টাঙ্গাইল, নাগরপুর, গাজীপুরের বিভিন্ন মেলায় অংশ নিতেন। বাবার বয়স হওয়ার পর নিজেই বাবার কাজের হাল ধরেন। কখন কীভাবে এ কাজে পারদর্শী হয়ে উঠছেন তা বুঝতেই পারেননি। যেটুকু আয় হতো তাতে সংসার ভালোভাবেই চলে যেত। কিন্তু আধুনিকতার সঙ্গে তাল মেলাতে পারেননি। নব্বইয়ের দশক থেকে মেলা আধুনিক রূপ ধারণ করতে থাকে। ‘শিক্ষিত’ না হওয়ার ফলে আধুনিকতার সঙ্গে তাল মেলাতে পারেননি। তার মতো ছেলেও পড়ালেখা না করে এ পেশায়ই নিযুক্ত হয়েছিলেন। কিন্তু ছেলে পরবর্তী সময়ে আর এ পেশায় থাকেননি। সাভারে গিয়ে স্টেশনারি দোকানে বিক্রয়কর্মী পেশা গ্রহণ করেন।

দীপক পালের মতো সাভার, ধামরাই অঞ্চলের প্রায় ১৫ জন কুমারপালের অভিজ্ঞতা একই রকম। প্রায় সমরূপ অভিজ্ঞতা মুড়ি-মুড়কি, বিন্নি খই বা রেশমি চুড়ি বিক্রেতাদের। মেলায় চুড়ি বিক্রেতা নারীদের পেশা বংশগত না হলেও অনেকেই মা, দাদি-নানিদের কাছ থেকে এ পেশা গ্রহণ করেছেন। একজন ৫৫ বছর বয়সী রেশমি চুড়ি বিক্রেতা নারী বলেন, ‘আমার মা, নানিদের দেখাদেখি এ পেশায় আসি। তবে এখন আর এ দিয়ে সংসার চলে না। দুই মেয়েকে গার্মেন্টসে কাজে দিছি। ওরা এখন বেতন পায়, আমাগোর মতো আয় অনিশ্চিত না।’

কিন্তু সেই আধুনিকতার ধরনটা কী, যার সঙ্গে তাল মেলানো কঠিন? এটা দৃশ্যমান যে নব্বইয়ের দশক থেকে মেলার কাঠামোগত পরিবর্তন শুরু হয়েছে। মাঠে খোলা জায়গার পরিবর্তে স্টল স্থাপনা, গেট পাস, নানাবিধ অনুমতি, স্থান পাওয়ার জন্য টেন্ডার আবেদন, জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি প্রদান—এ বিষয়গুলোর সূত্রপাত ঢাকা বা বড় শহর দিয়ে হলেও বর্তমানে তা দেশের বিভিন্ন মফস্বল বা গ্রামেও ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে। দীপক পালের মতো মেলার পণ্য সরবরাহকারীরা আগে মেলার আগের দিন বা মেলার দিন ভোরবেলায় নির্দিষ্ট স্থানে গিয়ে মালপত্র নিয়ে বসে যেতেন। মেলায় মালপত্র বিক্রি করে বাসায় ফিরে আসতেন। ক্ষেত্রবিশেষে মেলার সময় শেষ হলেও মেলার পরদিনও সেখানে মালপত্র বিক্রি হতো। এভাবে ঘুরে ঘুরে দেশের বিভিন্ন জায়গায় মেলায় অংশগ্রহণ ছিল তাদের জীবিকার অংশ। কিন্তু মেলার আধুনিক সংস্কৃতিতে যুক্ত হওয়ার জন্য মেলার আগেই স্টল বরাদ্দের আবেদনপত্র জমা, ক্ষেত্রবিশেষে স্টল বরাদ্দের জন্য ব্যাংকে জামানতের টাকা জমা দেয়া বা এগুলো করার জন্য যে ধরনের নেটওয়ার্ক, ‘শিক্ষা’ বা অভ্যস্ততার প্রয়োজন হয় তা তাদের না থাকায় মেলায় চিরায়ত পেশাজীবীদের অংশগ্রহণ সীমিত হয়ে পড়ছে। 

তবে চিরায়ত গ্রামীণ মেলার দৃশ্য এখনো অনুপস্থিত নয়। প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে এখনো মেলার চিরায়ত রূপ দৃশ্যমান হলেও পরিসর দিন দিন সংকুচিত হচ্ছে। এ সংকুচিত হওয়ার পেছনে নানাবিধ কারণও রয়েছে। প্রথমত, মফস্বল বা গ্রামে যে খোলা স্থানে, মাঠে মেলা বসত সেই খোলা স্থানগুলো কোথাও বাজার, কোথাও মার্কেট বা কোথাও ঘর-বাড়ি তৈরি হয়েছে। ফাঁকা জায়গা না থাকায় রাস্তার পাশে কর্তৃপক্ষ স্টল বরাদ্দ দিয়ে মেলা চালাচ্ছে। খোলা জায়গার স্বল্পতা, আধুনিক স্টল বরাদ্দ, নিরাপত্তা জোরদারকে কেন্দ্র করে মেলায় অংশগ্রহণ ও তার জন্য দাপ্তরিক কার্যক্রম সম্পাদন প্রক্রিয়া সাম্প্রতিক দশকে মেলার সনাতনী চরিত্রকে অনেকাংশে পাল্টে দিয়েছে। এ ধরনের ব্যবস্থা সব গ্রামীণ মেলায় না দেখতে পাওয়া গেলেও জেলা-উপজেলা এমনকি ইউনিয়ন পর্যায়েও স্টল বরাদ্দের বিষয়টি দৃশ্যমান।

দ্বিতীয়ত, স্টলেও মাটির তৈরি তৈজসপত্র বা খেলনা সমাগ্রী পাওয়া যায়। স্টলে বিক্রেতাদের বেশির ভাগই নিজে উৎপাদক বা প্রস্তুতকারী নন। স্টল সংস্কৃতির সঙ্গে শহুরে, ‘শিক্ষিত’ বা অধিক তথ্য ও যোগাযোগ জ্ঞানসম্পন্ন মানুষের সম্পর্ক। এ বিক্রেতা শ্রেণীর মানুষজন উৎপাদক বা প্রস্তুতকারীদের কাছ থেকে পণ্য কিনে মোড়কজাত করে মেলায় বিক্রি করেন। মেলায় ক্রেতার সংখ্যার চেয়ে দর্শক বেশি হয়, স্টল ভাড়া ও পণ্য আধুনিক করতে গিয়ে পণ্যের দাম বৃদ্ধি পায়। উৎপাদক বা প্রস্তুতকারীদের লাভ কম হয়।

তৃতীয়ত, কিছু গ্রামীণ মেলার সঙ্গে ঐতিহ্যগতভাবে ধর্মীয় সংস্কৃতির যোগসূত্র রয়েছে। মাজার ও মন্দিরকেন্দ্রিক মেলাগুলোয়ও আধুনিকতার ছোঁয়া মেলার স্থানকে সংকুচিত করেছে। উন্নয়ন কার্যক্রমের অংশ হিসেবে কোথাও কোথাও মাজারের খোলা জায়গায় কমপ্লেক্স তৈরি হয়েছে। মন্দিরের খোলা জায়গায়ও মন্দিরের কার্যালয়, মন্দিরের সম্প্রসারিত ভবন বা নাটমন্দির তৈরি হয়েছে। আবার এ ধরনের অনেক প্রতিষ্ঠানের ‘নিরাপত্তা’র কথা বিবেচনায় মেলার স্থানকেও বিশেষায়িত করা হয়েছে। দূর-দূরান্ত থেকে আসা খাদ্যবিক্রেতা, কুমারপাল বা রেশমি চুড়ি বিক্রেতাকে নানাবিধ পরিচয় প্রদানের মাধ্যমে মেলায় অংশগ্রহণ করতে হচ্ছে। একদিকে স্থান সংকট আর অন্যদিকে পরিচয় প্রদানের প্রক্রিয়া মেলার পণ্য বিক্রেতাকে নানাবিধ সমস্যার সম্মুখীন করছে। 

চতুর্থত, গ্রামীণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনপ্রণালিতেও আধুনিকতার ছোঁয়া লাগায় মাটির তৈরি তৈজসপত্রের ব্যবহার বা মুড়ি-মুড়কি বা বিন্নি খই খাবারের অভ্যাস বিশেষ বিশেষ উৎসবকেন্দ্রিক হয়ে উঠেছে। গ্রামীণ বাজারেও নানাবিধ পণ্যের ব্যাপক উপস্থিতি মেলার পণ্যকে উৎসবনির্ভর করে তুলেছে। গ্রামে বাজার ও যোগাযোগ ব্যবস্থার সম্প্রসারণ মেলায় নিত্যপণ্যের বাজারকে সংকুচিত করেছে।

পঞ্চমত, ঐতিহ্যবাহী পণ্য তৈরির কাঁচামাল দুষ্প্রাপ্য ও ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে। যেমন বিন্নি ধানের খইয়ের জন্য যে বিন্নি ধান প্রয়োজন তা এখন খুব কম জায়গায়ই উৎপাদিত হয়। পার্বত্য চট্টগ্রামে তার বহুল উপস্থিতি থাকলেও সেখান থেকে পণ্য পরিবহন খরচ বেশি। সাভারে ও মানিকগঞ্জের অনেক গ্রামেই এখনো বিন্নি ধান থেকে খই প্রস্তুত করে কিছু মানুষ জীবিকা নির্বাহ করে। তারা শুধু প্রস্তুতকারী। পাইকার এসে তাদের কাছ থেকে কিনে নিয়ে যান। কিছু পরিবার পূর্বপুরুষের ধারাবাহিকতায় পেশা হিসেবে এটিকে বহন করলেও কাঁচামালের দুষ্প্রাপ্যতা বা বেশি দামের কারণে অর্থ বিনিয়োগ করার সামর্থ্য অনেকেরই থাকে না। তাই পেশার পরিবর্তন ঘটে। একই অবস্থা কুমারপালের। এঁটেল মাটির স্বল্পতা, বেশি মূল্য এবং পরিবহন খরচ বেশি হওয়ার ফলে অর্থ বিনিয়েগের সামর্থ্য না থাকায় অনেক কুমারপাল বংশগত পেশা ছেড়ে দিচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রে পাইকাররা অর্থ বিনিয়োগ করেন, ওই পাইকাররাই প্রস্তুতকৃত পণ্য শহরে নিয়ে বিক্রি করেন। কিন্তু সেক্ষেত্রে কুমারপালরা লাভের খুব ক্ষুদ্র অংশ পেয়েই জীবিকা চালিয়ে নিতে বাধ্য থাকেন।

বাজার ব্যবস্থার সম্প্রসারণ মেলার বাইরেও মেলাকেন্দ্রিক পণ্যকে বৃহত্তর বাজার ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করেছে। শহুরে নিত্যবাজার ব্যবস্থা যেমন সুপার শপ, স্টেশনারি দোকান, শো পিসের দোকানে মেলার পণ্যের উপস্থিতি মেলে। বছরের যেকোনো সময় অনলাইনে অর্ডার দিয়েও মেলার পণ্য কেনা যায়। শহুরে জনগোষ্ঠীর কাছে মৃিশল্পের পণ্য নান্দনিক ও ব্যয়বহুল। শহুরে মানুষ একটি পণ্য অধিক দামে কিনছে বলে এটি ভাববার অবকাশ নেই যে উৎপাদক বা প্রস্তুতকারীদের গতিশীলতা বাড়ছে, আগের চেয়ে অধিক লাভে পণ্য বিক্রি করতে পারছে। বিষয়টি হচ্ছে শহুরে মানুষ কোন স্থান, কোন ব্যক্তি বা কোন প্রতিষ্ঠান থেকে পণ্য কিনছে। শহুরে জীবনে অভ্যস্ত একজন ব্যক্তি গ্রামীণ ঐতিহ্য বা গ্রামীণ জীবনের প্রতি আবেগতাড়িত হয়ে বাজার থেকে অধিক দামে মুড়ি-মুড়কি, মৃিশল্প সামগ্রী কিনলেও লভ্যাংশের ক্ষুদ্র একটি অংশ পৌঁছে গ্রামীণ উৎপাদকের কাছে। পণ্য আধুনিক বাজারে পৌঁছলেও খুব কম গ্রামীণ মৃিশল্পীর কারিগর বা খাদ্য উৎপাদকের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নয়ন ঘটে।

মৃিশল্প বা গ্রামীণ শিল্পকে ‘হেরিটেজ’ হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে হয়তো গ্রামীণ শিল্পের বাজার বাড়বে। ঐতিহ্যবাহী এসব পণ্যের জোগান দিতে গিয়ে ফরমায়েশি পণ্য প্রস্তুত হবে। কিন্তু চিরায়ত এসব পণ্য বিক্রির সঙ্গে জীবিকা জড়িত থাকলেও শিল্পকর্মের মধ্যে উৎপাদনকারীর জীবন অভিজ্ঞতা, সুখ-দুঃখ বা কখনো ভালোবাসা-সংগ্রাম পরিবেশিত হতো। ফরমায়েশি পণ্য প্রস্তুত করতে গিয়ে গ্রামীণ জীবন অভিজ্ঞতা কতটুকু গুরুত্ব পাবে বা আদৌ পাবে কিনা সেটিও ভাববার বিষয়। ঐতিহ্য বিকাশের এ প্রক্রিয়ায় গ্রামীণ মেলা ও তাকে কেন্দ্র করে জনমানুষের অভিজ্ঞতাও যে ‘হেরিটেজ’-এর অংশ, সে বিষয়টিও খেয়াল রাখা জরুরি। ঐতিহ্য সংরক্ষণের অংশ হিসেবে মেলাকে শুধু আধুনিক করলেই দায় শেষ হয় না, মেলাকে যারা টিকিয়ে রাখে তাদের দিকেও দৃষ্টি দেয়া প্রয়োজন। মেলাকে কেন্দ্র করে চিরায়ত পেশার সঙ্গে নিযুক্ত জনমানুষদের জীবিকা ও তাদের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতাকে সংরক্ষণ করাও জরুরি।

 

ড. রঞ্জন সাহা পার্থ: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক, বর্তমানে জাপানের টোকিও ইউনিভার্সিটি অব ফরেন স্টাডিজে ভিজিটিং প্রফেসর